শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ
ড. ওমর সুলাইমান 

 [সাইড নোট: "ডে-লাইট সেভিং" বন্ধ হয়ে যাওয়াতে ঘড়ির কাঁটা ১ ঘন্টা পেছানোয় জুমুআ শুরু হয়েছে সাড়ে বারোটায়। তার উপর আজকে বেশ বৃষ্টি ছিল। পার্কিং খুঁজে পেতেও অনেকক্ষন দেরি হয়েছে। দেরি করে পৌঁছানোয়, খুতবার প্রায় কিছুই শোনা হয় নাই।  যতটুকু শুনেছি সেটা মূলত ছিল এই বিষয়ে: অন্যের দোষ না খুঁজে, নিজের দোষ নিয়ে আমাদের চিন্তা করতে হবে। সহীহ হাদিসে নাকি আছে, যে ব্যক্তি অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ায়, আল্লাহ তা'য়ালা তার দোষ খুঁজবেন - অর্থাৎ আল্লাহ তার দোষ প্রকাশ করে দিবেন, কারণ আল্লাহ তা'য়ালার কাছে কিছুই অজানা নয়। খুতবায় পৌঁছানোয় দেরি হওয়ায় আগেই ভাবছিলাম যে কিছু দিন আগে শোনা অন্য একটা খুতবা নিয়ে লিখবো, কিন্তু সেটা যে মোটামুটি এই একই বিষয়ের উপর হবে, সেটা আগে ভাবি নাই। ড. ওমর সুলাইমানের এই খুতবাটা খুব বড় না, লিংক নিচে দিয়ে দিচ্ছি, কেউ দেখে নিলে আরো ভালো হবে।]

ইমাম শুরু করলেন ইমাম আল-সিরাজী (র:) -র একটা ঘটনা দিয়ে।  ইমাম আল-সিরাজী নিজেই এই ঘটনাটা বর্ণনা করেছিলেন। তিনি ছোট ছিলেন। এক রাতে তাঁর বাবা আর তিনি "কিয়ামুল লাইল" বা রাতের নামাজ [তাহাজ্জুদ?] পড়তে উঠেছেন। এই পর্যায়ে ইমাম (ওমর সুলাইমান) থেমে বললেন, ভাবা যায়, কী অদ্ভুদ সুন্দর তাঁদের আমল? এইসব আলেমরা ছোট বেলা থেকেই ইসলামী জ্ঞান আর আদব-কায়দা শিখে বড় হয়েছেন। বাবা-ছেলে ঘুম থেকে উঠে একসাথে নামাজ পড়তে দাঁড়িয়েছেন। আমাদের হয়তো সবার স্বপ্ন এমন একটা পরিবারের। যাই হোক, ঘুম থেকে উঠে নাকি তিনি (ইমাম আল-সিরাজী) খেয়াল করলেন আশেপাশে প্রতিবেশীরা সবাই ঘুমে, কেউ জেগে নাই। এই দেখে ছোট ইমাম আল-সিরাজী তাঁর বাবাকে বললেন: "আমরা ছাড়া কি আর কেউ দুই রাকাত নামাজ পড়ার নেই?" এটা শুনে তাঁর বাবা নাকি বলেছিলেন, বাবা তুমি জেগে না উঠে বরং ঘুমিয়ে থাকলে ভালো হতো! কারণ জেগে উঠে আল্লাহর বান্দাদের প্রতি অবজ্ঞা দেখানোর কারণে তোমার মধ্যে যে গর্ব কাজ করেছে, তার থেকে তুমি ঘুমিয়ে থাকলেই ভালো হতো!! ড. ওমর সুলাইমান বললেন, কত ছোট একটা ঘটনা কিন্তু কী গভীর তার শিক্ষা। আমরা অনেক সময়ই আমল করে হয়তো নিজেদের অজান্তেই গর্ব করে ফেলি, মনে অহংকার চলে আসে - এটা আমাদের ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট।  ইমাম স্মরণ করিয়ে দিলেন, সহীহ হাদিসে আছে রাসূল (সাঃ) বলেছেন, কারো মনে অনু পরিমান 'কিবর" বা গর্ব/অহংকার থাকলে সে ব্যক্তি জান্নাতে ঢুকতে পারবে না। 

ইমাম বললেন, আল্লাহ তা'য়ালার কাছে, দোষ করে, ভুল করে, গুনাহ করে যে ব্যক্তি অনুতপ্ত হয়, মাফ চেয়ে শোধরানোর চেষ্ঠা করে সেই ব্যক্তি বরং অনেক ভালো কাজ, ভালো আমল করে গর্ব করা ধার্মিক ব্যক্তির থেকে অনেক বেশি প্রিয়। ইমাম এরপর এই ব্যাপারে ইমাম ইবনে-আল-কাইয়ুম (র:)-র কিছু উক্তি বললেন, যেটা তিনি রাসূলের (সাঃ) হাদিসে পেয়েছেন, অনেকটা এইরকম: যখনই কেউ অন্যের ভুল বা দোষকে ব্যঙ্গ করে, সেটা আল্লাহ তার উপর এনে ফেলেন। দোষ করা প্রথম ব্যক্তি হয়তো পরে মাফ চেয়ে আল্লাহ তা'য়ালার ক্ষমা পেয়ে যাবে, কিন্তু দোষ ধরে ব্যঙ্গ করা, তাচ্ছিল্য করা দ্বিতীয় ব্যক্তি মাফ পাবে না, বরং আল্লাহ তা'য়ালা হয়তো তাকেই সেই দোষ দিয়ে পরীক্ষা করবেন, পাকড়াও করবেন। ইমাম বললেন, দোষ করে অনুতপ্ত ব্যক্তি হয়তো ওই দোষের কারণেই আরো আল্লাহ তা'য়ালার কাছাকাছি পৌছালো, আর ভালো কাজ করে গর্ব করা ব্যক্তি হয়তো আল্লাহ থেকে দূরে সরে গেলো। যে ব্যক্তি সারা রাত ঘুমিয়ে,  নামাজ না পড়ে ঘুম থেকে আফসোস নিয়ে উঠলো সে ব্যক্তি, রাতে নামাজ পড়ে ঘুম থেকে গর্ব নিয়ে ওঠা ব্যক্তির থেকে অনেকগুন ভালো।  

এরপর ইমাম একটা সত্যি গল্প বললেন। কোনো এক শহরে এক মুসলিম ব্যক্তির প্রতিবেশী এক আলেম ছিলেন। ওই মুসলিমের দোষ ছিল সে মদ্যপ থাকতো। সবাই তার এই দোষের, বদ-অভ্যাসের কথা জানতো। এই লোক মারা গেলে তার স্ত্রী ওই আলেম প্রতিবেশীকে তার জানাজা পড়াতে বললে তিনি অপারগতা জানান। ইমাম বললেন, ইসলামে কোনো দোষকে নিরুৎসাহিত করতে ইমামদের জানাজা না পড়ানোর, অপরাগতা জানানোর বিধান আছে, কিন্তু মৃত মুসলিম ব্যক্তির জন্য অন্যদের জানাজা পড়ে মাফ চাইতে কোনো বাধা নেই। তো ওই ইমাম জানাজা পড়াননি। কিন্তু পরে তিনি স্বপ্নে দেখেন, ওই লোক জান্নাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর বলছে, ওই আলেমকে বলে দিও, আমি খুশি যে (তিনি আমার জানাজা পড়াননি কিন্তু) জান্নাতে কে প্রবেশ করবে সেটা ঠিক করার তিনি নির্ধারক নন! এই স্বপ্ন দেখে ওই আলেম অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন। ওই মুসলিমের স্ত্রীকে ব্যাপারটা খুলে বললেন। তার ব্যাপারে আরো জানতে চাইলেন।  তখন ওই স্ত্রী জানালেন যে তার স্বামী মদ্যপ থাকতেন ঠিকই কিন্তু অনুশোচনায় ভুগতেন। প্রতি শুক্রবার এতিমদের তিনি খাওয়াতেন আর কাঁদতেন, আর ওই বাচ্চাদের বলতেন তোমরা তোমাদের এই চাচার জন্য দোয়া করো!

ইমাম বললেন, আমরা যেন কখনোই অন্যের দোষ ধরে আর নিজেদের ভালো কাজের জন্য গর্ব করে না বসি। এই ভালো কাজ তাহলে আমাদের ধ্বংসের কারণ হবে। 

খুতবার লিংক: https://youtu.be/DBd2DjAPWjw



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)