এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (২০ জানুয়ারি, ২০২৩): মানুষকে বিচার করা বা ধারণা পোষণ করা

এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (২০ জানুয়ারি, ২০২৩): মানুষকে বিচার করা বা ধারণা পোষণ করা 
ইসলামিক সোসাইটি অফ সেন্ট্রাল জার্সি, সাউথ ব্রান্সউইক টাউনশিপ,  নিউ জার্সি।

ইমাম শুরু করলেন এই বলে যে আমরা অনেক সময়ই খুব জলদি অন্য মানুষকে জাজ বা বিচার করে ফেলি। অর্থাৎ,  কাউকে দেখা মাত্র তার সম্পর্কে একটা ধারণা করে ফেলি। কিংবা কারো সম্পর্কে কিছু শোনা মাত্রই নিজেরা যাচাই-বাছাই না করেই  অন্যের কথায় বিশ্বাস করে ফেলি, কিংবা আমরা নিজেরাই কারো সম্পর্কে বাজে ধারণা পোষণ করে ফেলি। এটা খুব খারাপ। আমাদের এই অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। এরপর তিনি পুরা খুতবা জুড়ে এই সম্পর্কে আল্লাহ তা'য়ালা কুরআনের কী উদাহরণ দিয়েছেন আর তাদের পরিণতি কী হয়েছে সেটা আলাপ করলেন।  

ইমাম শুরু করলেন ইবলিস শয়তানের উদাহরণ দিয়ে। কুরআনে উল্লেখ আছে [সূরা আল-আরাফ, সূরা নম্বর ৭, আয়াত ১১ - ১৩], আল্লাহ যখন ইবলিসকে কে আদম (আঃ) কে সেজদা করতে আদেশ করেছিলেন, সে অমান্য করে, সেজদা করে নাই। তখন কারণ জিজ্ঞেস করলে ইবলিসের উত্তর ছিল এই রকম: "আমি তার থেকে উত্তম।  আপনি আমাকে তৈরি করেছেন আগুন থেকে আর তাকে করেছেন কাদামাটি থেকে।" - ইমাম বললেন, ইবলিসের এটা ছিল একটা সাংঘাতিক অপরাধ। সে আদম (আঃ) সম্পর্কে না জেনে, অহংকার আর ঈর্ষা বশতঃ তার সম্পর্কে বাজে ধারণা করে ফেলে। আল্লাহ'র সরাসরি আদেশ অমান্য করে।     

এরপর ইমাম বললেন, ফিরাউন ছিল তখনকার সময়ের সভ্যতার চরম শিখরে থাকা মিশরের রাজা। এই ফিরাউন আর তার লোকজনের কাছে যখন মুসা (আঃ) যখন মুজেজা বা প্রমানসহ তাওহীদের বা আল্লাহ'র একত্ববাদের আহ্বান নিয়ে আসলো, তখন ফিরাউনের উত্তর কি ছিল? সে তার পরিষদবর্গকে বলেছিলো [সূরা আজ-জুখরুফ, সূরা নম্বর ৪৩: আয়াত ৫১-৫২]: "এই মিশর রাজ্য কি আমার নয়? আমার নিচে দিয়ে কি এই নদীগুলো বয়ে যাচ্ছে না? তোমরা কি দেখতে পাও না যে আমি এই লোকের (মুসা (আঃ)) থেকে অনেক ভালো - যে কিনা মূল্যহীন আর ঠিকমতো কথাই বলতে পারে না? [সাইড নোট: মুসা (আঃ) তোতলাতেন, স্পষ্ট করে কথা বলতে পারতেন না]। তাকে কেনই বা সোনার বালা পাঠানো হলো না, আর কেনই বা ফেরেশতারা তার সঙ্গী হয়ে এলো না? "  পরে আল্লাহ এই ফিরাউনকে তার দলবলসহ লোহিত সাগরে ডুবিয়ে মারেন। 

ইমাম বললেন, মরিয়ম (আঃ) বা মা মেরিকে আল্লাহ তা'য়ালা দুনিয়ার সব নারীদের উপরে স্থান দিয়েছেন, তাকে নির্বাচিত করেছেন। কিন্তু এই অত্যন্ত সম্মানিত মরিয়ম (আঃ) যখন তাঁর অলৌকিক সন্তান, ঈসা (আঃ) কে নিয়ে তাঁর লোকজনের সামনে  হাজির হলেন, তখন তাদের প্রথম মন্তব্যই ছিল  [সূরা মরিয়ম, সূরা নম্বর ১৯, আয়াত ২৭ -২৮]:  ও মারিয়াম আপনি তো জঘন্য কিছু করেছেন। অন্যরা বলতে থাকে: ও হারুনের বোন [সাইড নোট: মুসা (আঃ) ও তাঁর ভাই হারুন (আঃ) -এর সম্প্রদায় বা তাঁর অনুসারীদেরকে বনি-ইসরাইল বলা হয়, "হারুনের বোন"- আক্ষরিক অর্থে বোন নয়, সম্মানিত করতে বলা একটা উপমা]! না তোমার বাবা খারাপ ছিলেন আর না তোমার মা চরিত্রহীন। - অর্থাৎ এইখানেও দেখা যায় তারা মরিয়ম (আঃ) কে দেখা মাত্রই, তাঁকে কিছু বলতে না দিয়েই লোকজন তাঁর সম্পর্কে বাজে ধারণা বা তাঁকে বিচার করে ফেলে।  

এরপর ইমাম বললেন, আমাদের রাসূল (সাঃ)-এর সময়কার কুরাইশদের কথা চিন্তা করতে বললেন।আরবের অন্যান্য সম্প্রদায়ের কথা চিন্তা করতে বললেন। তাদের কাছে সবচেয়ে বড় নিদর্শন কুরআন আর আল্লাহর রাসূল (সাঃ) উপস্থিত থাকলেও তারা তাঁকে মানতে বা বিশ্বাস করতে চাইলো না? তার কারণ কিন্তু তাদের কথা ছিল, তাদের মধ্যে থেকে সাধারণ রক্ত-মাংসের মানুষকে কেন আল্লাহ রাসূল বানালেন? কুরআনে [সূরা আজ-জুখরুফ, সূরা নম্বর ১৯, আয়াত ৩১] আল্লাহ তাদের ব্যাপারে বলছেন:"তারা বলে, 'কেন এই কুরআন দুই শহরের [মক্কা ও তায়েফের] কোনো [অর্থ, সম্পদ ও প্রতিপত্তিতে] মহান কোনো ব্যক্তির উপর নাজিল হলো না? '" - এইখানেও রাসূল (সাঃ) সম্পর্কে বাজে ধারণা বা লোকজনের তাকে বিচার করে ফেলার ঘটনাই প্রকাশ পাচ্ছে। 

আমাদের রাসূল (সাঃ) এর স্ত্রী,  আয়েশা (রাঃ) -র সম্পর্কে যখন মিথ্যা গুজব রটে যায় যে তিনি পরকীয়ায় জড়িত, তখন অনেকেই সেটা শুনেই বিশ্বাস করে ফেলে। কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা এদের সম্পর্কে বলছেন [সূরা আন-নূর, সূরা নম্বর ২৪, আয়াত ১২]: "কেন যখন তোমরা শুনলে - ও বিশ্বাসী পুরুষ এবং বিশ্বাসী নারীরা - তোমরা নিজেদের সম্পর্কে ভালো ভাবলে না - আর বললে না যে এতো সুস্পষ্ট মিথ্যা?"  ইমাম বললেন একটা হাদিসে নাকি আছে যে  কোনো মু'মিন অন্য মু'মিনের সম্পর্কে কোনো বাজে কথা শুনলে বা আন্দাজ করলে দরকার হলে প্রথমে ৭০ টা অজুহাত চিন্তা করতে যে কেন সেটা ঠিক না - তারপর সেটা বিশ্বাস করতে। 

সবশেষে ইমাম বললেন, তাহলে বোঝা গেলো,  কারো সম্পর্কে বাজে ধারণা পোষণ করা যাবে না, কারো সম্পর্কে বদনাম করা যাবে না, কারো সম্পর্কে খারাপ কিছু জানলেও সেটার পেছনে অন্তত ৭০ টা কারণ প্রথমে চিন্তা করতে হবে - তাহলে আমরা করবোটা কি? উত্তরে ইমাম বললেন, আমরা তার জন্য দোয়া করবো। কারণ হাদিসে আছে, কোনো ব্যক্তি যদি তার মু'মিন ভাই-বোনের সম্পর্কে তার অগোচরে আল্লাহ'র কাছে তার ভালো চেয়ে দোয়া করে - তাহলে ফেরেশতারা নাকি তার দোয়ার সাথে সাথে বলতে থাকেন - আল্লাহ আপনাকেও সেটা দিক। ইমাম বললেন, ফেরেশতারা আপনার জন্য আল্লাহ'র কাছে দোয়া করছেন - এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে? ইমামের মতে এটা "বুমেরাং দোয়া" - যেটা অন্যের জন্য করা হলেও নিজের জন্যই ফিরে আসে।  


[সাইড নোট: এই একই ইমামের "বুমেরাং দোয়া" নিয়ে দেয়া খুতবা উইলো গ্রোভ মসজিদে আগে একবার শুনেছিলাম। সেটা লিখেও ছিলাম। আজকের এই খুতবা সহ আগের সব খুতবার সারমর্ম এক জায়গায় পেতে নিচের লিংকে গিয়ে দেখতে পারেন: https://banglakhutba.substack.com/ ]     





মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ