এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (২৫ নভেম্বর, ২০২২): সালাত বা নামাজ
এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (২৫ নভেম্বর, ২০২২): সালাত বা নামাজ
মাসজিদ-আল-জামিয়া, ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভানিয়া।
ইমাম বললেন, আজকের খুতবা হবে সালাত বা নামাজের উপর। এরপর জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের রাসূল (সাঃ) মারা যাবার সময় তাঁর বলা শেষ শব্দ কি ছিল আমরা কি সেটা জানি? উত্তরে বললেন এক বর্ণনায় এসেছে যে তা ছিল: "আস-সালাত, আস-সালাত"। ইমাম বললেন, রাসূল (সাঃ) -এর অতি প্রিয় ছিল এই নামাজ। এমনও নাকি হয়েছে যে তিনি পরিবারের সাথে সময় দিচ্ছেন, এমন সময় আজান হওয়া মাত্র তিনি যেন তাঁদের আর চিনতেন না, নামাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়া শুরু করতেন। ইমাম বললেন, রাসূল (সাঃ)-এর যে নামাজ এতো প্রিয় ছিল, মৃত্যুর সময় তাঁর শেষ শব্দ সেই নামাজ হবে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই; কিন্তু এর বাইরেও এতে করে মুসলিমের জীবনে নামাজের গুরুত্ব বোঝা যায়।
এরপর ইমাম বললেন, পৃথিবীতে এখন প্রায় দেড় বিলিয়ন মুসলিম আছে। আমরা সবাই আল্লাহর তাওহীদ বা একত্ববাদ ঘোষণা দিয়ে, "লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুররাসূলুল্লাহ" বলে ঈমান এনেছি, মুসলিম হয়েছি। কিন্তু আমরা কী ঠিক মতো সালাত আদায় করছি? আমরা যদি ঠিকমতো নামাজ না পড়ি, তাহলে কী আমরা নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করতে পারবো? এরপর ইমাম একটা হাদিস বললেন, যেখানে রাসূল (সাঃ) নাকি বলেছেন: "তাদের আর আমাদের মধ্যে তফাৎ সৃষ্টিকারী শর্ত হচ্ছে সালাত, এবং যে কেউ সালাতের ব্যাপারে অবজ্ঞা/গাফিলতি করলো, সে অবিশ্বাসী বা কাফের হয়ে গেলো"। ইমাম বললেন, এই সালাত বা নামাজের ব্যাপারে আমাদের অনেক বেশি সাবধানী হতে হবে।
ইমাম এরপর বললেন, সূরা আনকাবুতে (সূরা নম্বর ২৯, আয়াত ৪৫) আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর রাসূল (সাঃ) শিখিয়ে দিচ্ছেন: "তেলাওয়াত করুন আপনার প্রতি যে কিতাব নাজিল হয়েছে তা হতে, এবং সালাত প্রতিষ্টা করুন। নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীলতা আর খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে। আল্লাহর স্মরণ (অশ্লীলতা আর খারাপ কাজ হতে বিরত রাখতে) আরো ভালো। এবং আল্লাহ জানেন যা কিছু তোমরা করছো।" ইমাম বললেন, আল্লাহ'র ওয়াদা কখনো মিথ্যা হয় না। আল্লাহ এই আয়াতে স্পষ্টতই বলে দিয়েছেন নামাজ অশ্লীলতা আর খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে। কাজেই কেউ যদি নামাজ পড়ে, এবং তারপর খারাপ কাজ করে, তাহলে তাকে নিজেকেই প্রশ্ন করতে হবে, তার নামাজ ঠিক মতো হচ্ছে কিনা। ইমাম আরো বললেন, আমাদের মধ্যে সেই সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিমান যে কিনা আল্লাহ তা'য়ালা তার হিসাব নেয়ার আগে সে নিজেই নিজের হিসাব নেয়। আর আমাদের মৃত্যুর পর সবচেয়ে প্রথম যেই বিষয়ের হিসাব আল্লাহ তা'য়ালা নিবেন, তা হচ্ছে সালাত বা নামাজ। কাজেই আমাদের এই নামাজের ব্যাপারে আরো অনেক বেশি মনোযোগী আর সাবধানী হতে হবে, দিন শেষে নিজের কাজের চিন্তা করে দেখতে হবে আমরা ঠিকমতো নামাজ পড়েছি কিনা।
এরপর ইমাম বললেন, রাসূল (সাঃ) কিভাবে নামাজ পড়েছেন, সেটা আমাদের জানতে হবে। আমাদের অনেকেরই নামাজ পড়ার সময় বেসিক অনেক ভুল হয়। সেগুলো নিয়ে আলাপ করার আগে বললেন, আমরা যখন নামাজে দাঁড়াই, তখন আল্লাহর সাথে সরাসরি কথা বলার জন্যই দাঁড়াই। প্রথমতঃ নিয়ত ঠিক করে সেই নামাজে দাঁড়াতে হবে। নামাজ "খুশু" নিয়ে [অর্থাৎ নূন্যতম পক্ষে আল্লাহ তা'য়ালা আমাকে দেখতে পাচ্ছেন - এমন ভেবে] পড়তে হবে। নিয়ত ঠিক না করে, "খুশু" ছাড়া নামাজকে ইমাম "মৃত" নামাজ বললেন। আরো বললেন, নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহ তা'য়ালার সাথে সরাসরি কথোপকথনের সময় যদি আমরা অন্যমনস্ক থাকি, তাহলে আল্লাহ তা'য়ালা কী আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন না? ইমাম বললেন, তিনি খেয়াল করেছেন, অনেক ভাইয়েরা নামাজের সময় ফোন চালু রেখে নামাজে দাঁড়ান। নামাজরত থাকা অবস্থায় ফোন আসলে না কোনো নোটিফিকেশন আসলে, পকেটে হাত ঢুকিয়ে ফোন হাতে নিয়ে তাদের টেক্সট মেসেজ করতেও তিনি দেখেছেন! এইগুলো কোনোভাবেই করা যাবে না। এই প্রসংগে আরো বললেন, জুমুআর খুতবা চলার সময় যেখানে রাসূল (সাঃ) সাবধান করে দিয়েছেন যে অন্যমনস্ক হয়ে একটা নুড়িও হাতে নিলে সেই জুমুআ বাতিল হয়ে যায়, সেখানে আজকাল অনেক মুসল্লি ভাইয়েরা খুতবা চলার সময় ফোন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে থাকেন, অনেকে কথা বলতে থাকেন - এইগুলো নিষিদ্ধ বা হারাম।
সবশেষে ইমাম বললেন, আমাদের রাসূল (সাঃ) কিভাবে নামাজ পড়তেন, সেটা আমাদের জানতে হবে, শিখতে হবে।এই বিষয়ে ইমাম আল-বানীর একটা বই আছে, যাতে তিনি রাসূল (সাঃ) নামাজ পড়ার পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। আমরা পারলে সেই বই পড়তে পারি, আর তা না পারলে যাঁরা জানেন, সেই আলেমদের কাছ থেকে ঠিকমতো নামাজ পড়ার পদ্ধতি শিখে নিতে পারি। শেখার জন্য কখনোই দেরি হয় না। এরপর ইমাম তার দেখা আমাদের অনেকের নামাজে কিছু বেসিক ভুলের কথা বললেন। এর কয়েকটা এইরকম: সেজদায় গিয়ে নাক-কপাল জায়নামাজে না লাগা, পিছনে পা উঠে যাওয়া, সেজদায় হাতের আঙ্গুলগুলো একসাথে মিশিয়ে কেবলা বরাবর না রেখে ছড়িয়ে রাখা, দুই সেজদার মাঝে বসে, সময় নিয়ে নূন্যতম পক্ষে ৩ বার "আল্লাহুমাগফিরলী" না বলা, আত্তাহিয়াতু পড়ার সময় হাঁটুর উপর হাতের আঙ্গুলগুলো সেজদার মতো একসাথে মিশিয়ে না রেখে ছড়িয়ে রাখা - ইত্যাদি। ইমাম বললেন, কিছু মাজহাব বা মতভেদের কারণে নামাজ পড়ার কিছু নিয়মকানুন হয়তো একটু ভিন্ন, কিন্তু মূল পদ্ধতি কিন্তু একই। অন্তত আমাদের সেগুলো ঠিকমতো পালন করে, নিয়ত ঠিক করে, "খুশু" নিয়ে নামাজ পড়তে হবে। তারপরেই কেবল আমরা আশা করতে পারি আমাদের সেই নামাজ আমাদের অশ্লীলতা আর খারাপ কাজ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে।
[সাইড নোট: নামাজ শেষে আমি ইমামের কাছে গিয়ে দেখাতে নিয়ে নিজের কিছু ভুল আবিষ্কার করলাম। আমি সেজদায় গিয়ে পিছনে পা না তুললেও, দুই পায়ের পাতা পাশাপাশি রাখতাম না, ছড়িয়ে রাখতাম। ইমাম নিজের হাত দিয়ে আমার পায়ের পাতা ধরে ঠিক করে দিলেন। সেজদায় গিয়ে দুই হাত, কনুই শরীরের সাথে প্রায় মিশিয়ে রাখতাম। ইমাম বললেন, জামাতে পাশে কেউ নামাজ না পড়লে, সেজদায় গিয়ে ছেলেদের হাত-কনুই শরীর থেকে সরিয়ে রাখতে হবে। আরো একটা ভুল যেটা আমি প্রায়ই করতাম তা হচ্ছে, বেশি মনোযোগ দিয়ে নামাজ পড়তে গিয়ে চোখ বন্ধ করে নামাজ পড়তাম। ইমাম বললেন, নামাজে গিয়ে সব সময় চোখ খোলা রাখতে হবে, চোখ বন্ধ করে নামাজ পড়তে রাসূল (সাঃ) সরাসরি নিষেধ করেছেন। তাছাড়াও, মাথা উপরে তুলে, উপরের দিকে তাঁকিয়ে নামাজ পড়ার ব্যাপারেও নিষেধ করা হয়েছে। আমার আরও ভালো করে শিখতে হবে। আল্লাহ তা'য়ালা সবাইকে তৌফিক দেন।]
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন