এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১০ জুন, ২০২২) - মানুষের ইচ্ছাশক্তি

এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১০ জুন, ২০২২)  
মাসজিদ আল-জামিয়া, ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভানিয়া

আজকের খুতবা গত খুতবার আলোচনার সম্প্রসারণ ছিল। আলোচনার বিষয় মানুষের ইচ্ছাশক্তি বা "ফ্রি উইল"। আল্লাহ যদিও সবার ভাগ্যে কি আছে তা আগে থেকেই জানেন, তবে মানুষকে তাঁর ইচ্ছামতো চলার স্বাধীনতা দিয়েই  দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছে। সূরা কাহাফের (১৮:২৯ নম্বর আয়াতের) উদ্ধৃতি দিয়ে ইমাম বললেন, আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর রাসূলকে (সা:) বলতে শেখাচ্ছেন : "বলুন, সত্য আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে। আর তাই, যার ইচ্ছা সে তা বিশ্বাস করুক, আর যার ইচ্ছা সে তা অবিশ্বাস করুক" - এই আয়াতের পরের অংশে আল্লাহ তা'য়ালা অবিশ্বাসীদের পরিণতির ভয়াবহতা বর্ণনা করেছেন। ইমাম বললেন, আর এ থেকে বুঝা যায়, মানুষ তার ইচ্ছানুযায়ী কর্ম, পথ বেছে নিবে, কিন্তু তার পরিণতির জন্য সে নিজেই দায়ী থাকবে, অন্য কেউ না। 

এই কথা বলার কারণ হিসাবে ইমাম বললেন যে দুইটা ভ্রান্ত ধারণা নবীর যুগের পর থেকেই চালু আছে। একটা হচ্ছে, মানুষের কোনো কাজ-ই, সেটা  খারাপ হোক, আর ভালো হোক -  আসলে সেটা তার নিজের না, সেটা আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে আছে। অনেকটা যেন আল্লাহ তা'য়ালা মানুষের উপর তা চাপিয়ে দিয়েছেন (নাউযুবিল্লাহ - আমরা আল্লাহর আশ্রয় চাই)। আরেকটা "ভ্রান্ত" মত হচ্ছে, মানুষের সকল ভালো কাজ আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, আর খারাপ কাজ মানুষ নিজে করে যেটার উপর আল্লাহ তা'য়ালার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এটা অনেকটা এই ধারণা থেকে আসছে যে, মানুষ যে খারাপ কাজ করবে আল্লাহ তা'য়ালা সেটা আগে থেকে জানেন না (নাউযুবিল্লাহ - আমরা আল্লাহর আশ্রয় চাই )। [ইমাম এই দুই মতের নাম বলেছিলেন, আমার এখন খেয়াল নাই]। ইমাম বললেন এই দুই ধারণাই ভুল। সঠিক মত হচ্ছে, আল্লাহ যেমন মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তেমনি মানুষের কাজও তিনি সৃষ্টি করেছেন ভালো হোক বা খারাপ, মানুষ সব কাজই আল্লাহর অনুমতিক্রমে করে থাকে, কিন্তু মানুষ নিজের ইচ্ছায়ই তা করে থাকে। ইমাম বললেন, আল্লাহ অনেকসময় মানুষের সৎ-নিয়তের কোনো কাজ করার অনুমতি দেন না (তার কারণ আল্লাহই ভালো জানেন), আর তাই সেটা করা হয়ে ওঠে না। একই ভাবে অনেকসময় মানুষ কোনো একটা খারাপ কাজ করতে গিয়েও করতে পারে না কারণ আল্লাহ তার অনুমতি দেন নাই।

অনেকে খারাপ কাজ করার পর বলেন শয়তান তাকে দিয়ে এই খারাপ কাজ করিয়েছে। এই প্রসঙ্গে ইমাম সূরা ইব্রাহিমের (১৪:২২ নম্বর আয়াত) উদ্ধৃতি দিয়ে বললেন, কেয়ামতের দিন বিচার শেষে শয়তান জাহান্নামীদেরকে বলবে, যার অর্থ অনেকটা এইরকম: "আল্লাহ তোমাদেরকে সত্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আর আমি মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যা আমি পূরণ করি নাই। তোমাদের উপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না, আমি শুধু তোমাদেরকে আহ্বান করেছিলাম আর তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলে। কাজেই আমাকে দোষারোপ না করে নিজেদেরকেই দোষারোপ করো। না আমি তোমাদের কোনো উপকারে/কাজে আসবো, আর না তোমরা আমার কোনো উপকারে/কাজে আসবে"। ইমাম বললেন, আল্লাহ শেষ বিচারের দিন কারো প্রতি অবিচার বা জুলুম করবেন না - দুনিয়াতে যার যা কর্মফল ছিল, শেষ বিচারের দিনে তাই-ই তার প্রাপ্য হবে।  

এরপর প্রথম ভ্রান্ত মতের লোকদের (যারা মনে করে সব কিছুই আল্লাহ নির্ধারিত, মানুষ শুধু রোবটের মতো করে যাচ্ছে) ব্যাপারে একটা গল্প বললেন (যেটা আমি আগে শুনি নাই)। উমর (রা:)-র খেলাফতের সময় নাকি এক মুসলিম চুরি করে ধরা পড়েছে। তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো মুসলিম হয়ে, চুরি করা হারাম এবং এর শাস্তি হাত কেটে নেয়া জেনেও কেন সে চুরি করলো? উত্তরে সে নাকি উমর (রা:) কে বলেছিলো, আল্লাহর পূর্ব-নির্ধারিত ইচ্ছায়, তাঁর অনুমতিতেই সে চুরি করেছে। এর উত্তরে উমর (রা:) নাকি বলেছিলেন, তাহলে তো আমাকে বলতে হয় আল্লাহর পূর্ব নির্ধারিত ইচ্ছায়, তাঁর অনুমতিতেই এখন আমাকে শাস্তি প্রয়োগ করতে হবে। শাস্তি হিসাবে ঐ লোকের হাত কেটে নেয়া হয়েছিল। শুধু তাই না, আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করায় তাকে বেতের বাড়িও দেয়া হয়েছিল।  

সবশেষে ইমাম একটা হাদিস বলে একটা মন্তব্য করলেন, যেটা শুনে আমি চিন্তায় পড়েছি। একটা সহীহ হাদিস আছে যে রাসূল (সা:) বলেছেন শেষ জমানায় মুসলিমরা ৭৩ টা ভাগে বা দলে বিভক্ত হবে। এর মধ্যে শুধু এক ভাগ বা দল সঠিক পথে থাকবে। ইমাম বললেন, আজকের দিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইউটিউব সহ অন্যান্য প্লাটফর্মে অনেক বিষয়ের উপর লেকচার, ওয়াজ ইত্যাদি হয়। আমরা এইসব বক্তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা,  বিশেষত ইসলামী শিক্ষার ব্যাকগ্রাউন্ড, তাদের বক্তব্যের রেফারেন্স বা সোর্স যাচাই না করেই তাদের বক্তব্য শুনে যাচ্ছি। বিশেষ করে ঐসব বক্তা যদি বাকপটু হন, তাহলে আমরা অনেকক্ষেত্রেই শুধু শুনছিই না, বিশ্বাস করছি, মানছিও। ইমাম বললেন, আজকাল অনেক বক্তাই জেনে কিংবা না জেনে অনেক সময় মূল তথ্য বিকৃত করে ফেলছেন, ভুল বলছেন। ইমাম সাবধান করে দিয়ে বললেন আমরা যেন বাকি ৭২ দলের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে যাই। কিন্তু কিভাবে এর থেকে বাঁচা যাবে?  ইমাম বললেন, আমাদের উচিত রাসূল (সা:)-এর সময়কার সাহাবী, কিংবা তার পর পর ২-১ প্রজন্মের সাহাবী/আলেমদের কাজ, লেখা বইগুলো পড়া। ওই প্রজন্মের অনেক বড় বড় আলেমের ইসলামী সব বিষয়ের উপর লেখা বই, কুরআনের তাফসীর, হাদিসের ব্যাখ্যা ইত্যাদি আছে। তাঁরা রাসূল (সা:) কাছ থেকে সরাসরি কিংবা তাঁর সরাসরি সাহাবীদের কাছ থেকে ভালোভাবে বুঝে নিয়েই এইসব বিষয়ের উপর লিখে গেছেন। বর্তমান সময়ের বক্তা যারা ঐসব সোর্স ব্যবহার করেন, রেফারেন্স দিয়ে কথা বলেন, তাদের লেকচার শুনলে ঠিক আছে। আমরা যেন আমাদের ধর্মের ব্যাপারে সিরিয়াস হই।  আমাদের কোনো কাজের বিনিময়ে আমরা যেমন নকল টাকা বা পারিশ্রমিক নিতে রাজি হবো না, একই ভাবে আমাদের আমলের, ধর্মের জন্য ব্যয় করা সময়ের, চেষ্টার বিনিময়েও যেন আমরা যে কারো উপদেশ গ্রহণ না করি।     



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ