এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (২০ মে, ২০২২)

এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (২০ মে, ২০২২)
মাসজিদ আল-জামিয়া, ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভানিয়া

ইমাম শুরু করলেন সূরা আলে-ইমরানের (৩: ১০২ নম্বর) আয়াত দিয়ে, যেটা প্রতি খুতবার শুরুতে ইমামরা পড়ে থাকেন: "ও বিশ্বাসীগণ, আল্লাহকে ভয় করো, যেমনভাবে তাঁকে ভয় পাওয়া উচিত, আর মুসলিম না হয়ে কেউ মৃত্যুবরণ কোরো না"। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম বললেন, এরকম অনেক উদাহরণ আছে যেখানে সারা জীবন আপাত মুসলিম বা বিশ্বাসী হয়ে জীবনযাপন করে, যেমন নামাজ পড়ে, জাকাত দিয়ে, রোজা রেখেও মৃত্যুর শেষ সময়ে এসে মানুষ অবিশ্বাসী, অমুসলিম হয়ে মারা যায়। সূরা কাসাসের (২৮:৮৩ নম্বর) আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে ইমাম বললেন, আল্লাহ তা'য়ালা এই আয়াতে বলেছেন তিনি বেহেশত তাদের জন্য নির্ধারিত করে রেখেছেন যারা দুনিয়াতে অহংকারী নয়, দুর্নীতি করে না আর যাদের শেষ হয় মুত্তাকীতে (আল্লাহর ভীতিতে)। ইমাম খেয়াল করিয়ে দিলেন যে এই আয়াতেও শেষ পরিণতিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।   

ইমাম বললেন আমাদের অনেকেই নিজেদের অজান্তেই নিজেদের "ভালো মুসলিম" মনে করি, "আমি তো অন্যের থেকে বেশি পরহেজগার" ভেবে অহংকার করে ফেলি, অন্যকে ছোট করে ফেলি। খুব সাবধান থাকতে হবে। অন্যের আখিরাত কেমন হবে, সে ব্যাপারে আমরা যেন কখনোই বিচার করে না ফেলি, সিদ্ধান্ত নিয়ে না ফেলি। বরং নিজেদের শেষ সময় কিভাবে মুসলিম অবস্থায় হয়, সেটা নিয়ে যেন ভাবি। এরপর ইমাম রেফারেন্স দিয়ে একটা সহীহ হাদিস বললেন: রাসূল (সা:) বলেছেন, এই দুনিয়াতে অনেক মানুষ আছে যাদের জীবনযাপন বেহেশত বা জান্নাতবাসীদের মতো যদিও তাদের শেষ আবাস হবে জাহান্নাম, আবার অনেক মানুষ আছে যাদের চাল-চলন জাহান্নামীদের মতো তবে তাদের শেষ আবাস হবে জান্নাত! ইমাম বললেন শেষ বিচারের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা'য়ালা। তিনিই সবার অন্তরের খবর জানেন, আর কেউ না।

এরপর ইমাম একটা গল্প বললেন: এক ব্যক্তি হ্বজে [অথবা উমরাহ - আমার ঠিক খেয়াল নাই] গিয়ে নাকি খালি চিৎকার করে দোয়া করছিলো যেন আল্লাহ তা'য়ালা তার মৃত্যু মুসলিম অবস্থায় করেন। বাকি মুসল্লিরা তাওয়াফ করে করে ঘুরে ওই লোকের কাছে আসলে তখনো তাকে একই দোয়া করতে শুনছিলেন। এরপর একজন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেসই করে ফেললেন যে এর বাইরে কি আল্লাহর কাছে তার আর চাওয়ার কিছু নাই? উত্তরে ওই লোক বলেছিলো, তার অবস্থা জানলে নাকি তাকে কেউ এই প্রশ্ন করতো না। তারা তিন ভাই। বড় ভাই ৪০ বছর ধরে নাকি মসজিদের মুয়াজ্জিন ছিলেন। কখনো নামাজ বাদ দিতেন না। সবাই তাকে মুসল্লি, সজ্জন হিসেবেই চিনতো। কিন্তু মৃত্যুর সময় পরিবারের সবাই তাকে কালেমা পড়াতে চেষ্টা করেও পারছিলেন না। শেষ সময় নাকি ওই বড় ভাই একটা কুরআন চাইলে সবাই খুশি হয়ে তার হাতে একটা কুরআন দিতেই তিনি নাকি কসম খেয়ে বলেছেন, তিনি এই কুরআনের থেকে অনেক দূরে, এটাতে বিশ্বাস করেন না!  পরের ভাইও নাকি ঠিক একই ভাবে মারা গেছেন। শেষ ভাই হিসেবে তার ভয় ঢুকে গেছে, আর তাই-ই তিনি শুধু এই একটাই দোয়া করছেন। 

এরপর ইমাম শেষ সময় কারা মুত্তাকী বা বিশ্বাসী, তাদের লক্ষণ বা চিহ্ন কি হবে সেটা বললেন। রাসূল (সা:) নাকি চার ধরণের উদাহরণ দিয়েছেন: ১. মৃত্যুর আগে যে ব্যক্তির শেষ কথা বা সাক্ষ্য হবে কালেমা: লা-ইলাহা -ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (অর্থাৎ, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আর মুহাম্মাদ (সা:) আল্লাহর রাসূল) তার জন্য জান্নাত নিশ্চিত। ২. এইরকম ব্যক্তির আরেকটা লক্ষণ হবে যে মৃত্যুর সময় তাঁর কপাল ঘামবে। ৩. কারো মৃত্যু শুক্রবার সকালে, অথবা শুক্রবার রাতে (আসলে বৃহস্পতিবার রাতে কেননা ইসলামে কোনো দিনের শুরু হয় রাতে, আর শেষ হয় ওই দিন শেষে সূর্য অস্ত গেলে) হলে সেটা মুত্তাকীর লক্ষণ, আল্লাহ তার কবরের আজাব কমিয়ে দেন, ৪. কেউ শহীদ হয়ে মারা গেলে। এরপর ইমাম বললেন শুধু যে ইসলামের জন্য যুদ্ধে মারা গিয়ে শহীদ হতে হবে এমন নয়। ইসলামে এছাড়াও যারা নিজের জীবন বা আত্মরক্ষা করতে গিয়ে, কিংবা নিজের সম্পত্তি বা পরিবার রক্ষা করতে গিয়ে মারা যায়, তাঁরাও শহীদ। এর ব্যাখ্যায় ইমাম বললেন, ইসলামে প্রতিটি মানুষের জীবন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ বলে গণ্য আর সেই মানুষ যদি মুসলিম হয়, তাহলে তা আরো সম্মানিত। ইমাম আরেকটা হাদিস বললেন, মানুষ যে যে অবস্থায় মারা যাবে, কিয়ামতের দিন তাকে সেই অবস্থায় পুনরুজ্জীবিত করা হবে। যেমন কেউ হ্বজ করতে গিয়ে মারা গেলে সে "লাব্বায়েক আল্লাহ হুম্মা লাব্বায়েক" বলতে বলতে জেগে উঠবে, কেউ সিজদারত অবস্থায় মারা গেলে সে ওই অবস্থায় উঠবে। ইমাম বললেন, আমাদের মৃত্যু যেন মুসলিম অবস্থায়, ভালো কাজে থাকা অবস্থায় হয় - সেটা আমাদের দোয়ার অংশ হওয়া উচিত। 

সব শেষে ইমাম রাসূল (সা:)-এর একটা দোয়া শিখিয়ে দিলেন, যেটার ভাবার্থ অনেকটা এইরকম: আল্লাহ আমাদের সবার সব কাজের শেষ ভালো করে দিও, জীবিত অবস্থায় অপমান থেকে রক্ষা করো আর মৃত্যুর পর জাহান্নামের আগুন/আজাব থেকে বাঁচাও।  


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ