নোমান আলী খানের অনলাইন খুতবা : ছেলে-মেয়েদের নামাজ পড়তে বলা
ছেলে-মেয়েদের নামাজ পড়তে বলা
নোমান আলী খানের অনলাইন খুতবা
[সাইড নোট: সর্দি-কাশিতে ভুগছি, বাসায় রিমেরও জ্বর। বাচ্চাদের জ্বর-সর্দি হয়ে এখন অবশ্য ভালোর দিকে। তাই এই শুক্রবার (২৭ জানুয়ারি, ২০২৩) জুমুআর নামাজে যাই নাই। কাজ থেকেও ছুটি নিয়ে বাসায় ছিলাম। কয়েকদিন আগে ইউটুবে নোমান আলী খানের খুব ইন্টারেষ্টিং একটা খুতবা শুনছি। খুতবাটা উনি টেক্সাসের একটা মসজিদে ডিসেম্বরের বন্ধের সময় কোনো এক শুক্রবার দিয়েছিলেন। এখন সেটার সারমর্ম লেখার চেষ্টা করবো। ভিডিওটার লিংক নিচে দিয়ে দিচ্ছি। আমার লেখা না পড়ে, ২০-২৫ মিনিটের ওই খুতবাটা নিজে শুনে নিলেই সবচেয়ে ভালো হবে। লেখায় অনেক উদাহরণ, অনেক কিছুই তুলে আনা যায় না। খুতবাটা উঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েদের জন্য হলেও, আমাদের নিজেদেরও কাজে লাগবে। অন্তত আমার কাজে লাগবে।]
ইমাম বললেন, এখন ডিসেম্বরের ছুটি চলছে। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া অনেক ছেলে-মেয়েই এখন বাসায়। তাই মসজিদেও তুলনামূলক ভাবে উপস্থিতি বেশি।বললেন, তাঁকে অনুরোধ করা হয়েছে যেন তিনি খুতবায় এই ছেলে-মেয়েদের উদ্দেশে কিছু বলেন, যাতে করে তারা নামাজ পড়তে উদ্বুদ্ধ হয়। ইমাম বললেন, তাই তিনি আজকের খুতবাটা এমনভাবে দিবেন যেন তিনি তাঁর নিজের সন্তানদের উদ্দেশ্যে খুতবা দিচ্ছেন। বললেন যে, ভেবে নিতে যে তিনি মিম্বরে দাঁড়িয়ে নেই, বরং বাসায় বসে আলাপ করছেন। আরও বললেন, এই আলাপটা ৫-৬ বছরের ছেলে মেয়েদের জন্য না, বরং সেইসব বয়সী ছেলেমেয়েদের জন্য যারা এখন অনেক কাজই তাদের বাবা-মা'র সাথে করতে পারে। মজা করে উদাহরণ দিয়ে বললেন, যেমন যারা তাদের বাবা-মা'র সাথে গেম খেলতে পারে, কিংবা তাদের সাথে বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনা করতে পারে। মসজিদে বসা সেইসব ছেলে-মেয়েদের উদ্দেশ্যে বললেন, আর আমি তোমাদেরকে ছোট ছেলে-মেয়ে না, বরং তরুণ-তরুণী হিসেবেই কথা বলবো। তারপর মূল খুতবা শুরু করলেন।
[ছেলেমেয়েদের উদ্দেশ্যে] ইমাম বললেন, জেনে রাখো, একটা সময় ছিল, যখন তোমাকে আমি চিনতাম না, তোমার প্রতি আমার কোনো আদর-ভালোবাসা ছিল না। আমার কাছে তোমার কোন অস্তিত্বই ছিল না। তারপর তুমি যখন জন্মালে, আস্তে আস্তে কিছু পরিবর্তন ঘটতে লাগলো। আমাদের সম্পর্ক তৈরী হতে লাগলো। কিন্তু এই সম্পর্কও ক্ষণস্থায়ী। আমরা একই বাসায় হয়তো আছি, কিন্তু তারপরেও চিন্তা করে দেখো, আমরা খুব কম সময়ই একসাথে কাটাই। তুমি তোমার স্কুল, পড়াশুনা, হোমওয়ার্ক নিয়ে ব্যস্ত থাকো, আমি কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকি। আর আমাদের এই সম্পর্কও সবসময় একই থাকবে না। ভেবে দেখো, আর কিছুদিন পরেই তুমি ইউনিভার্সিটিতে চলে যাবা, তারপর পাশ করে চাকরি করবা, একসময় বিয়েশাদি করে সংসার করবা তখন কিন্তু এখন যেমন কখনো দৌড়ে আমার কাছে আসো - তাও আসবা না। কিন্তু আল্লাহ'র সাথে তোমার সম্পর্ক তোমার জন্মের আগেও ছিল, এখনো আছে। তুমি বড়ো হয়ে বাসা ছেড়ে চলে যখন যাবে, তখনো থাকবে। এমনকি, মৃত্যুর পরেও এই সম্পর্ক টিকে থাকবে। আল্লাহ তা'য়ালা তোমাকে একদম শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ভালোবাসছেন, ভালোবেসেও যাবেন।
তারপর ইমাম ছেলেমেয়েদের উদ্দেশ্যে বললেন: তুমি হয়তো এখন ভাবো আমি তোমাকে খালি বাঁধা দেই, খবরদারি করি। তোমার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করি। কিন্তু আসলে তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করার খুব একটা ক্ষমতাও আমার নাই। চিন্তা করে দেখো, তুমি স্কুলে বা কলেজে গিয়ে বন্ধুদের সাথে কি কথা বলছো, কি করছো - তা আমি নিয়ন্ত্ৰণ করতে পারি না। তোমাকে ফোন বা আইপেড কিনে দিয়ে থাকলে, সেটা ব্যবহার করে তুমি বন্ধুদের সাথে মেসেজে কি কথা বলছো, কি চিন্তা করছো - কিছুই আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। সেই হিসাবে তোমার উপর আমার নিয়ন্ত্রণ খুবই কম। কিন্তু মনে রেখো, আল্লাহ তা'য়ালা তোমার জন্মের আগে থেকেই তোমার ব্যাপারে সব জানেন, তোমার আকার-আকৃতি, চেহারা কি হবে - সব নিয়ন্ত্ৰণ করেছেন।
আর তুমি বড়ো হচ্ছো। তোমার স্বাধীনতা বাড়ছে। কিন্তু স্বাধীনতা বাড়ার সাথে সাথে দায়িত্বও বাড়ছে। একসময় তোমার দায়িত্ব পুরোপুরিই তোমাকেই নিতে হবে। তুমি কয়েকদিন পরে ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালিয়ে কোনো নিয়ম ভেঙে যদি পুলিশের টিকেট খাও, সেটা তোমাকেই সামলাতে হবে। তখন পুলিশকে "আমার আব্বার সাথে একটু আলাপ করুন" বলে লাভ হবে না; ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে কোনো সাবজেক্টে ফেল করলে "প্রফেসর, আমার আম্মুর সাথে একটু আলাপ করুন" - বলে পার পাওয়া যাবে না। একইরকম ভাবে, ইসলামে যার যার দায়িত্ব, জবাবদিহিতা যার যার নিজের। শেষ বিচারের দিন আমরা সবাই সম্পূর্ণ একা থাকবো। সেদিন কেউ কারো হয়ে সুপারিশ করতে পারবে না। হাদিসে আছে, রাসূল (সাঃ) তাঁর মেয়ে ফাতিমা (আঃ) কে বলেছেন, "ও মুহাম্মাদের মেয়ে ফাতিমা, আল্লাহকে স্মরণ করো, কারণ সেইদিন তোমাকে রক্ষা করার কোনো ক্ষমতা আমার থাকবে না"।
এরপর ইমাম ছেলেমেয়েদের উদ্দেশ্যে বললেন: এখন যেমন আমার কাছ থেকে তোমার কিছু পাওয়ার আছে। একইভাবে তোমার কাছ থেকেও আমার সন্মান, আনুগত্য পাবার অধিকার আছে। তুমি যেমন আশা করো, আমি তোমার খেয়াল করবো, টেবিলে খাবার আনার ব্যবস্থা করবো, তোমার কাপড়-চোপড় সহ অন্যান্য চাহিদা মিটাবো, একইভাবে আমিও আশা করি, তুমি আমার কথা শুনবে, আমাকে সন্মান করবে। কিন্তু আল্লাহ তা'য়ালার এসবের কিছুই দরকার নাই। আল্লাহই বলেছেন, একসময় এই দুনিয়া এবং আর অন্য সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে, কিন্তু তাঁর মাহাত্ম টিকে থাকবে। তাঁর গুণকীর্তন বা প্রশংসা করার জন্য কারোর দরকার নেই। আল্লাহ'র সাহায্য আমাদের দরকার, কিন্তু তাঁর আমাদের পক্ষ থেকে কোনোকিছুই দরকার নেই। এমনকি আল্লাহ তা'য়ালার আমাদের নামাজ, রোজা, জাকাত - ইত্যাদি ইবাদতেরও কোনো দরকার নাই। কাজেই নামাজ পরে ভাবার দরকার নেই যে "আমি খুব উদ্ধার করে ফেলেছি", আদতে আমরা এসব আমাদের ভালোর জন্যই, নিজেদের জন্যই করি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেউ কেউ নামাজ পড়ে না কেন? এর অনেকগুলো উত্তরই হতে পারে। কিন্তু আল্লাহ তা'য়ালাই উত্তর দিয়ে দিচ্ছেন। এবং উত্তরটা খুবই আশংকার, ভয়ের কারণ। আল্লাহ বলেছেন [সূরা কিয়ামা, সূরা নম্বর ৭৫, আয়াত ৩১], "সে না সত্য মানলো আর না সালাত আদায় করলো।" - কাজেই তার মানে, আল্লাহ বলছেন, যে নামাজ পড়লো না, সে আসলে সত্য মানছে না, মানে বিশ্বাস করছে না। ইমাম ছেলে-মেয়েদের উদ্দেশ্য করে বললেন, তুমি এটা শুনে হয়তো বলবে, "না, না, আমি মুসলিম, আমি বিশ্বাস করি"। উত্তরে ইমাম মাথার দিকে ইশারা করে বললেন, হ্যা, তুমি হয়তো মুসলিম তোমার বুদ্ধি-চিন্তায় (মগজে), কিন্তু এই বিশ্বাস হয়তো তোমার, আমার অন্তরে পৌঁছায় নাই। অনেক সময়ই আমি, তুমি এই সত্যটা অন্তর দিয়ে অনুধাবন করতে পারি না। আর তখনই আমরা মাঝে মাঝে নামাজ ছেড়ে দেই।
আচ্ছা, এর পরের প্রশ্ন হতে পারি, এই নামাজ পড়ার উদ্দেশ্য কি? কেউ হয়তো বলবে জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য, আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। কিন্তু সেটা নেগেটিভ চিন্তা। নামাজ পড়ার উদ্দেশ্য পজিটিভও হতে পারে - আল্লাহর সন্তুষ্টি, আল্লাহর রহমত, বরকত আর তাঁর সান্নিধ্য পাওয়ার ইচ্ছা কারণ হতে পারি। উদাহরণ দিয়ে বললেন, কোন ছাত্র বা ছাত্রী যে কিনা শুধু পাস করার জন্য পড়ে, আর যে ছাত্র বা ছাত্রী কোনো সাবজেক্ট পছন্দ করে বলে পড়ে - যদিও তারা দুইজনই পড়ছে, কিন্তু তারা কি কখনো এক হতে পারে? ইমাম বললেন, তোমার জীবনে যা কিছু ভালো, রহমত, রিজিক ইত্যাদি সবকিছুই আল্লাহ তা'য়ালার কাছ থেকে আসে। আমি হয়তো মাধ্যম মাত্র। কাজেই তুমি যদি চাও এইসব তোমার জীবনে জারি থাকুক, তাহলে আল্লাহ'র সাথে তোমার সেই সম্পর্কটার কথা তোমার মনে রাখা দরকার। কিন্তু সেটা মনে রাখবে কিভাবে? নামাজ পড়ে। নামাজই হচ্ছে সবচেয়ে ভালো জিকির। তাছাড়াও, আল্লাহ বলেছেন, নামাজ হচ্ছে সেই উপায় যেটা তোমাকে অশ্লীলতা থেকে বাঁচিয়ে রাখবে। আজকের দিনে চারিদিকে অশ্লীলতার ছড়াছড়ি। বাবা হিসেবে আমি চাইলেও তোমাকে সেই অশ্লীলতা থেকে বাঁচাতে পারবো না। আর অশ্লীলতা অনেকটা দূষিত বাতাসের মতো। প্রথম কিছুদিন তুমি সেটা নিশ্বাসের সাথে নিলে কাশবে, কিন্তু কিছুদিন পরেই সেটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাবে। একইভাবে অশ্লীলতা তোমার অন্তরকে দূষিত করে দিবে, আর তখন তুমি আরো খারাপ কাজ করতে দ্বিধা করবে না। আর এই নামাজই সেই খারাপ রাস্তা থেকে তোমাকে বাঁচাতে পারবে।
ইমাম সবশেষে বাবা-মাদের উদ্দেশ্যে দুই-একটা কথা বলেছেন। [সেটা আমি আর লিখছি না। ভিডিওটা দেখে নেয়ার অনুরোধ থাকলো।]
খুতবার ভিডিও লিংক: https://youtu.be/ssLAhmuq1G8
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন