এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১ জুলাই, ২০২২) - জ্বিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের ফজিলত, আমল

এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১ জুলাই, ২০২২) - জ্বিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের ফজিলত, আমল 
মাসজিদ আল-জামিয়া, ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভানিয়া

আরবি জ্বিলহজ মাসের আজকে দ্বিতীয় দিন। ইমাম শুরুতেই একটা হাদিসের রেফারেন্স দিয়ে বললেন এই মাসের প্রথম ১০ দিনে করা বান্দার যেকোনো ভালো আমল বছরের অন্য যেকোনো  'দিনের' চেয়ে আল্লাহ তা'য়ালার কাছে অনেক বেশি প্রিয়, বান্দার জন্য অনেক বেশি সওয়াবের। সাহাবীরা নাকি এই কথা শুনে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এমনকি জিহাদের যাওয়ার চেয়েও ভালো? উত্তরে রাসূল (সা:) 'হ্যাঁ' বলে বলেছিলেন অন্য যেকোন আমলের চেয়ে, এমনকি আল্লাহর দ্বীনকে রক্ষার জন্য জিহাদের যাওয়ার চেয়েও ভাল, একমাত্র ব্যতিক্রম হচ্ছে, যদি কেউ জিহাদে গিয়ে শহীদ হয়, শুধু সেই ব্যক্তির আমল ছাড়া। এতটাই গুরুত্বপূর্ণ জ্বিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন। এই মাসের ৯ নম্বর দিন - আরাফাতের দিন হচ্ছে সেই দিন, যেদিন আল্লাহ তা'য়ালা জাহান্নামী অনেককে মাফ করে দেন।  আর ১০ নম্বর দিন কুরবানীর ঈদ। 

এরপর ইমাম খুতবা জুড়ে মূলত আলোচনা করলেন কী কী আমল করা যায়। মূলত প্রথমসারির ৩ টা আমল: ১) হ্বজ করা,  ২) কুরবানী দেয়া ৩) রোজা রাখা নিয়ে বললেন। ইমাম বললেন কেউ হ্বজ করতে গেলে আর সেটা 'মাবরুর' হ্বজ হলে সেটার বিনিময় বা পুরস্কার কেবল একটাই: জান্নাত। যাঁরা এই বছর হ্বজ করতে গেছেন তাঁদের জন্য ইমাম দোয়া করে বললেন, আমরা যারা যেতে পারি নাই, আল্লাহ যেন আমাদেরকে আগামীবছর যাওয়ার, কিংবা তার পরে কোনো বছর যাওয়ার তৌফিক দেন। "মাবরুর' হ্বজ -এর ব্যাপারে ইমাম বললেন সেটা হওয়ার মূল শর্ত হচ্ছে রাসূল (সা:) -এর দেখিয়ে দেয়া পন্থায়, সর্বোচ্চ চেষ্টা করে হ্বজ করতে হবে। ইমাম বললেন সেজন্য আমাদের রাসূল (সা:)-এর হ্বজ করার পন্থা জানার চেষ্টা করতে হবে, পড়াশুনা করতে হবে।  ইমাম আক্ষেপ করে বললেন, আমরা না জেনে অনেকেই রাসূলের সুন্নাহ বা দেখিয়ে দেয়া পন্থায় নামাজ পড়ি না, এমনকি ওযুও ঠিকমতো করতে পারি না। আর সেই হিসাবে সহীহ পন্থায় হ্বজ করা তো অনেক কঠিন কাজ। 

এরপর ইমাম বললেন, জ্বিলহজ মাসের ১০ তারিখ, অর্থাৎ ঈদের দিন আল্লাহর নামে কুরবানী দেয়া আল্লাহ তা'য়ালার কাছে আরেকটা পছন্দনীয় আমল। কেউ পরিষ্কার নিয়তে, এই দিন কুরবানী দিলে কুরবানীর পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহ তা'য়ালা তা কবুল করে নেন। আর তাই যারাই এই দিন কুরবানী দিবেন, তারাও যেন খুশিমনে কুরবানী দেন, ইমাম সে ব্যাপারে জোর দিলেন। এরপর ইমাম বললেন কি ধরণের প্রাণী, আর তার বয়স কত হতে হবে সেটা বললেন।  ৫  প্রকার প্রাণী কুরবানীর যোগ্য: ১. উট (নূন্যতম পাঁচ বছর), ২. গরু (নূন্যতম ২ বছর), ৩ ছাগল (নূন্যতম ১ বছর), ৪. ভেড়া (নূন্যতম ১ বছর) [৫ নম্বর প্রাণীর কথা ইমাম বলতে হয়তো ভুলে গেছেন] । ভেড়ার বয়সের ব্যাপারে কিছু ব্যতিক্রম আছে, তবে ৬ মাসের নিচে বয়সী ভেড়া কুরবানী দেয়া যাবে না। ইমাম সতর্ক করলেন কুরবানীর পশু কেনার ব্যাপারে আমরা যেন কার্পণ্য না করি। কম দামি, রোগা কিংবা অসুস্থ, বেশি বয়সী পশু যেন কুরবানীর জন্য ঠিক না করি। 

এরপর ইমাম বললেন, আমরা অনেকেই নিজেরা কুরবানী না দিয়ে অন্যকে দিয়ে, এমনকি অন্য দেশে কুরবানী দেই। ব্যাপারটা হয়তো ঠিক আছে, কিন্তু নিজে কুরবানী দেয়াটা সবচেয়ে ভালো। অন্য কাউকে দিয়ে কিংবা অন্য দেশে কুরবানী দিলে যেন আমরা নিশ্চিত করি যে  আমরা তাদের চিনি কিংবা জানি, আর তারা ঠিকভাবে আপনার-আমার নাম নিয়ে কুরবানী দিচ্ছে। এ ব্যাপারে ইমাম রাসূল (সা:) -র কুরবানীর পন্থা বললেন। আমাদের রাসূল (সা:) নাকি সবসময় দুইটা কুরবানী দিতেন। একটা তার নিজের এবং নিজের পরিবারের নামে; আরেকটা তার উম্মাহর যারা কুরবানী দিতে পারছে না, তাদের নামে। কুরবানী দেয়ার সময় রাসূল (সা:) তাঁর নিয়ত নাকি উচ্চারণ করে (মুখে বলে) কুরবানী দিতেন। ইমাম বললেন কাজেই আমাদের উচিত আগে নিজের, নিজের পরিবারের নামে নিজে কুরবানী দিয়ে, পরে অন্য কোথাও আরেকটা নাম বা কুরবানী দেয়া। ইমাম আরো সতর্ক করলেন, কারো সামর্থ থাকার পর, আল্লাহর কাছে এটা পছন্দনীয় আমল জেনেও যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কুরবানী না দেয় - তাহলে তার আর ঈদের নামাজে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। 

এরপর ইমাম বললেন, হ্বজ কিংবা কুরবানীর পরে সবচেয়ে ভালো আমল হচ্ছে রোজা রাখা। আর ইমাম স্মরণ করিয়ে দিলেন,  রোজার প্রতিদান আল্লাহ কি দিবেন সেটা রাসূল (সা:) কেও আল্লাহ বলেন নাই। ফেরেশতারাও জানে না।  রোজার প্রতিদান শুধুমাত্র আল্লাহ ও তাঁর বান্দার মধ্যে একটা ব্যাপার। ঈদের দিন যেহেতু রোজা রাখা যায় না, কাজেই জ্বিলহজ মাসের প্রথম ৯ দিন রোজা রাখা খুব ভালো একটা আমল। কেউ পারলে ৯ দিনই রোজা রাখতে পারেন। আর কম রাখলেও অসুবিধা নাই। কিন্তু ইমাম বললেন আমরা যেন জ্বিলহজ মাসের ৯ তারিখ অন্তত রোজা রাখার চেষ্টা করি। আগামী শুক্রবার (৭ জুলাই'২২) জ্বিলহজ মাসের ৯ তারিখ, আরাফার দিন। যদিও অন্য সময় শুক্রবার আর শনিবার রোজা রাখতে না করা হয়েছে [ কারণ শুক্রবার অনেকটা ঈদের দিন, শনিবার কেন রোজা রাখতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে সেটা ইমাম ব্যাখ্যা করেন নাই] - কিন্তু যেহেতু আরাফার দিন শুক্রবার পড়েছে, কাজেই সেইদিন আমাদের রোজা রাখতে কোনো অসুবিধা নাই। 

সবশেষে ইমাম স্মরণ করিয়ে দিলেন, কেউ যদি কুরবানী করার নিয়ত করে, তবে সুন্নাহ হচ্ছে জ্বিলহজ মাসে, কুরবানীর আগে যেন কোনো প্রকার চুল কাটা, সেভ করা কিংবা নখ না কাটে। কেউ ভুল করে তা করে ফেললে আল্লাহ নিশ্চয়ই মাফ করবেন কিন্তু ইচ্ছাকৃত ভাবে করলে সেটা রাসূল (সা:)-এর সুন্নাতের পরিপন্থী হবে।  

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ