এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১৩ মে, ২০২২)

এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১৩ মে, ২০২২)
মাসজিদ আল-জামিয়া, ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভানিয়া 

আজকের খুতবার বিষয় ছিল মৃত্যু-পরবর্তী কবরের আজাব, এই আজাব হওয়ার কারণ, এর থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য করণীয় এবং দুআর আলোচনা। ইমাম মূলতঃ সহীহ হাদিসের বিভিন্ন রেফারেন্স ব্যবহার করে এইসব নিয়ে  আলোচনা করেছেন। 

ইমাম শুরু করলেন একটা হাদিস বলে যেটা অনেকটা এইরকম: প্রত্যেক মানুষ তিন ধরণের জীবনের মধ্যে দিয়ে যাবে। প্রথমটা ইহকাল, পরেরটা মৃত্যু পরবর্তী কবরের জীবন, আর তারপর কেয়ামতের পরে আখিরাতের অনন্ত জীবন। ইমাম  বললেন, অনেকের জন্যই ইহকাল শুরুর আগেই অথবা সাথে সাথেই শেষ হয়ে যায়, কিন্তু কবরের জীবন আর কেয়ামতের পর আখিরাতের জীবন থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই। কবরের জীবন বা সময়কাল যার জন্য ভালো, তার আখিরাত আরো ভালো; আর যার জন্য কবরের সময় খারাপ, তার জন্য আখিরাত আরো খারাপ। ইমাম হাদিসের রেফারেন্স দিয়ে বললেন, প্রত্যেক মানুষ দুনিয়ার জীবন ছেড়ে যাওয়ার সময় কবর পর্যন্ত তার তিন সঙ্গী থাকে, ১. আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-পরিচিত, ২. তার 'মাল' বা সম্পদ আর ৩. তার 'আমল' বা কাজ। কবরে শুইয়ে দিয়ে প্রথম দুই সঙ্গী বিদায় নেয়, যারা তার আর কোনো কাজে আসে না কিন্তু তৃতীয় সঙ্গী বা 'আমল' কবরে তার সাথে থাকে। আর এই আমলের উপর ভিত্তি করেই কবরের জীবনের আজাব বা শান্তির মাত্রা ঠিক হয়। মৃত্যুর পর কবর পর্যন্ত কারো 'মাল' বা সম্পদ যাওয়ার ব্যাখ্যায় ইমাম বললেন এর একটা মানে হচ্ছে তার সম্পদের কারণে তার কবরস্থান পর্যন্ত যাওয়ার মিছিলে গাড়ি বা বাহনের চাকচিক্য, সংখ্যা ইত্যাদি বোঝায়।       

এরপর ইমাম হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে যেটা বললেন সেটা বেশ ভয়ঙ্কর। প্রত্যেকটা মানুষের কবরের আজাব হবে। এটা হবেই -  এর মাত্রা বা স্থায়ীত্ব হয়তো তার আমলের কারণে ভিন্ন হবে, কিন্তু কবরের 'চাপ' প্রত্যেকের জন্যই হবে। মৃত্যুর পরে এই 'চাপ'/ আজাব কি শারীরিক, আত্মার উপর, না অন্য কোনো উপায়ে হবে - সেটা নিয়ে বিতর্ক না করে ইমাম বললেন, যেহেতু সহীহ হাদিসে এর উল্লেখ আছে, তাই আমাদের এটাতে বিশ্বাস করতে হবে। হাদিসে আরো আছে, রাসূল (সা:) নাকি বলেছেন, মানুষ যদি কবরের আজাবের কারণে মুর্দার আর্তনাদ শুনতে পেতো তাহলে সে নিজেকে বা নিজের আত্মীয়-স্বজনকে মৃত্যুর পর আর দাফন করতো না!

কী কী কারণে মৃত ব্যক্তির কবরের আজাব হয় সেটার ব্যাখ্যায় ইমাম বললেন হাদিসে আছে রাসূল (সা:) বলেছেন মূলতঃ ৪ টা কারণের তা হয়ে থাকে: ১. কেউ অবিশ্বাসী হয়ে মারা গেলে, ২. জীবিত থাকতে পরনিন্দা-পরচর্চা করলে, ৩. বাথরুম করার সময় ঠিক মতো না করলে, ৪. মারা যাওয়ার পর কারো আত্মীয়-স্বজন বিলাপ করে কান্না-কাটি করলে! প্রথম দুটো কারণ সহজে বুঝা যায়। আর বাথরুম ঠিকমতো ব্যবহার না করার ব্যাখ্যায় ইমাম উদারণ দিয়ে বললেন, অনেক মুসল্লিই খুব তাড়াহুড়ো করে বাথরুমের কাজ সারেন, বিশেষ করে ছোট বাথরুম, এমনকি অনেকে দাঁড়িয়ে করে - এতে করে কাপড়ে ছিটা পরে, অনেকের বাথরুম ঠিকমতো শেষ না হতেই বের হয়ে আসেন - এই অবস্থায় তাদের নামাজ কবুলের প্রথম শর্ত (অর্থাৎ কাপড়, দেহ পরিষ্কার থাকা- ওযু থাকা) নষ্ট হয়ে যায়, যাতে করে তাদের নামাজ হয় না। আর তাই-ই এই আজাব। তাই নিজেদের বাসার, মসজিদের টয়লেট, বাথরুম পরিষ্কার রাখা, ঠিক মতো ব্যবহার করার নিয়ম জানার উপর ইমাম জোর দিলেন। চার নম্বর (আত্মীয়-স্বজন বিলাপ করে কান্না-কাটি করলে যে আজাব হয়) কারণের ব্যাখ্যায় ইমাম বললেন, মৃত্যু আল্লাহ তা'য়ালার নির্দেশে, নির্ধারিত সময়ে আসে। কারো মৃত্যু হলে পরিবার- আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী মন খারাপ করে কান্না-কাটি করতেই পারে,  আফসোস করতেই পারে - তাতে কোনো অসুবিধা বা বাধা নাই; কিন্তু হা-হুতাশ করে "আমার উপর কেন এমন হলো?", "এইটা আল্লাহ তোমার কি বিচার?", "কেনো তাকে আমার কাছ থেকে নিয়ে গেলা?"  - টাইপ বিলাপ করে, চিৎকার করে কান্না-কাটি করলে আদতে তা আল্লাহর ইচ্ছার, তাঁর নির্দেশের প্রতি অনাস্থা দেখানো হয়। ইমাম বললেন সেইজন্য আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজেদের আত্মীয়-স্বজনকে আগে থেকেই সাবধান করে দেয়া যেন আমাদের মৃত্যুর পর তারা এমন না করেন। 

সবশেষে ইমাম রাসূল (সাঃ) -এর একটা দোয়া শিখিয়ে দিলেন: প্রত্যেক ফরজ নামাজের পরে (আত্তাহিয়াতু আর দুরুদ পড়ার পর) ৪ টা জিনিস থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ে সব সময় দোয়া করতে হবে: ১. দোজখের আগুন, ২. মৃত্যুর পর কবরের আজাব, ৩. জীবিত ও মৃত জীবনের সব রকম পরীক্ষা আর ৪. শেষ সময়ে দজ্জালের ফিতনা বা পরীক্ষা থেকে। ইমাম এই দোয়াকে অভ্যাসে পরিণত করার পরামর্শ দিলেন। 

[নামাজ শেষ করার পর আমি ইমামকে দোয়ার ৩ নম্বর, অর্থাৎ  "জীবিত ও মৃত জীবনের সব রকম পরীক্ষা" - এর মানে জিজ্ঞেস করেছিলাম। ইমাম বললেন, এরকম অনেক উদাহরণ আছে, সারা জীবন আমল করেও শেষ সময়ে মানুষ লক্ষ্য হারিয়ে ফেলে, ঈমান হারিয়ে ফেলে, মৃত্যু হচ্ছে জেনেও 'কালেমা' পড়তে চায় না। এইগুলো হচ্ছে জীবিত অবস্থায় পরীক্ষা। আর মৃত্যুর পর ফেরেশতাদের 'সওয়াল - জবাব' (যখন রব, দ্বীন আর রাসূল (সা:) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে) তখন অনেকে জেনেও তার উত্তর দিতে পারবে না  - এইটা হচ্ছে মৃত্যুর পর পরীক্ষা। এই দুই ধরণের পরীক্ষা থেকে বাঁচার দোয়াই করতে বলা হয়েছে।]   

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ