এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩): আত্ম-উপলব্ধি

এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩): আত্ম-উপলব্ধি 
মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি।

ইমাম শুরু করলেন বলে যে: অনেক সময় দেখা যায়, দুইজন মানুষ একটা জিনিসের দিকে একইসাথে, একই সময় নিয়ে তাকালো, তারপর তাদের একজন হয়তো কিছু একটা বুঝলো, কিন্তু অপরজন অনেক গভীর ভাবে চিন্তা করে ওই একই জিনিসের ব্যাপারে অনেককিছু বুঝে গেলো, অনেক কিছু বিশ্লেষণ করে ফেললো। তখন আমরা বলি দ্বিতীয় ব্যক্তির চিন্তার গভীরতা অনেক, অন্তর্দৃষ্টি অনেক। ইমাম বললেন, এই অল্প সময়ে বেশি কিছু করে ফেলার ক্ষমতা, অনেকদূর পর্যন্ত চিন্তা করে ফেলার সক্ষমতা, কিংবা কম ইনপুটে বেশি আউটপুট আসাকে ইংরেজিতে ইফিসিয়েন্সি বা প্রোডাক্টিভিটি বলে, আর অনেকটা এই একই অর্থে আরবি 'বারাকা' শব্দ ব্যবহার হয় [সাইডনোট: বাংলায় আমরা অল্পতে বেশি পাওয়াকে "বরকত" বলি]। ইমাম আরো উদাহরণ দিলেন, আমরা অনেকে সূরা ফাতেহার অর্থ জানি, কিন্তু শুধু এই সূরা ফাতেহার অর্থের তাফসীর করতে গিয়ে অনেক আলেম পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে গেছেন, কয়েক খন্ডের বই বের করেছেন। আর এই যে এতো কম শব্দে, এতো অল্প বাক্যে আল্লাহ তা'য়ালা এতো গভীর একটা জিনিস, এই কুরআন মানুষকে দিয়েছেন, এটাই একটা 'বারাকা'। আল্লাহ তা'য়ালা নিজেই এটা কুরআনে বলেছেন।

এরপর ইমাম সূরা সোয়াদ  -এর আয়াত তেলাওয়াত করলেন [সূরা নম্বর ৩৮, আয়াত ২৯], যার অর্থ অনেকটা এইরকম: "এই সেই 'বরকত'ময় বই, যা আমরা তোমার [রাসূল (সাঃ)] উপর অবতীর্ন করেছি যেন জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিরা এর আয়াত [বা নিদর্শন] নিয়ে চিন্তা করে আর উপদেশ গ্রহণ করে।" [সাইডনোট: ক্লাসিকাল আরবিতে সন্মান আর মহিমা প্রকাশ করতে একবচন  'আমি' না বলে নিজেকে বহুবচন 'আমরা' বলে সম্বোধন করা হয়। কুরআনে এর অনেক উদাহরণ আছে। আর এই একই জিনিস নাকি আগের ক্লাসিকাল ইংরেজিতে রাজা-বাদশাদের বিভিন্ন আদেশ জারিতে দেখা যেত, তাদের বিভিন্ন প্রজ্ঞাপনে নিজেকে 'I' না বলে 'We' বলতে দেখা যেত]। এরপর ইমাম সূরা সোয়াদ এরপরের কয়েকটা আয়াত [সূরা নম্বর ৩৮, আয়াত ৩০ - ৩৩] তেলাওয়াত করে ব্যাখ্যা করলেন যেখানে আল্লাহ তা'য়ালা সুলাইমান (আ) -এর কথা, তাঁর ঘোড়া প্রীতি, সেটা সম্পর্কে তাঁর আত্ম-উপলব্ধির কথা উল্লেখ করেছেন। ইমাম এই আয়াতগুলো নিয়ে প্রচলিত কিছু ধারণা, সুলাইমান (আঃ) কে নিয়ে রাসূল (সাঃ) আর আয়েশা (রাঃ) -র একটা হাদিস, বান্দার আত্ম-উপলব্ধি আর তার ফলে মাফ চেয়ে আল্লাহ'র দিকে ফিরে আসাতে আল্লাহ তা'য়ালা যে কী পরিমাণ খুশি হোন - সেটার একটা উদাহরণ হাদিসে কিভাবে এসেছে - এইগুলো নিয়ে আলাপ করলেন।       

সূরা সোয়াদ-এর [সূরা নম্বর ৩৮: আয়াত ৩০ - ৩৩] আয়াতে আল্লাহ বলছেন, যার অর্থ অনেকটা এইরকম: "আমরা দাউদ (আঃ) কে সুলাইমান (আঃ) কে [ছেলে হিসেবে] দিয়েছিলাম। কতই না ভালো ছিল সেই বান্দা। নিশ্চয়ই সে অতিশয় আল্লাহর অভিমুখী (অর্থাৎ ফিরে আসে, তওবাকারী) ছিল। যখন সন্ধ্যা/বিকেল বেলা তার কাছে দ্রুতগামী, খুবই উঁচু মানের ঘোড়া নিয়ে আসা হলো (তিনি নামাজ পড়তে ভুলে গেলেন) আর বললেন "নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর স্মরণে, ভালোবেসে ফেলেছি এই ঘোড়াগুলির প্রতি ভালোবাসা, আর আড়ালে চলে গেলো (সূর্য - অর্থাৎ সূর্য ডুবে গেলো)"।তারপর সে বললো "নিয়ে আসো সেটা", আর সে ঘোড়াগুলির পা আর ঘাড়ে হাত বুলাতে লাগলো।"   - ইমাম বললেন এই আয়াতগুলো খুব ইন্টারেষ্টিং। আল্লাহ তা'য়ালা সুলাইমান (আঃ) কে আত্ম-উপলব্ধি সম্পন্ন একজন বান্দা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। সুলাইমান (আঃ) যে উন্নত মানের ঘোড়া ভালোবাসতেন - সেটার সাথে আজকের দিনের কারো দামি, ভালোমানের গাড়ির প্রতি ভালোবাসার তুলনা করলেন। ইমাম বললেন আমাদের মধ্যে এমন অনেকে আছেন যারা কোনো ভালো গাড়ি দেখেই সেটার খুঁটিনাটি সব বৈশিষ্ট বলে দিতে পারেন। ইমাম বললেন, সুলাইমান (আঃ) -এর সেটা বুঝতে পারার ব্যাপারটা, সেই আত্ম-উপলব্ধিটা আবারো খেয়াল করতে বললেন। বললেন ঐ আয়াতে সুলাইমান (আঃ) বলছেন তিনি কিন্তু আল্লাহর উদ্দেশ্যেই ভালোবেসে ফেলেছেন 'ঘোড়ার প্রতি ভালোবাসা'। কিন্তু সেই ভালোবাসাও যে তার সময়মতো নামাজ পড়ার কথা ভুলিয়ে দিয়েছে সেটা তিনি বুঝতে পেরেছেন। আয়াতের এরপরের অংশ নিয়ে কিছু মতভেদ আর কথা চালু আছে। ইমাম বললেন, একটা মত হচ্ছে, তাঁর এই দুর্বলতা বুঝতে পেরে সুলাইমান (আঃ) নাকি ঘোড়াগুলোকে তার সামনে নিয়ে আসতে বলেছেন, আর তারপর হাত বুলিয়েছেন কিন্তু পরে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানী করে দিয়েছেন! আবার এই কথাও প্রচলিত আছে যে, "নিয়ে আসো সেটা" - বলে তিনি সূর্যকে নিয়ন্ত্রণ করা ফেরেশতাদেরকে বলেছেন সূর্যকে ফিরিয়ে আনতে, এরপর তিনি নামাজ আদায় করেছেন। আর এই অপরাধবোধ থেকে তিনি কিন্তু ঘোড়াগুলোকে কোনো শাস্তি দেন নাই, বরং তাদের পায়ে, ঘাড়ে হাত বুলিয়ে দিয়েছেন!        

ইমাম বললেন, একটা হাদিস আছে যেখানে রাসূল (সাঃ) একবার ঘরে ফিরে আয়েশা (রাঃ) -র কিছু খেলনা দেখলেন। সেগুলোর মধ্যে একটা পাখাওয়ালা ঘোড়াও ছিল। রাসূল (সাঃ) "এইটা কী" জিজ্ঞেস করতে আয়েশা (রাঃ) নাকি বলেছিলেন, 'কেন আপনি জানেন না সুলাইমান (আঃ) -এর একটা পাখাওয়ালা ঘোড়া ছিল?' এইকথা শুনে রাসূল (সাঃ) নাকি এতবড়ো করে হেসেছিলেন যে তার মুখের ভেতরের দাঁত পর্যন্ত দেখা গিয়েছিলো। ইমাম বললেন, সুলাইমান (আঃ) এই উল্লেখই রাসূলের (সাঃ) আনন্দের কারণ ছিল।         

সবশেষে ইমাম আরেকটা হাদিস বললেন যেখানে বান্দার (আত্ম-উপলব্ধির কারণে) মাফ চেয়ে আল্লাহ'র কাছে ফিরে আসাটাকে যে আল্লাহ তা'য়ালা যে কী পরিমাণ পছন্দ করেন সেটার একটা উদাহরণ রাসূল (সাঃ) কিভাবে দিয়েছিলেন সেটা বললেন। রাসূল (সাঃ) নাকি তাঁর সাহাবীদেরকে বলেছেন, কোনো ব্যক্তি যখন মরুভূমিতে চলার সময় থেমে একটু ঘুমিয়ে নেয়, আর উঠে যখন দেখে খাবার আর পানীয় সহ তার সেই উট চলে গেছে, হারিয়ে গেছে, তখন সেই ব্যক্তি হন্যে হয়ে সেই উট খুঁজতে শুরু করে, খুঁজে না পেয়ে বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়ে, ক্লান্ত হয়ে যখন সে আবার ঘুমিয়ে পড়ে, আর এরপর যদি ঘুম থেকে উঠে দেখে যে তার সেই হারিয়ে যাওয়া উট তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে, সে যেমন তখন অতি খুশির চোটে আবোলতাবোল, উল্টো কথা বলা শুরু করে যে, "হে আল্লাহ! তুমি আমার বান্দা আর আমি তোমার রব"! - আল্লাহ তা'য়ালা তার থেকেও বেশি খুশি হোন যখন কোনো বান্দা তার কাছে মাফ চায়, ফিরে আসে।   

ইমাম বললেন, তিনি চান আমরা আল্লাহ'র কথা চিন্তা করলে যেন তার এই খুশির কথা সবসময় চিন্তা করি, আর আমাদের দুর্বলতা, ভুলগুলো আত্ম-উপলব্ধি করে, সবসময় মাফ চেয়ে আল্লাহর কাছে যেন ফিরে আসি।  

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ