এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২): দুনিয়ার চিন্তা

এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২): দুনিয়ার চিন্তা 
মসজিদ আল জামিয়া, ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভানিয়া।

ইমাম খুতবা শুরু করলেন বলে যে আমরা ভাবি আমাদের হাতে সময় আছে। কিন্তু কার সময় যে কখন ফুরিয়ে যাবে তা কেউ জানি না। এরপর গত সপ্তাহে পাশের "রোক্সবরো" শহরে হাইস্কুল ছেলেদের খেলা নিয়ে মারামারি, পরে গুলাগুলি আর তাতে রাস্তায় দাঁড়ানো ১৪ বছরের একটা ছেলের মারা যাওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে বললেন, উনি খবরে ওই ছেলের মা'র ইন্টারভিউ দেখেছেন। মুসলিম ফ্যামিলি, মা ছেলে মারা যাওয়ার সময় পাশে ছিলেন, ছেলে নাকি 'কালেমা শাহাদা' বলে মারা গেছে। আমরা হয়তো এতটা ভাগ্যবান হবো না। ইমাম এরপর ফ্লোরিডার ঘূর্ণিঝড়ের খবর বললেন - অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, অনেকে মারা গেছে - যারা বয়সে অনেক তরুণ। তারপরও আমরা উপলব্ধি করতে পারি না যে দুনিয়ার সময় কত ক্ষণস্থায়ী। এরপর তিনি খুতবা জুড়ে দুনিয়া ঘিরে আমাদের চিন্তা কেমন, কিন্তু আসলে কেমন হওয়া উচিত, কুরআন আর হাদিসের রেফারেন্স দিয়ে তা আলাপ করলেন। 

ইমাম নিজেদের প্রতি সত্য থেকে চিন্তা করতে বললেন, আমাদেরকে রাতে জাগিয়ে রাখে কোন চিন্তা? আখিরাতের চিন্তা, ফজরের নামাজ পড়ার চিন্তা, নাকি দুনিয়ার অন্য কোনো টেনশন? বললেন, আমাদের বেশির ভাগের ক্ষেত্রেই তা আসলে দুনিয়ার কোনো চিন্তা। ইমাম সূরা হাদীদের (সূরা ৫৭, আয়াত ২০) রেফারেন্স দিয়ে বললেন, আল্লাহ তা'য়ালা নিজেই দুনিয়ার জীবন আমাদের জন্য কেমন সেটা বলে দিয়েছেন। সেটা মূলত ৫ টা জিনিসের (কোনো একটা কিংবা কয়েকটার) কম্বিনেশন: একধরণের খেলা; বিনোদন বা ডিস্ট্রেকশন (অমনোযোগিতা);  সৌন্দর্যের প্রদর্শন; একে অন্যের মধ্যে নিজেকে জাহির করা; সম্পদ আর সন্তানের বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা। ইমাম চিন্তা করে দেখতে বললেন, জীবন এক ধরণের খেলা, যেখানে আমরা প্রতিনিয়তই ডিস্ট্রাক্টেড বা অমনোযোগী থাকি। প্রশ্ন করলেন, আজকে নামাজে আসার সময় আমরা কয়জন ফোন কল করে কথা বলেছি, কিংবা মেসেজ দিয়েছি? বললেন, আমরা একটুক্ষণ চুপচাপ বসতে পারি না, ফোন, কিংবা অন্য কিছু দিয়ে নিজেদের ব্যস্ত রেখে মূল কাজ থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখি, অমনোযোগী করে রাখি। সৌন্দর্যের প্রদর্শন আর জাহির করার কথা বলতে গিয়ে চিন্তা করে দেখতে বললেন, আমরা ভালো কাপড় পড়লে, কোথাও ঘুরতে গেলে, এমনকি রান্না করা খাবারের ছবি যোগাযোগ মাধ্যমে দিয়ে আমরা কী সেটাই করছি না? সবসময়ই নিজেদের জীবনের একটা অংশ আমরা বাকি সবাইকে জানিয়ে 'আপডেটেড' করে রাখার চেষ্টা করছি। কিন্তু কেন? আমাদেরকে মনে রাখার জন্য? কেউ কি আমাদের এইসব কখনো মনে রাখবে? 

এই প্রসঙ্গে ইমাম একটা সত্যি গল্প বললেন। কোনো এক মসজিদের উলটোদিকে রাস্তার পাশে একটা ওয়ালে অনেক আঁকাবুকি (গ্রাফিতি) করা। একদিন মসজিদের ওয়ালে ৯-১০ বছরের এক ছেলেকে স্প্রে পেইন্ট দিয়ে কিছু একটা করতে দেখে একজন মুসল্লি তাকে থামিয়ে জিগ্গেস করলো সে কি করছে। উত্তরে ছেলেটা বললো সে তার নাম লিখছে। তাতে ওই মুসল্লি নাকি রাস্তার উল্টো পাশে গ্রাফিতি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো: আচ্ছা, ঐযে লেখা 'রক' সে কে তুমি চেনো? ছেলেটা না বলায় আরেকটা নাম দেখিয়ে আবারো জিজ্ঞেস করলো: তাকে? তাতেও না বলায় মুসল্লি এইবার ঐ ছেলেকে বললেন তাহলে তোমার নাম এই ওয়ালে লিখে কি লাভ বলো? কেউ তো তোমাকে চিনবে না। ছেলেটা সেদিন নাম না লিখেই চলে গিয়েছিলো। পরে তার মাকে নিয়ে এসে নাকি বলেছিলো সে ওই মুসল্লির মতো মুসলিম হতে চায়! ইমাম বললেন, নাম না লিখে তার পরের এই কাজটাই তার বংশধরদের মাধ্যমে তার লেগাসি হয়ে থাকবে। গল্পটা বলে ইমাম প্রশ্ন করলেন, আমাদের আগে তো আরো কত বিখ্যাত-বিখ্যাত মানুষ এসে চলে গেছেন। তাদের সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি? সাহাবীদের কয়জনের নামই বা আমরা জানি।তারপরও কেন নিজেদের জাহির করার আমাদের এতো চেষ্টা?

সম্পদ আর সন্তানের বৃদ্ধির প্রতিযোগিতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বললেন, সেটা আমরা মূলত করছি গরিব হয়ে যাওয়ার ভয়ে। আমাদের সম্পদ বৃদ্ধির সব চেষ্টা ভবিষ্যতের জন্য, যাতে পরে কখনো 'গরিব' না হয়ে পড়ি। ইমাম আরো বললেন, আমরা কেন ভুলে যাই যে আমাদের রিজিক আগে থেকেই নির্ধারিত? রিজিক হয়তো আস্তে-ধীরে আসবে কিন্তু মুসলিম হিসাবে আমাদের বিশ্বাস করতে হবে কারো মৃত্যুর আগে রিজিকের একদানাও কম-বেশি হবে না। তারপরও আমাদের ভয়, আশংকা কমে না। ইমাম সূরা মুনাফিকুনের (সূরা ৬৩, আয়াত ৯) আয়াতের রেফারেন্স দিয়ে বললেন, আল্লাহ তা'য়ালা বলছেন, "ও বিশ্বাসীগণ, তোমাদের সম্পদ আর সন্তানাদি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে ভুলিয়ে না রাখে, যারা সেটা করবে তারা অসফলকাম (আরবিতে 'খাসিরুন' আর ইংরেজিতে Looser)"। 

ইমাম বললেন, শয়তানের একটা চালাকিই হচ্ছে দারিদ্র্যতার ভয় দেখানো। আর এই ভয়েই আমরা দুনিয়াতে সম্পদ জমাতে ব্যস্ত থাকি, আখিরাত ভুলে যাই। যে ব্যক্তি দুনিয়ার ব্যাপারে বেশি মনোযোগী, তার কাজ (লক্ষ্যস্থির না থেকে) বহুমুখী হবে, অন্যদিকে আখিরাতের ব্যাপারে মনোযোগী ব্যক্তি তার যা আছে সেটাতেই সন্তুষ্ট থাকবে। শুধু তাই না, সে কৃতজ্ঞও হবে। ইমাম পরিষ্কার করলেন, তার মানে এই না যে দুনিয়াতে আমরা কোনো কাজ না করে বসে থাকবো। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) নিজেও উপার্জন করেছেন, নিজের, নিজের পরিবারের চাহিদা মিটিয়েছেন। বাসায় খাবারও জমিয়ে রাখতেন। কিন্তু সেটা পরিমিত, কখনোই মাত্রাতিরিক্ত করতেন না। সম্ভবত একটা হাদিস আছে যেখানে রাসূল (সাঃ) বলেছেন, দুনিয়ার যা হালাল তা থেকে উপার্জন করো, আর যা হারাম তা ছেড়ে দিও। 

সব শেষে ইমাম একটা হাদিস বললেন। ইবনে উমর থেকে বর্ণিত সহীহ হাদিস (তিরমিযী ৩৫০২), রাসূল (সাঃ) নাকি যেকোনো জমায়েত থেকে উঠে যাওয়ার সময় একটা দোয়া করতেন, খুব কম সময়ই তা বাদ দিতেন। দোয়াটার একটা অংশ অনেকটা এইরকম: হে আল্লাহ! দুনিয়া যেন আমাদের সব চিন্তার কারণ না হয়, আর না আমাদের জ্ঞানের সব কিছু (দুনিয়াকে ঘিরে হয়)। ইংরেজিতে এর অনুবাদ করা আছে এইভাবে:  Let not the world be our greatest worry, nor the extent of our knowledge।     

[সাইড নোট:  আমি মসজিদে গাড়ি ড্রাইভ করে যাওয়ার সময় আসলেই একটা ই-মেইল পাঠিয়েছি (সিগনালে দাঁড়ানো অবস্থায় অবশ্য), আর ফোনে কথা বলেছি। ইমাম আরো বলেছেন, একটা স্টাডি আছে যে অমনোযোগী ড্রাইভিং নাকি মদ্যপ ড্রাইভিংয়ের থেকেও খারাপ!]


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ