এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২): মৃত্যু চিন্তা
এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২): মৃত্যু চিন্তা
উইলো গ্রোভ মসজিদ, পেনসিলভানিয়া।
ইমাম খুতবা শুরু করলেন সূরা আল-মু'মিনুন এর একটা আয়াত [সূরা ২৩, আয়াত ৯৯ - ১০০] তেলাওয়াত করে, যেখানে আল্লাহ তা'য়ালা অবিশ্বাসীদের, মুশরিকদের ব্যাপারে বলছেন যখন তাদের কারো কাছে মৃত্যু এসে হাজির হয়, তখন সে (দ্বিতীয় সুযোগ চেয়ে) বলে "আমার রব, আমাকে ফেরত পাঠান যেন আমি নেক আমল করে আসতে পারি সেখানে যা আমি ফেলে এসেছি"। তার উত্তরে আল্লাহ বলেন কক্ষনোই না, এতো শুধু তার একটা কথা! ইমাম বলতে চাইলেন, মৃত্যু মানুষকে উপলব্ধি করতে শেখায়। পরে পুরো খুতবা জুড়ে মানুষের জীবনে মৃত্যু চিন্তা, এর উপরকারিতা এবং বিভিন্ন হাদিসে আমাদের রাসূল (সাঃ) যে সেটা আমাদের করতে বলেছেন, এই ব্যাপারে আলাপ করলেন।
ইমাম বললেন একটা বর্ণনায় নাকি আছে যে মৃত্যুর ফেরেশতা মানুষ রূপে দাউদ (আঃ) -এর কাছে আসলে দাউদ (আঃ) তার পরিচয় জিজ্ঞেস করেন। উত্তরে ওই লোক নিজের ব্যাপারে বলেন যে তিনি এমন যে কারো ব্যাপারে ভেদাভেদ করেন না, ছোট-বড়, ধনী-গরিব, সুস্হ-অসুস্থ, বর্ণ -ধর্ম কিছুই তাকে বাধা দেয় না, দুর্ভেদ্য দুর্গেও তার অবাধ চলাচল। এটা শুনে দাউদ (আঃ) নাকি তাকে মৃত্যুর ফেরেশতা হিসাবে চিনতে পারেন। ইমাম বললেন, মৃত্যুর বাস্তবতা সত্য, মানুষ যতভাবেই সেটা এড়াতে চাক না কেন, আমাদেরকে সেটার সামনে আসতেই হবে। ইমাম বললেন, আরবি 'ইনসান' বা মানুষ শব্দ আর 'ভুলে যাওয়া' শব্দের উৎপত্তি মূল একই। মানুষ মাত্রই ভুলে যায়, আর তাই মানুষকে মৃত্যুর চিন্তা বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে, মৃত্যু চিন্তা মাথায় রাখলেই কেবল দুনিয়ার মায়ার পরিবর্তে আখিরাতের ব্যাপারে আমরা মনোযোগী হবো। তখন দুনিয়ার ধন-সম্পদের চেয়ে আল্লাহ তা'য়ালার কাছে যা প্রিয় (অর্থাৎ, নামাজ, রোজা, জাকাত ইত্যাদি ইবাদত বা আমল) সেসব আমাদের কাছেও কাঙ্খিত আর মধুর মনে হবে। ইমাম একটা হাদিস বললেন যেখানে রাসূল (সাঃ) উপদেশ দিচ্ছেন দুনিয়ার জীবন একজন আগুন্তক বা পর্যটকের মতো কাটানো উচিত।
'আহ্সানু- আমলা' - অর্থাৎ আমলের সর্বোত্তম অবস্থা কী সেটা এরপর ইমাম ব্যাখ্যা করলেন। বললেন, এর দুইটা দিক আছে: প্রথম হচ্ছে যেকোনো আমলের কিছু পূর্ব শর্ত আছে, সেগুলো ঠিকমতো পূরণ করা; এরপর আমলের ব্যাপারে 'ইখলাস' বা সিন্সিয়ারিটি বা একাগ্রতা থাকা। উদাহরণ দিয়ে বললেন, যেমন নামাজ পড়ার পূর্ব শর্ত হচ্ছে ওযু করা। ঠিকমতো ওযু না করে একজন যতই একাগ্রতার সাথে নামাজ পড়ুক না কেন সেটা কবুল হবে না। আবার উল্টোভাবে খুব ভালোভাবে নামাজের সব পূর্ব শর্ত মেনে, যেমন পাক শরীর-কাপড়ে, ঠিকমতো ওযু করে কেউ নামাজ পড়লো, কিন্তু সেটায় কোনো একাগ্রতা ছিল না - লোক দেখানো ছিল, সেই নামাজ কবুল হবে না। ইমাম এই দুইটা দিকের সমানভাবে খেয়াল রাখতে বললেন।
এরপর একটা গল্প বললেন। এক ব্যক্তি নাকি এক আলেমের কাছে গিয়ে উপদেশ চাইলো যে কিভাবে সে তার (ইবাদতের ব্যাপারে) অন্তর খুলতে পারবে। আলেম নাকি জিজ্ঞেস করলেন তোমার বাবা কোথায়? উত্তরে ওই লোক বললো যে তার বাবা মারা গেছেন। এরপর একইভাবে তার দাদার কথা জিজ্ঞেস করায় ওই লোক একই উত্তর দিলো। তখন আলেম বললেন, তুমি আমার কাছে কেন উপদেশের জন্য এসেছো যখন তোমার পূর্ব পুরুষরা তোমার সামনে এরই মধ্যে উদাহরণ সহ উপদেশ রেখে গেছেন? অর্থাৎ, তাদের মৃত্যুই তো তোমার অন্তর খুলে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। ইমাম উদাহরণ দিয়ে বললেন, ব্রিটেনের রানী মারা গেছেন, আমরা অনেকেই তাঁর মৃত্যুর খবর আগ্রহ নিয়ে দেখছি, আলাপ করছি কিন্তু সেটা আমাদের জন্য একটা রিমাইন্ডার হওয়া উচিত। কারো জানাজার মিছিলে শরিক হয়ে আমাদের ভাবা উচিত যে এরপরের ব্যক্তি হয়তো আমিই হবো। দিনের শুরুতে ওই রাতের ব্যাপারে, কিংবা রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় পরের দিনের ব্যাপারে আমরা যেন কখনো নিশ্চিত না হই।
ইমাম বললেন [সম্ভবত একটা হাদিস আছে], যেই ব্যক্তির মৃত্যু চিন্তা কম, তার তিনটা বৈশিষ্ট্য আছে: ১) সে ভুল করে সাথে সাথে তওবা করে না, ভাবে সময় আছে, পরে করবে; ২) দুনিয়ার ধন-সম্পদের আহরণের ব্যাপারে বেশি মনোযোগী হবে; ৩) আল্লাহর ইবাদতের ব্যাপারে উদাসীন হবে। আর যার মধ্যে মৃত্যু চিন্তা থাকে, তার বেলায় ঠিক এর উল্টো হবে: সে ভুল করেই ক্ষমা চাবে, অল্পতেই সন্তুষ্ট হবে আর আল্লাহর ইবাদতের ব্যাপারে মনোযোগী হবে।
ইমাম খুতবা শেষ করলেন চীনের উইঘুর মুসলিমদের অবস্থা বর্ণনা করে। উনার মসজিদে এক মুসল্লি উইঘুরের। তার রেফারেন্স দিয়ে ইমাম বললেন, উইঘুরের মুসলিমের নির্যাতনের সাম্প্রতিক ঘটনা হচ্ছে, করোনা প্রতিরোধের দোহাই দিয়ে তাদের নাকি গত ৪০ দিন ধরে কোনোরকম খাদ্য সাহায্য না দিয়ে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। উইঘুর মুসলিম নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-শিশু নিজেদের ঘরে না খেয়ে মারা যাচ্ছে। কিন্তু কারো কোনো মাথা ব্যথা নাই। ইমাম একটা হাদিস বললেন, রাসূল (সাঃ) নাকি ভবিষ্যৎবাণী করে বলেছিলেন, এমন একটা সময় আসবে যখন মানুষ যেভাবে অন্যদের দাওয়াত দিয়ে আপ্যায়ন করে, একইভাবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে তখন অন্যরা একে অন্যকে আহ্বান করবে। শুনে একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করেছিলেন কেন? তখন কী মুসলিমরা সংখ্যায় কম হবে, প্রাচুর্যে-শক্তিতে দুর্বল হবে? উত্তরে রাসূল (সাঃ) নাকি বলেছিলেন না, তখন মুসলিমরা সংখ্যার দিক দিয়ে অনেক হবে, কিছুই কম থাকবে না কিন্তু তারা দুনিয়ার ধন-সম্পদের ব্যাপারে বেশি মনোযোগী হয়ে থাকবে! ইমাম বললেন, আমরা হয়তো সেই সময়েই আছি। কারণ সংখ্যায় কয়েক বিলিয়নের উপরে হলেও মুসলিমদের এখন আর কেউ ভয় পায় না। চিনের উইঘুর, ভারত, ইয়ামেন, ইসরায়েল, মিয়ানমার সহ পৃথিবীর অনেক জায়গায় মুসলিমদের নির্যাতন করা হলেও আমাদের বাকিদের যেন কিছুই যায়-আসে না। ইমাম বললেন আমরা যেন যে যার জায়গা থেকে এইসব অন্যায় সহ সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই।
[সাইড নোট: মানুষ বা আরবি "ইনসান"-এর র মূল 'নাসিয়া' বা নুন-সিন-ইয়া যার অর্থ ভুলে যাওয়া। খুতবা শোনার সময় অনেক ক্ষেত্রেই আমি কোনটা হাদিস আর কোনটা ইমামের নিজস্ব মন্তব্য সেটা খেয়াল করতে পারি না বা ভুলে যাই। তাই, আমার লেখা সারমর্ম পড়ে নিজেদের যাচাই করে নেয়া উচিত। আমি সাধারণতঃ দুইটা মসজিদে জুমু'আর নামাজ পড়তে যাই। কোনো মসজিদেই একই ইমাম সবসময় খুতবা দেন না। ঘুরে-ফিরে একেক সপ্তাহে একেক জন ইমাম খুতবা দেন।]
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন