এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১৪ অক্টোবর , ২০২২): আস্তাগফিরুল্লাহ ও অন্যান্য জিকিরের গুরুত্ব
এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১৪ অক্টোবর , ২০২২): আস্তাগফিরুল্লাহ ও অন্যান্য জিকিরের গুরুত্ব
মাসজিদ-আল-জামিয়া, ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভানিয়া।
ইমাম বললেন গত শুক্রবার তিনি আলাপ করেছেন আস্তাগফিরুল্লাহ সহ অন্যান্য জিকির সম্পর্কে: কিভাবে, কখন এগুলো করা উচিত। আর আজকের খুতবায় তিনি আলাপ করবেন এইগুলার গুরুত্ব, উপকারিতা বা ফজিলত সম্পর্কে। তারপর পুরা খুতবা জুড়ে বিভিন্ন নবী রাসূলের উদাহরণ, তাঁদের মাফ চাওয়া আর এর ফলে কি হয়েছিল, সেগুলো কুরআন আর সুন্নাহর আলোকে আলাপ করলেন। বললেন, তাঁদের করা প্রত্যেকটা দোয়া'ই ইস্তেগফার হিসাবে আমরা এখন করতে পারি।
ইমাম বললেন, কোনো উপকারের আশা করার আগেই আমাদের জানা উচিত, আস্তাগফিরুল্লাহ আর আল্লাহর প্রশংসা করে জিকির করা সব নবী রাসূলের সুন্নাত। শুধু সুন্নাত পালনের উদ্দেশ্যেই আমাদের এইগুলা নিয়মকরে করা উচিত। এরপর তিনি বললেন আদম (আঃ) আর বিবি হাওয়া (রাঃ) -র করা ভুলের জন্য (নিষিদ্ধ গাছ থেকে খাওয়া পর) তাঁদের সম্মিলিত ভাবে করা ইস্তেগফার সূরা আল-আরাফের আয়াত (সূরা ৭, আয়াত ২৩)-এ বলা আছে, যা আমরা কমবেশি সবাই জানি: "রাব্বানা ঝলামনা আনফুসানা.....খাসিরুন" যার অর্থ: "হে আমাদের রব, আমরা ভুল করেছি (নিজেদের প্রতি অবিচার করেছি), আপনি আমাদেরকে মাফ না করলে আর দয়া না করলে নির্ঘাত আমরা ব্যর্থ / ক্ষতিগ্রস্ত হবো (ইংরেজিতে loosers)"। নূহ (আ:)-এর করা ইস্তেগফার শুধু তাঁর নিজের জন্য ছিল না, তাঁর পিতা-মাতা সহ তাঁর ঘরে প্রবেশ করেছে এমন সহ বাকি সব বিশ্বাসীদের জন্য তিনি দোয়া করেছেন। সূরা নূহ-এর এই দোয়া আল্লাহ তা'য়ালা কুরআনের সূরা নূহ-এ (সূরা ৭১: আয়াত ২৮) বলেছেন: "রাব্বিগ ফিরলি ওয়ালি ওয়ালিদাইয়া..." যার অর্থ: হে আমার রব, আমাকে, ও আমার পিতামাতা কে, আমার ঘরে প্রবেশ করেছে এমন বিশ্বাসী সহ সকল বিশ্বাসী পুরুষ ও নারীকে মাফ করে দাও।
ইমাম সুলাইমান (আঃ) -র ইস্তেগফারের দোয়া কুরআনের সূরা সাদ (সূরা ৩৮, আয়াত ৩৫)-এ আছে উল্লেখ করে বললেন: "রাব্বিগ ফিরলি, ওয়া হাবলি মূলকান ..." যার অর্থ: হে আমার রব, আমাকে মাফ করে দিন, এবং আমাকে এমন এক "মূলক"/ সাম্রাজ্য/ কর্তৃত্ব দিন যা পরে আর কেউ কোনোদিন পাবে না, আপনি তো পরম দাতা। ইমাম বললেন, আল্লাহ তা'য়ালা সুলাইমান (আঃ)-এর এই দোয়া কবুল করেছিলেন। আর তাকে জ্বীন, বাতাসের কর্তৃত্ব দিয়েছিলেন, পশুপাখী-পোকামাকড়ের ভাষা বোঝার ক্ষমতা দিয়েছিলেন -- যা আর কেউ কোনোদিন পাবে না। ইমাম খেয়াল করতে বললেন যে কিভাবে সুলাইমান (আঃ) মাফ বা ইস্তেগফারের পরেই তার প্রয়োজনীয় জিনিস আল্লাহ তা'য়ালার কাছে চাইছেন। ইমাম বললেন, এটা আমাদের জন্য উদাহরণ, আমাদের প্রয়োজনীয় কিছু আল্লাহ তা'য়ালার কাছে চাইতে প্রথমে আমরা নিজেদের করা ভুলের জন্য মাফ চেয়ে নিতে পারি।
মুসা (আঃ) যখন দুর্ঘটনাবশতঃ ফেরাউনের গোত্রের একজনকে মেরে ফেলেছিলেন তখন তিনি কী দোয়া করেছিলেন সেটা সূরা কাসাসের (সূরা ২৮, আয়াত ১৬) আয়াতে উল্লেখ আছে: "রাব্বি ইন্নি ঝলামতু নাফসি ফাগ ফিরলি..." যার অর্থ: "হে আমার রব, আমি তো আমার নফসের বিরুদ্ধে জুলুম করেছি, সুতরাং আমাকে মাফ করে দিন"। ইমাম বললেন, এই আয়াতের পরের অংশেই আছে, আল্লাহ বলছেন, "অতঃপর তিনি (আল্লাহ) তাকে (মুসা আঃ -কে ) ক্ষমা করলেন, তিনিতো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু"। ইমাম বললেন, যে কোনো গুনাহর প্রকৃত ক্ষমা একমাত্র আল্লাহই করতে পারেন। আমাদেরকে শুধু সিন্সিয়ারিলি মাফ চাইতে হবে, শোধরানো চেষ্টা করতে হবে।
ইউনুস (আ:)-র ঘটনা বললেন। ইউনুস (আঃ) তাঁর গোত্রের উপর রাগ করে আল্লাহর অনুমতির আগেই তাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। তারপর যখন সমুদ্রে বিশাল তিমি মাছ তাঁকে গিলে নিলো, তিনি তাঁর ভুল বুঝতে পারলেন। তিমি মাছের পেটের ভেতর সম্পূর্ণ অন্ধকারে থেকে শুধু একটা দোয়ার কারণেই ইউনুস (আঃ) রক্ষা পেয়েছিলেন। সূরা আল আনবিয়া (সূরা ২১, আয়াত ৮৭)-তে সেই দোয়া আল্লাহ তা'য়ালা উল্লেখ করেছেন, যা আমরা সবাই কমবেশি জানি: "লা ইলাহা ইল্লা আন্তা, সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাঝলিমিন", যার অর্থ: "(হে আল্লাহ ) আপনি ছাড়া আর কেউ উপাস্য নেই, সব পবিত্রতা আপনার, নিশ্চই আমি সীমালঙ্ঘনকারী"। ইমাম বললেন, যেকোনো বিপদে তাই এই দোয়া করলে আল্লাহ চাইলে আমরা উদ্ধার পেতে পারি।
আর ইমাম বললেন, সহীহ হাদিসে আছে যে আমাদের নিজেদের রাসূল (সাঃ) তো নিজেই বলেছেন যে তিনি দিনে কমপক্ষে ৭০ বার (বা তারও বেশি) ইস্তেগফার করেন। ইমাম এরপর ইস্তেগফারের উপকারিতার কথা বললেন। বললেন সূরা নূহের (সূরা ৭১, আয়াত ১০-১২) আয়াতে আল্লাহ তা'য়ালা ইস্তেগফারের উপকারিতা তো বলেই দিয়েছেন, যার অর্থ অনেকটা এইরকম: "তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও, তিনি তো মহা ক্ষমাশীল, তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটাবেন, তোমাদেরকে সম্পদ-সন্তান-সন্ততিতে সমৃদ্ধ করবেন, তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও নদী-নালা। তোমাদের কী হয়েছে যে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতে চাচ্ছ না?"
এরপর ইমাম ইস্তেগফার না জিকির কোনটা করা বেশি ভালো সে বিষয়ে খুব সুন্দর একটা ঘটনা বললেন। কোনো এক আলেমকে [আমার নাম মনে নাই, খুব সম্ভবত তাইমিয়া] জিজ্ঞেস করায় তিনি নাকি উপমা দিয়ে উত্তর দিয়েছিলেন, যা অনেকটা এইরকম: কাপড় ময়লা হলে তাতে সুগন্ধি না লাগিয়ে বরং পরিষ্কার করা উচিত! ইমাম ব্যাখ্যা করলেন, ইস্তেগফার গুনাহর কারণে আমাদের নাফসের উপর পড়া ময়লা পরিষ্কার হয়, আর আল্লাহ'র প্রশংসা করে জিকির করলে তা আল্লাহ'র কাছে পছন্দনীয় হয়। কাজেই আমাদের উচিত বেশি বেশি করে ইস্তেগফার করা, আর সাথে জিকিরও করতে হবে যাতে আমাদের নাফসের স্ট্যাটাস আল্লাহর কাছে আরো বেশি গ্রহণযোগ্য হয়।
সবশেষে ইমাম একটা উপদেশ দিলেন। আমরা যেন ইস্তেগফার করার সময় শুধু নিজেদের জন্য না, বরং নিজের বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানী, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনদের জন্য করি। বিশেষ করে যারা মারা গেছেন, তাদের জন্য । কারণ, তাদের জন্য করা আমাদের ইস্তেগফার কবুল হলে তাদের অবস্থার উন্নতি হবে, কেউ হয়তো জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাবেন, কারো হয়তো জান্নাতের উঁচু স্তরে স্থান হবে। ইমাম বললেন, আমাদের পূর্বপুরুষেরা অনেক কিছু না জেনে, বা ভুল জেনেই মারা গেছেন। তথ্য প্রযুক্তির অভাব থাকায় অনেকে হয়তো না জেনে বিদআত করে গেছেন, ভুলভাবে ইসলাম পালন করেই মারা গেছেন। তাঁদের জন্য আমাদের মাফ চেয়ে/ ইস্তেগফার করে দোয়া করতে হবে। ইমাম আরেকটা হাদিসের রেফারেন্স দিলেন, যেখানে বলা হয়েছে কেউ যদি তার মুসলিম ভাইয়ের জন্য তার অজ্ঞাতে দোয়া করে, তখন ফেরেশতারা দোয়া কবুলের জন্য 'আমিন' বলার সাথে সাথে দোয়াকারীর জন্য একই রকম বা তার চেয়ে ভালো চেয়ে আল্লাহ'র কাছে দোয়া করে [অন্য এক খুতবায় আরেক ইমাম যেটাকে "বুমেরাং" দোয়া বলেছিলেন]। কাজেই নিজেদের জন্য হলেও আমাদের অন্যদের জন্য বেশি করে ইস্তেগফার আর দোয়া করা উচিত।
[সাইড নোট: আগের খুতবার সারমর্ম গুলা এক জায়গায়, নিচের লিংকে পাওয়া যাবে: https://banglakhutba.substack.com/ ]
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন