এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২): অদৃশ্য দেনা বা ঋণ
এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২): অদৃশ্য দেনা বা ঋণ
উইলো গ্রোভ মসজিদ, পেনসিলভানিয়া।
ইমাম খুতবা শুরু করলেন একটা হাদিস বলে যেটা অনেকটা এইরকম: একজন শহীদের সব গুনাহ আল্লাহ তা'য়ালা মাফ করে দিবেন কেবল মাত্র তাঁর অপরিশোধিত দেনা বা ঋণ ছাড়া। ইমাম ভেবে দেখতে বললেন, যেই শহীদ আল্লাহর রাস্তায়,আল্লাহর দ্বীন রক্ষা করতে জীবন দিয়ে দিলেন, তাঁকেও আল্লাহ তা'য়ালা তার অপরিশোধিত দেনার জন্য জবাবদিহি করবেন। কাজেই, অপরিশোধিত দেনা কতটা ভয়ংকর তা ভেবে দেখতে বললেন। এরপর উদাহরণ দিলেন, আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যাদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন, তাদের কোনো দেনা নেই, কারণ তারা ভাড়া বাসায় থাকেন, কিংবা গাড়ি - বাড়ির ঋণ শোধ করে দিয়েছেন, তাদের কোনো পাওনাদার নেই। এটা বাহ্যিক দেনার বেলায় সত্য, কিন্তু আমরা অনেকেই জানিনা আমাদের অনেক "অদৃশ্য" দেনা আছে। পরে পুরো খুতবা জুড়ে ইমাম পাঁচ প্রকার 'অদৃশ্য' দেনার ব্যাপারে আলাপ করলেন। নামাজ শেষে আমি অবশ্য উনাকে আরেকটা সম্ভাব্য দেনার কথা জিজ্ঞেস করলাম, সেটা কী আর ওই ব্যাপারে তিনিই বা কী মন্তব্য করলেন সেটা শেষে সাইড নোট হিসাবে লিখে দিচ্ছি।
ইমাম কুরআনের একটা আয়াতের [সূরা আল-আরাফ ৭: আয়াত ১৭২] উদ্ধৃতি দিয়ে বললেন, আমাদের সবাই - (অর্থাৎ সবার রূহ) সৃষ্টির শুরুতে আল্লাহ যে আমাদের রব - সেটা সাক্ষ্য দিয়ে এসেছি। এই সাক্ষ্য দিয়ে আমরা প্রকারান্তরে তাঁর ইবাদত করার ব্যাপারে, তাঁর নির্ধারিত দ্বীন মেনে চলার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞা করে এসেছি। এই ওয়াদা আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে "দেনা"। যদিও আমাদের কারো এটা এখন মনে নাই, কিন্তু শেষ বিচারের দিন, আমাদের ঠিকই মনে পড়বে। আর সেই হিসাবেই এটা এখন আমাদের জন্য "অদৃশ্য" দেনা। আল্লাহ তা'য়ালা কে জানার চেষ্টা করা, তাঁর নির্ধারিত দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা আর তা জেনে মেনে চললেই আমাদের এই "অদৃশ্য" দেনা শোধ হবে। ইমাম বললেন, আমাদের অনেকেই আগে, কিংবা এখনো অনেক সময় নামাজ ছেড়ে দেই। আমাদের উচিত নামাজ পড়ার এই 'দেনা'র ব্যাপারে সতর্ক হওয়া। জীবন সংক্ষিপ্ত, তাই ছেড়ে আসা নামাজ 'কাজা' হিসাবে আদায় করা উচিত। দরকার হলে, হিসাব করে কত ওয়াক্ত নামাজ 'কাজা' হয়েছে সেটা লিখে আদায় করার চেষ্টা করা। কেননা, আমরা যদি মারা যাই, তাহলে সেটাও আমাদের চেষ্টার একটা সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।
দ্বিতীয় 'অদৃশ্য' দেনা হচ্ছে: মা-বাবার প্রতি দেনা। ইমাম কুরআনের আয়াত [সূরা আল-ইসরা ১৭: আয়াত ২৩] উদ্ধৃত করে বললেন, আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর বান্দাদের আদেশ করছেন তারা যেন তাঁকে ছাড়া আর কাউকে উপাস্য না করে (অর্থাৎ তাওহীদ) আর মা-বাবার প্রতি যেন সদয় আচরণ করে। ইমাম চিন্তা করে দেখতে বললেন, আল্লাহ তা'য়ালা তাওহীদ আর মা-বাবার প্রতি কর্তব্য আক্ষরিকভাবেই একই আয়াতের অংশ হিসাবে উল্লেখ করেছেন। এর পরের আয়াতেই [সূরা আল-ইসরা ১৭: আয়াত ২৪] এই সদয় আচরণ কেমন হবে, তাঁদের জন্য কিভাবে দোয়া করতে হবে সেটা শিখিয়ে দিয়েছেন। কাজেই মা-বাবার প্রতি সদয় আচরণ যে কতটা জরুরি 'অদৃশ্য' দেনা সেটা উপলব্ধি করতে বললেন। সাথে এটাও বললেন যে, আমাদের মা-বাবা আমাদের জন্ম দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে, লালন-পালন করে আমাদের প্রতি তাঁদের কর্তব্য পালন করেছেন। এখন তাঁদের বৃদ্ধ বয়সে সেই অসীম দেনার কিছু অংশ ফেরত দেয়ার চেষ্টা করা আমাদের কর্তব্য।
তৃতীয় 'অদৃশ্য' দেনা হচ্ছে, গরিবের প্রতি। আমাদের ধন-সম্পদ-মালের একটা অংশ তো আল্লাহ গরিবের হক [জাকাত হিসাবে] করেই দিয়েছেন। তারপরেও অনেক গরিব আছেন, যারা চাইতে পারেন না। তাদেরকে খুঁজে নিয়ে সাহায্য করা আমাদের 'অদৃশ্য' দেনা। এরপর উদাহরণ দিয়ে বললেন, কোনো দেশে খরা, যুদ্ধ, কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়েছে, তারা হয়তো আমাদের কাছে সাহায্য চাইতে পারছে না। তাদেরকে আমাদের নিজেদের উদ্যোগেই সাহায্য করতে হবে। এরপর ইমাম একটা হাদিস/গল্প বললেন যেখানে দুইভাইয়ের এক ভাই ব্যবসা করে অনেক উন্নতি করেছেন। কিন্তু আরেকভাই গরিব, তিনি নিজের শ্রম রাসূল (সাঃ)-র কাজে দিয়ে রেখেছেন। প্রথম ভাই এসে রাসূল (সাঃ) কে দ্বিতীয় ভাইয়ের ব্যাপারে নালিশ করলেন যে সে কিছুই রুজি করে না। উত্তরে রাসূল (সাঃ) নাকি তাকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, হয়তোবা আল্লাহ তা'য়ালা তার এই গরিব ভাইয়ের জন্যই তাকে এতো উন্নতি দিচ্ছেন! ইমাম বললেন, আমাদের গরিব আত্মীয় স্বজনের কারণেই হয়তোবা আমরা আজকে এতটা সচ্ছল। ইমাম আরেকটা আয়াতের রেফারেন্স [সূরা আল-মা'আরিজ ৭০: আয়াত ১৯ - ২১] দিলেন, যেখানে আল্লাহ তা'য়ালা বলেই দিয়েছেন যে মানুষ মাত্রই অস্থির, বিপদে পড়লে অধৈর্য হয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে আর ভালো সময়ে কৃপণতা করে। আমরা যেন আমাদের খারাপ সময়ে ধৈয্য ধরি, আর ভালো সময়ে কৃপণতা না করে গরিবদের সাহায্য করি - ইমাম সেটা খেয়াল করিয়ে দিলেন।
চতুর্থ 'অদৃশ্য' দেনা হচ্ছে, আমাদের সন্তানদের প্রতি। আমাদের তাদেরকে খাওয়া-পড়া ইত্যাদির ব্যবস্থা করার পাশাপাশি তাদের সাথে 'কোয়ালিটি' বা ভালো সময় ব্যয় করতে হবে। এই ব্যাপারে কুরআনে লোকমান (আঃ)-এর উদাহরণ দেখতে বললেন। ইমাম বললেন, সন্তানদেরকে নিয়ে নামাজ পড়া, তাদের সাথে নিয়ে গরিবদের দান-খয়রাত করা ইত্যাদির পাশাপাশি তাদেরকে ধৈর্য ধরার শিক্ষা দেয়া তাদের প্রতি আমাদের 'অদৃশ্য' দেনার অংশ। ধৈর্য শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে বললেন, তারা ভুল করলে, রাগ করে তাদের সাথে চিৎকার, চেঁচামেচি বা মারামারি না করে, বরং নিজেরা ধৈয্য ধরে, তাদের ভুল ধরিয়ে দিয়েই এই শিক্ষা দেয়া সম্ভব [সাইড নোট: আমার ব্যাপারটা শিখতে হবে।]।
পঞ্চম 'অদৃশ্য' দেনা হচ্ছে, এক মুসলিমের প্রতি আরেক মুসলিমের দেনা। এই ব্যাপারে সাহাবীরা রাসূল (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করলে তিনি নাকি বলেছিলেন, ছয়টা হক বা দেনা আছে: ১) সালাম দিলে উত্তর দেয়া, ২) দাওয়াত দিলে তা গ্রহণ করা, ৩) কোনো উপদেশ চাইলে, সাধ্যমতো, সিন্সিয়ারিলি উপদেশ দেয়া, ৪) হাঁচি দিয়ে কেউ 'আলহামদুলিল্লাহ' বললে, উত্তরে 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' বলা, ৫) অসুস্হ হলে দেখতে যাওয়া আর ৬) মারা গেলে জানাজা পড়ে, মিছিলে শরিক হয়ে দাফনে অংশ নেয়া।
ইমাম আমাদেরকে এইসব 'অদৃশ্য' দেনা শোধের ব্যাপারে নিজের সাধ্যমতো চেষ্টা করার উপদেশ দিয়ে আল্লাহ তা'য়ালা যেন আমাদের সেটা করার তৌফিক দেন সেটা দোয়া করে খুতবা শেষ করলেন।
[সাইড নোট: নামাজ শেষে, আমি ইমামের কাছে গিয়ে তাঁকে চিন্তার খোরাক জোগানো, চমৎকার খুতবার জন্য ধন্যবাদ জানালাম। উনি উত্তরে 'আল্লাহ তা'য়ালা তা কবুল করুন' বললেন। এরপর আমি অনেকটা কৌতুক করেই জিজ্ঞেস করলাম, স্বামী-স্ত্রীর একে অপরের প্রতি কোনো দেনা নাই? বললাম আমি তো আসলে অপেক্ষা করছিলাম উনি এটা বলবেন, এই ব্যাপারে তো নিশ্চয়ই কুরআনে আর হাদিসে আলোচনা থাকার কথা। উনি বললেন, নিশ্চয়ই আছে। উনার এই মুহূর্তে মনে নাই, কিন্তু কুরআনের একটা আয়াত আছে যেখানে স্বামী-স্ত্রীকে একে অপরের 'রক্ষাকারী' হিসাবে বলা আছে। ইমাম বললেন, প্রচলিত ধারণা মতে স্বামীই কেবল 'রক্ষাকারী' হিসাবে আমরা মনে করি, কিন্তু ওই আয়াতে একে-অপরের 'রক্ষাকারী' হিসাবে উল্লেখ করে আল্লাহ তা'য়ালা আসলে স্বামী-স্ত্রীর একজনের প্রতি আরেকজনের 'দেনা' বা দায়িত্ব বুঝিয়েছেন। উদাহরণ দিয়ে বললেন, স্বামী-স্ত্রী একজন আরেকজনকে নামাজ পড়া সহ ভালো কাজে উৎসাহিত করবে, একজন খেপে বা রেগে গেলে আরেকজন শান্ত থেকে অন্যজনকে শান্ত হতে বলবে, ইত্যাদি। ইমাম আমার ইমেইল এড্রেস রেখে বললেন উনি আয়াতটা বের করে আমাকে পাঠাবেন। আরো বললেন, উনার এই ব্যাপারটা খেয়াল হয় নাই, পরের বার উনি এটা যোগ করবেন, হয়তো পুরো একটা খুতবা এই টপিকে দিবেন। আমি পরে সার্চ করে দেখলাম, সূরা বাকারার ২: আয়াত ১৮৭ তে আল্লাহ তা'য়ালা স্ত্রীদেরকে স্বামীর, আর স্বামীদেরকে স্ত্রীর 'পোশাক' হিসাবে উল্লেখ করেছেন। ইমাম সম্ভবত এই আয়াতের রেফারেন্সই দিচ্ছিলেন।]
[আপডেট: ইমাম আমাকে ইমেইল করেছেন। ওই আয়াত হচ্ছে সূরা তাওবা, ৯: আয়াত ৭১, যেখানে আল্লাহ সুবহানাহু তা'য়ালা বলছেন: মু'মিন পুরুষ ও মহিলা একে অপরের সহযোগী/সাহায্যকারী/রক্ষাকারী (আউলিয়া)। তারা একে অপরকে ভালো কাজে উপদেশ আর মন্দ কাজে নিষেধ করে, সালাত প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত দেয়, আর আল্লাহ ও তার রাসূলকে মেনে চলে। তাদেরকেই আল্লাহ তা'য়ালা রহমত দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ব শক্তিমান, বুদ্ধিমান]
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন