এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (৬ জানুয়ারি, ২০২৩): নতুন বছর, ইসলামী (চন্দ্র) ক্যালেন্ডার ও আমাদের ভুল
এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (৬ জানুয়ারি, ২০২৩): নতুন বছর, ইসলামী ক্যালেন্ডার ও আমাদের ভুল
মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, নিউ জার্সি।
[সাইডনোট: আজকের খুতবার বিষয়টা নিয়ে আমিও অনেকদিন ভেবেছি। ইসলামী ক্যালেন্ডার বা চান্দ্রমাস হিসাবে বছর ১০ দিন করে কমে, চাঁদের হিসাবে ২৯ না ৩০ দিনে মাস হবে - এই ব্যাপারটা নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে রোজার শুরু, ঈদ ইত্যাদি নিয়ে তর্ক, মাতামাতি তো আছেই, তাছাড়া এই চান্দ্রমাস সবাই না মানলে তো একেক দেশে একেক দিন হবে! এটা কেন? কিভাবে ব্যাপারটা মেনে নেয়া যায়? কোনো ভালো উত্তর পাচ্ছিলাম না। কিন্তু ইমাম আজকের খুতবাতে যেটা বললেন, সেভাবে কোনোদিনও ভাবি নাই। আমার কাছে খুতবাটা খুব ভালো লেগেছে। নামাজ শেষে তাই ভাবছিলাম ইমামকে একটা ধন্যবাদ দিবো, কিন্তু আমার একটু তাড়া থাকায় আর উনি অন্যদের সাথে আলাপ করতে ব্যস্ত থাকায় আর বলা হয় নাই। এখন চেষ্টা করছি ভুলভাল না করে উনার দেয়া খুতবাটা ঠিক করে লিখতে। বরাবরের মতো ডিসক্লেইমার: এই লেখা আমার শুনে, বুঝে আর পরে ইন্টারনেটে রেফারেন্স ঘাটাঘাটি করে লেখা, আমার ভুল হতেই পারে। নিচে মসজিদের ফেসবুক লিংক দিয়ে দিচ্ছি, আজকের খুতবার ভিডিও এখনো আপলোড হয় নাই, হলে নিজেরা দেখে নিলে সবচেয়ে ভালো হবে।]
ইমাম শুরু করলেন উনার একটা পর্যবেক্ষণ দিয়ে, বললেন উনি খেয়াল করে দেখেছেন, প্রতি (খ্রিস্ট) বছর, নতুন বছরের শুরুতে আমাদের মুসলিমদের মধ্যে একটা অংশ বেশ জোরেসোরে বলা শুরু করেন যে, আমাদের নিজস্ব ইসলামী বা হিজরী ক্যালেন্ডার আছে, আমাদের সেটা ধারণ করা উচিত। অনেকেই আবার এমন একটা মনোভাব রাখেন যে, সারা দুনিয়া একদিকে আর মুসলিমরা আরেকদিকে, মুসলিম হিসাবে আমাদের স্বকীয়তা ধরে রাখতে হবে, ইত্যাদি। ইমাম বললেন, এই কথাবার্তা গুলা আসলে ডিফেন্সিভ (আত্মরক্ষামূলক বা রক্ষণশীল) মনোভাব-এর কারণে বলা হয়, যার পেছনে আসলে মূল কারণ হচ্ছে ইসলাম নিয়ে ইনসিকিউরিটি বা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা। ইমাম বললেন, প্রথমেই আমাদের বুঝতে হবে, আল্লাহ তা'য়ালা কুরআনে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে, [সূরা আল-হিজর, সূরা নম্বর ১৫, আয়াত ৯] "তিনি কুরআন নাজিল করেছেন এবং তিনিই তা সংরক্ষণ করবেন।" - কাজেই কুরআন কিংবা ইসলাম নিয়ে আমাদের ইনসিকিউরিটি বা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগার কোনো কারণ নেই।
এরপর ইমাম বললেন, আমাদের অনেকেই মনে করেন, ইসলামে শুধু চান্দ্রমাস হিসাবে দিন বা বছরের হিসাব করতে বলা হয়েছে। ব্যাপারটা মোটেও তা না - কুরআনে শুধু চাঁদকে না, সূর্যকেও দিন গণনার জন্য ব্যবহারের কথা বলা আছে। সূরা ইউনুস (সূরা নম্বর ১০, আয়াত ৫) -এ আল্লাহ তা'য়ালা বলছেন: "তিনিই (আল্লাহ) যিনি সূর্যকে দীপ্তিময় আর চাঁদকে আলোকময় করেছেন, তার জন্য বিভিন্ন ধাপ নির্ধারিত করেছেন, যেন তোমরা বছরের গণনা আর সময়ের হিসাব রাখতে পারো। আল্লাহ এসবকিছু কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া এমনি তৈরী করেন নাই। তিনি এসবের বিস্তারিত বর্ণনা করেন তাদের জন্য যারা জানে"। ইমাম বললেন, কুরআনের সূরা আন-আমে (সূরা নম্বর ৬, আয়াত ৯৬) আল্লাহ তা'য়ালা বলছেন: "তিনি রাতকে বানিয়েছেন বিশ্রামের জন্য, আর সূর্য আর চাঁদকে (নির্ধারণ) করেছেন গণনার জন্য, এটা নির্ধারিত হয়েছে মহাপরাক্রমশালী আর মহাজ্ঞানীর পক্ষ থেকে"। ইমাম বললেন, কাজেই এটা স্পষ্ট যে সূর্যকে হিসাবের জন্য, ক্যালেন্ডারের জন্য ব্যবহার করা যাবে না - এটা সম্পূর্ণ একটা ভুল ধারণা বরং উল্টোটাই সত্য।
এরপর ইমাম বললেন, আরবে ইসলামের অনেক আগেই চান্দ্রমাস চালু ছিল, ইসলাম এসে নতুন করে এটা শুরু করে নাই। ইসলামের প্রতিষ্ঠার আগেই বিশেষ কিছু মাসে আরবরা মারামারি-যুদ্ধ ইত্যাদি করতো না - কারণ তখন তারা হ্বজ কিংবা অন্য ধর্মীয় আচার-আচরণ গুলো করার জন্য এইসব মাসে তা হারাম ঘোষণা করেছিল। সে হিসাবে, অনেক আগে থেকেই চান্দ্রমাস বা ক্যালেন্ডার ধর্মীয় কারণে ব্যবহার হয়ে আসছে। ইসলাম এসে সেটা চালু রেখেছে। এরপর ইমাম বললেন, এই চান্দ্রমাস হিসাবে ইসলামের ধর্মীয় দিনগুলো পালন করার নির্দেশের পেছনে আল্লাহ তা'য়ালার নিশ্চয়ই প্রজ্ঞা আছে। এরপর তিনি এর কয়েকটা সুবিধার কথা বললেন।
প্রথমেই বললেন, চান্দ্রমাস বা ক্যালেন্ডার যেহেতু ১০ দিন করে আগায়, তাই সৌরবছরের হিসাবে হ্বজ, রোজা ইত্যাদি সময়ের সাথে সাথে সারা বছর ধরেই হয়। বললেন ভেবে দেখতে, যদি তা না হয়ে, সৌরবছরের ক্যালেন্ডারের হিসাবে ইসলামী ধর্মীয় দিনগুলো নির্ধারিত হতো, তাহলে সবসময় দুনিয়ার কোন এক জায়গায় একই সময়ে (যেমন গরমে কিংবা শীতে) রোজা হতো, তাতে দুনিয়ার কোনো এক অংশের মুসলিমদের জন্য হয়তো তা দিন ছোট হওয়ার কারণে সুবিধার কারণ হতো, কিন্তু অন্যদের জন্য তা কষ্টের কারণ হতো। এরপর বললেন, কেউ হয়তো নতুন করে মুসলিম হচ্ছে, তার জন্য ইসলামী বা চান্দ্রমাসের ক্যালেন্ডার একটা "অ্যাড-অন" বা সংযুক্তিমূলক; তার জন্য অন্যসব কিছু ছেড়ে দিতে হচ্ছে না। ইমামের মতে, এই "আলাদা" ধর্মীয় চান্দ্রমাস ক্যালেন্ডার থাকার কারণেই ইসলামী ক্যালেন্ডার যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন রাজা, সাম্রাজ্য আর সময়ের সাথে এখনো টিকে আছে, কেউ এসে এটা পরিবর্তন করে দেয় নাই। এটা আল্লাহ তা'য়ালারই নিশ্চয়ই একটা প্রজ্ঞার অংশ। ইমাম আরো বললেন, ইতিহাস ঘাঁটলে, বই-দলিল ঘাঁটলে দেখা যায় যে, মুসলিম অটোমান সাম্রাজ্যের সময়ও তারা সৌর আর চান্দ্র - দুটো আলাদা ক্যালেন্ডারই ব্যবহার করতো।
কাজেই সৌরবছর বা খ্রিস্টবছর মানা ঠিক হচ্ছে না, কিংবা এই খ্রিস্ট বছরের শুরুতে কাউকে "হ্যাপি নিউ ইয়ার" বলা যাবে না - ইত্যাদি নিতান্তই ভুল। ইমাম বললেন, ইসলামে অন্যদের ভালো গ্রহণ করতে কোনো বাঁধা নাই। তবে অবশ্যই হালাল-হারাম মেনে আমরা অন্যদের যা ভালো তা গ্রহণ করতে পারবো। ইসলামের এই 'ইনক্লুসিভ' বা অন্তর্ভুক্তিমূলক মনোভাবের কারণেই বিভিন্ন বর্ণ, গোত্র আর দেশের মানুষ এতে যোগ দিতে পারে। সবশেষে ইমাম নতুন বছর সবার জন্য সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি আর একে-ওপরের প্রতি ভাতৃত্বমূলক সৌহার্দ্য বয়ে নিয়ে আসুক বলে দোয়া করলেন।
মসজিদের ফেসবুক পেইজ: https://www.facebook.com/mcgpnj/?ref=page_internal
আগের জুমুআর খুতবার সারমর্ম গুলো এক জায়গায় পেতে: https://banglakhutba.substack.com/
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন