এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (২৯ জুলাই, ২০২২) - কেয়ামতের দিন যে ৪ টা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে।
এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (২৯ জুলাই, ২০২২) - কেয়ামতের দিন যে ৪ টা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে।
মাসজিদ আল-জামিয়া, ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভানিয়া
ইমাম খুতবা শুরু করলেন তিরমিযী (রাঃ) থেকে বর্ণিত একটা হাদিস দিয়ে। রাসূল (সাঃ) নাকি বলেছেন, কেয়ামতের দিন প্রত্যেক ব্যক্তিকে চারটা প্রশ্নের উত্তর বা হিসাব দিতে হবে। উত্তর না দিয়ে কেউ একটুও নড়তে পারবে না। প্রশ্নের উত্তর বা হিসাব দিয়ে তবেই কেবল কারো জান্নাত আর কারো জাহান্নামের দিকে যাওয়া শুরু হবে। আর এই চারটা প্রশ্ন হচ্ছে দুনিয়াতে উপভোগ করা প্রত্যকের, ১) জীবন বা সময়, ২) প্রাপ্ত জ্ঞান ও তার ব্যবহার, ৩) সম্পদ ও তার ব্যবহার আর ৪) স্বাস্হ্য। এর পর পুরো খুতবা জুড়ে ইমাম প্রথম পয়েন্ট, অর্থাৎ আমাদের জীবন বা দুনিয়াতে আমরা আমাদের সময় কিভাবে কাটাই, কিভাবে কাটানো উচিত ইত্যাদি নিয়ে আলাপ করলেন।
ইমাম সূরা-যারিয়াতের (সূরা নম্বর ৫১, আয়াত ৫৫-৫৬) রেফারেন্স দিয়ে বললেন, আল্লাহ তা'য়ালা রাসূল (সাঃ) কে উপদেশ দিচ্ছেন, তিনি (সাঃ) যেন বারবার মনে করিয়ে দেন, কারণ এতে মুমিনদের উপকার হয়, আরো বলছেন তিনি (আল্লাহ তা'য়ালা) জ্বীন আর মানুষকে শুধু মাত্র তাঁরই ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছেন। ইমাম বললেন, আল্লাহ তা'য়ালা আমাদেরকে জীবিকা উপার্জন, সমাজ-সংসার, পরিবার গঠন ইত্যাদির অনুমতি দিয়েছেন মূলত জীবনকে সহজ করার জন্য, কৃতজ্ঞ থেকে তাঁর ইবাদতে যেন আরো মনোযোগী হতে পারি, সেজন্য। কিন্তু আমরা সেটা ভুলে শুধু জীবন-জীবিকার পেছনেই ছুটছি। ইমাম সূরা মু'মিনের (সূরা নম্বর ২৩, আয়াত ১১৫) রেফারেন্স দিয়ে বললেন, আল্লাহ সাবধান করে দিয়ে মানুষকে প্রশ্ন করছেন, আমরা কী মনে করি যে তিনি (আল্লাহ তা'য়ালা) আমাদের কোনো কারণ বা উদ্দেশ্য ছাড়া সৃষ্টি করেছেন আর আমাদেরকে তাঁর দিকে ফিরে যেতে (হিসাব দিতে) হবে না?
এরপর ইমাম হিসাব দিলেন যে আমরা আমাদের জীবনের মাত্র কতটুকু অংশ আল্লাহ'র ইবাদতে ব্যয় করি। আমরা গড়ে কতদিন বাঁচি, তার মধ্যে প্রথম ১০- ১৫ বছর কিছু না বুঝেই কাটাই, আর তারপর প্রতিদিন ঘুমিয়ে বলতে গেলে পুরো জীবনের ২০% কাটিয়ে দেই। চিন্তা করে দেখতে বললেন, দৈনন্দিন জীবনের বাকি কাজ করে আমরা আল্লাহ তা'য়ালার ইবাদতের জন্য কতটুকুই বা রাখি? তার উপর ইদানিং ফেইসবুকসহ অন্যান্য মিডিয়াতে যে পরিমান সময় আমরা ব্যয় করি, তার তুলনায় কতটুকু আমরা আল্লাহর স্বরণ বা জিকিরে, ইস্তেগফারে কাটাই? ইমাম বললেন, ঘড়ি ধরে হিসাব করে দেখতে আমাদের নামাজ পড়তে কত কম সময় লাগে। তারপরেও কি আমরা ঠিকমতো, সময়মতো, মনোযোগ দিয়ে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি? পুরুষদের উদ্দেশ্য বললেন, যেখানে সবার মসজিদে এসে জামাতে নামাজ পড়া উচিত, আমরা কতজন সেটা করি? আক্ষেপ করে বললেন, তিনি প্রায়ই ফোন পান জানতে চেয়ে যে "জুমু'আর নামাজ কয়টায়?" উত্তরে শুক্রবার ১ টায় বললে নাকি লোকজন জিজ্ঞেস করে, "না মানে ঠিক কয়টায় ইকামত (নামাজ শুরু) হয়?" ইমাম অনেকটা বিরক্তি নিয়েই বললেন, আগে যেখানে মানুষজন পায়ে হেঁটে এক দেশ থেকে অন্য দেশে গিয়ে, আলেমদের সাথে বসে ইসলামী জ্ঞান অর্জন করতো, এখন আমাদের অনেকেই জুমু'আর খুতবা পর্যন্ত শুনতে চাই না। খুতবা শোনা যেখানে ওয়াজিব, সেখানে খুতবার শেষ অংশে কোনোরকমে যোগ দিয়ে ফরজ নামাজ আদায় করেই অনেকের মধ্যে মসজিদ থেকে বের হয়ে যাওয়ার যেন প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। ইমাম একটা হাদিসের রেফারেন্স দিলেন যেখানে রাসূল (সাঃ) ধীর পায়ে মসজিদে যেতে ও নামাজ শেষ করে বের হতে বলেছেন। আমরা এমনভাবে বের যেন না হই যেন কেউ আমাদেরকে তাড়া দিয়ে বের করে দিচ্ছে কিংবা ঘরে (মসজিদে) আগুন লেগেছে।
ইমাম জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কী সপ্তাহে ১ ঘন্টাও কুরআন পড়ার জন্য রেখেছি? যিনি জানেন, এমন কারো সাথে বসে কি আমরা ঠিকমতো আমাদের মুখস্ত থাকা সূরাগুলো তেলাওয়াত করেছি? ঠিকমতো নামাজ আদায় করছি কিনা - এইগুলো কি যাচাই করে নিয়েছি? ইমাম বললেন, যেখানে ইসলামে নামাজ প্রথম স্তম্ভ, সেটা আদায়ে যদি আমরা এতটাই অমনোযোগী হই, উদাসী হই - তাহলে ধরেই নেয়া যায় আমাদের বাকি ইবাদত: রোজা, জাকাত, হ্বজ ঠিকমতো আদায় হচ্ছে না।
ইমাম আরো বললেন, আমাদের মধ্যে অনেকেই "আল্লাহ তা'য়ালা গাফুরুর-রাহিম" তিনি আমাদের মাফ করবেন - এই ভেবে বসে আছি। কিন্তু আমাদের ইস্তেগফারে (মাফ চাওয়ায়), ইবাদতে 'ইখলাস' বা একাগ্রতা না থাকলে, নিয়ত পরিষ্কার না থাকলে এই আশা করা ভুল। আগের দিনে সাহাবীরা এতকিছু করার পরও সন্দেহে, শঙ্কায় থাকতেন যে আল্লাহ তা'য়ালা তাঁদের মাফ চাওয়া কবুল করবেন কিনা, আর এখন আমরা নূন্যতম চেষ্টা না করেই আশা করে বসে থাকি - এটা কখনোই ঠিক না।
ইমাম একটা হাদিস বললেন যেখানে বুদ্ধিমান ব্যক্তির বৈশিষ্ট হিসাবে বলা হয়েছে, ওই ব্যক্তিই বুদ্ধিমান যে নিজের 'নফস' কে দমন করে রাখতে পারে আর পরকালের জন্য দুনিয়াতে বেশি বেশি ভালো কাজ করে থাকে। সবশেষে ইমাম উমর (রাঃ)-এর একটা বিখ্যাত উক্তি বললেন যেটা অনেকটা এইরকম: (কেয়ামতের দিনে) দায়বদ্ধ হওয়ার আগে নিজের কাছে নিজেকে দায়বদ্ধ করো, তোমার হিসাব নেয়ার আগে নিজেই নিজের কাজের হিসাব নিও, আজকের এই হিসাব তাহলে তোমার আগামীদিনের হিসাবকে সহজ করে দিবে।
[সাইড নোট: আজকের খুতবা আমার কাছে বেশ কড়া মনে হয়েছে। ইমামকে বেশ রাগ আর বিরক্তি নিয়ে কথা বলতে শুনলাম। বিশেষ করে জুমআর দিনে সবার হুড়াহুড়ি করা নিয়ে গিয়ে বলতে গিয়ে তো বলেই ফেললেন, ইসলাম নিয়মকানুনের ধর্ম। বয়স্কদের সম্মান করে চলা এইখানে জরুরি। কোনোদিকে খেয়াল না করে, অন্যের অসুবিধা না দেখে ধাক্কা-ধাক্কি করে যেন আজকে নামাজ শেষে কেউ বের না হোন। এর আগেও একদিন এইরকম মসজিদে ফোন বাজা, খুতবার সময় কথা বলা নিয়ে বেশ কড়া করে কথা বলেছিলেন। যাই হোক, আমার পরে মনে হয়েছে, সপ্তাহে এই একদিন যেমন আশার কথা শোনানো জরুরি, তেমনি সাবধান করাটাও জরুরী। অন্যের কথা জানি না, কিন্তু মাঝে মাঝে এইরকম ধাক্কা বা নাড়া দেয়াটা আমার জন্য দরকার।]
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন