এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (২ ডিসেম্বর, ২০২২): হিদায়া/হেদায়াত বা পথ প্রদর্শন
এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (২ ডিসেম্বর, ২০২২): হিদায়া/হেদায়াত বা সঠিক পথ প্রদর্শন
মাসজিদ-আল-জামিয়া, ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভানিয়া।
ইমাম বললেন, আমরা দিনে যতবারই নামাজ পড়ি, সূরা ফাতেহা দিয়ে শুরু করি, আর এই সূরা ফাতেহাতে আমরা কিন্তু আল্লাহ তা'য়ালার কাছে হিদায়া বা সঠিক, সরল পথের প্রদর্শন চেয়ে দোয়া করি। ইমাম বললেন, আমরা আল্লাহতে বিশ্বাস করে মুসলিম হতে পারি, ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে পারি, কিন্তু আমরা যে তাতে করে হেদায়াত প্রাপ্ত হয়ে গেছি - বা আমরা একবার হেদায়েত প্রাপ্ত হয়েছি, কিন্তু আবার পথভ্রষ্ট হবো না - এমন কিন্তু কোনো নিশ্চয়তা নাই। আমাদের আল্লাহ যেন হেদায়া দিয়ে সরল পথে থাকার তৌফিক দেন, এই জন্যই আমরা প্রতি নামাজে দোয়া করি।
এরপর ইমাম উদাহরণ দিয়ে বললেন, রাসূল (সাঃ)-এর চাচা, তাঁর বাবাপ্রতিম অভিভাবক, যিনি কিনা তাঁর দাদার মৃত্যুর পর থেকে তাঁর দেখ-ভালের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, সেই আবু তালিব ইবনে মুত্তালিব কিন্তু সব দেখেও 'হেদায়াত' প্রাপ্ত হন নাই। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি রাসূল (সাঃ) -র সুরক্ষার দিয়ে গেছেন, এই চাচা আবু তালিব কিন্তু আবার আলী (রাঃ)-এর বাবা। নিজের ভাতিজা মুহাম্মদ (সাঃ)-এর প্রতি তাঁর অগাথ আস্থা ছিল, তিনি তাঁকে বিশ্বাসও করতেন, নিজের ছেলে আলী (রাঃ)-ও মুসলিম হয়ে গিয়েছেন - এসব কিছু দেখেও শেষ পর্যন্ত তিনি আল্লাহর তৌহিদ বা একত্ববাদ স্বীকার করেন নাই। তার মৃত্যু শয্যায় রাসূল (সাঃ) মিনতি করে বলেছিলেন, দয়া করে যেন তিনি অন্তত একবার "লা-ইলাহা ইলাল্লাহ" বলেন [মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ - বলার দরকার নেই], যাতে করে যেন তিনি (রাসূল (সাঃ)) শেষ বিচারের দিন তার হয়ে আল্লাহ'র কাছে সুপারিশ, ফরিয়াদ করতে পারেন - কিন্তু তাতেও লাভ হয় নাই। চাচা আবু-তালিব বাকিদের কথা মতো তার বাপ-দাদার ধর্ম, শিরক ছাড়তে পারেন নাই, অমুসলিম, অংশীবাদী বা মুশরিক হিসাবেই মারা যান। ইমাম বললেন, রাসূল (সাঃ) নাকি বলেছিলেন, তার পরেও তিনি তার চাচার জন্য দোয়া করবেন। কিন্তু পরে আয়াত নাজিল হয়, সূরা আত- তাওবা (সূরা নম্বর ৯, আয়াত ১১৩)- যেখানে আল্লাহ তা'য়ালা সরাসরি রাসূল (সাঃ) কে দোয়া করতে নিষেধ করেন: "নবী ও মুসলিমদের জন্য এটা ঠিক নয় যে তারা অংশীবাদী/মুশরিকদের জন্য দোয়া করে, যদিও তারা কাছের আত্মীয়ও হয় - এটা প্রকাশ হওয়ার পর যে তারা জাহান্নামের অধিবাসী।" [এ ব্যাপারে আরেকটা আয়াত আছে, সূরা কাসাসের আয়াত (সূরা নম্বর ২৮, আয়াত ৫৬), যার অর্থ অনেকটা এইরকম: "নিশ্চই আপনি (হে নবী) যাকে ভালোবাসেন, চাইলেই তাকে পথ দেখাতে পারেন না, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দেন, আর তিনি খুব ভালো করেই জানেন সৎ পথপ্রাপ্তদের সম্পর্কে [অর্থাৎ কারা হেদায়াত প্রাপ্তির যোগ্য]।"
ইমাম বললেন, কাজেই কারো হেদায়াত প্রাপ্তি নিশ্চিত নয়। অনেক প্রমাণ, নিদর্শন দেখার পরও কারো পক্ষে হয়তো হেদায়াত পাওয়া সম্ভব হবে না যদি তার মাঝে অন্য কোনো বাধা থাকে। আবার উল্টোটাও হবে, অনেক খারাপ সঙ্গ, পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে থেকেও কারো হয়তো হেদায়াত প্রাপ্তি হতে পারে। এই প্রসঙ্গে ইমাম ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়া (রাঃ)-র উদাহরণ দিলেন। আসিয়া (রাঃ) অলৌকিকভাবে শিশু মুসা (আঃ) -র লালন-পালনের দায়িত্ব পান। মুসা (আ:) বড় হয়ে পরে যখন নবুয়তের দাবি নিয়ে এক আল্লাহ'র ইবাদতের আহ্বান করেন, প্রথমে আসিয়া (রাঃ) লুকিয়ে লুকিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। পরে কল্পনাতীত শাস্তি আর নির্ঘাত মৃত্যু জেনেও তিনি তাঁর ইসলাম ফিরাউনের সামনে ঘোষণা করেন। ফিরাউন যখন এর শাস্তি হিসেবে নিজের স্ত্রী আসিয়া (রাঃ) কে নির্যাতন করে ধীরে ধীরে মেরে ফেলতে থাকে তখনও তিনি ঈমান ভঙ্গ করেন নাই। মৃত্যুর ঠিক আগে তিনি যে দোয়া করেন, সেটা আল্লাহ কুরআনে উল্লেখ করেছেন: সূরা আত-তাহরীম (সূরা নম্বর ৬৬, আয়াত ১১) যেটা অনেকটা এইরকম: "হে আমার রব, আমার জন্য জান্নাতে আপনার সান্নিধ্যে একটা ঘর বানিয়ে দিন, আর আমাকে উদ্ধার করুন ফিরাউন ও তার কাজ থেকে, আর উদ্ধার করুন জালিম সম্প্রদায় থেকে।"
আমাদের রাসূল (সাঃ) হেদায়াত প্রাপ্তির জন্য তিনি নিজে দোয়া করে আমাদের সেই দোয়া শিখিয়ে দিয়ে গেছেন। কুফর থেকে বেঁচে, হেদায়াত চেয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করা রাসূলের (সাঃ)-এর সুন্নতের অংশ। কাজেই আমাদের সবসময় হেদায়াত চেয়ে একাগ্র ভাবে আল্লাহ তা'য়ালার কাছে দোয়া করতে হবে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন