এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (২২ জুলাই, ২০২২) - কুরবানীর কাহিনী থেকে শিক্ষণীয়।
এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (২২ জুলাই, ২০২২) - কুরবানীর কাহিনী থেকে শিক্ষণীয়।
মাসজিদ আল-জামিয়া, ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভানিয়া
[আপডেট: ইমাম জন স্টার্লিং তাঁর খুতবা আমার সাথে শেয়ার করেছেন, এই লিংকে গিয়ে পাওয়া যাবে:]
এই শুক্রবারের খুতবা দিলেন আরেকজন ইমাম। উনি একজন কনভার্টেড (বা রিভার্টেড) মুসলিম [এখন অবশ্য অনেকেই আর কনভার্টেড বলে না, রিভার্টেড বলে। কারণ আইডিয়াটা হচ্ছে প্রত্যেক মানুষের জন্ম হয় মুসলিম বা আল্লাহর প্রতি অনুগত হয়েই। পরে অন্য ধর্মে চলে যায়। কাজেই যখন কেউ আবার ইসলাম গ্রহণ করে, সে আসলে ফিরে আসলো, বা রিভার্টেড (reverted) হলো । উনার সম্পর্কে শেষে একটা পরিচিতি লিংক দিয়ে দিবো]।
ইমাম বললেন হ্বজ শেষ হয়ে গেছে, কুরবানীও শেষ, কিন্তু তিনি কুরবানীর যে মূল কাহিনী, হজরত ইব্রাহিম (আ:) ও তাঁর ছেলে হজরত ইসমাইল (আঃ) -এর ঘটনা - তার উপর আজকে আবারো রিফ্লেক্ট বা চিন্তা করে আলোচনা করতে চান। উনি বললেন, আমরা প্রতি বছরই হ্বজের এই সময়টা হজরত ইব্রাহিম (আ:) তাঁর ছেলেকে কুরবানী দেয়ার জন্য নিয়ে যাওয়ার এই ঘটনা আলাপ করি - কিন্তু যখন করি, তখন আসলে তার শেষটা জেনেই করি। অর্থাৎ, আমরা আগে থেকেই জানি ইব্রাহিম (আঃ) শেষমেষ তাঁর ছেলেকে কুরবানী করা থেকে বেঁচে যান, আল্লাহ তা'য়ালা তাঁদের পরীক্ষা করার জন্যই এই আদেশ দিয়েছিলেন, কখনোই শাস্তি দেয়ার জন্য না। আর তাই আল্লাহ তা'য়ালাই একটা পশু দিয়ে ইসমাইল (আঃ) -কে পরিবর্তন করিয়ে দেন। ইমাম স্মরণ করিয়ে দিলেন, তাঁদের দুইজনের কেউই কিন্তু এর শেষ না জেনেই আল্লাহ'র আদেশ পালন করছিলেন। ইমাম চিন্তা করতে বললেন, এটা তাঁরা পেরেছিলেন কিভাবে?
ইমাম বললেন, আল্লাহর উপর বিশ্বাস করা, তাঁর আদেশ নিষেধ সত্য বলে জানা হচ্ছে ঈমান। কিন্তু তার উপরের ধাপ হচ্ছে 'ইয়াকীন'। আল্লাহর প্রতি 'ইয়াকীন' আসলেই (নিশ্চিত হওয়া) কেবল কারো পক্ষে এইভাবে আদেশ পালন করা সম্ভব। ইমাম বললেন, ইসমাইল (আঃ)-এর কথা চিন্তা করতে। ইসমাইল (আঃ), ইব্রাহিম (আঃ)-এর প্রথম সন্তান। তাকে কুরবানী করতে হবে এই কথা যখন বাবা ছেলেকে বললেন, ছেলের উত্তর কি ছিল? সূরা সাফফাতে (সূরা নম্বর ৩৭: আয়াত ১০২ - ১১০) - এর বর্ণনা আছে, ইসমাইল (আঃ) তাঁর বাবাকে বলেছিলেন, আপনি আদেশ পালন করুন, ইনশাআল্লাহ (আল্লাহ চান তো) আমাকে ধৈর্যশীলদের মাঝেই পাবেন। ইসমাইল (আঃ) এই 'ইয়াকিন' সম্পর্কে আল্লাহ তা'য়ালা রাসূল (সাঃ) কে সূরা মারিয়ামে (সূরা নম্বর ১৯, আয়াত ৫৪-৫৫) বলছেন, ইসমাইল (আঃ) ছিলেন ওয়াদা রক্ষাকারী, একজন নবী ও রাসূল। তিনি (ইসমাইল (আঃ)) নিজের পরিবারকে নামাজ কায়েম করতে ও জাকাত দিতে বলতেন আর তিনি ছিলেন আল্লাহ'র সন্তুষ্টিভাজন।
ইমাম বললেন, তাঁদের (ইব্রাহিম-ইসমাইল (আঃ)) সাথে আমাদের মূল তফাৎটা এই আদেশ পালনেই, কার্যকর করাতেই। আমরা আল্লাহর অনেক আদেশ জানি, কিন্তু তা জেনেও সেটা পালন করি না। আবার অনেক নিষেধ সম্পর্কে জানি, কিন্তু তাও করে থাকি -যদিও এই আদেশ-নিষেধ কোনোটাই নিজের সন্তানকে কুরবানী করার মতো কঠিন এবং অসম্ভব কিছু না।
ইমাম এরপর বললেন, আমাদের জীবনে যখন কোনো পরীক্ষা আসে, বিপদ-আপদ আসে - স্বাভাবিকভাবেই আমরা মানসিক কষ্ঠে ভুগি, চাপে থাকি। এই চাপ সহ্য করতে না পারলে, এই "পরীক্ষা" পাস করা অসম্ভব মনে হলে অনেকে ডিপ্রেশনে ভুগে, এমনকি ধর্ম, বিশ্বাস ত্যাগ করার মতো ঘটনাও ঘটে। ইমাম এরপর এর স্বপক্ষে কিছু গবেষণার রেফারেন্স দিলেন। কলোম্বিয়া ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অফ আলাবামা আর 'পিউ রিসার্চ' সেন্টারের কিছু গবেষণায় নাকি দেখা গেছে ২০০৫ - ২০১৫ পর্যন্ত, ১০ বছরে যেখানে আমেরিকাতে ডিপ্রেশনের হার বেড়েছে ১- ১.৫%, কিন্তু শুধু এই করোনা মহামারীতে, তাও শুধু প্রথম বছরে সেটা বেড়ে প্রায় ১০-১৩% হয়েছে। আমেরিকাতে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে প্রতি ১০ জন পূর্ণ বয়ষ্ক মানুষের মধ্যে গড়ে ৩ জন নাকি এখন নিজেকে কোনো ধর্মে বিশ্বাসী বলে দাবি করেন না। ইমাম খেয়াল করিয়ে দিলেন, এই প্রতি ১০ জনে ৩ জন -এর মধ্যে কিন্তু সবাই পড়ে, আমরা যারা মুসলিম, তারাও আছি। কিন্তু আরেকটা গবেষণার রেফারেন্স দিলেন, যেখানে দেখা গেছে যাদের কোনো না কোনো ধর্ম বিশ্বাস আছে, তাদের মধ্যে ডিপ্রেশনের মাত্রা কম। তাদের বিপদ কাটিয়ে উঠে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বেশি।
ইমাম বললেন, হজরত ইব্রাহিম ও ইসমাইল (আঃ)-এর ঘটনা আমাদের জীবনে বিপদ বা পরীক্ষায় ধৈর্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার শিক্ষায়ই দেয়। আল্লাহ তা'য়ালা আমাদের বিপদ থেকে উদ্ধার করবেন - এই 'ইয়াকিন' অর্জন করতে শিক্ষা দেয়। ইমাম বললেন এটা একদিনে অর্জন করা সম্ভব না। তার জন্য আল্লাহর উপর বিশ্বাসের সাথে সাথে আল্লাহ তা'য়ালার সাথে একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরী করতে হবে। আর ইসলামের সৌন্দর্য হচ্ছে, দিনে অন্তত পাঁচ বার নামাজের মাধ্যমে সেটা চর্চা করার সুযোগ আমাদের আছে। ইমাম বললেন শুধু বিপদে পড়লে আমরা আল্লাহর আশ্রয়, সাহায্য চাবো আর তার আগে নিজেদের ভালো সময়ে মুখ ফিরিয়ে রাখবো - এটা করলে হবে না। উদাহরণ দিয়ে বললেন, ডাক্তারের কাছে গিয়ে যদি কোনো রোগী যদি শুনে যে তার আর ভালো হওয়ার সম্ভাবনা নাই, এতদিনের খাওয়া-দাওয়ার আর অন্যান্য অনিয়ম আর এক্সারসাইজ না করাই এই রোগের কারণ - তখন যেমন নিজেকে শুধরিয়ে আর লাভ নাই, আরো আগে থেকে এসব করা উচিত ছিল - একই ভাবে জীবনের বিপদে, "পরীক্ষায়" পড়ার আগে থেকেই সেটা সামলানোর জন্য আমাদের নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করে যেতে হবে।
সবশেষ নোট: ইমাম অনেকগুলো রেফারেন্স দিয়েছিলেন। সবগুলো আমার মনে নাই। নামাজ শেষে আমি উনার কাছে গিয়ে আমি সারমর্ম লিখি সেটা বলে উনার খুতবার নোট শেয়ার করার সম্ভব হবে কিনা জিজ্ঞেস করেছিলাম। উনি আমাকে দিবেন বলেছেন। আমি পেলে তা শেয়ার করবো ইনশাআল্লাহ। বাসায় এসে উনার সম্পর্কে জানতে Google করেছিলাম। নিচের ভিডিওতে উনার ইসলামে আসার কাহিনী আছে। খুবই চমৎকার। অনেক কিছু শেখার আছে। কেউ চাইলে দেখতে পারেন: https://youtu.be/qIos8Yikm-g
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন