এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১৬ ডিসেম্বর, ২০২২): আমেরিকায় ক্রিসমাস ও মুসলিম গোষ্ঠী মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, নিউ জার্সি।
এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১৬ ডিসেম্বর, ২০২২): আমেরিকায় ক্রিসমাস ও মুসলিম গোষ্ঠী
মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, নিউ জার্সি।
[সাইড নোট: আমরা পেনসিলভানিয়া থেকে নিউ জার্সিতে মুভ করার পর এই মসজিদে প্রথমবারের মতো জুমুআর খুতবাতে গেলাম। বেশ বড় আর সুন্দর মসজিদ। কিন্তু মনটা ভালো ছিলনা। আমার স্কুলের বন্ধু মুনফরিদ তার আগেরদিন কুমিল্লায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গেছে। আমাদের অনেকেই তাকে সংক্ষেপে "মুন" বলে ডাকতাম। তার দুইটা মেয়ে, বড় মেয়েটা ১২/১৩ বছরের, ছোট মেয়েটার বয়স মাত্র ৬/৭ মাস হবে হয়তো। পাগলাটে মুনফরিদ তার আগেও একবার মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা করে প্রায় মরতে বসেছিল। কিন্তু তাও মোটরসাইকেল চড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘুরতে যাওয়ার ভুত তার মাথা থেকে নামে নাই। গত বছর দেশে যাওয়ার পর, ১৭ ডিসেম্বর'২১ সকালে পুরান ঢাকায় একটা রেস্টুরেন্টে স্কুলের কিছু বন্ধুরা মিলে নাস্তা করেছিলাম। মুনফরিদও ছিল। আমরা অনেক ছবি তুলেছিলাম। ওর সাথে সেই দেখাই শেষ দেখা। আমি গতকালকেও ফেসবুকে সেই ছবিগুলো দেখছিলাম। আরেক বন্ধু রোমান তখন ব্যাপারটা খেয়াল করিয়ে দিলো: তার ঠিক এক বছর পর, এই ১৭ ডিসেম্বর'২২ - ঐ বন্ধুদের অনেকেই আবারো সকালে একসাথে হলো। তবে এইবার নাস্তা খেতে না, মুনের জানাজা আর দাফনের জন্য। আরেকটা ব্যাপার ঘটলো, আমি সেইদিন যেই নীল সোয়েটারটা পড়ে ছিলাম, ওর মারা যাওয়ার খবরটা পাবার সময়ও কাকতালীয়ভাবে ওই একই সোয়েটারটাই পড়ে ছিলাম। আমি দুঃখে সত্যিই সোয়েটারটা খুলে ছুঁড়ে ফেলসি। জিনিস থেকে যায়, মানুষই কেবল থাকে না।
আজকে খুতবার সারমর্ম লিখতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু তাও খুব সংক্ষেপে লিখছি। সবাই মুনের জন্য দোয়া করবেন। ওর মেয়েগুলার জন্য দোয়া করবেন।]
ইমাম বললেন, '৯০-র দিকে উনি যখন আমেরিকায় বড় হোন, তখন একটা টিভি শো বা 'থিম' খুব চালু ছিল। ক্রিসমাসকে, ক্রিসমাসের স্পিরিটকে মানে না, এইরককম একটা বুড়ো নিন্দিত লোককে দেখানো হতো, তার নাম "স্ক্রুচ", যে কিনা কিপ্টামি করতো, গিফট দিতে চাইতো না, বাচ্চাদেরকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিতো। "বা হামবাগ" বলে তার বিরক্তি প্রকাশ করতো। [ভেরাইজোন ফোনের একটা এডভার্টাইসমেন্টেও এইরকম একটা লোককে ইদানিং দেখায়, আমি প্রথমে বুঝতাম না এর মানে কি]। ইমাম বললেন, এই কাজটা করে আসলে ক্রিসমাসের বিরোধিতা করে, মানে না, বা গিফট-গিভিং আর হলিডে স্পিরিট উদযাপন করে না - এই দলকে পক্ষান্তরে ছোট করে দেখানো হয়েছে। ইমাম বললেন, ক্রিসমাস এখন আর খৃস্টানদের ধর্মীয় উদযাপন থাকে নাই - একে সেক্যুলার বানিয়ে ব্যবসার একটা উপলক্ষ তৈরী করা হয়েছে। ইমাম বললেন, আমাদের মুসলিমদের অনেকেই সবার সাথে তাল মিলিয়ে ক্রিসমাস উদযাপন করতে লেগে যাই। আর যদি তা নাও করি, তাল মিলাতে গিয়ে আমাদের ঈদকে ক্রিসমাসের মতোই আলোক উজ্জ্বল, হৈ-হুল্লোড় করে উদযাপন করার প্রতিযোগিতায় লেগে পড়ি। ইমাম জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের মুসলিমদের ঈদকে যদি এইরকম ব্যবসার উপলক্ষ বানিয়ে, আল্লাহকে ভুলে গিয়ে, সবাই মিলে শুধু উৎসব উদযাপন করার একটা দিনে পরিণত করা হয়, তাহলে আমাদের কেমন লাগবে? ইমাম বললেন, আর তাই, মুসলিম হিসাবে আমাদের প্রথমেই ক্রিসমাসকে একটা খ্রিস্টান ধর্মীয় দিন হিসাবে মানতে হবে। তাদের খুশিতে আমাদের আনন্দিত হতে কোনো অসুবিধা নাই, দাওয়াত বা কোনো গেট-টুগেদারে যেতেও বাঁধা নাই, কিন্তু আল্লাহ প্রদত্ত আমাদের ঈদে খুশি না থেকে - তাদের ধর্মীয় উৎসবে বেশি খুশি কিংবা তাদেরটা আমাদের থেকে ভালো - এইরকম চিন্তা আসলেই সমস্যা, ঐরকম মানসিকতা থেকে আমাদের দূরে থাকতে হবে।
ইমাম এই প্রসংগে সুলাইমান (আঃ) আর শিবার রানী, বিলকিসের কাহিনী বর্ণনা করলেন। খুব সংক্ষেপে কাহিনীটা এই রকম, নবী সুলাইমান (আঃ) যখন জানতে পারেন শিবার রানী আর তাঁর প্রজারা সূর্য উপাসক, আর শয়তান তাদেরকে, তাদের কাজকে সুন্দর দেখিয়ে তাদের ভুলিয়ে রেখেছে, তখন সুলাইমান (আঃ) রানীকে ইসলাম গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়ে চিঠি লিখেন। উত্তরে রানী বিলকিস সুলাইমান (আঃ) আসলেই নবী কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য তার বার্তাবাহকদের দিয়ে দামি উপহার সামগ্রী পাঠান। আল্লাহ তা'য়ালা কুরআনের সূরা নামল -এ (সূরা নম্বর ২৭, আয়াত ৩৫ - ৩৭) এই ঘটনা বর্ণনা করেছেন: উপহার সামগ্রী পেয়ে সুলাইমান (আঃ) বলেন, "তোমরা কী আমাকে আর্থিক সাহায্য করতে চাচ্ছ? অথচ আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন তা তোমাদের যা দিয়েছেন (অর্থাৎ, প্রাচুর্য) তা থেকে উত্তম" - এই বলে তিনি উপহার ফেরত পাঠিয়ে দেন। ইমাম বললেন, আল্লাহ তা'য়ালা আমাদের যা দিয়েছেন (অর্থাৎ, ইসলামী উৎসব, ধর্মীয় দিন, ইত্যাদি) তা নিয়ে আমাদের খুশি থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, ছোট ছোট বিষয়েই আসল আনন্দ আছে, চাকচিক্যে আর প্রতিযোগিতায় নয়। এরপর তিনি আমাদের বাচ্চাদেরকে এই ব্যাপারগুলো কিভাবে শেখানো যায়, বোঝানো যায় সেটা আলাপ করলেন।
আপডেট: বাচ্চাদেরকে কিভাবে শেখানো যায় সেটা বোঝানোর জন্য ইমাম দুইটা উদাহরণ দিলেন। প্রথম উদাহরণ হচ্ছে, আয়েশা (রাঃ) ও তাঁর বাবা, আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ)'র। আয়েশা (রাঃ) নাকি বলেছেন তাঁর জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে যেই ঘটনা সেটা হচ্ছে ছোটবেলায় তাঁর বাবা তাঁর হাত ধরে হাঁটছেন, আর কুরআন তেলাওয়াত করতে করতে অঝোরে কাঁদছেন। এই কান্না ভয়ের না, খুশি আর বিস্ময়ের। আর দ্বিতীয় উদাহরণ হচ্ছে, আমাদের রাসূল (সাঃ)'র। তিনি পরিবারের সাথে হয়তো সময় দিচ্ছেন, আনন্দ করছেন, কিন্তু যখনই আজান পড়ে যেত, তিনি নামাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন, তখন যেন পরিবারকে তিনি আর চেনেনই না। এই দুই উদাহরণ দিয়ে ইমাম বললেন, আমরা মা-বাবারা ইবাদতকে - সেটা নামাজ হোক, কিংবা কুরআন তেলাওয়াত হোক - যখন গুরুত্ব দিবো, যখন এমনভাবে সেটা আদায় করবো যেন সেটা আমাদের খুবই প্রিয় একটা কাজ - তখন বাচ্চাদেরকে আর মুখে বলতে হবে না - আমাদের কাজ দেখেই তারা বুঝে যাবে, নিজে থেকেই শিখে যাবে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন