এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১৩ জানুয়ারি, ২০২৩): মার্টিন লুথার কিং ডে'র ভাবনা

এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১৩ জানুয়ারি, ২০২৩): মার্টিন লুথার কিং ডে'র ভাবনা
মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, নিউ জার্সি।


আগামী সোমবার আমেরিকার অনেক জায়গায় নাগরিক অধিকার অন্দোলন বা সিভিল রাইটস মুভমেন্টের নেতা ড. মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের স্মরণে বন্ধ। আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের বা সংখ্যালঘুদের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় যার অবদান কম-বেশি সবাই জানেন। ইমাম বললেন, মসজিদে উপস্থিত সম্ভবতঃ সবাই এই আন্দোলনের পর আমেরিকায় এসেছেন আর সেই হিসাবে সেই আন্দোলনের ফসল, বা অন্যভাবে বললে ড. মার্টিন লুথার কিংয়ের অবদানের সুবিধা আমরা সবাই ভোগ করছি।  তাঁর কাজ সম্পর্কে আমাদের জানার চেষ্টা করা উচিত। 

মার্টিন লুথার কিং নাকি একটা প্রবন্ধ বা চিঠি লিখে সেই সময়ে কৃষ্ণাঙ্গদের চার্চে-চার্চে পাঠিয়েছিলেন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, এটা ঠিক যে, এই আন্দোলনের আগে কিন্তু শান্তি বিরাজ করছিলো। তার কারণ, সবাই সবার জায়গাতে বেশ মানিয়ে নিয়েছিল। সেসময় দাস প্রথা না থাকলেও, সমঅধিকার না থাকার কোনো প্রতিবাদ না করে কৃষ্ণাঙ্গরা তাদের অবস্থানে, আর সাদারা তাদের অবস্থানে মানিয়ে নিয়ে ছিল। এই মানিয়ে নেওয়ায় সমাজে শান্তি বিরাজ করলেও সেটা আসল শান্তি ছিল না; এটাকে তিনি "নেগেটিভ শান্তি" আখ্যা দিয়েছিলেন। "পজিটিভ শান্তির" জন্য তিনি কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে ভাতৃত্ববোধ, একতা জাগিয়ে তুলে, সম- নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের আহ্বান করেছিলেন।   

ইমাম বললেন, পবিত্র কুরআনে ইব্রাহিম (আঃ)-এর ঘটনা পড়লে আমরা দেখবো তিনিও তাঁর বাবার ও সমসাময়িক অন্যদের মূর্তি-পূজা মেনে নেন নাই। আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর রাসূল (সাঃ) কে কুরআনের সূরা মারিয়ামে (সূরা নম্বর ১৯, আয়াত ৪১ - ৫০) বলছেন: "ইব্রাহিম (আঃ) একজন সত্যনিষ্ট নবী ছিলেন। তিনি তাঁর বাবাকে জিজ্ঞেস করেছেন, প্রিয় বাবা, কেন আপনি উপাসনা করেন এমন কিছুর - যা না শুনতে পায়, না দেখে আর না আপনার কোনো উপকারে আসবে।হে প্রিয় বাবা, আমার কাছে এমন জ্ঞান এসেছে, যা আপনার কাছে আসেনি, তাই, আমাকে অনুসরণ করুন, আমি আপনাকে সরল পথ দেখাবো। হে প্রিয় বাবা, শয়তানের পূজা করবেন না। শয়তান নিশ্চয়ই দয়াময়ের অবাধ্য।হে প্রিয় বাবা, আমার ভয় হয়, দয়াময়ের কাছ থেকে কোনো শাস্তি আপনাকে স্পর্শ করবে, আর আপনি শয়তানের সঙ্গী হয়ে যাবেন। তিনি (ইব্রাহিম (আঃ)-র বাবা) বললেন, তুমি কি আমার দেব-দেবীর বিমুখ হে ইব্রাহিম? তুমি যদি না থামো, তবে তোমাকে আমি পাথর মারবো (হত্যা করবো)। আর আমার কাছ থেকে চিরতরে চলে যাও। সে (ইব্রাহিম (আঃ)) বললেন, "সালামুন আলাইকা (আপনার উপর শান্তি)", আমি আপনার জন্য আমার রবের কাছে ক্ষমা চাইবো, তিনি সবসময়ই আমার প্রতি অনুগ্রহশীল ছিলেন। এবং আমি চলে যাচ্ছি আপনার আর আপনি আল্লাহ ছাড়া যাদের ডাকেন, তাদের কাছ থেকে।আর আমি আমার রবকে ডাকবো, আশা করি তাঁকে ডেকে আমি বিফল হবো না। [এরপর আল্লাহ বলছেন] সে যখন তাদের কাছ থেকে আর আল্লাহ ছাড়া তারা যাদের পূজা করতো, তাদের কাছ থেকে দূরে চলে গেলো,  আমি তাঁকে (ইব্রাহিম (আঃ) কে) ইসহাক আর ইয়াকুব (আঃ) কে দান করলাম। আর তাঁদের প্রত্যেককে করলাম নবী। আর তাদের দান করলাম অনেক অনুগ্রহ, আর তাঁদের নামকে করলাম সুউচ্চ।"   

ইমাম বললেন, পরে ইসহাক (আঃ) আর ইয়াকুব (আঃ) এর বংশ থেকে অনেক নবী-রাসূল এসেছেন। ইব্রাহিম (আঃ) তাঁর বাবা ও তার সঙ্গীসাথীদের দল ত্যাগ করলেও, আল্লাহ তাঁকে পরে তাঁর নিজের দল বা বংশধারা দিলেন। ইমাম সরাসরি না বললেও বোঝালেন যে এইখানেও সত্য আর সঠিকের জয় ভাতৃত্ববোধ আর একতার মাধ্যমেই হয়েছে। এরপর ইমাম আরেক কৃষ্ণাঙ্গ নেতার নাম বললেন। তিনি মুসলিম ছিলেন। তাঁর নাম ম্যালকম এক্স। ম্যালকম এক্স' ড. মার্টিন লুথার কিংয়ের সমসাময়িক নাগরিক আন্দোলনের নেতা ছিলেন। তবে তিনি একটু ভিন্ন চিন্তা ধারার ছিলেন। সম নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর মতবাদ ছিল নিজেদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বা মুক্তি। তিনি কৃষ্ণাঙ্গদের নিজস্ব ব্যবসা, বাণিজ্য, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ার পক্ষে ছিলেন। 

ইমাম এই দুই নেতার উদাহরণ দিয়ে পরে আমেরিকার সংখ্যালঘু মুসলিম - বা আমাদের অবস্থা চিন্তা করতে বললেন। বললেন দুৰ্ভাগ্য যে আমাদের অনেকের কাছেই মুসলিম ভাতৃত্ববোধ বা একতা শুধু জুমুআর দিনে মসজিদে এসে নামাজ পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আমরা কোনোকিছুতেই জড়াতে চাই না। অর্থনৈতিক মুক্তির চেষ্টাও আমাদের নিজেদের মধ্যে কিংবা পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে। ইমাম বললেন, মসজিদে তো অনেক ব্যবসায়ী আছেন, চিকিৎসকসহ অন্যান্য পেশার মানুষ আছেন। কই, তিনি তো আমাদের মধ্যে পেশাগত, ব্যাবসায়িক বা অন্যান্য কাজে একে অপরকে সাহায্য করতে, একে অপরের দ্বারস্থ হতে দেখেন না। ইমাম বললেন, যখনই কেউ কারো সাথে ব্যবসা বা লেন-দেন করতে চায় না - তখন বুঝতে হবে সেটা মূলত এই কারণে যে একজন অন্যজনকে বিশ্বাস করে না। ইমাম আফসোস করে বললেন, আমাদের মধ্যে এটা হওয়ার কথা ছিল না। 

ইমাম সবশেষে দোয়া করলেন, আমরা যেন একে অপরের সাথে বিশ্বাসের সাথে, ভাতৃত্ব আর একতার মাধ্যমে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি। 


[সাইড নোট: সূরা মারিয়ামে (সূরা ১৯, আয়াত ৪১-৫০) উল্লেখ আছে, ইব্রাহিম (আঃ) তাঁর বাবাকে সম্বোধন করেছেন "ইয়া আবাতি" বলে। আমি শেখ আব্দুন নাসের জাঙদার এক লেকচারে শুনেছিলাম, এই "ইয়া আবাতি"-র    অনুবাদ "হে প্রিয় বাবা" করলে আসলে তাতে আবেগটা ধরা পরে না। এইটা অনেকটা যখন আমরা আমাদের আব্বা বা বাবাদের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর আদর মিশিয়ে "আব্বু' বলে ডাকি - অনেকটা সেই রকম। বক্তা বলছিলেন, খেয়াল করতে যে সাংঘাতিক সাংঘর্ষিক একটা বিষয়ে আলাপ করার সময়ও ইব্রাহিম (আঃ) কিন্তু প্রতি কথাতে তাঁর বাবা কে "ইয়া আবাতি" বলে সম্বোধন করেছেন। তাঁর বাবা যখন তাঁকে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছেন, চিরতরে চলে যেতে বলেছেন  -- তার পরেও ইব্রাহিম (আঃ) কিন্তু "সালাম" জানিয়ে সরে এসেছেন, তার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন, ক্ষমা চাইবেন বলেছেন কিন্তু বাজে ব্যবহার করেন নাই। বাবাদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়, মতে না মিললেও  - এটার একটা চমৎকার উদাহরণ এই আয়াত গুলো।]

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ