এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (২৪ জুন, ২০২২) - হজ্জ্ব করার উপকারিতা
এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (২৪ জুন, ২০২২) - হজ্জ্ব করার উপকারিতা
মাসজিদ আল-জামিয়া, ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভানিয়া
গত জুমুআর খুতবায় ইমাম হ্বজের নির্দেশ, এর গুরত্ব নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। আজকের খুতবায় ওই বিষয়ের সাথে আরো যোগ করলেন, আর হ্বজের উপকারিতা বা ফজিলত নিয়ে আলাপ করলেন। খুতবার পরে, নামাজ শেষে আমি ইমামকে হ্বজ নিয়ে একটা প্রশ্ন করেছিলাম, সেইটা আর তার উত্তর কি দিলেন, শেষে সেটা লিখে দিচ্ছি।
একটা সহীহ হাদিসের রেফারেন্স দিয়ে ইমাম বললেন, রাসূল (সা:) বলেছেন, ইসলামের ৫ টা মূল ভিত্তি: ১) এক আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে (সা:) বিশ্বাস, ২) ৫ ওয়াক্ত নামাজ প্রতিষ্ঠা করা, ৩) জাকাত দেয়া, ৪) হ্বজ পালন করা আর ৫) রোজা মাসে রোজা রাখা। ইমাম বললেন, এই হাদিসের অন্য বর্ণনায় ৪ নম্বর আর ৫ নম্বর (হ্বজ, আর রোজা) আগে পরে বলা আছে, কিন্তু ৫ টা মূল ভিত্তির এই হাদিস সহীহ। এর পর ইমাম বললেন, কারো উপর হ্বজ ফরজ হওয়ার ৫ টা শর্ত আছে: ১) ওই ব্যক্তিকে মুসলিম হতে হবে, ২) প্রাপ্ত-বয়স্ক হতে হবে, ৩) স্বাভাবিক বুদ্ধিসম্পন্ন হতে হবে (সাউন্ড মাইন্ড), ৪) দাসত্ব থেকে মুক্ত বা স্বাধীন ভাবে চলাচলের সুযোগ থাকতে হবে, ৫) হ্বজ করার শারীরিক আর আর্থিক সক্ষমতা থাকতে হবে। এরপর প্রত্যেকটা পয়েন্ট ব্যাখ্যা করলেন। প্রথম শর্তের ব্যাখ্যায় বললেন, কেউ আল্লাহ তা'য়ালার উপর বিশ্বাস না করলে, অর্থাৎ মুসলিম না হলে তার হ্বজ করার দরকার নাই, সেটা কবুলও হবে না। দ্বিতীয় শর্তের ব্যাখ্যায় বললেন, অনেক মা-বাবা তাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক বাচ্চাদের নিয়ে হ্বজ করেন, আল্লাহ তা'য়ালা এর সওয়াব নিশ্চয়ই তাদের দিবেন, কিন্তু ওই বাচ্চাদের প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে নিজ দায়িত্বে আবার হ্বজ করতে হবে। বাচ্চাকালে বাবা-মার সাথে হ্বজ করলে সেটায় ফরজ আদায় হয় না। বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়ার শর্ত বলতে ইমাম আলাদা করে কিছু বলেন নাই কিন্তু আমার মনে হয়েছে তিনি কেউ নিজের ভালো-মন্দ বোঝার ক্ষমতা, নিজে থেকে চলার বুদ্ধি সম্পন্ন হওয়া বুঝিয়েছেন। দাসত্ব থেকে মুক্তি প্রসঙ্গে ইমাম বললেন, আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের সময়ে এখন আর কেউ দাসত্বের মধ্যে নাই, সবাই মুক্ত কিন্তু কেউ কারো যদি স্বাধীন ভাবে চলাচলের সুযোগ না থাকে, যেমন কেউ কারাগারে বন্দি, তার জন্য বাকি সব শর্ত পূরণ হলেও হ্বজ ফরজ হবে না। আর শারীরিক আর আর্থিক সক্ষমতা থাকেল, দেরি না করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হ্বজ করে ফেলা উচিত। কেউ শারীরিকভাবে সক্ষম না হলে অন্য কাউকে দিয়ে হলেও হ্বজ করিয়ে নেয়া উচিত।
হ্বজ করার নির্দের্শের ব্যাপারে ইমাম আবারো বললেন, হ্বজ করতে আল্লাহ তা'য়ালা ইব্রাহিম (আ:) মাধ্যমে, ইব্রাহিম (আঃ)-এর সময় থেকেই আহ্বান করে রেখেছেন। কাজেই এখন কেউ এই ডাকে ইচ্ছা করে সাড়া না দিলে সেটার জবাব তাকেই দিতে হবে। স্বপ্নে হ্বজ করার নির্দেশ বা অন্য কোনো গায়েবিভাবে নতুন করে হ্বজ করতে যাওয়ার নির্দেশের অপেক্ষা করার কোনো সুযোগ ইসলামে নাই।
হ্বজের উপকারিতা কিংবা ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে ইমাম আয়েশা (রাঃ)-র একটা হাদিস বললেন। আয়েশা (রাঃ) নাকি রাসূল (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'জিহাদ' (অর্থাৎ, ইসলাম রক্ষার জন্য ইসলামের শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা) যেহেতু সবচেয়ে ভালো ইবাদত, তাহলে মেয়েদের বেলায় সেটা কি হবে? উত্তরে রাসূল (সাঃ) নাকি বলেছিলেন, 'মাবরুর হ্বজ' হলো সবচেয়ে ভালো জিহাদ। এটা বলার পর সাইড নোট হিসাবে ইমাম চট করে 'জিহাদ' আর এর সম্পর্কে ভুল ধারণার ব্যাখ্যা দিলেন [যেটা আমার খুব ভালো লেগেছে]। ইমাম বললেন 'জিহাদ' করার অন্যতম শর্ত হচ্ছে সেটা রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুমোদিত হয়ে, ঘোষণা দিয়ে হতে হবে। কেউ নিজে থেকে জিহাদের ডাক দিয়ে, ইসলামের নামে কাউকে মারা, কিংবা রক্তপাত করলে সেটা কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না। ইমাম বললেন, আজকে বিভিন্ন গ্ৰুপ জিহাদের নামে রক্তপাত করছে, এরা কখনোই ভালো মুসলিম না - বরং এরা ইসলামের ক্ষতি করছে। আমাদের সবাইকে, বিশেষ করে তরুণদেরকে এদের থেকে সাবধান থাকতে বললেন।
এরপর ইমাম 'মাবরুর হ্বজ' কি সেটা ব্যাখ্যা করলেন: কেউ যদি রাসূলের (সাঃ) সব সুন্নাহ পালন করে হ্বজ করে এবং হ্বজ করার সময় কোনো খারাপ বা অশ্লীল কথা না বলে, তাহলে তার হ্বজ 'মাবরুর' অর্থাৎ কবুল হবে। ইমাম আরো একটা হাদিস বললেন যেখানে রাসূল (সা:) বলেছেন, 'মাবরুর হ্বজ' করা ব্যক্তির করা সব দোয়া আল্লাহ তা'য়ালা কবুল করেন এবং তাঁর সব গুনাহ মাফ করে দেন। গুনাহ মাফের ব্যাপারে বললেন ওই ব্যক্তি যেন মাত্রই তার মা'র পেট থেকে ভুমিষ্ট হলো - এমন নিষ্পাপ হয়ে যায়! ইমাম আরো হাদিস বললেন যেখানে রাসূল (সাঃ) হ্বাজীদের আল্লাহর প্রতিনিধি আখ্যা দিয়ে সম্মানিত করেছেন। ইমাম এরপর বেশি বেশি হ্বজ আর উমরাহ করার উপদেশ দিলেন। রাসূল (সাঃ) নাকি বলেছেন, প্রত্যেক হ্বজ কিংবা উমরাহ করা ব্যক্তির তার আগের হ্বজ কিংবা উমরাহ করার পর থেকে করা সব গুনাহ মাফ হয়ে যায়। এছাড়াও এরকম ব্যক্তির কোনো অভাব থাকবে না, তার করা সব দোয়া কবুল হবে।
এরপর ইমাম একটা গল্প বললেন যেটা কোনো হাদিস না, কিন্তু সত্যি ঘটনা। আব্দুল্লাহ-ইবনে-মুবারক নামে এক লোক নাকি একবছর পর পর হ্বজ কিংবা উমরাহ করতেন। কোনো এক বছর হ্বজ করতে যাওয়ার সময় ইরাকে থেমেছিলেন। সেখানে কোনো এক রাতে উনি এক মহিলাকে ময়লার স্তূপথেকে মরা মুরগি বা অন্য কোনো মৃত প্রাণী সংগ্রহ করতে দেখে এর কারণ জিজ্ঞেস করেছিলেন। উত্তরে মহিলা তার অভাব, আর পরিবারে রোজগারের কোনো ব্যক্তি না থাকার কথা বলায়, আব্দুল্লাহ-ইবনে-মুবারক তাঁর হ্বজের সমস্ত টাকা ওই মহিলাকে দান করে দেন, আর হ্বজ না করেই দেশে ফিরে যান। কিন্তু এরপর হ্বজ শেষ করে যখন অন্যরা ফিরে আসেন, উনি সবাইকে দেখতে যান, আর আল্লাহ যেন তাদের হ্বজ কবুল করেন - ইত্যাদি বলে দোয়া করতে থাকেন। উত্তরে অন্য অনেকেই আল্লাহ যেন তাঁর হ্বজও কবুল করেন বলে সম্বোধন করতে থাকে। পর পর কয়েকবার এমনটা হলে উনি বলেই ফেলেন যে উনি এই বছর হ্বজে যান নাই! তখন হ্বাজীদের অনেকেই বলতে থাকেন: "কি বলছেন?! আমরা তো আপনাকে হ্বজ করতে দেখেছি"! কেউ কেউ নাকি আরো বলেন "আপনি তো আমাদেরকে হ্বজ সম্পর্কে করা প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন!" - এর ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারে নাই। পরে ঐ রাতে আব্দুল্লাহ-ইবনে-মুবারক নাকি স্বপ্নে রাসূল (সা:) দেখেন (কিংবা তাকে বলতে শুনেন) - যে আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর করা ওই মহৎ দানে খুশি হয়ে তাঁর হ্বজ কবুল হওয়ার সুসংবাদ জানাচ্ছেন। আর কোনো এক ফেরেশতা তার অবয়বে, তার হয়ে পুরা হ্বজ পালন করেছেন (আর সেটাই লোকজন দেখেছে)! ইমাম বললেন, এই ঘটনার বিস্তারিত কিংবা সত্যতা আল্লাহই ভালো জানেন, কিন্তু এই গল্প থেকে এটা বোঝা যায় যে কারো ফরজ হ্বজ পালন করা হয়ে গেলে, পরেরবার সেই টাকায় অন্যের অভাব দূর করা কিংবা হ্বজ করতে আর্থিকভাবে অক্ষম কাউকে হ্বজ করানো 'মাবরুর হ্বজ' করার মতোই সওয়াবের। ইমাম আমাদের মধ্যে যাদের হ্বজ ফরজ হয়ে গেছে তাদের দেরি না করে হ্বজ করার নিয়্যত করতে আর বাকিদের আল্লাহ যেন হ্বজ করার তৌফিক দেন সেই দোয়া করলেন।
সবশেষ: নামাজের পরে আমি আলাদা করে ইমামকে তাঁর খুতবার জন্য ধন্যবাদ দিয়ে প্রশ্ন করেছি: কারো যদি মা-বাবা হ্বজ না করে মারা যান, তাহলে কি তার সন্তানরা তার জন্য বদলা হ্বজ করতে পারবে? ইমাম উত্তরে বললেন রাসূল (সাঃ) কে কোনো এক মহিলা একই প্রশ্ন করেছিলেন এবং উত্তরে রাসূল (সা:) নাকি বলেছেন সেটা হবে। ইমাম বললেন তবে শর্ত হচ্ছে সন্তানকে [বা অন্য যাকে দিয়ে হ্বজ করানো হচ্ছে] আগে তার নিজের হ্বজ করতে হবে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন