আগের সব গুলো শুক্রবারের খুতবার সারমর্ম, এক জায়গায়

 আগের সব গুলো শুক্রবারের খুতবার সারমর্ম, এক জায়গায়:

(সব গুলোর তারিখ শুরুর দিকে লিখে রাখতাম না)

এই ব্লগের ভূমিকা এই পোস্টে পাওয়া যাবে। 

এই শুক্রবার খুতবার সারমর্ম: সূরা মাউন'র শেষ তিন আয়াত। যেখানে আল্লাহ তায়ালা মুসল্লিদের জন্য আফসোস করছেন! যারা নামাজের ব্যাপারে উদাসীন,  যখন পড়ে লোক দেখানোর জন্য পড়ে আর ছোটোখাটো দয়া বা সাহায্য করা থেকে বিরত থাকে! ইমাম বলছেন, যেকোনো রোগের ঔষধ যেমন তখনি কাজে দেয় যখন ঠিকমতো, সময়মতো খাওয়া হয়, উল্টা পাল্টা করলে যেমন উপকারের চেয়ে অপকার হতে পারে - ঠিক তেমনি 'সালাত' বা নামাজ পড়ার যে ঔষধ আল্লাহ তায়ালা আর তাঁর রাসূল (সাঃ) আমাদের কুরআন আর সুন্নাহর মাধ্যমে শিখিয়েছেন সেটা আদায় করার ব্যাপারে খুব সাবধান, খেয়াল রাখতে হবে, তা না হলে আফসোস। কিন্তু কিভাবে সেটা করা সম্ভব? ইমামের মতে সূরার শেষ অংশে আল্লাহ তায়ালা সেটা বলে দিচ্ছেন, ছোটোখাটো দয়া দেখানো, অন্যকে সাহায্য করার মাধ্যমে তা করা সম্ভব: সেটা নিজের পরিবার, প্রতিবেশী কিংবা আত্মীয়-স্বজন কিংবা নিজের বাসা-বাড়িতে কাজ করার লোক, অফিসের সহকারী কিংবা অধীনস্ত সহ যে কেউ হতে পারে - যার বিনিময়ে কিছু আশা করা হয় না। 

---

গত শুক্রবারের খুতবার সারমর্ম: সূরা আলে-ইমরান (সূরা ৩) আয়াত ২৬-র শেষ অংশে আল্লাহ তায়ালা রাসূল (সাঃ) শিখিয়ে দিচ্ছেন বলার জন্য যে "নিশ্চই আপনিই (আল্লাহ তায়ালা) সবকিছুর উপর ক্ষমতাশীল" ("ইন্নাকা আলা কুল্লি শাঈ-ইন ক্বাদীর")। ইমামের মতে আমরা বেশির ভাগ মুসলিমরা এই "সব কিছুর উপর ক্ষমতাশীল" ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে পারি না। আমরা ভাবি আমাদের ভাগ্য, কোনো কাজের ফলাফল আমাদের নিয়ন্ত্রণে, আসলে সেটা মোটেই না।  সব কিছু আল্লাহর ইচ্ছায় হয়। ভালো কিছু হোক কিংবা খারাপ কিছু - সবই তাঁর ইচ্ছায়। ইমামের মতে, আমাদের জীবনে খারাপ কিছু হলেও আসলে তার পেছনে আল্লাহর কোনো নেয়ামত আছে যা আমাদের অজানা, সেটা ভুল শুধরিয়ে সঠিক পথে ফেরার সুযোগ হতে পারে, গুনাহ মাফ হতে পারে, কিংবা এর থেকে ভালো কিছুর প্রতিদানেও হতে পারে। যারা ভালো কিছু হলে শুকরানা আদায় করে, আর খারাপ কিছু হলে ধৈর্য ধরে থাকে এই ভেবে যে আল্লাহর ইচ্ছায় অবস্থা নিশ্চই ভালো হবে - তারাই সফলকাম। 

---

৮ অক্টোবর ২০২১

আজকের জুম্মার খুতবার সারমর্ম: আমাদের নবী (সাঃ) এক সাহাবীকে নাকি জিজ্ঞেস করেছিলেন, বলো তো বান্দার উপর আল্লাহ'র হক কী? উত্তর না জানা সাহাবী বলেছিলেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই সেটা ভালো জানেন। উত্তরে রাসূল (সা:) বলেছিলেন, শুধু এক আল্লাহর ইবাদত করাই বান্দার উপর আল্লাহর হক। ইমাম এরপর স্মরণ করিয়ে দিলেন যে আল্লাহ তায়ালা জ্বীন আর মানুষকে সৃষ্টি করেছেন শুধু তাঁরই ইবাদত করার জন্য (যদিও এই ইবাদতের আল্লাহ তায়ালার কোনোই দরকার নাই, বান্দার নিজের জন্যই এই ইবাদত জরুরি)। শেষে, সম্পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রেখে এক  আল্লাহর ইবাদত করার যে কী ক্ষমতা সেটা বোঝাতে ইমাম ইউনুস (আ:) -র ঘটনা  [সূরা আম্বিয়া (২৭): আয়াত ৮৭] মনে করিয়ে দিয়ে বললেন, মাছের পেটে থাকা অবস্থায় নবী ইউনুস (আ:) শুধু একটাই দোয়া করেছিলেন: "লা ইলাহা ইল্লা আন্তা, সুবহানাকা, ইন্নি কুনতু মিনাজওয়ালিমিন" ( অর্থ: [ইয়া আল্লাহ,] তুমি ছাড়া আর কেউ উপাস্য নেই,  পবিত্রতা তোমারই, নিশ্চই আমি সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত") - যার ফলে পরে তিনি উদ্ধার পেয়েছিলেন।

---

২২ অক্টোবর ২০২১:

আজকে খুতবার বিষয়বস্তু ছিল তওবা। ছিঁড়ে যাওয়া কাপড়ে যেরকম তালি মারা হয়, তওবা ঠিক একইভাবে আমাদের রুহের মেরামত করে। তওবা কবুলের জন্য চারটা শর্ত প্রযোজ্য: ১. ভুলের জন্য অনুশোচনা, ২. একই ভুল আর হবে না এরকম নিয়ত, ৩. ভুল করার সাথে সাথে সেখান থেকে বিরত হয়ে মাফ চাওয়া (দেরি করা যাবে না), ৪. কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন ভুল করে থাকলে তার কাছ থেকে মাফ চাওয়া। ইমাম স্মরণ করিয়ে দিলেন আমাদের রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম দিনে ৭০ বারের বেশি ইস্তেগফার করতেন। ইমাম আরো বললেন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু নাকি এক সাহাবীকে তাড়াতাড়ি ইস্তেগফার করতে দেখে বলেছিলেন ইস্তেগফার/ তওবা করার সময়, সময় নিয়ে চিন্তা করে করে ইস্তেগফার করতে হবে। ইমামের মতে আজকের দুনিয়ায় গীবত হচ্ছে অন্যের হক নষ্ট করা বা অবিচার করার সবচেয়ে সহজ উপায়। এর থেকে বের হতে তওবা করতে হবে। কিন্তু চতুর্থ শর্ত মোতাবেক যার বিরুদ্ধে গীবত করা হচ্ছে তার কাছে গিয়ে মাফ চাইতে হবে। এতে ঝামেলা বা ক্ষতির সম্ভাবনা থাকলে তা না করে ওই ব্যক্তির জন্য বেশি বেশি দোয়া করা, তার হয়ে দান - খয়রাত করা যেতে পারে। 

পাদটীকা: তোমরা যারা আমার গীবত করেছো কিংবা ভবিষ্যতে করবা, তারা দেশে গেলে আমাকে খাওয়ায় দিও, আমি খুশী হয়ে মাফ করে দিব।

---

২৯ অক্টোবর, ২০২১, শুক্রবার 

এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম:  এখন আরবি রবিউল আউয়াল মাস চলছে। এই মাসে রাসূল (সা:) জন্মদিন। জন্মদিন উপলক্ষে কিছু করা জায়েজ, নাকি বেদআত - ওই বিতর্কে না গিয়ে ইমাম রাসূল (সা:) কে ভালোবাসার, মেনে চলার ব্যাপারে একটা গল্প বললেন। কোনো এক সাহাবী নাকি রাসূল (সা:) -এর কাছে গিয়ে বললেন, তিনি তাঁকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসেন। এতটাই ভালোবাসেন যে বাসায় ফিরেও ভাবতে থাকেন পরে আবার কখন দেখা হবে। আরো ভাবেন যে এক সময় তার আর রাসূলের (সা:) -এর মৃত্যু হবে। আর এই বিষয় ভেবে মন খারাপ করেন যে, এখন যদিও তাদের দেখা হচ্ছে, মৃত্যুর পরে আর দেখা হবে না। তিনি যদি বেহেশতেও যান, সেখানে গিয়েও তিনি রাসূল (সা:)-এর আর দেখা পাবেন না, কারণ রাসূল (সা:) তখন অন্য নবী-রাসূলদের সাথে থাকবেন। উত্তরে রাসূল (সা:) নাকি নিশ্চুপ ছিলেন। কারণ তখনও এই ব্যাপারে কোনো আয়াত নাজিল হয় নাই। পরে আল্লাহ তায়ালা সূরা নিসা'র (৪:৬৯)-নম্বর আয়াত নাজিল করেন যেটার অর্থ অনেকটা এই রকম: "যারাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে মেনে চলবে, তারাই (আখিরাতে) তাদের সঙ্গী হবে যাদের আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন - নবী, সত্যবাদী (সিদ্দিক), শহীদ আর সৎ কর্মশীল - কত উত্তমই না সে সঙ্গ !" একটা হাদিস আছে যে প্রকৃত ঈমানদার হতে হলে রাসূল (সা:) কে নিজের থেকে, নিজের সন্তান, নিজের বাবার এবং অন্য সবার থেকে বেশি ভালোবাসতে হবে। এইসব শুনে সাহাবীরা আশ্বস্ত আর খুশি হয়ে গিয়েছিলেন। কারণ, তাঁদের নিজেদের নামাজ, রোজা, জাকাত আর আমল ইত্যাদি নিয়ে সন্দেহ থাকলেও আল্লাহ আর তাঁর রাসূলের প্রতি ভালোবাসায় কোনো সন্দেহ ছিল না। কিন্তু  রাসূল (সা:)কে  না দেখে, তাঁর সঙ্গে না থেকে আজকের দিনে আমাদের পক্ষে সেটা কি করে করা সম্ভব? উত্তরে ইমাম বললেন, যখন আমরা বেশি বেশি রাসূল (সা:) সম্পর্কে জানবো, আমাদের জন্য তিনি কী করেছেন সেটা বুঝবো আর উপলব্ধি করবো যে তাঁর শিখিয়ে দেয়া রাস্তার কারণেই আমরা আজকে মুসলিম - তখনই কেবল সেটা করা সম্ভব। 


পাদটীকা: বাংলায় রাসূল (সা:) সম্পর্কে জানতে কবি গোলাম মোস্তফার লেখা/অনুবাদ করা 'বিশ্ব নবী' বইটা আমরা সবাই পড়তে পারি।  

---

এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম:

খুৎবার শুরুতে ইমামরা সাধারণত একটা আয়াত তেলাওয়াত করেন: "ইয়া আইয়ুহাল্লাজিনা আমানু ইত্তাকুল্লাহ হাক্কা তুকাতিহি ওয়ালা তামুতুন্না ইল্লা ওয়াআনতুম মুসলিমুন" - সূরা আল-ইমরানের ৩:১০২ নম্বর আয়াত। যেখানে আল্লাহ তায়ালা বলছেন, "ও বিশ্বাসীগণ, আল্লাহকে ভয় করো (হ্বক ভাবে) যেভাবে তাঁকে ভয় করা উচিত, আর তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না"। ইমাম বলছেন, এইটা একটা ভয়ঙ্কর আয়াত। চিন্তা করে দেখুন, আল্লাহ বলছেন, "ও বিশ্বাসী গণ" -  বিশ্বাসী লোকতো মুসলিমই, তাই না? তাহলে কেন বলছেন মুসলিম না হয়ে মৃত্যু বরণ করতে না? কারণ হিসাবে ইমাম ব্যাখ্যা করলেন, শুধু বিশ্বাস করলেই মুসলিম হওয়া যায় না। "মুসলিম" অর্থ আল্লাহর ইচ্ছায় নিজেকে সপে দেয়া। বিশ্বাসে, কাজে, ব্যবহারে, চরিত্রে, চিন্তায় আমাদেরকে "মুসলিম" হতে হবে।  আজকের দুনিয়ায় অনেক বেশি 'Distraction' বা মনোযোগ নষ্ট হওয়ার কারণ আছে। তাই মুসলিম হতে হলে আমাদের ইসলামের ব্যাপারে মনোযোগী হতে হবে, কোরআন, হাদিস পড়তে হবে, জানার চেষ্টা করতে হবে - মোট কথা সময় দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, আল্লাহ আমাদেরকে ইসলাম দিয়ে সম্মানিত করেছেন। আমাদের আরো বেশি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত।  

---

খুতবার সারমর্ম:

তার আগে বলে নেই, আমি যেই মসজিদে জুমআর নামাজ পড়ি,  সেখানে মাঝে মাঝে টেম্পল ইউনিভার্সিটি হসপিটালের চোখের একজন ডাক্তার খুতবা দিতে আসেন।  খুবই সুন্দর ইংরেজিতে, স্পষ্ট উচ্চারণে খুতবা দেন।  তারপর যখন নামাজ পড়ান, এতো সুন্দর আর এতো জোরে কিরাআত করে পড়ান, যেন পুরা মসজিদ গম গম করে উঠে, মনে-শরীরে নাড়া লাগে। আজকের খুতবা উনিই দিলেন। খালার মৃত্যুতে মন খারাপ ছিল, আর এমন দিনেই উনি এতো প্রাসঙ্গিক একটা বিষয়ে বললেন, যেটা আমি লিখে আসলে বোঝাতে পারবো না। তাও চেষ্টা করছি, একটু লম্বা হবে হয়তো, ধৈর্য ধরে পুরাটা পড়ার অনুরোধ থাকলো।  

আমাদের রাসূল (সা:) কেই কেন আল্লাহ শেষ নবী হিসাবে, কুরআন নাজিলের জন্য বেছে নিলেন? কিতাব, আয়াত কী আল্লাহ কোনো ফেরেশতা দিয়ে, আকাশ থেকে নামিয়ে সবার মধ্যে দিতে পারতেন না? এইটা তখনো এবং এখনো অনেক অবিশ্বাসীদের একটা প্রশ্ন। ইমাম বললেন, আল্লাহ কুরআনে -এর উত্তরে সূরা আহযাব (৩৩) এর ২১ নম্বর আয়াতে যা বলেছেন তা অনেকটা এইরকম: "নিশ্চই আল্লাহর রাসূলের মধ্যেই রয়েছে সবচেয়ে ভালো উদারণ তাদের জন্য যারা আল্লাহর উপর ভরসা করে... "। আল্লাহ কুরআনের আরেক জায়গায় নাকি বলেছেন অনেকটা এইরকম: তোমাদের মধ্যে থেকেই রাসূল মনোনীত করে আমি তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছি।  এর মানে কী?

তারপর ইমাম কিছু ফ্যাক্টস বললেন, যার কিছু আগে জানা ছিল, কিছু আজকেই জানলাম। যেমন: রাসূল (সা:) ৬ বছর বয়সে মাকে হারিয়ে নাকি কবর ধরে শুয়ে ছিলেন, তাঁকে টেনে সরিয়ে নিতে হয়েছিল। আর বাবা তো তাঁর জন্মের আগেই মারা গিয়েছিলেন। তখনকার দিনে যুদ্ধে হারলে ওপর পক্ষ নাকি সব পুরুষদের মেরে ফেলে, সম্পদ, নারী, শিশু বাজেয়াপ্ত করতো।  বদর যুদ্ধে যখন মক্কার কুরাইশদের বিরাট বাহিনীর বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ এমন এক যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছেন, তখন তাঁর মেয়ে রুকাইয়া খুবই অসুস্থ।  আমরা বাচ্চাদের অসুস্থতার সময় আর কিছুতেই মন দিতে পারি না।  কিন্তু তবুও রাসূল (সা:) যুদ্ধে গেছেন, এবং ফিরে এসে দেখেছেন তাঁর রুকাইয়া মারা গেছেন, তাকে করবরস্থ করা হয়ে গেছে। রাসূল (সা:) ছেলে মারা যাওয়াও, তার পাশের বাসার প্রতিবেশী তাঁর চাচা, আবু লাহাব খুশিতে উদযাপন করেছে (এর পরই সূরা কাওসার নাজিল হয় )! তাঁর একজন ছাড়া বাকি সব বাচ্চাই তাঁর জীবদ্দশাতেই মারা গেছেন। এইটা চিন্তা করা যায়?  রাসূল (সা:) অভাবী ছিলেন, না খেয়েও থাকতে হয়েছে। আরো আছে, ইমাম বললেন, আমরা অনেক সময় নিজেদের কিংবা নিজের সন্তানদের শশুড়বাড়ির লোকজনের উৎপাত, অত্যাচার মেনে নিতে পারি না।  রাসূল (সা)-এর বেলায়ও তাঁর মেয়ের দিকের শশুড়বাড়ির যন্ত্রনা সহ্য করতে হয়েছে। এমনকি তাঁর মৃত্যু কালীন যন্ত্রনা এতো বেশি ছিল যে একটা হাদিস নাকি আছে যে রাসূল (সা:) বলেছেন, তাঁর যন্ত্রনা ১০ জনের পক্ষেও সহ্য করা কঠিন। কিন্তু কেন ? ইমাম বললেন, আলেমরা এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, যেন মৃত্যুকালীন সময়ের কারো যন্ত্রনায় আমরা ভেবে না বসি যে নিশ্চই এই ব্যক্তি কোনো অন্যায় করেছেন দেখেই কষ্ট পাচ্ছেন।  বরং এই ভেবে ঐ ব্যক্তি এবং বাকিরা যেন সান্তনা পান যে, আমাদের রাসূল (সা:) ও মৃত্যুর আগে কষ্ট করেছেন।   

সব শেষে ইমাম বললেন, কেউ নাকি কখনো দাবি করতে পারবে না যে তাঁর কষ্ট রাসূল (সা:) থেকে বেশি।  আর আল্লাহ তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বান্দা, রাসূল (সা:) কে উদাহরণ হিসাবে দেখাতেই এতো পরীক্ষায় ফেলেছেন। যেন রাসূলের উম্মত হিসাবে আমরা কষ্টের সময় সান্তনা খুঁজে পাই, আল্লাহর ইচ্ছায়,  আর আল্লাহর দয়ায়, গুনাহ মাফের আশায় যেন ভরসা করতে পারি। 

কোনো ফেরেশতা দিয়ে আয়াত নাজিল করলে তা মানুষের জন্য উদাহরণ হতে পারতো না। 

---

আজকের লেখা জুমআর খুতবার সারমর্ম না।  বরং আরেকটা লেকচার থেকে জানা নামাজ'র ব্যাপারে। 

নামাজ বা সালাত মনোযোগ সহকারে, "আল্লাহর আমাকে দেখতে পাচ্ছেন" ভেবে পড়াকে "খুশু" সহকারে নামাজ পড়া বলে। আমাদের নামাজ কতটা ভালো ভাবে আদায় হলো, সেটার একটা সহজ পরীক্ষা হচ্ছে, নামাজ শেষে ভেবে দেখা কোন কোনো সূরা দিয়ে নামাজটা পড়লাম। যদি মনে করতে না পারি, তাহলে ধরে নিতে পারি আসলে খুব ভালোভাবে নামাজ আদায় হয় নাই। একটা হাদিস আছে অনেকটা এই রকম: সাহাবা মুআদ বিন জাবাল (রাঃ) বলেন: আল্লাহর রাসূল (সাঃ) আমার হাত ধরে বলেছেন: "ও মুআদ, আল্লাহর কসম আমি তোমাকে ভালোবাসি আর উপদেশ দেই যে কখনো সালাত শেষে এই দোয়া করতে ভুলো না: আল্লাহুম্মা আ’ইন্নি আলা জিকরিকা, ওয়া শুকরিকা ওয়া হুসনি ইবাদাতিক। যার অর্থ "ও আল্লাহ! আমাকে সাহায্য করো তোমার জিকির(স্মরণ) এবং তোমার শুকরিয়া এবং তোমার উত্তম ইবাদত করতে" । খেয়াল করুন, আমাদের রাসূল (সা:) নামাজ শেষেই কিন্তু এই দোয়া করতে আমাদেরকে শেখাচ্ছেন। মুখস্থ করার সুবিধার জন্য নিচের ইউটুব ভিডিও দিয়ে দিচ্ছি: https://youtu.be/Z_LUCUg5eWY


---

এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম:

ইমাম আমেরিকায় শীতের সময় (সব দেশের জন্যই সম্ভবত প্রযোজ্য) সবাই একটু ঝিমিয়ে যায়, অনেকে ডিপ্রেশনে পরে, সূর্যের আলো কম সময় থাকায় ভালো লাগে না, বেশিদিন তুষারপাত হলে তো কথাই নেই  - ইত্যাদি বলে স্মরণ করিয়ে দিলেন যে যদিও বছরের পর বছর আমরা এই একই নিয়মের সাথে অভ্যস্ত, তারপরেও কেন জানি আমরা ব্যাপারটা সহজ ভাবে নিতে পারি না। সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর এই নিয়মতান্ত্রিক, কক্ষপথে "সাতরিয়ে" চলার একটু হেরফেরের কারণে এই যে আবহাওয়ার পরিবর্তন, শীত-গ্রীষ্মের আবর্তন -- এই ঘূর্ণন যদি কোনো কারণে বন্ধ, কিংবা পৃথিবী যদি কক্ষচ্যুত হয়ে যায়, তাহলে এর পরিণাম কী হবে আমরা কি তা একবারও ভেবেছি? একবারও কী এই 'নিয়ামতের' জন্য আল্লাহর শুকরানা আদায় করেছি? উদাহরণ হিসেবে ইমাম বললেন,  সূরা কুরাইশ -এ আল্লাহ কুরাইশবাসীদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে তাদের শীত কিংবা গ্রীষ্মে ব্যবসা বহরের 'গ্রাজ্য' বা 'নিশ্চিত' নিরাপত্তা  কিংবা খাবারের জোগাড় থাকাকে মনে করে তারা যেন কাবা ঘরের মালিকের (অর্থাৎ আল্লাহর) ইবাদত করে। আমরা যেন "আমরা তো কুরাইশ না" - এই ভেবে সূরা কুরাইশে আল্লাহর এই নির্দেশ ভুলে না যাই। এর পর ইমাম আরেকটা কথা বললেন যেটা অনেকটা এই রকম: শীত যত তীব্রই হোক না কেন, এক সময় তা শেষ হয়ে গ্রীষ্ম আসবেই। একই ভাবে আল্লাহ সূরা আল-ইনশিরাহ (৯৪:৫) তে বলছেন, 'ইন্নামা আল ঊস্রি ইয়ুসরা' - যার অর্থ: নিশ্চই কষ্টের পর/সাথে স্বস্তি আসে। তাই,  কষ্টের সময় ধৈর্য ধরে, বিশ্বাস রেখে স্বস্তির অপেক্ষা করাই প্রকৃত মুমিনের কাজ।   

---

এই শুক্রবারের ভার্চুয়াল খুতবার সারমর্ম:

ইমাম খুতবা শুরু করলেন একটা প্রশ্ন দিয়ে: "যদি একজন মু'মিনের দোআর লিস্ট, আরেকজন অন্য ধর্মাবলম্বীর করা দোআ'র লিস্ট দেখা সম্ভব হয়,  তাতে কী মিল না অমিল পাওয়া যাবে?" আপনি আমার মতো হলে নিশ্চই ভাবছেন, মিলই বেশি হবে।  ঠিক? আসলে না।  কিছু মিল হলেও একটা বিরাট অমিল আছে (থাকা উচিত)। উদাহরণ দিয়ে ইমাম সূরা নিসার একটা আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বললেন, উহুদের যুদ্ধে দুই পক্ষের কষ্ট,  স্বজন হারানোর বেদনা এক হলেও আল্লাহ মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে দুই পক্ষের লক্ষ্য ভিন্ন। এক পক্ষের (কাফেরদের) যুদ্ধ জয়ের গর্ব, বদর যুদ্ধে হারার প্রতিশোধ, বীরত্বের কাহিনী কিংবা যুদ্ধের মাল লাভের আশা ছিল, কিন্তু ওপর পক্ষের (মুসলিমদের) আল্লাহর আদেশ মেনে তাঁর সন্তুষ্টি লাভ ছিল মূল উদ্দেশ্য। একই ভাবে, জাহিলিয়াতের যুগেও যখন হ্বজ চালু ছিল, তখন কুরাইশদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতো, কে কার চেয়ে বেশি, গরিবদের খাওয়াবে, দান খয়রাত করবে কিংবা ক্রীতদাস মুক্ত করবে।  যদিও সবগুলোই ভালো কাজ,  তবে সবগুলোর পেছনে উদ্দেশ্য ছিল কে কার চেয়ে বেশি সুনাম কুড়াতে পারে। তাই আমাদের ভালো আমল'র উদ্দেশ্য হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি, খেয়াল রাখতে হবে যেন লোক দেখানো কিংবা সুনাম বা পরিচিতি কুড়ানো না হয় । একই ভাবে, আমাদের দোআ'র পেছনে উদ্দেশ্য শুধু দুনিয়ার সুযোগ-সুবিধা, কিছু পাবার আশায় যেন না হয়। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল, আমাদের দোআ শিখিয়ে দিয়েছেন: "রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানা, ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানা, ওয়াকিনা আযাবান্নার", অর্থাৎ, ও আমাদের রব, আমাদেরকে দুনিয়াতে [যা কিছু] উত্তম দিন, এবং পরকালেও [যা কিছু] উত্তম দিন, এবং [পরকালে] আজাবের আগুন থেকে রক্ষা করুন। 

অর্থাৎ,  ইমাম বলছেন, দোআতে আমরা যেন ব্যালান্স রাখি।  দুনিয়ার ভালো চাওয়া কোনো দোষের কিছু না, কিন্তু আখিরাতের চিন্তা মাথায় রেখে দোআতে তাও যেন মনে রাখি। আল্লাহ দোআ কবুল করবেন, এই বিশ্বাসে যেন দোআ করি। আর দুনিয়ার জন্য করা কোনো দোআ কবুল না হলে যেন মনে করি, আল্লাহ নিশ্চই আমার জন্য এর চেয়ে ভালো কিছু আখিরাতের জন্য রেখেছেন। এর বিনিময়ে আমার গুনাহ নিশ্চই তিনি মাফ করবেন।

---

এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১৪ জানুয়ারী, ২০২২):

আমরা সবাই জানি, নামাজ আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায়। সেজদাতে বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছায়। মুসলিম হিসাবে আমাদের এই জীবনের লক্ষ্য যেহেতু ভালো কাজ করে আখিরাতে চিরস্থায়ী জান্নাত লাভ করা - তাই ইমাম উপদেশ দিলেন যে, নামাজে সেজদায় গিয়ে যেন আমরা আল্লাহর কাছে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার জন্য: "আল্লাহুম্মা আজিরনি মিনান নার" অর্থ : ও আল্লাহ (জাহান্নামের) আগুন থেকে আমাকে বাঁচাও - এই দোআ করি; আর জান্নাত পাবার জন্য যেন বলি "আল্লাহুম্মা ইন্নি আসলুকা'ল জান্নাহ", অর্থ: ও আল্লাহ, আমি আপনার কাছে জান্নাত প্রার্থনা করি।  ইমাম স্মরণ করিয়ে দিলেন, শেষ বিচারের দিন আল্লাহ সর্বপ্রথম এই নামাজের হিসাব চাইবেন। তাই আমরা যেন নামাজ এবং এতে দেয়া সেজদা খুব গুরুত্ব সহকারে নেই। কতটা গুরুত্ব দেয়া উচিত? উদাহরণ হিসাবে আয়েশা (রা:) কে উদ্ধৃতি দিয়ে ইমাম বললেন, আমাদের রাসূল (সা:) পরিবারের সাথে সময় পার করছেন, এমন সময় যখন আজান হতো উনি সবকিছু বাদ দিয়ে, যেন পরিবারের কাউকে আর চিনেন না - এমনভাবে নামাজের জন্য প্রস্তুতি নিতে তৈরী হতেন। তারপর ইমাম একটা হাদিস বর্ণনা করলেন যেটা শুনে আমি আসলেই ধাক্কা খেয়েছি। রাসূল (সা:) নাকি একবার তাঁর সাহাবীদেরকে বলেছেন, শেষ বিচারের দিন এমন কিছু মানুষ আসবে যাদের ভালো কাজের আমল পাহাড়সম থাকবে, কিন্তু সেগুলোকে আল্লাহ আমলে নিবেন না, তা তাদের কোনো কাজে আসবে না! এরা করা জিজ্ঞেস করায় রাসূল (সা:) নাকি বলেছেন, এরা তোমাদেরই ভাই, যারা জনসমুক্ষে প্রচুর ভালো আমল করে (যেমন নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, যাকাত দেয় ইত্যাদি), কিন্তু যখন একাকী থাকে, যখন শুধু আল্লাহ ছাড়া আর কেউ তাদের দেখে না, তখন পাপে নিমজ্জিত হয়। শেষ বিচারের দিন মানুষ কিভাবে সাহায্যহীন অবস্থায় থাকবে, আর তার সব গোপন কাজ প্রকাশ হয়ে পড়বে তা জানার জন্য ইমাম সূরা তারিক (সূরা নং ৮৬) পড়ার অনুরোধ করলেন। সবশেষে ইমাম স্মরণ করিয়ে দিলেন, আজকের যুগে ইন্টারনেট আর ফোন যেমন জীবন অনেক সহজ করে দিয়েছে, একইভাবে পাপে লিপ্ত হওয়াও অনেক সহজ করে দিয়েছে। আমরা যেন সাবধান হই। 

---

এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (২১ জানুয়ারী, ২০২২):

খুতবার বিষয় ছিল আমানত এবং এর প্রকারভেদ ও গুরুত্ব।  ইমাম সূরা আহযাবের ৭২ নং আয়াত উল্লেখ করে বললেন, মানুষ হিসেবে, বিশেষ করে মুসলিম হিসাবে আল্লাহ সুবহানাওয়াতায়ালা আমাদেরকে এক বিরাট আমানত দিয়ে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন (মনে রাখতে হবে আদম (আ:) কে আল্লাহ দুনিয়াতে তাঁর প্রতিনিধি করে পাঠিয়েছিলেন, তাঁর উত্তরসূরি হিসাবে মানুষ মাত্রই সেই আমানতের  অংশীদার)। অনেক ধরনের আমানতের মধ্যে একটা আমানত হলো অন্যের হ্বক বা প্রাপ্য বুঝিয়ে দেয়া। এর গুরুত্ব বোঝাতে ইমাম একটা হাদিস বললেন, সেটা এইরকম: রাসূল(সা:) বলেছেন, যে ব্যক্তি উনাকে ৬ টি বিষয় সম্পর্কে নিশ্চিত করতে পারবে, তিনি সে ব্যক্তির জন্য জান্নাত নিশ্চিত জানাচ্ছেন। এই ৬ টা বিষয় হলো: নামাজ, যাকাত, আমানত, গোপন অঙ্গের সুরক্ষা, হালাল খাবার ও জিহ্ববার সুরক্ষা। অনেকে শুধু আল্লাহর আমানত (যেমন, তাঁর ইবাদত করা) রক্ষায় ব্যস্ত কিন্তু নিজ পরিবার, আত্মীয়-প্রতিবেশীর দেখভাল করার যে আমানত, সে ব্যাপারে উদাসীন। এই বিষয়ের গুরুত্ব বোঝাতে ইমাম রাসূল (সা:) সময়ে দুই সাহাবীর একটা ঘটনা বললেন। রাসূল (সা:) নাকি আবু-দারদা (রাঃ) আর সালমান-আল-ফারসি (রাঃ) -- এই দুই সাহাবীকে একজনকে অন্যজনের 'ভাই' করে দিয়ে নিজেদের দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সালমান-আল-ফারসি একবার আবু দারদার বাসায় গিয়ে তাঁকে পেলেন না। জিজ্ঞেস করায় আবু দারদার স্ত্রী জানালেন, উনি সারাদিন দ্বীনের কাজে বাইরে থাকেন। পরে আরেকদিন, বাসায় গিয়ে উনাকে পেলেন। খাবারের সময় এক সাথে বসলেও আবু দারদা জানালেন যে উনি রোজা রেখেছেন, খাবেন না। সালমান-আল-ফারসি, এখন রোজার মাস না, নফল রোজা ভাঙতে সমস্যা নেই, উনার সাথে খেতেই হবে ইত্যাদি বুঝিয়ে অনেকটা জোর করেই আবু-দারদাকে রোজা ভাঙিয়ে খাওয়ালেন। রাতে ঘুমানোর সময় সব ব্যবস্থা করে দিয়ে, আবু দারদা জানালেন, যে উনি এখন ঘুমাবেন না, কারণ সারারাত ইবাদতি করবেন। এইবারও সালমান-আল-ফারসি ছাড়লেন না। জোর করে বললেন যে আবু দারদাকে ঘুমাতে হবে, পরে তাহাজ্জুদের সময় একসাথে উঠে উনারা ইবাদতি করবেন।  সালমান-আল-ফারসির এইরকম জোরাজুরির খবর রাসূল (সাঃ) কাছে পৌঁছালে তিনি বললেন, সালমান-আল-ফারসিই সঠিক। অর্থাৎ, বান্দার উপর আল্লাহর ইবাদত করা যেমন আমানত, ঠিক একইভাবে নিজের শরীর, পরিবার, আত্মীয়, প্রতিবেশী ইত্যাদির যত্ন নেয়া,  দেখভাল করা, সময় দেয়াও আমানত। সব শেষে ইমাম বললেন, আমাদের আজকের উম্মাহর দুরবস্থার একটা বড় কারণ আমরা এখন বড় বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি। অন্যের সমস্যা, অসুবিধা, বিপদের সময় "এটা আমার বিষয় না", "আমার কিছুই করার নেই"  - এই মনোভাব দেখিয়ে আমানতের খিয়ানত করার কারণেই আমরা দিন দিন তলিয়ে যাচ্ছি।   




এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (২8 জানুয়ারী, ২০২২):

সূরা নূর (সূরা নং ২৪, আয়াত ৪১)- এর উদ্ধৃতি দিয়ে ইমাম বললেন, আকাশ ও জমিনে যা কিছু আছে তার সব কিছুই প্রতিনিয়ত আল্লাহ'র মহিমা ঘোষণা করে।  তাদের প্রত্যেকেই তাদের নিজস্ব উপায়ে আল্লাহর প্রশংসা ঘোষণা করছে, ইবাদত করে যাচ্ছে। আর আল্লাহ এসব কিছুই জানেন ও দেখছেন। ইমাম সবাইকে ডিসকভারি, কিংবা ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেলে প্রকৃতির উপর ডকুমেন্টারি দেখার উৎসাহ দিয়ে বললেন,  আমরা 'আয়াত' বলতে শুধু কুরআনের আয়াতের কথা মনে করি।  কিন্তু 'আয়াত' -এর আসল মানে চিহ্ন বা নিদর্শন। আল্লাহ কুরআনের প্রতিটা লাইনে যেমন চিহ্ন রেখেছেন, তেমনি প্রকৃতির মাঝেও তাঁর অজস্র চিহ্ন আছে। আপাত দৃষ্টিতে প্রত্যেক প্রাণী তাদের স্ব-স্ব জীবন যাপনে ব্যস্ত মনে হলেও, ভালো ভাবে খেয়াল করলে কিংবা চিন্তা করলে দেখা যাবে আসলে এদের প্রত্যেকেরই এই জীব বৈচিত্রে কোনো না কোনো ভূমিকা আছে। আর এই ভূমিকা পালনের মধ্যে দিয়েই জীবকুল  তাদের ইবাদত করে যাচ্ছে। কুরআনেও বলা আছে, চিন্তাশীলদের জন্য এতে প্রচুর আয়াত বা নিদর্শন আছে। এরপর ইমাম উনার দেখা এরকম দুইটা উদাহরণ দিলেন: Atlas Moth (এক ধরণের প্রজাপতি - খোলস থেকে বের হওয়ার পর যার কোনো মুখ থাকে না, না খেয়ে কয়েকদিনের মধ্যেই মারা যায়!), Pitcher Plant (পোকা খেকো এক ধরণের গাছ)। এদের থেকে উনি কী শিক্ষা পেলেন, সেটা বললেন (সেটা আর লিখলাম না)।    

সাইড নোট: রিসেন্টলি একটা দোয়ার কথা জানলাম, সেটা শেয়ার করছি, দোয়াটা খুবই সহজ কিন্তু খুবই পাওয়ারফুল: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসলুকাল আ'ফিয়া  (অর্থ: ও আল্লাহ আমাকে আ'ফিয়া [দুঃখ, কষ্ট থেকে সুরক্ষা] দান করুন)

এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২২):
উইলো গ্রোভ মসজিদ, পেনসিলভানিয়া। 

সূরা তওবার (সূরা ৯, আয়াত ৩৬) রেফারেন্স দিয়ে ইমাম বললেন, আল্লাহ সৃষ্টির প্রথম থেকেই ১২ মাসের হিসাবে বছর ঠিক করে দিয়েছেন। আর তার মধ্যে চারটা মাস বিশেষভাবে পবিত্র।  সেগুলো হলো: জুল-ক্বাদ, জুল-হিজ্ব, মুহাররাম ও রজব। এইসব পবিত্র মাসে আল্লাহ একে অপরের প্রতি জুলুম করা থেকে বিরত থাকতে বিশেষভাবে সাবধান করে দিয়েছেন। এখন আরবি রজব মাস চলছে। ইমাম আরো বললেন, এই রজব মাসের পর, শাওয়াল আর তারপরেই রমাদান (রোজার) মাস। রাসূল (সা:)-এর সময় সাহাবীরা এই রজব মাস থেকেই রোজার প্রস্তুতি শুরু করতেন। আল্লাহর কাছে বিশেষ ভাবে দোআ করা শুরু করতেন যেন তাঁরা রোজার মাসে পৌঁছুতে পারেন। ইমাম বললেন, রজব মাস বীজ বপনের সময়, শাওয়াল মাস যেন জমিতে সেচ দেয়ার সময়, আর তারপর রমাদান বা রোজার মাস হলো ফসল ফলিয়ে, ফসল কেটে ঘরে তোলার মাস। আরো উদাহরণ দিয়ে ইমাম বললেন, অলিম্পিকের মূল আসরে যাওয়ার অনেক আগে থেকেই যেমন খেলোয়াড়রা মানসিক, শারীরিক প্রস্তুতি নেয়,  ঠিক একই ভাবে মুসলিম হিসাবে আমাদেরকে রমাদান বা রোজার মাসের প্রস্তুতি হিসাবে রজব মাস থেকেই মানসিক, শারীরিক আর আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি নিতে হবে। কী কী করা যায়, কিভাবে প্রস্তুতি নেয়া যায়, তা এখন থেকেই চিন্তা করে ঠিক করে নিতে হবে। আরো মনে করিয়ে দিলেন, রোজার বাইরে শাওয়াল মাসেই আমাদের রাসূল (সা:) সবচেয়ে বেশি নফল রোজা রাখতেন। 

মজার ব্যাপার হলো, আল্লাহ যেন আমাদেরকে সেই তৌফিক দেন, সব শেষে সেটা দোআ করে ইমাম নিজেই বললেন আজকের খুতবা যেন পরিবারের সবার সাথে শেয়ার করি!


এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২):
উইলো গ্রোভ মসজিদ, পেনসিলভানিয়া। 

রজব মাস থেকেই রমাদান বা রোজার মাসের প্রস্তুতি নেয়ার কথা আবারো মনে করিয়ে দিয়ে ইমাম বললেন, চিন্তা করে দেখতে যে মুসলিম হিসাবে আমরা আমাদের সারা জীবন 'তাকওয়া' (আল্লাহ ভীতি বা 'আল্লাহ আমাদের সব সময় দেখছেন' - এই চিন্তা) অর্জনের চেষ্টাই করে যাই। দুনিয়ায় যার তাকওয়া বেশি ছিল, শেষ বিচারের দিন সেই-ই সফলকাম হবে; আর যার তা কম ছিল বা ছিল না, সেই-ই দুনিয়ায় ভুল বেশি করবে, গুনাহর কাজে ভয় পাবে না, দায়িত্ব (নামাজ, রোজা, জাকাত ইত্যাদি) পালনে গাফিলতি করবে - অর্থাৎ ব্যর্থ হবে। তো, 'তাকওয়া' কী? কিভাবে সেটা অর্জন করা যায়? - এই ব্যাপারে হজরত আলী (রাঃ)'র একটা উক্তি নিয়েই মূলত ইমাম খুতবায় আলোচনা করলেন। হজরত আলী (রাঃ) নাকি বলেছেন, তাকওয়া হচ্ছে চারটা জিনিস: ১) সর্বশক্তিমান আল্লাহ শাস্তিকে ভয় করা, ২) কুরআন, সুন্নাহর নির্দেশনায় জীবন যাপন করা, ৩) অল্পতে খুশি থাকা আর ৪) শেষ সফরের দিনের (যেদিন এই দুনিয়া ছেড়ে অন্য দুনিয়ায় যাত্রা শুরু হবে, আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে) প্রস্তুতি নেয়া।

ইমাম প্রতিটা পয়েন্ট বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, যার মধ্যে একটা ছিল, অনেকেই ভাবেন (অন্যান্য অনেক ধর্মে আছে) এই তাকওয়া অর্জন করতে দুনিয়াদারি, সমাজ-সংসার সব ছেড়ে দিয়ে সন্ন্যাস জীবন নিতে হবে - ইসলামে সেটা মোটেও বলা হয় নাই। ইসলাম আমাদেরকে মধ্যপন্থা বা 'ব্যালান্স' করে চলার শিক্ষা দেয়।     


এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২২):
উইলো গ্রোভ মসজিদ, পেনসিলভানিয়া। 

খুতবার বিষয় লাইলাতুল মিরাজ (শবে মেরাজ বা রাত্রির যাত্রা)। যেহেতু এখন আরবি রজব মাস চলছে, আর এই মাসেই মিরাজের এই অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছিল, ইমাম তাই এই বিষয়টা বেছে নিয়েছেন।ইমাম বললেন মিরাজের ওই ঘটনা, তার শিক্ষা আজকের দিনে আমাদের জন্য কিভাবে প্রযোজ্য সেটা তিনি আলাপ করবেন। তবে ঘটনার কনটেক্সট বা সমসাময়িক কিছু বিষয় বা ইতিহাস জানা প্রয়োজন, যেটা ইমাম খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে বলেছেন। আমিও লেখার চেষ্টা করছি। তাই আগেই বলে নেই আজকের লেখা একটু বড় হবে, ধৈর্য নিয়ে পড়তে হবে। এছাড়াও আমার শোনার ভুল হতে পারে, লেখা পড়ে নিজেরা ভেরিফাই করে নিলে ভালো হয়।    

ইসলামের শুরুর দিকে দুই জন মানুষের ইসলাম গ্রহণ মুসলিমদের অনেক শক্তি ও সাহস যুগিয়ে ছিল। একজন হলেন রাসূল (সা:) -র চাচা, "সিংহ"-খ্যাত হামজা (রাঃ); আরেকজন উমর (রাঃ)। এই হামজা (রাঃ) উহুদ যুদ্ধে নির্মমভাবে শহীদ হন। যুদ্ধে রাসূল (সাঃ) নিজেও চরমভাবে আহত হন, মারা যাওয়ার অবস্থা হয়, তাঁর দাঁত ভেঙে যায়। অনেক সাহাবা মারা যান। যুদ্ধে কোনো পক্ষই জয়ী হয় না। বদরের যুদ্ধে হারার প্রতিশোধ নিতেই কুরাইশরা উহুদের যুদ্ধে হামলা করে। যাই হোক, পরে কোনো একসময় আয়েশা (রাঃ) রাসূল (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে উনার জীবনে উহুদের চেয়েও খারাপ কোনো সময় এসেছিলো কিনা? এর উত্তরে রাসূল (সাঃ) বলেছিলেন, হ্যাঁ এসেছিলো, "দুঃখের বছরে" যখন উনি তায়েফ শহরে যান, সেইসময়। তো, কী এই "দুঃখের বছর"? তায়েফে কি হয়েছিল? মিরাজের সাথেই বা এর কী সম্পর্ক?

রাসূলের (সাঃ) নবুয়্যত পাওয়ার দশম বছর হচ্ছে সেই "দুঃখের বছর"। এই বছরে রাসূল (সাঃ) কে 'প্রটেকশন' দেওয়া তাঁর চাচা, কুরাইশদের অন্যতম নেতা আবু-তালিব (যিনি আলী (রাঃ)-র বাবা) মারা যান। রাসূল (সাঃ) অনেক চেষ্টা করেও তাঁর পিতৃতুল্য চাচাকে ইসলামে আনতে পারেন নি। সেজন্য মনে খুব কষ্ট পাওয়া ছাড়াও, সেই যুগে এই "প্রটেকশন" খুব জরুরি ছিল। সেই 'প্রটেকশন' আজকের দিনে আমেরিকায় অনেকটা ' ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস' -এর মতো। যার এই প্রটেকশন নাই, তার মক্কায় থাকার অনুমতি নাই। জীবনের নিরাপত্তাও নাই। কেউ মেরে ফেললেও অন্যরা কিছু বলতো না। এর কিছুদিন পরেই রাসূলের (সা:) স্ত্রী,  খাদিজা (রাঃ) মারা যান। চাচাকে হারিয়ে বাইরের, আর খাদিজাকে হারিয়ে ঘরের সমর্থন হারিয়ে রাসূল (সাঃ) খুব ভেঙে পড়েন। এই সমসাময়িক সময় কুরাইশরা সম্ভবত মুসলিমদের এমনিতেই একঘরে করে রেখেছিল। এই অবস্থায় রাসূল (সাঃ) তাঁর পালকপুত্র জায়েদকে নিয়ে হেটে মক্কার পাশেই পাহাড় ঘেরা 'তায়িফ' শহরে যান। সেখানে তাঁর দূরসম্পর্কের আত্মীয়রা ছিল। উনি তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত আর সমর্থন চাইতে সেখানে যান। কিন্তু ওরা সমর্থন তো করলো নাই-ই, বরং উনাকে চরম অপমান করলো। তায়িফ ছেড়ে চলে যেতে বলে শহরের ছেলে-ছোকরাদের উনার পিছে লেলিয়ে দিলো, পাথর মেরে বের করে দিতে বললো। হেটে ফেরার পথে ছেলেপিলেদের ছোড়া পাথরে রাসূল (সাঃ) রক্তাক্ত হলেন। জায়েদ (আ:) -ও তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে রক্তাক্ত হলেন।  প্রত্যাখ্যাত, রক্তাক্ত রাসূল (সাঃ) আঘাতে আঘাতে অনেকটা হুশ-জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। কোনোভাবে তায়িফ শহরের সীমানা পেরিয়ে এক জায়গায় বসে পড়েন। 

মক্কায় পরিবার আর তায়িফে সমর্থন হারিয়ে, লোকজন ইসলামের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করায় রাসূল (সাঃ) শারীরিক ও  মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েন। আর এই অবস্থায় রাসূলকে সান্তনা দিতেই আল্লাহ তায়ালা উনাকে মিরাজে নিয়ে যান। রাতের এক অংশের মধ্যেই  প্রথমে মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস (ফিলিস্তিনের আল-আকসা মসজিদ), এর পরে উপরে তুলে নিয়ে, অন্য নবী-রাসূল, জান্নাত, জাহান্নাম দেখানো ছাড়াও আল্লাহ নিজে তাঁর সাথে কথা বলেন। মুসলিমদের জন্য  ৫ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের বিধান এই মিরাজেই ঠিক হয়। এসব দেখিয়ে আল্লাহ তায়ালা যেন রাসূল (সাঃ) কে এই বলে সান্তনা দিলেন যে, দুনিয়ার সবাই মুখ ফিরিয়ে নিলেও তিনি যেন হতাশ না হন, কারণ তাঁর সাথে আল্লাহ আছেন। বিজয়ী তিনি হবেনই। ফিরে এসে অলৌকিক এই ঘটনা বর্ণনা করায় মুসলিমরা বিশ্বাস করলেও অমুসলিমরা হাসাহাসি, কটাক্ষ করা শুরু করলো। এতো কম সময়ের মধ্যে এতো কিছু কী করে সম্ভব? এ ব্যাপারে আবু বকর (রাঃ) -র উত্তরটা বেশ ভালো ছিল।  তিনি নাকি বলেছিলেন, আমরা যদি জিব্রাইল (আঃ) ফেরেশতার মাধ্যমে রাসূলের (সাঃ) কাছে আল্লাহর বাণী বা ওহী আনায় বিশ্বাস করতে পারি,  তাহলে মিরাজে তাঁর যাওয়ায় বিশ্বাস করা আর কঠিন কি!? 

মিরাজের ব্যাপারে (আমি নাম ভুলে গেছি) এক মহিলা সাহাবী রাসূল (সাঃ) কে নাকি জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি আল্লাহর রাসূল, আপনার জন্য মিরাজে গিয়ে এইসব দেখে আসা সম্ভব, কিন্তু আমরা সাধারণ বান্দা/বান্দি, আমাদের পক্ষে তো কোনোদিনও এসব দেখা সম্ভব না। আমরা কি করবো? উত্তরে রাসূল (সাঃ) নাকি বলেছিলেন, মু'মিনের জন্য নামাজই মিরাজ!

আর এটাই ইমামের মূল বক্তব্য। ইমাম বললেন মু'মিনের জন্য যখন খারাপ সময় যায়, বিপদ আসে, যখন কেউ সাথে নাই, সমর্থন করার কেউ নাই, তখন নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সাথে একান্তে কথা বলা, আল্লাহ তায়ালার কাছে সাহায্য চেয়ে দোয়া করাই তার জন্য 'মিরাজ' - সান্তনা, শান্তি, ভরসা পাওয়ার জায়গা।     

সাইড নোট: ১. তায়েফের সীমানা পার হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় বসে পরা  রাসূলের (সা:) কাছে 'মালাকূল জিবাল' বা পাহাড়ের ফেরেশতা এসে নাকি অনুমতি চেয়েছিল, অনুমতি পেলেই শাস্তি হিসাবে পুরো তায়িফ শহরকে পাহাড় দিয়ে পিষে ফেলা হতো। উত্তরে ওই অবস্থায়ই রাসূল (সা:) নাকি বলেছিলেন, না থাক। আজকে ওরা বিশ্বাস করছে না, কিন্তু ভবিষ্যতে ওদের বংশধরদের মধ্যে থেকেই কেউ  হয়তো এক আল্লাহ'য় বিশ্বাস করবে, মুসলিম হবে। রাসূলের এই দোয়া কবুল হয়েছিল। ২. রাসূলের (সা:) সীরাত বা জীবনীর উপর ইংরেজিতে ড. ইয়াসির কাদির একটা বিস্তারিত, লম্বা লেকচার সিরিজ আছে। পডকাস্ট কিংবা ইউটুবে পাওয়া যায়। ফোনে পডকাস্টের এপ নামিয়ে ফ্রীতে শোনা যায়।  গাড়িতে কিংবা ট্রাফিক জ্যামে বসে থাকা অবস্থায় সময় কাজে লাগানোর এটা খুব ভালো একটা উপায় হতে পারে।  



এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (৩ মার্চ, ২০২২):
উইলো গ্রোভ মসজিদ, পেনসিলভানিয়া।  


এখন আরবি শাবান মাস চলছে, এর পরেই রমাদান বা রোজার মাস। এই মাসে আমাদের নবীজি (সা:) কী কী আমল  করতেন, কেনই বা করতেন আর আমরা আজকের দিনে সেগুলির কতটুকু করতে পারি, এই বিষয়েই মূলত ইমাম খুতবায় বললেন। ইমাম শুরু করলেন এই বলে যে, একজন প্রকৃত মু'মিন কখনোই নিজের আমলে সন্তুষ্ট বা "অনেক করেছি, আর কিছু করার নেই" এই মনোভাব পোষণ করেন না। তাঁর সবসময়ই আগের থেকে বেশি আমল করার একটা ইচ্ছা বা প্রবণতা থাকে (বা থাকা উচিত)। আমাদের নবী (সা:) যা যা আমল করেছেন, বা তাঁর সাহাবীরা যা করেছেন - তার সবটুকু না হলেও, আমাদের উচিত তাঁরা কি করেছেন জেনে তার কিছুটা হলেও আমল করার চেষ্টা করা। তো, শাবান মাসে আমাদের নবী করিম (সা:) কী করতেন? সেটা আয়েশা (রা:)-র বর্ণনায় পাওয়া যায়। রাসূল (সা:) নাকি এতো বেশি রোজা রাখতেন যেন মনে হতো উনি পুরো মাসই রোজা রেখে ফেলবেন। কোনো এক সাহাবী রাসূল (সা:) কে এর কারণ জিজ্ঞেস করায় উনি (সা:) নাকি বলেছিলেন, এই মাসেই বান্দার পুরো বছরের আমলের হিসাব ফেরেশতারা আল্লাহর কাছে নিয়ে পেশ করেন। আর তাই এই পেশ করার সময় যেন তিনি (সা:) রোজাদার হিসাবে থাকতে পারেন, সেই কারণেই এতো বেশি রোজা রাখেন!

ইমাম রোজা রাখার ফজিলত বর্ণনা করে স্মরণ করিয়ে দিলেন যে, আল্লাহ নাকি বান্দার রোজার প্রতিদান নিজেই দিবেন এবং সেটা কী পরিমাণ দিবেন সেটা তিনিই জানেন। তাছাড়াও রমাদানের প্রস্তুতির জন্যও আমাদের শাবান মাসে বেশি বেশি রোজা রাখা উচিত। তাতে করে রমাদানের বা রোজার সময় আমাদের সিয়াম-কিয়াম করায় (অর্থাৎ, রোজা রাখা, রাত জেগে তারাবি বা অন্য নফল নামাজ পড়ায়) কষ্ট হবে না। রোজা মাসে অপ্রস্তুত অবস্থায় প্রবেশ করা হবে আমাদের জন্য সবচেয়ে বোকামির কাজ। ইমাম আরেকটা বিষয় খেয়াল করিয়ে দিলেন, আমাদের অনেকেই রোজায় বেশি সওয়াবের আশায় জাকাত, দান-খয়রাত ইত্যাদি অন্য সময় না দিয়ে, রোজার জন্য জমিয়ে রাখেন। এটা ঠিক না, বরং রোজার আগেই জাকাত, দান-খয়রাত এমনভাবে করা উচিত যেন গরিবের রোজার সময় আর আর্থিক দিক চিন্তা করা না লাগে। এতে করে গরিবরা রোজার সময় আল্লাহর ইবাদতে বেশি মনোযোগী হতে পারবে, যেটার প্রতিদান দানকারীও পাবে, ইনশাআল্লাহ। 

সবশেষে ইমাম আবু-দারদা (রাঃ) থেকে একটা হাদিস বললেন, রাসূল (সা:) নাকি একবার তাঁর সাহাবীদের জিজ্ঞেস করেছিলেন নফল রোজা, নামাজ এবং সাদাকা (দান-খয়রাত) ইত্যাদি অন্য ইবাদতের চেয়েও ভালো আরেকটা আমল আছে, তাঁরা সেটা জানতে চান কিনা। উত্তরে "হ্যাঁ অবশ্যই আল্লাহর রাসূল" বলায় রাসূল (সাঃ) নাকি বলেছিলেন মানুষে-মানুষে সম্পর্ক ঠিক করা; সম্পর্ক নষ্ট করা খুবই ধ্বংসাত্মক। ইমাম বললেন, শাবান মাসের আমল হিসাবে এই হাদিস মনে করে হলেও আমরা যেন রোজা রাখা, বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত, নামাজ পড়া, দান-খয়রাত করার পাশাপাশি চিন্তা করে দেখি কাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক ভালো না: নিজ পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব - যাদের সাথেই সম্পর্ক ভালো না, তাদের সাথে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে আমরা যেন সচেষ্ট হই।  



এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১৮ মার্চ, ২০২২):

উইলো গ্রোভ মসজিদ, পেনসিলভানিয়া।  

একটা হাদিস আছে, যেখানে রাসূল (সা:) দান করার মাধ্যমে দোজখের আগুন আর নিজেদের মধ্যে অন্তরায় বা বাধা তৈরী করার কথা বলেছেন, সেটা একটা খেঁজুরের অর্ধেক পরিমান দান করার মাধ্যমে হলেও। ইমাম বললেন, এই "একটা খেঁজুরের অর্ধেক পরিমান দান" - করার ব্যাপারটা নাকি অনেক হাদিসেই এসেছে। এটা নাকি এইজন্য এসেছে যেন সবাই বুঝতে পারে যে এখানে দানের পরিমান মুখ্য না, 'ইখলাস' বা 'আন্তরিকতার' সাথে দানের ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। এই হাদিস শুনে আয়েশা (রাঃ) নাকি একবার দুই বাচ্চা সহ এক মহিলা ভিখারিকে, তাঁর কাছে আর কিছু না থাকায় ৩ টা খেঁজুর দিয়েছিলেন। ওই ভিখারি মা নাকি তার দুই বাচ্চা কে দুইটা খেঁজুর দিয়ে নিজে একটা খেতে গিয়েও খান নাই, নিজের খেঁজুরটা ভাগ করে তার দুই বাচ্চাকে দিয়ে দিয়েছিলেন। আয়েশা (রা:) এই ঘটনা দেখে এসে রাসূল (সা:) কে বলার পর নাকি রাসূল (সা:) মন্তব্য করেছিলেন, ওই মা আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে শুধু এই দানের জন্য বেহেশত পেয়ে গেলো! আয়েশা (রাঃ) দানের এই ব্যাপারটা নাকি এতটাই সিরিয়াসলি নিয়েছিলেন যে, রাসূল (সাঃ) মারা যাওয়ার পরও কেউ তাঁর কাছে কিছু চাইলে, তাঁর যা আছে, সেখান থেকেই কিছু হলেও দান করে দিতেন। এমনও হয়েছে যে সেটা একটা আঙ্গুর বা কিসমিসের অর্ধেক পরিমাণও ছিল। এই ব্যাপারে আলেমদের ব্যাখ্যা অনেকটা এই রকম: কুরআনে আল্লাহ তায়ালা যেহেতু বলেছেন যে তিনি অনু পরিমান ভালো কাজেরও প্রতিদান দিবেন, সেজন্য দান পরিমাণে খুব সামান্য হলেও সেটা আল্লাহর দরবারে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বা বড় হতে পারে। এই "অনু পরিমান" ব্যাপারটা অনেকটা রোদের আলোতে বাতাসে দৃশ্যমান ধূলিকণার মতো, যা খালি চোখে অন্য সময় দেখা যায় না, কিন্তু যার অস্তিত্ব সবসময়ই আছে। সে হিসাবে অর্ধেক পরিমান খেঁজুর, আঙ্গুর বা কিসমিস তো ওজনে অনেক বেশি। আমাদের রাসূল (সাঃ) কিংবা আয়েশা (রাঃ)-র কাছে নাকি কেউ কিছু চেয়ে কোনোদিন খালি হাতে ফিরে নাই। তাই  ইমাম বললেন, আমরাও যেন কোনো ভিক্ষুক বা সাহায্যপ্রার্থীকে কখনো ফিরিয়ে না দেই। "এতো কম কী করে দেই?" - ভেবে যেন সওয়াবের সুবর্ণ সুযোগ না হারাই।  

সব শেষে ইমাম  হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে স্মরণ করিয়ে দিলেন, রোজার মাসে যেকোন দানের সওয়াব আল্লাহর কাছে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক গুন বেশি। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার দয়া এতটাই বেশি যে যেকোনো একটা খারাপ কাজের গুনাহ কিন্তু সবসময় একটাই, সেটা কয়েক গুন না। তাছাড়া, কুরআনে আল্লাহ তো বলেছেনই যে রোজার মাসে "লাইতাতুল ক্বদরের" রাতের ইবাদতের সওয়াব হাজার মাসের থেকেও বেশি। ইমাম বললেন আমরা যেন সূরা আরাফের ৪৬ নম্বর আয়াতে বলা ওই জাতির মতো না হয়ে যাই, যাদের ভালো-খারাপের পাল্লা সমান। এতো সুযোগ থাকার পরও যদি আমরা সওয়াবের পাল্লা ভারী করতে না পারি, তাহলে খুবই আফসোসের বিষয় হবে। ইমাম দোয়া করলেন আমরা যেন সবাই রোজা/রমাদান মাসে পৌঁছাতে আর তাতে ঠিকভাবে আমল করতে পারি, আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের সবাইকে সেই তৌফিক দেন।     



এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (২৫ মার্চ, ২০২২):
উইলো গ্রোভ মসজিদ, পেনসিলভানিয়া।  

আজকের খুতবা অন্য ইমাম দিলেন। এই ইমাম পেশায় একজন চোখের ডাক্তার। অসম্ভব সুন্দর কের'আত করে কুরআন তেলাওয়াত করে নামাজ পড়ান। শুরুতেই মাফ চেয়ে বলে নিলেন উনার মুখে কিছু একটা হয়েছে (মনে হলো দাঁত ফেলেছেন), কথা জড়িয়ে যাচ্ছে, আমরা যেন কিছু মনে না করি। আরো বললেন যে উনি বেশ কিছুদিন ধরে ভালোভাবে খেতে পারছেন না। আর তাতে নাকি তাঁর উপলব্ধি হয়েছে যে আসলে বেঁচে থাকার জন্য আমাদের খুব বেশি খাবার খাওয়ার দরকার নাই। অনেকটা মজা করে বললেন, রোজার সময় তাই না-খাওয়ার কষ্টের জন্য ভয় পাওয়ার দরকার নাই। 

যাই হোক, গত শুক্রবারের মতো আজকেও ইমাম "অর্ধেক খেঁজুর দান" করার হাদিস বললেন, আয়েশা (রাঃ)-র দুই বাচ্চার এক গরিব মাকে ৩টা খেঁজুর দেয়ার কাহিনী বললেন। এর পর যেটা বললেন, সেটা বেশ ইন্টারেষ্টিং ছিল। ইমাম বললেন আমরা অনেকেই খেয়াল করি না যে ওই সময় মদিনা শহরের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল। খরা আর দুর্ভিক্ষের মতো অবস্থা থাকায় প্রায়ই মানুষ না খেয়ে থাকতে হতো। ওই অবস্থায়, ওই মা নিজে ক্ষুধার্ত থাকার পরও নিজের খেঁজুর ভাগ করে বাচ্চাদের দিয়ে দেওয়া আপাত ভাবে "বাচ্চার প্রতি মায়ের ভালোবাসা" মনে হলেও, আসলে এর থেকে অনেক বড় ব্যাপার ছিল: নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের আন্তরিকতা বা "ইখলাস" ছিল। ইমাম বললেন, ইখলাস বা আন্তরিকতা হচ্ছে হিপোক্রেসির বা কপটতার উল্টো। কপটতা কি? ভেতরে এক আর বাহিরে আরেক - এর নামই কপটতা। আর তাই ভেতরে-বাইরে এক থাকাই হচ্ছে 'ইখলাস' বা আন্তরিকতা। এরপর উদাহরণ দিয়ে বললেন, আমরা নামাজে দাঁড়িয়ে যদি বাহ্যিকভাবে নামাজ আদায় করি, হাত-পা নাড়ছি, মুখ নড়ছে, কিন্তু নামাজে মন নাই - তাহলে সে নামাজ বাইরে থেকে পড়া হচ্ছে, ভেতর থেকে না। নামাজে আমাদের দেহের বিভিন্ন অঙ্গের সাথে সাথে মনেরও ইবাদতে মশগুল থাকতে হবে, 'ইখলাস' থাকতে হবে। নামাজ ছাড়াও আমাদের সব কাজেই মনে-বাইরে এক থাকার চেষ্টা করে যেতে হবে।   

এরপর বললেন আমরা যেন "অনু" পরিমাণ ভালো কাজকে ছোট না করি, একইভাবে "অনু" পরিমাণ খারাপ কাজকেও যেন হালকা ভাবে না নেই। বিশেষ করে সামনের রোজা মাসে এই সময়টাতে। ব্যাখ্যা করে বললেন, রোজার মাসে অনেক সময়ই আমরা ভাবি "সারাদিন রোজা রেখেছি, আগামীকাল কাজ আছে, রোজা রাখার জন্যই এখন রেস্ট নেওয়া জরুরি, আজকে আর নফল নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত করার দরকার নাই, কালকে করবো" -- এই ধরণের চিন্তা করে আমরা ভালো কাজ কে ছোট করে ফেলি। একই ভাবে, "আরে, আল্লাহর কাছে মাফ চেয়ে নিবো, আল্লাহ তায়ালা তো মাফ করে দিবেনই"  - ভেবে ছোটখাট গুনাহর কাজকে হালকাভাবে নিয়ে করে ফেলি। সেটা করা যাবে না। উদাহরণ দিয়ে বললেন, ধরা যাক, কারো পুরো "হেলথ ইন্সুরেন্স" করা আছে, অসুস্থ হলে হাসপাতালের, ঔষধপত্রের যাবতীয় খরচ সেটা দিয়ে উঠে আসবে, চিকিৎসা পেয়ে সুস্থও হয়তো হয়ে যাবে - কিন্তু তাই বলে তো কেউ আর তিন তলা থেকে লাফ দিয়ে নিজের ক্ষতি করে না। একই ভাবে, আল্লাহ তায়ালা মাফ করে দিবেন বলেই নিজের ক্ষতি করে ছোটোখাটো গুনাহর কাজ করা ঠিক হবে না। তারপর একটা হাদিস বললেন সেটা অনেকটা এই রকম: প্রকৃত মু'মিন নাকি ছোটখাটো গুনাহর কাজকেও নিজের মাথার উপর 'যেকোন সময় ভেঙে পড়বে' এমন একটা পাহাড় ঝুলে আছে মনে করে, আর উল্টোদিকে কপট ব্যক্তি নাকি এই রকম কাজকে নিজের মুখের উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া পোকার মতো হাত দিয়ে তাচ্ছিল্যভরে সরিয়ে দেয়, আমলে নেয় না! ইমাম সাবধান করে দোআ করলেন আমরা যেন ঐরকম গাফেল আর আল্লাহর অবাধ্য না হই। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ