এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম - আসল জীবন শুরু হয়, মৃত্যুর পর থেকে।

 এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম: আসল জীবন শুরু হয়, মৃত্যুর পর থেকে। 

[প্রথমেই সাইড নোট: এই শুক্রবার জুমুআর নামাজ পড়ি নাই। পথে ছিলাম, তাই খুতবাও শোনা হয় নাই। কিন্তু তার আগে ড. ওমর সুলাইমানের অন্য এক খুতবার রেকর্ডিং শুনেছিলাম। ১৮ মিনিটের খুতবা, নিচে লিংক দিয়ে দিচ্ছি। আজকে আবারো শুনলাম। ওইটার সারমর্ম লিখছি। অসম্ভব সুন্দর খুতবা। সরাসরি শুনে নিলে আরো ভালো।লেকচারের লিংক: https://youtu.be/sKqQl42jTC0] 

মূল বক্তব্য: আসল জীবন শুরু হয়, মৃত্যুর পর থেকে। 

ইমাম শুরু করলেন কল্পনা করতে বলে যে আপনি রাসূল (সাঃ)-এর সাথে মদিনায় খন্দকের যুদ্ধের প্রস্তুতিতে পরিখা খনন করছেন। আক্রমণকারী মক্কার কুরাইশদের তুলনায় আপনারা সংখ্যায় খুবই কম। খাবার-দাবার, রসদ ফুরিয়ে আসছে, না-খেয়ে আছেন রাসূল (সাঃ) নিজেই। পরিখা খননের এই স্ট্রাটেজি কাজে না আসলে, শত্রু একবার ভেতরে ঢুকতে পারলে সব শেষ, সবাইকে মেরে ফেলবে। শুধু তাই না মদিনার ভেতরেও মুনাফিক শত্রুরা রাসূল (সাঃ)-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। দুনিয়ার হিসাবে এই স্ট্রাটেজি খুবই নাজুক। এই অবস্থায় রাসূল (সাঃ) দাঁড়িয়ে, পূর্ণ বিশ্বাসে আপনাদের সবার উদ্দেশ্যে ঘোষণা করলেন,  "ও আল্লাহ, আখিরাতের জীবন ছাড়া আর কোনো জীবন নাই।"

এরপর ইমাম কিছুদিন আগে মারা যাওয়া এক আলেমের রেফারেন্স দিলেন: শেখ মোহাম্মদ আল-শরীফ, যিনি কিছুদিন আগে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে মাগরিবের নামাজের সময় মারা গেছেন। অনেকেই খুব আফসোস করছেন যে তিনি কম বয়সে মারা গেলেন। এইরকম কাউকে কম বয়সে মারা যেতে দেখলে আমরা বলি: আহা, অমুক তো জীবন উপভোগ করতে পারলো না। অথবা কোনো প্রাক্টিসিং তরুণকে দেখলে বলি, আহা সে অন্য সব কিশোর-তরুণের চেয়ে জীবনকে কম উপভোগ করছে। ইমাম বললেন আমরা অনেকটা আল্লাহর সাথে বিদ্রোহ করেই দুনিয়ার জীবনের ব্যাপারে যেন একটা টাইম-লাইন তৈরী করে রেখেছি। সবাই ধরেই রেখেছি, আমরা যেকোনো সময় মারা যাবো না। জীবন-যৌবন উপভোগ করে বুড়ো বয়সে পৌঁছে তবেই আল্লাহর ইবাদতি শুরু করবো। যেন গ্রাডুয়েশন, বিয়ে, বেড়ানো, সন্তান, গাড়ি-বাড়ি করে সব হলে তবেই জীবন পূর্ণ হবে। কিন্তু কেন এমন করি?  কারণ আমাদের ধারণা, জীবনের শুরুর এই সময়টাই 'আসল', এইটাকে কাজে লাগাতে পারলেই  "জীবন" উপভোগ করা যাবে। 

কিন্তু আমাদের রাসূল (সাঃ) আমাদের শিখাচ্ছেন:  "ও আল্লাহ, আখিরাতের জীবন ছাড়া আর কোনো জীবন নাই।" বলতে চাচ্ছেন আসল জীবন শুরু হয়ই কেবল কারো মৃত্যুর পর থেকে। ইমাম বললেন, রাসূলের (সাঃ) এই কথা কেউ উপলব্ধি করতে পারলেই অনেক কিছুই পরিষ্কার হবে। পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নাহল (সূরা নম্বর ১৬, আয়াত ৯৭)-এ  আল্লাহ তা'য়ালা বলছেন বিশ্বাসী পুরুষ কিংবা নারী, যে দুনিয়াতে ভালো কাজ করবে, আল্লাহ তা'য়ালা তাকে ভালো "জীবন" দিবেন, এবং তার কাজের অনুযায়ী পুরস্কৃত করবেন। ইমাম বললেন এই দুনিয়াতে তাদের "জান্নাতুল ইয়াকিন" (হৃদয়ে বিশ্বাসের প্রশান্তি) দেয়া হবে, তবে "আসল জীবন", আসল পুরস্কার দেয়া হবে আখিরাতে।  

আর এর উল্টো চিত্র আল্লাহ তা'য়ালা তুলে ধরেছেন সূরা ফজরে (সূরা নম্বর ৮৯, আয়াত ২১- ২৪), যেখানে আল্লাহ তা'য়ালা কিয়ামতের দিনের অবস্থা বর্ণনা করছেন। যখন দুনিয়ার সব কিছু চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে, ফেরেশতারা সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়াবে, জাহান্নামকে সবার সামনে আনা হবে, তখন মানুষ দুনিয়ায় তার করা সবকিছু মনে করবে, কিন্তু কি লাভ তখন? মানুষ বলবে, হায় আমি যদি আমার "এই আসল জীবনের" জন্য দুনিয়া থেকে কিছু পাঠিয়ে রাখতে পারতাম। ইমাম খেয়াল করিয়ে বললেন, তখন কিন্তু মানুষ দুনিয়ার জীবন উপভোগ করার কথা বলবে না, আখিরাতের "আসল" জীবনের জন্য দুনিয়ার জীবনকে ঠিক ভাবে কাজে লাগানোর কথা বলবে। কারণ মানুষ তখন উপলব্ধি করতে পারবে, রাসূল (সাঃ) সেই কথা: "ও আল্লাহ, আখিরাতের জীবন ছাড়া আর কোনো জীবন নাই।"

ইমাম বললেন, আমরা যখন মৃত্যুকে জীবনের শুরু চিন্তা করা শুরু করতে পারবো, সেটা আমাদেরকে "হতাশাবাদী" করবে না, বরং "আশাবাদী" মানুষে, মুসলিমে পরিণত করবে। কারণ দুনিয়াতে সবকিছুই অনিশ্চিত, কেবল মৃত্যু নিশ্চিত, এবং তারপরের জীবন নিশ্চিত। একজন বিশ্বাসী এটাতে আশাবাদী হবে, কারণ সে জানবে যে দুনিয়ার এই জীবন শুধু ভালো কাজ করার জন্য, আখিরাতের 'আসল' জীবনের জন্য প্রস্তুতির জন্য।  সে জানবে যে, এই দুনিয়াতে হয়তো আমার সব সুন্দর-সুন্দর জায়গা দেখা হবে না,  নামি-দামি লোকজনের সাথে পরিচয় হবে না, গাড়ি-বাড়ি হয়তো হবে না - কিন্তু আল্লাহ চান তো মৃত্যুর পর আমার বেহেশত দেখা হবে, রাসূল (সাঃ) সাথে দেখা হবে, আমার কবর হবে বেহেশতের একটা টুকরা। সে এটা পারবে কারণ সে জানবে যে: "ও আল্লাহ, আখিরাতের জীবন ছাড়া আর কোনো জীবন নাই"। সে  অন্যদের মতো কিয়ামতের দিন "হায়, আমি যদি আমার "এই আসল জীবনের" জন্য দুনিয়া থেকে কিছু পাঠিয়ে রাখতে পারতাম।" - না বলে বরং যখন তার ডানহাতে আমলনামা দেয়া হবে সে খুশিতে চিৎকার করে কেঁদে উঠে বলবে (সূরা আল-হাক্ক, সূরা নম্বর ৬৯, আয়াত ১৯ - ২১): "আমি জানতাম এমন দিন আসবে" - তারপর সে সুখের "জীবন" যাপন করতে থাকবে। 

ইমাম দোয়া করলেন যেন আমরা সবাই দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে বিভিন্ন পরীক্ষার সময় যেন মনে রাখতে পারি এটা আমাদের "আসল" জীবন না, আমাদের আসল জীবন শুরু হবে আমাদের মৃত্যুর পর থেকে। 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ