এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (৪ নভেম্বর, ২০২২): বিদআত বা ধর্মে নতুন কিছু সৃষ্টি করা
এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (৪ নভেম্বর, ২০২২): বিদআত বা ধর্মে নতুন কিছু সৃষ্টি করা
ইমাম শুরু করলেন একটা সহীহ হাদিস উল্লেখ করে, যেটা অনেকটা এইরকম, রাসূল (সাঃ) বলেছেন: যে কোন একটা ভালো কিছু শুরু করলো এবং বাকিরা সেটা অনুসরণ করলো, সে ব্যক্তি নিজে ওই ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত হবে, আর যারা তা অনুসরণ করবে, তাদের থেকেও কিছুমাত্র না কমিয়ে ওই (প্রথম) ব্যক্তিকে সমানভাবে পুরস্কৃত করা হবে। একইভাবে, যে কোন খারাপ কিছু শুরু করলো, এবং বাকিরা সেটা অনুসরণ করলো, ওই ব্যক্তি নিজে গুনাহগার হবে, এবং তাকে অনুসরণকারীদের থেকে কিছু না কমিয়ে তাকে সমানভাবে (ওই খারাপ কাজের জন্য) গুনাহর ভাগিদার করা হবে। ইমাম বললেন, এই একটা হাদিসের প্রথম অংশের ভুল ব্যাখ্যা করে অনেকেই, আল্লাহ তা'য়ালার সান্নিধ্য আর সন্তুষ্টি পাওয়ার আশায়, "ভালো কিছু করার উদ্দেশ্যে" ইসলাম ধর্মে নতুন নতুন "ইবাদতের" শুরু করেছেন যেটাকে আরবি তে 'বিদআত' বলে - কিন্তু যেটার পরিনাম ভয়াবহ।
ইমাম বললেন, এই হাদিসের প্রেক্ষাপট বুঝলে এইখানে আর কোনো সন্দেহ থাকতো না। হাদিসের বর্ণনাকারীদের ভাষ্যমতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একবার একদল মুসলিমকে দেখলেন [যারা সম্ভবত সফর করে মদিনায় এসেছিলেন], যাদের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। তাদের দৈন্যদশা এতটাই প্রকট ছিল যে তাদের চেহারা আর কাপড়ে তা স্পষ্ট ছিল। এতে রাসূল (সাঃ) খুব মন খারাপ করেন, নামাজের পর সব সাহাবীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, কারা এই দলকে সাহায্য করতে পারবে? সাহাবীদের নিজেদের অনেকের অবস্থাই ভালো ছিল না। তাদের সামান্য সাহায্যে বা সাদাকায় এই দলের কী আর লাভ হবে, হয়তো এই ভেবে, অনেকটা সংকোচেই অনেকে নাকি এগিয়ে আসছিলেন না। এর মধ্যে এক সাহাবী নিজেদের ঘর থেকে তার সাধ্য মতো বেশকিছু কাপড় আর খাবার নিয়ে এসে জড়ো করলেন, আর ওই সাহাবীর এই কাজেই যেন বাকি সবার টনক নড়লো, তার দেখাদেখি বাকি সবাই যার যার সাধ্য মতো সাহায্য নিজে এগিয়ে আসলে বেশ ভালো পরিমান কাপড়, খাবারসহ বাকি জিনিসপত্র জমা হয়ে গেলো। এই দেখে রাসূল (সাঃ) খুশি হয়ে উপরের ওই হাদিস বলেন।
ইমাম বললেন, এইখানে এইটা স্পষ্ট ছিল যে এই ভালোকাজে রাসূল (সাঃ) নিজে উৎসাহ দিয়েছিলেন, তাঁর অনুমতি ছিল। এইখানে এই ভালোকাজের "শুরু" টা কিন্তু ধর্মে কোন নতুন কিছুর উদ্ভাবন ছিল না। ইমাম আরো ব্যাখ্যা করলেন, ধরা যাক কারো পরিবারে কোনো একটা সুন্নাহ পালন করা হয় না, যেমন সপ্তাহে সোমবার আর বৃহস্পতিবারের রোজা রাখার সুন্নত। এখন কেউ একজন কোনো খুতবায় বা হালাকায় এই সুন্নাহ শিখে, এর গুরুত্ব বুঝে নিজে এটা পালন করা শুরু করলো, আর তার নিজের পরিবারের কাছে গিয়ে তাদের বুঝিয়ে বলায়, তার দেখাদেখি পরিবারের অন্যরাও সেটা পালন করা শুরু করলো - এইটা হবে রাসূল (সাঃ) সেই হাদিসের একটা চমৎকার উদাহরণ। ইমাম বললেন, আমাদের রাসূল (সাঃ) জীবনের প্রতিটা মুহূর্তের জন্য তাঁর সুন্নাহ রেখে গেছেন। তার অনেকগুলোই আমরা হারিয়ে ফেলতে বসেছি। নিজের, পরিবারের কিংবা সমাজে এইগুলোর যেকোন একটার নতুন করে "শুরু" করা হবে ওই হাদিসের উদাহরণ। ইমাম বললেন, আমাদের উচিত আমরা যখনই নতুন কিছু শিখবো, যিনি বলছেন তার কাছ থেকে এর দলিল জেনে, প্রথমে নিজেরা এর সত্যতা যাচাই করে নিয়ে নিশ্চিত হবো। আর যখন নিশ্চিত হয়ে যাবো, তখন নিজে আমল করে অন্যদেরকে সেটা জানানো, আর শেয়ার করা হবে আমাদের দায়িত্ব।
এরপর ইমাম সাবধান করলেন, আমরা যেন আবার কিছু শুনেই সেটা সহীহ হাদিস বা সুন্নাহ বলে বিশ্বাস করে না বসি। ইন্টারনেট আর সামাজিক যোগাযোগের এই যুগে এখন প্রচুর উল্টাপাল্টা "আমল" করার উপদেশ অনেকেই দিচ্ছেন। আমরা যেন সবসময় যাচাই করে নিয়ে তারপর আমল করি। এরপর ইমাম সরাসরি বললেন, ঈদে মিলাদুন্নবী বা রাসূলের (সাঃ) জন্মদিন উদযাপন, মিলাদ এইসব কখনোই আমাদের রাসূল (সাঃ) নিজে করেন নাই, তাঁর সাহাবীরাও করেন নাই। এইগুলো তাঁদের অনেক পরে ধর্মে "চালু" করা হয়েছে। যারা করেছেন, তারা রাসূল (সাঃ) -এর উপরের ওই হাদীসকেই যুক্তি হিসাবে দেখান যে এটা একটা "ভালো" কাজ, আল্লাহকে খুশি করার জন্য, তাঁর রাসূলকে (সাঃ) সম্মানিত করার জন্য তারা চালু করেছেন - কিন্তু এটা স্পশতই বিদআত, এগুলো করা যাবে না।
ইমাম এরপর এই ব্যাপারে কুরআনের একটা আয়াত বললেন, সূরা আল-মায়েদার (সূরা ৫, আয়াত ৩), যেখানে আল্লাহ বলছেন, "আজকে আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম, আর ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন/ধর্ম হিসাবে মনোনীত করলাম।" - ইমাম বললেন এই আয়াত থেকে স্পষ্ট যে ইসলাম সম্পূর্ণ করা হয়ে গেছে, এইখানে আর নতুন কিছু যোগ করার সুযোগ নেই। এরপর ইমাম, ইমাম মালিকের (রাঃ) একটা বিখ্যাত উক্তি বললেন যেটা অনেকটা এইরকম: যারা ইসলামে আল্লাহর সন্তুষ্টি আর সান্নিধ্য পাবার জন্য নতুন কিছু (বিদআত) চালু করতে চায়, তারা আদতে রাসূল (সাঃ) কে অপমান করছে, তাঁকে দোষারোপ করছে। কেননা, তারা কী বলতে চাচ্ছে যে রাসূল (সাঃ) আল্লাহ তা'য়ালাকে সঠিক ভাবে ইবাদত করা জানতেন না? কিংবা জানলেও সেটা তাঁর উম্মাতের কাছ থেকে গোপন করেছেন?! [অবশই না]
এরপর ইমাম আরেকটা হাদিস বললেন যেখানে রাসূল (সাঃ) স্পষ্টই বলে গেছেন আমরা যেন কুরআন আর তাঁর সুন্নাহ 'আকড়িয়ে" ধরে চলি, আর প্রয়োজনে "খুলাফায়ে রাশেদীন" বা হজরত আবু বকর (রাঃ) , উমর (রাঃ) , উসমান (রাঃ) আর আলী (রাঃ)-র এঁদের অনুকরণ করি, মেনে চলি। এর বাইরে দেখতে, শুনতে যত "ভালোই" মনে হোক না কেন, আমরা যেন বিদআত করা থেকে নিজেদের রক্ষা করি।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন