এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (২৮ অক্টোবর , ২০২২): নাসীহা বা উপদেশ

 এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (২৮ অক্টোবর , ২০২২): নাসীহা বা উপদেশ

ড. ওমর সুলাইমানের অনলাইনে শোনা খুতবা  

[সাইড নোট: আজকেও দেরি করে মসজিদে পৌঁছেছি। অবশ্য সত্যি বলতে খুব একটা ক্ষতি হয় নাই, কারণ ইমাম খুতবা জুড়ে একটা বিষয়ই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আলাপ করলেন: আল্লাহ সুবাহানুওয়াতায়ালা অশেষ ক্ষমাকারী, বান্দার যেকোনো গুনাহ তিনি মাফ করে দেন যদি বান্দা আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, একাগ্রচিত্তে মাফ চায়, ভুল থেকে ফিরে আসে। আমরা যেন কখনোই আল্লাহর ক্ষমা থেকে নিরাশ না হই। কারণ আল্লাহ ক্ষমা করতে, মাফ করতে ভালোবাসেন, আর আল্লাহ তা'য়ালা তার বান্দাদের ভালোবাসেন। কাজেই আজকে এই সুযোগে কিছুদিন আগে শোনা ড. ওমর সুলাইমানের ২৪ মিনিটের আরেকটা চমৎকার খুতবার সারমর্ম লিখে ফেলছি। নিচে সেটার রেফারেন্স দিয়ে দিচ্ছি। আমার মনে হয় সবার খুব কাজে লাগবে, সবচেয়ে ভালো হয় কেউ যদি নিজে থেকে খুতবাটা শুনে নেন।]

ইমাম বললেন, আরবি "নাসীহা" শব্দের অর্থ হচ্ছে সিন্সিয়ারিলি কাউকে উপদেশ দেয়া [বাংলায় আমরা সম্ভবত 'নসিয়ত' বলি]। কারো ভালো চেয়ে দেয়া এই উপদেশ বা নাসীহার ব্যাপারে কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা যেমন বলেছেন, তেমনি রাসূল (সাঃ)-রও এই ব্যাপারে অনেক সহীহ হাদিস আছে। একটা সহীহ হাদিস আছে যেখানে রাসূল (সাঃ) একজন মুমিনের জন্য আরেকজন মুমিন আয়নার মতো - বলেছেন। ইমাম ব্যাখ্যা করলেন, আমরা যেমন আমাদের কাপড়ে লেগে থাকা কোনো দাগ, কিংবা মুখে লেগে থাকা কোনো ময়লা নিজেরা দেখতে পাই না, কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সেটা দেখি, দেখে ঠিক করে নেই - ঠিক একই ভাবে একজন মুমিন আরেকজন মুমিনের জন্য আধ্যাতিক 'আয়না'। যার অর্থ হচ্ছে, একজন মুমিন আরেকজন মুমিনের কোনো দোষ বা ত্রুটি যা সে নিজে উপলব্ধি করতে পারে না, সেটা ধরিয়ে দিবে। এই ভুল শোধরানোর মাধ্যমেই একজন যখন আরেকজনের উন্নতিকরবে, সমষ্টিগত ভাবে সবাই উন্নতি করবে, উপকৃত হবে। আর যখনই এটা করা বন্ধ হয়ে যাবে - তখনই আস্তে আস্তে একটা জাতির অধঃপতন শুরু হবে। 

এই ব্যাপারে ইমাম গাজ্জালী (র:)-র একটা বিখ্যাত উক্তি নাকি আছে। যেখানে তিনি বলেছেন, একজন মুমিন, আরেকজন মুমিনের ভুল দেখেও শুধরিয়ে না দেয়াটা অনেকটা কারো পিঠে থাকা বিষাক্ত 'বিছা/বিচ্ছু ' দেখেও তাকে সাবধান না করার মতো। ইমাম বললেন, কারো "পিঠে বিছা" থাকার অর্থ হচ্ছে সেই ব্যক্তি সেটা সম্পর্কে জানে না, কিন্তু অন্যরা সেটা ঠিকই "দেখছে" বা জানে। এখন সেটা সম্পর্কে বলে, সাবধান করে দিয়ে যেমন সেই ব্যক্তিকে সমূহ বিপদ থেকে উদ্ধার করা হয়, ঠিক একইভাবে কাউকে ভুল শুধরিয়ে দিতে 'নাসীহা' দিলেও তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করা হয়। 

এরপর ইমাম বললেন, এক বিখ্যাত আলেম ছিলেন, যিনি সবসময় নাসীহা বা উপদেশ দিতেন।  একসময় তিনি তা দেয়া বন্ধ করে দিলে অন্যেরা জিজ্ঞেস করলো কেন তিনি আর নাসীহা দিচ্ছেন না।  উত্তরে নাকি তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন, কেউ কি আর নসীহা শুনতে চায়? ইমাম বললেন, অনেক আগেই ওই ইমাম এই কথা বলেছেন, আর আজকের দিনে যেটা হয়তো আরো সত্যি। আমাদের 'ইগো' অন্যের 'নসীহা' শোনার ব্যাপারে সবচেয়ে বড়ো বাঁধা।  কেউ আমাদের ভুল ধরিয়ে দিলে হয়তো আমরা উল্টো বলে বসবো নিজের দোষ আগে খুঁজুন। কিন্তু হওয়ার কথা ঠিক তার উল্টা, আমাদের খুশি হওয়া উচিত। সম্ভবত:  এই একই আলেমের আরেকটা বিখ্যাত ঘটনা আছে যেটা অনেকটা এইরকম: কেউ একজন এসে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কোনো ব্যক্তির জন্য সবচেয়ে কাঙ্খিত বৈশিষ্ট কী হওয়া উচিত? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, নিজে নিজেই চিন্তার প্রতিফলন করতে পারা (অর্থাৎ তাদাব্বুর বা নিজের দোষ শুধরাতে চিন্তা করতে পারা)। যদি সেটা না থাকে? এর উত্তরে তিনি বলেছিলেন, উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়া। সেটা যদি না থাকে?  তখন তিনি বলেছিলেন ভালো বন্ধুর সাহচর্য পাওয়া যে কিনা তার ভুল শুধরিয়ে দিতে পারবে। সেটাও যদি না থাকে? তখন তিনি বলেছিলেন তাহলে সেই ব্যক্তির উচিত যতটা সম্ভব চুপ করে থাকা। ইমাম এর ব্যাখ্যায় বললেন, কাজেই "নসীহা' না পাওয়া ব্যক্তির জন্য গুনাহ করার সম্ভাবনা এতটাই বেশি যে সে কথা বললেও গুনাহ হতে পারে। 

নসীহা গ্রহণ করার উদাহরণ দিতে গিয়ে ইমাম মদিনার একসময় ইমাম, মালিকি মাজহাবের মূল ব্যক্তি ইমাম মালিকের একটা ঘটনা বললেন। মালিকি মাজহাব বা ইমাম মালিকের মতে নাকি আসরের পরে কেউ মসজিদে ঢুকলে তার 'তাহিয়াতুল মসজিদ' বা মসজিদে প্রবেশের নামাজ পড়া ঠিক না। তো এই মাজহাবের প্রবক্তা ইমাম মালিক নিজে একদিন আসরের পর মসজিদে ঢুকলে, আগে থেকেই মসজিদে থাকা এক তরুণ তাঁকে না চিনে, তার মাজহাব না জেনে অনেকটা কর্কশ ভাবেই তাকে 'তাহিয়াতুল মসজিদ' -এর নামাজ পড়তে বলে। উত্তরে তিনি কিছু না বলে তৎক্ষণাৎ নামাজ পড়ে ফেলেন। এটা দেখে মসজিদের অন্য লোকজন, যারা কিনা ইমাম মালিকের সরাসরি ছাত্র, তারা অবাক হয়ে পরে এর কারণ জিজ্ঞেস করায় ইমাম মালিক নাকি উত্তর দিয়েছিলেন তিনি চান না তিনি তাদের অন্তর্ভুক্ত হতে যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'য়ালা কুরআনে বলেছেন: "যখন তাদেরকে বলা হয় 'আল্লাহর প্রতি নত হও', তারা হয় না" [সূরা আল-মুরসালাত ৭৭: আয়াত ৪৮]!

ইমাম বললেন, ইমাম মালিকের মতো ব্যক্তিও কখনো 'নসীহা' গ্রহণের ব্যাপারে আপত্তি করেন নাই। এরপর ইমাম আরেকটা উদাহরণ দিলেন: ওমর (রাঃ) খলিফা থাকার সময়ও এমনভাবে তাকে "নসিয়ত" কারীর প্রশংসা করে আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন যে সবাই জানতো যে ওমর (রাঃ) সবসময়ই উপদেশ গ্রহণ করার জন্য রাজি আছেন,  আর তাকে যে কেউই উপদেশ দিতে পারবে। ইমাম বললেন, আমরাও আমাদের চারপাশে এমন একটা পরিবেশ তৈরী করতে হবে যাতে কেউ আমাদের উপদেশ দিতে ভয় বা সংকোচ না করে। কেউ বাজে ভাবে উপদেশ দিলে আমাদের উচিত তাকে ধন্যবাদ দিয়ে, তার দেয়া "নসীহা" খুব উপকারে লাগবে বলে তাকে সুন্দরভাবে বলা যে পরেরবার অন্য কাউকে এই উপদেশ দেয়ার সময়  যেন আরেকটু সুন্দর করে বলে। 

সবশেষে ইমাম বললেন, আমরা কেউই "নসীহা'র উর্ধে না। সময়ের সাথে আমরা পাল্টাই।  আমাদের ব্যবহার বদলায়। কাজেই উপদেশ বা নসীহা আমরা সবসময়ই নিতে পারি। এমনকি আমাদের সন্তানদের কাছ থেকেও "নসীহা" বা উপদেশ চাইতে পারি। তারা যদি দেখে আমরা আমাদের উন্নতির জন্য, ভুল শোধরানোর জন্য তাদের উপদেশ চাচ্ছি, পরে তারাও আমাদের উপদেশ মনোযোগ দিয়ে শুনবে, মানবে। ইমাম এরপর সবাইকে একটা এসাইনমেন্ট দিলেন:  এই খুতবার পর সবাই যেন নিজের খুব কাছের অন্তত ২ জন ব্যক্তির কাছে গিয়ে ভুল শোধরানোর জন্য "নসীহা" চান। আর তারপর সেটা নিয়ে চিন্তা করেন।  

 লেকচারের লিংক: https://youtu.be/7dShem8t5NU

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ