এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (৮ জুলাই, ২০২২) - আরাফার দিনের তাৎপর্য
এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (৮ জুলাই, ২০২২) - আরাফার দিনের তাৎপর্য
মাসজিদ আল-জামিয়া, ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভানিয়া
আজকে আরবি জ্বিলহ্বাজ মাসের ৯ তারিখ, আরাফার দিন। আর এই দিনের তাৎপর্য আর তার পরের দিন, কুরবানীর ঈদ - নিয়েই আজকে ইমাম খুতবায় আলাপ করলেন।
শুরু করলেন এই বলে যে, একটা সহীহ হাদিস আছে যেখানে রাসূল (সা:) নাকি বলেছেন, হ্বজ মানেই হচ্ছে আরাফার দিন। ইমাম বললেন, আর যেহেতু ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটা মূল স্তম্ভ এই হ্বজ, আর আরাফার দিন মানেই হ্বজ, কাজেই জ্বিলহ্বাজ মাসের এই ৯ তারিখ অর্থাৎ আরাফার দিনের গুরুত্ব ইসলামে যে কী এটা সহজেই অনুমেয়।
ইমাম বললেন সূরা আল-আরাফ (সূরা নম্বর ৭, আয়াত ১৭২)-এ আল্লাহ তা'য়ালা রাসূল (সা:) কে জানাচ্ছেন তিনি আদম (আ:) -এর সব সন্তানদেরকে সমবেত করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি কী তোমাদের প্রতিপালক নই? উত্তরে সবাই (আমরা সহ সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির সবাই) সাক্ষ্য দিয়েছিলাম যে আপনি (আল্লাহ তা'য়ালা) আমাদের প্রতিপালক। ওই আয়াতে আল্লাহ আরো বলছেন এই সাক্ষ্য নেয়ার উদ্দেশ্য ছিল যেন শেষ বিচারের দিন আমরা কেউ অস্বীকার করতে না পারি যে আমরা তাঁর সম্পর্কে জানতাম না। ইমাম বললেন প্রত্যেক মানুষের ভেতর এই 'ফিতরা' আছে যে আল্লাহ বলে একজন প্রতিপালক আছেন, আমরা সেটা স্বীকার করি আর নাই-ই করি। ইমাম আরো বললেন, তার নিজের বা আমাদের কারো সাক্ষ্য দেয়ার এই ঘটনা মনে নাই। কিন্তু এটা ঘটেছিলো। উদাহরণ দিয়ে বললেন, আমাদের যেমন মায়ের পেটে থাকার সময়ের কোনো ঘটনা, এমনকি জন্মের পরের ঘটনাও কিছু মনে নেই - কিন্তু তা যেমন সত্য, ঠিক একই ভাবে এই সাক্ষ্য দেয়ার ঘটনা আমাদের মনে না থাকলেও এটা ঘটেছিলো। আর একটা বর্ণনায় আছে যে এই সাক্ষ্য দেয়ার ঘটনা এই নাকি আরাফার দিনেই ঘটেছিলো!
ইমাম আরো কিছু রেফারেন্স দিয়ে বললেন, এই দিন আল্লাহ তা'য়ালা সবচেয়ে বেশি মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। দোয়া কবুল করেন। এই দিন যেন আমরা আমাদের ইহকাল আর পরকালের যাবতীয় কিছুর জন্য দোয়া করে কোনো কিছু চাইতে যেন ভুলে না যাই। দোয়া করা যেমন ইবাদত, একই ভাবে আল্লাহ তা'য়ালার প্রশংসা করাও ইবাদত। এই দিন রাসূল (সা:) আমাদেরকে বেশি বেশি করে আল্লাহ তা'য়ালার প্রশংসা করে দোয়া একটা করতে শিখিয়েছেন, যা তাঁর আগের নবী-রাসূলও করে গেছেন: "লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহু লা শারীকালাহু, লাহুল মুলকু, ওয়া লাহুল হ্বামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর" [অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো 'ইলাহ/প্রতিপালক" নেই, তাঁর কোনো শরিক নেই, মূলক/সব কিছুর আধিপত্য তাঁরই, সকল হামদ (প্রশংসা ও ধন্যবাদ) তাঁরই প্রাপ্য, তিনি সবকিছুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান]
এই দিন রোজা রাখা সুন্নত। আর রোজাদারদের দোয়া বেশি কবুল হয় বলে ইমাম আজকে যারাই রোজা রেখেছেন তাদের বেশি বেশি দোয়া করতে বললেন। সাথে এটাও স্বরণ করিয়ে দিলেন, কারো হ্বক নষ্ট করে, সুদ আর হারাম উপার্জন করে যদি আমরা রোজা রাখি, তাহলে কোনো লাভ হবে না। এগুলো থেকে দূরে থেকে, তওবা করে তবেই আমাদের মাফ পাওয়ার আশা করতে হবে।
এরপর আরাফার তাৎপর্যের আরো বর্ণনা দিলেন। একটা কাহিনী বললেন: উমর (আঃ)-এর খেলাফতের সময় এক ইহুদি নাকি তাঁকে বলেছিলেন, হে খলিফা, আপনাদের কিতাবে এমন একটা আয়াত আছে, সেটা মুসলিমরা সবাই তেলাওয়াত করে, সেই আয়াত যদি আমাদের প্রতি নাজিল হতো, তবে আমরা সেই দিন (আয়াত নাজিলের দিন) উৎসব হিসাবে পালন করতাম। উমর (রাঃ) সেটা কোন আয়াত জিজ্ঞেস করায় ওই ইহুদি বলেছিলো: "আজকে আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম ইসলাম পরিপূর্ণ করে দিয়েছি, আর তোমাদের প্রতি আমার দয়া/নিয়ামত সম্পূর্ণ করেছি"। উত্তরে উমর (রাঃ) নাকি বলেছিলেন,তাঁর স্পষ্ট মনে আছে যে এই আয়াত (সূরা মায়েদা: সূরা নম্বর ৫, আয়াত ৩) হ্বজের সময়, আরাফার দিনে রাসূলের (সা:) কাছে নাজিল হয়েছিল। আরেক বর্ণনায় আছে, ঐদিন শুক্রবার ছিল। আর এই আয়াত নাজিলের পর উমর (রাঃ) নাকি কাঁদছিলেন। রাসূল (সা:) কারণ জিজ্ঞেস করায় উমর (রাঃ) নাকি বলেছিলেন, আমাদের জন্য ইসলাম আজকে ধর্ম হিসাবে পরিপূর্ণ করা হয়েছে, কিন্তু তিনি কাঁদছেন কারণ পরিপূর্ণ যে কোনো কিছুই সময়ের সাথে ক্ষয়ে যায়। এটা শুনে রাসূল (সা:) সম্মতি জানিয়ে বলেছিলেন উমর (রা:) ঠিক কথাই বলেছেন।
ইমাম এর পর আরাফার পরেরদিন, অর্থাৎ, ঈদের দিনের কিছু নিয়ম-কানুন বললেন। আবারো বললেন সম্ভব হলে আমরা যেন নিজেদের কুরবানী নিজেরাই দেই। আর কুরবানীর মাংস তিন ভাগ করে, একভাগ নিজেদের জন্য রেখে, এক ভাগ গরিবদের আর আরেকভাগ আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধুদের দেই। ইমাম বললেন, গরিবদের জন্য করা ভাগ যেন কোনোভাবেই কম না হয়। আরো বললেন, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধুদের জন্য করা ভাগ দেয়ার ক্ষেত্রে গরিব-ধনী, ছোট-বড় কিছুই দেখার দরকার নেই। উপহার হিসাবে যে কাউকেই সেটা দেয়া যায়। আমাদের রাসূল (সা:) নিজে কখনো সাদাকা গ্রহণ করেন নাই, কিন্তু উপহার নিতেন। কাজেই উপহার হিসাবে অন্যভাগ আমরা যাকে ইচ্ছা দিতে পারি।
সবশেষে ইমাম আবারো দোয়া করলেন, এবার যারা হ্বজে গেছেন আল্লাহ তা'য়ালা যেন তাদের হ্বজকে মাবরুর হ্বজ হিসাবে কবুল করেন, আর আমাদের মধ্যে যারা এখনো হ্বজ করার সুযোগ পাই নাই, তাদের যেন অতি জলদি হ্বজ করার তৌফিক দেন।
[সাইড নোট: আজকে আম্মা-আব্বা বেড়াতে আমেরিকায় এসেছেন। জুমুআর পরে তাঁদের আনতে এয়ারপোর্ট যাবো বলে খুশিতে একটু অন্যমনষ্ক ছিলাম। খুতবার আলোচনা যতটুকু সম্ভব মনোযোগ দিয়ে শুনে, বাসায় বসে এখন রেফারেন্স চেক করে লিখলাম। তারপরও ভুল হতে পারে, সবাইকে নিজ দায়িত্বে চেক করে নেয়ার অনুরোধ থাকলো। আর আব্বা-আম্মা সহ আমাদের সবার জন্য নেক হায়াৎ আর সুস্থতার দোয়া করার অনুরোধ থাকলো। আর আমার কথায়, কাজে কিংবা ব্যবহারে কেউ কখনো আঘাত পেয়ে থাকলে মাফ করে দেয়ারও অনুরোধ থাকলো। সবাইকে ঈদ মোবারাক!]
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন