এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১৭ জুন, ২০২২) - হজ্জ্ব করার গুরুত্ব
এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১৭ জুন, ২০২২) - হজ্জ্ব করার গুরুত্ব
মাসজিদ আল-জামিয়া, ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভানিয়া
আজকে একটু দেরি করে জুমুআর খুতবায় পৌঁছেছি। অনেকগুলো রাস্তা বন্ধ ছিল, মেরামতের কাজ চলছে। বেশ কিছুটা পথ হেঁটে গিয়ে পৌঁছাতে দেরি হয়ে গেছে। গিয়ে শুনলাম আলোচনা হচ্ছে হজ্জ্ব করার গুরুত্বের উপর।
ইমাম বলছিলেন ইব্রাহিম (আ:) ও তাঁর ছেলে ইসমাইল (আ:) যখন কাবা শরীফের ভিত্তি তৈরি করে দুআ করেছিলেন, তখন আল্লাহ তা'য়ালা ইব্রাহিম (আ:) কে দুনিয়ার সব মানুষকে আহ্বান করে আল্লাহর ঘরে হজ্জ্ব করতে বলেছিলেন। ইব্রাহিম (আ:) নাকি প্রশ্ন করেছিলেন তাঁর আহ্বান মানুষের কানে পৌঁছাবে কিভাবে? উত্তরে নাকি আল্লাহ তা'য়ালা বলেছিলেন ইব্রাহিম (আ:)-এর কাজ আহ্বান করা, সেটা পৌঁছানোর দায়িত্ব আল্লাহ তা'য়ালার। এরপর ইব্রাহিম (আ:) কাবার পাশে কোনো এক পাহাড়ে (সাফওয়া কিংবা মারওয়া - আল্লাহ ভালো জানেন) উঠে নাকি আহ্বান করেছিলেন। সেই আহ্বান নাকি সেই সময় অলৌকিকভাবে সবাই শুনেছিলো।
ইমাম বললেন, কুরআনে সূরা হজ্জ্ব-এ (সূরা নং ২২: আয়াত ২৭-২৮) ইব্রাহিম (আ:) কে আহ্বান করার এই নির্দেশ বর্ণনা করা আছে। আরো বলা আছে এই আহ্বান শুনে মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে পায়ে হেঁটে, পশুতে চড়ে আসবে। আল্লাহ তা'য়ালা রাসূল (সা:) কে এই আয়াতে আরো স্মরণ আরো করিয়ে দিচ্ছেন যে হজ্জ্ব করার অনেক উপকারিতা আছে, ফজিলত আছে। হজ্জের সময় যেন মানুষ পশু কুরবানী করে নিজে খায়, আর গরিবকেও খাওয়ায়। ইমাম বললেন, ইব্রাহিম (আ:) -এর মাধ্যমে সমস্ত মানুষজাতিকে আল্লাহ তা'য়ালা হজ্জ্ব করার আহ্বান করেছেন। এই কিছুদিন আগেও মানুষজন পায়ে হেঁটে, উটে কিংবা অন্য কোনো পশুর উপর চড়ে হজ্জ্ব করতে আসতো। ইমাম বললেন তার শিক্ষক সমসাময়িক কিছু মানুষ এখনো বেঁচে আছেন যাঁরা পায়ে হেঁটে হজ্জ্ব করতে গেছেন। তখনকার দিনে কারো হজ্জ্ব করার সামর্থ থাকা বলতে উট বা অন্য কোনো পশুর বাহন থাকা, খাবার-দাবার থাকা আর শারীরিক শক্তি বোঝাতো। এখনকার দিনে সেটা শুধু টাকা আর শারীরিক সামর্থ থাকা হয়ে গেছে।
ইমাম বললেন, হজ্জ্ব করা আল্লাহর আহ্বান। কারো সামর্থ থাকলে, অর্থাৎ হজ্জ্ব করা ফরজ হয়ে গেলে যেন কেউ আল্লাহর আহ্বানে সাড়া দিতে দেরি না করেন। কোনো মুসলিম যদি সামর্থ থাকা সত্বেও, কোনো কারণ ছাড়া হজ্জ্ব না করে, কিংবা দুনিয়ার কাজে ব্যস্ত থাকায় দেরি করতে গিয়ে হজ্জ্ব না করেই মারা যায়, তাহলে সে কাফের হয়ে মারা গেলো -- ব্যাপারটা এতটাই সিরিয়াস। ইমাম বললেন আমরা অনেক সময়ই ভাবি, "বয়স হয়ে নিক, সব গুছিয়ে নেই, বাচ্চা-কাচ্চা মানুষ করে নেই, তারপর হজ্জ্ব করবো" - এইটা ভুল একটা চিন্তা। কারো সামর্থ হলে সাথে সাথেই হজ্জ্ব করে ফেলা কিংবা নূন্যতম পক্ষে নিয়ত করে সেই হিসাবে কাজ শুরু করা উচিত। কোনোভাবেই দেরি করা উচিত না। আল্লাহর আহ্বানে সাড়া দিলে এই দৃঢ় বিশ্বাস রাখা জুরুরি যে আল্লাহই দুনিয়ার বাকি সবকিছুর ব্যবস্থা করে দিবেন। ইমাম স্মরণ করিয়ে দিলেন এই পান্ড্যেমিকে অনেক মানুষ হজ্জ্ব করার জন্য টাকা জমা দিয়ে দিয়েছিলেন। পরে সব বাতিল হয়ে যায়। তাদের মধ্যে হয়তো অনেকেই করোনা ভাইরাসে কিংবা অন্য কোনোভাবে মারা গেছেন, আর হজ্জ্ব করার সুযোগ পাননি। এখন যখন আবার হজ্জ্ব চালু হয়েছে, যদিও সেটাও সীমিত সংখ্যায়। কাজেই আজকে আমার সামর্থ আছে, কিন্তু আমি হজ্জ্ব করলাম না, কিন্তু পরে সেটা আর আদৌ করা হবে কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
এরপর ইমাম একটা সহীহ হাদিস বললেন। রাসূল (সা:) নাকি তাঁর সাহাবীদেরকে হজ্জ্ব করার গুরুত্বের কথা বলছিলেন। তখন এক সাহাবী রাসূল (সা:) কে জিজ্ঞেস করলেন যে তাঁদের কি প্রতি বছর হজ্জ্ব করা উচিত কিনা। রাসূল (সা:) এই প্রশ্নের উত্তর না দেয়ায় ওই সাহাবী নাকি পরপর আরো দুইবার একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন। এর উত্তরে রাসূল (সা:) নাকি বলেছিলেন তিনি যদি 'হ্যাঁ' বলেন তাহলে সেটা (অর্থাৎ, তাঁর উম্মতের মধ্যে সামর্থবানদের প্রতি বছর হজ্জ্ব করা) ওয়াজিব হয়ে যাবে, যেটা কষ্টসাধ্য হবে, অনেকেই হয়তো করবে না। তিনি আরো বলেছিলেন, যদি তিনি কোনো নির্দেশনার বিষয়ে বিস্তারিত না বলেন, তাহলে বুঝে নিতে যে সেটা ভালোর জন্যই বলেন না। এরপর আগের নবীদের ঘটনা বলে তিনি (সা:) নাকি বলেছিলেন, আগের অনেক নবীর উম্মতেরা এইরকম নির্দেশনার পক্ষে-বিপক্ষে প্রশ্ন আর তর্ক-বিতর্ক করে পথভ্রষ্ট হয়ে গিয়েছিলো, আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। [যদিও ইমাম নির্দিষ্টকরে বললেন নি, কিন্তু আমার মনে হয়েছে এই হাদিস বলে ইমাম এটাই বোঝাতে চেয়েছেন যে যখন কারো উপর হজ্জ্ব ফরজ হয়ে যাবে, সে যেন যুক্তি-তর্ক করে সেটা দেরি করার কারণ না খুঁজে।]
সাইড নোট: আমার পরিচিত অন্তত দুইজন আমাকে আলাদাভাবে একই কথা বলেছেন। তাদের হজ্জ্ব করার সামর্থ ছিল না, কিংবা সামর্থ থাকলেও সুযোগ ছিল না। কিন্তু তারা দুইজনই নিয়ত করেছিলেন হজ্জ্ব বা উমরা করবেন, পরে আল্লাহ তা'য়ালা কোনো না কোনো উপায়ে, যেটা তারা কখনো ভাবেনও নাই, সেই হজ্জ্ব কিংবা উমরা করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এরা দুইজনই আমার পরিচিত পরহেজগার লোক, হয়তো তাই আল্লাহ তাদের নিয়ত, ইচ্ছা পূরণ করেছিলেন। আল্লাহ আমাদের মধ্যে যাদের হজ্জ্ব করার সামর্থ আছে, তাদের খুব জলদি হজ্জ্ব করার তৌফিক দিন, আমিন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন