এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩): প্রসঙ্গ ভূমিকম্প

এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩): প্রসঙ্গ ভূমিকম্প 
ইয়াকীন ইনস্টিটিউট পডকাস্ট, শেখ মুহাম্মদ এলসিনাওয়ে 

[সাইড নোট: এই শুক্রবার কাজ থেকে বেরিয়ে অন্য এক মসজিদে জুমুআর নামাজে পৌঁছাতে দেরি করে ফেলেছি। খুতবার শুধু শেষ অংশ শুনতে পেরেছি। ইমাম আলোচনা করছিলেন তুরস্ক-সিরিয়ার ভূমিকম্প নিয়ে। তার আগে এশার নামাজের পর আমাদের মসজিদের ইমামও ছোট করে আলোচনা করেছিলেন ভূমিকম্প নিয়ে। কিন্তু দু'টার কোনোটাই সম্পূর্ণ ছিল না। তাই, এই শুক্রবারের খুতবার সারমর্ম কী লিখবো, ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কিন্তু এর পরই, ইয়াকীন ইনস্টিটিউটের পডকাস্টটা শুনলাম, আমি নিচে লিংক দিয়ে দিচ্ছি। এই পডকাস্ট-এর ব্যাপারে একটু বলে নেই: উপস্থাপক প্রতি পর্বে বিভিন্ন ইসলামী আলোচক, আলেমকে নিয়ে আসেন আর খুবই সমসাময়িক, আমাদের মনে যেইসব প্রশ্ন প্রায়ই আসে, কিন্তু সাহস করে জিজ্ঞেস করতে পারি না, কিংবা কাকে জিজ্ঞেস করবো সেটাও ভেবে পাই না - এমন প্রশ্ন গুলো করেন, আর সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেন। এই পর্বেও তার ব্যতিক্রম না। উপস্থাপক জিজ্ঞেস করেছেন: আল্লাহ তা'য়ালা কী করে ভূমিকম্পের মতো এতবড়ো দুর্যোগ, তাও আবার মুসলিম দেশগুলোতে দিলেন? এটা কী পাপের শাস্তি? এতো বাচ্চা মারা গেলো, তাদের কি হবে? - এরকম বেশ কয়েকটা 'কঠিন' প্রশ্ন। আমি অনুরোধ করবো, কারো যদি ইংরেজি বুঝতে অসুবিধা না হয়, তাহলে নিজেই পডকাস্টটা শুনে নিবেন। হৈচৈ'র মধ্যে না, বরং চুপচাপ পরিবেশে মনোযোগ দিয়ে শুনে নিবেন। আমি সারমর্ম লিখে কোনোভাবেই পুরো আলোচনার বিষয় তুলে আনতে পারবো না। আমি এই পডকাস্টের মূল, আর আমাদের ইমামের আলোচনার সারমর্ম লিখার চেষ্টা করছি। 

দয়াময়, পরম করুনাময় আল্লাহ তা'য়ালা কী করে এতো বড় দুর্যোগ দিতে পারলেন? এই প্রশ্নের উত্তরে ইমাম শেখ এলসিনওয়ে বললেন, আমাদের প্রথমেই বুঝতে হবে যে, আমরা মানুষ অতি ক্ষুদ্র, নগন্য। আর এইসব ভূমিকম্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা কতটা অসহায়, ক্ষমতাহীন। আরো মনে রাখতে হবে, আমাদের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। আমাদের সীমিত জ্ঞানে আল্লাহ তা'য়ালার ক্বদর বা ইচ্ছা আমরা সবসময় বুঝতে পারবো না। উদহারণ হিসাবে ইমাম কুরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে বললেন [সূরা বাকারা, সূরা নম্বর ২, আয়াত ৩৪], আল্লাহ তা'য়ালা যখন আদম (আঃ) কে তৈরী করেন, তখন ফেরেশতারা আল্লাহ তা'য়ালাকে প্রশ্ন করেছিল, মানবজাতি তৈরী করে কি হবে যখন ওরা দুনিয়াতে রক্তপাত ঘটাবে, ফ্যাসাদ সৃষ্টি করবে? উত্তরে আল্লাহ তা'য়ালা বলেছিলেন: নিশ্চয়ই আমি জানি যা তোমরা জানো না। আর এরপর যখন তারা আল্লাহ তা'য়ালার শিখানো, আদম (আঃ)-র জ্ঞানের নমুনা দেখলো,  তখন তারা আল্লাহকে বলেছিলো: সব পবিত্রতা আপনার, আমাদের কোনো জ্ঞান নাই শুধু আপনি যতটুকু শিখিয়েছেন তা ছাড়া। আপনিই মহাজ্ঞানী, মহাবিজ্ঞ। 

এরপর ইমাম বললেন, আল্লাহ তা'য়ালা জানেন যে মানুষ তাঁর ক্বদরের, সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অনেক কিছুই  অনেক সময় বুঝবে না। আর তাই, আল্লাহ তা'য়ালা কিছু ঘটনার ব্যাখ্যা কুরআনে দিয়ে দিয়েছেন। যেমন মুসা (আঃ) আর আল-খাদররের ঘটনা কুরআনে আল্লাহ বলেছেন। যখন আল-খাদর গরিব মাঝিদের নৌকা নষ্ট করে দিচ্ছিলেন, মুসা (আঃ) এর কারণ বুঝতে পারছিলেন না। আবার যখন আল-খাদর ছোট একটা বাচ্চাকে মেরে ফেললেন, মুসা (আঃ) তখন রীতিমতো প্রতিবাদ করেছিলেন। তখন আল্লাহ'র নির্দেশে আল-খাদর ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, নৌকা গুলো নষ্ট করা হয়েছে তাদেরকে এক রাজার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য যে কিনা ভালো সব নৌকা বাজেয়াপ্ত করছিলো। আর আল্লাহর নির্দেশে বাচ্চাকে মেরে ফেলার ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন। ইমাম বললেন, কিন্তু এইসব ব্যাখ্যা মুসা (আঃ) আর তার পর কুরআন আর রাসূল (সাঃ)-এর  মাধ্যমে আমরা এখন জানলেও, সেই মাঝিরা আর মারা যাওয়া বাচ্চার মা-বাবা কিন্তু কোনোদিন জানতে পারে নাই, কিয়ামতের দিন হয়তো তারা জানতে পারবে। কাজেই, এই ভুমিকম্প আর তার কারণে এতো ক্ষয়-ক্ষতির কারণ আমরাও হয়তো পরে বুঝতে পারবো। 

এরপর উপস্থাপক জিজ্ঞেস করলেন, তিনি ছোট বেলা থেকেই শুনে আসছেন, এইসব ভুমিকম্প, দুর্যোগ এক ধরণের গজব, যা মানুষের পাপের ফল, তাই কি? উত্তরে ইমাম বললেন, রাসূলের (সাঃ) -এর একাধিক সহীহ হাদিস আছে, যা এই ধারণাকে সমর্থন করে। যেমন, ওমর (রাঃ), আয়েশা (রাঃ)  আর ইবনে মাসুদ (রাঃ)'র বর্ণনায় আছে যে, যখন মদ্যপান, গান-বাজনা আর ব্যভিচার ছড়িয়ে পড়বে, তখন তাদের পায়ের নিচের মাটি কেঁপে উঠবে, ভূমিকম্প হবে। কিন্তু এইসাথে এই হাদিসও আছে যেখানে, রাসূল (সাঃ) বলেছেন প্লেগকে আল্লাহ তা'য়ালা আগেরদিনের মুশরিকদের জন্য গজব, আর মুসলিমদের জন্য রহমতের কারণ বলেছেন। এর কারণ কি? এরকমও হাদিস নাকি আছে যেখানে রাসূল (সাঃ) বলেছেন, মু'মিনদের জন্য আল্লাহ তা'য়ালা এই দুনিয়াতেই কষ্ট-শাস্তি দিয়ে পবিত্র করে নিবেন, যাতে আখিরাতে তারা পবিত্র হয়ে উত্থিত হবে। বলা আছে, তাদের জন্য 'নির্যাতন', 'মৃত্যু' আর 'ভূমিকম্প'-র মতো পরীক্ষা থাকবে।অর্থাৎ, তার মানে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগকেই শুধু গজব আর শাস্তি হিসাবে দেখার কারণ নাই। অনেক সময় এইসব দুর্যোগ মানুষদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনে, গুনাহ মাফ করে, পবিত্র করে।

এরপর উপস্থাপক প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা, তুরস্ক-সিরিয়া এগুলোতো মুসলিম দেশ, আল্লাহ তাদেরকে এতবড় দুর্যোগ কেন দিলেন? মুসলিম দেশগুলোই খালি এতো বড় বিপদে কেন পড়ে? উত্তরে ইমাম বললেন, আমরা অনেক সময় কোনো দুর্যোগে আগের দুর্যোগগুলোর কথা ভুলে যাই, আর শুধু মুসলিম দেশ গুলোকে নিয়ে ভাবি। মনে করিয়ে দিলেন হাইতিতে ২০১০ সালে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পের কথা। হাইতি মুসলিম দেশ ছিল না, কিন্তু তাদের সেই দুর্যোগে ২ লক্ষের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিলো। ইমাম প্রশ্ন করলেন, আর করোনা মহামারীকে কি আমরা দুর্যোগ বলবো না? শুধু আমেরিকাতেই এই করোনাতে ১০ লক্ষের বেশি মানুষ মারা গেছে। আরো বললেন,  শুধু মৃতের সংখ্যা নয়, উনি সার্চ করে দেখেছেন, পৃথিবীতে সবচেয়ে ভূমিকম্প প্রবণ প্রথম ১০ টি দেশের মধ্যে খালি ২ টি মুসলিম দেশ আছে। 

উপস্থাপক এর পর বললেন, একটা খবর বা ছবি খুব শেয়ার হচ্ছে, এই ভূমিকম্পে একটা বাচ্চা জন্ম নিয়েছে, যার মা-বাবা সহ পরিবারের সবাই মারা গেছে, এই বাচ্চার সম্পর্কে আপনি কি বলবেন? ইমাম বললেন, শুধু তর্কের খাতিরে না, কিন্তু একটু ভেবে দেখেন, শিশু রাসূল (সাঃ)-এর কথা। তিনি তাঁর বাবার মুখ দেখেন নাই। মা'কে খুব একটা পান নাই। তাঁর দাদা তাঁকে লালন পালন করেছেন। সেই দাদাও কিছুদিনের মধ্যেই মারা যান। আল্লাহ কেন এমনটা করলেন? কিন্তু আমরা পরে বুঝতে পারি আল্লাহ তা'য়ালা আসলে পুরাটা সময় রাসূল (সাঃ) কে নবী হিসাবে তৈরী করছিলেন। ইমাম আরো বললেন, আমরা অনেক সময় নিজেদের স্বচ্ছন্দে, আরামের পরিবেশে বসে এইধরণের প্রশ্ন করি। কিন্তু যারা আসলে ভুক্তভোগী তাদের অনেকেই এমন কোনো প্রশ্ন করে না। উদহারণ দিলেন, তিনি দেখেছেন ধ্বংসস্তূপে নিচে আটকা পড়া একটা লোক ওই অবস্থায় ওযু করার জন্য পানি চাচ্ছে। বাকি লোকজন তাকে ধুলা দিয়ে 'তাইমুম' করে নিতে বললেও সে রাজি হচ্ছে না। ওই অবস্থায়ও লোকটার কোনো অভিযোগ নেই বরং আল্লাহ তা'য়ালার প্রতি তার বিশ্বাস, ভালোবাসা আছে। ইমাম আরো বললেন, আমরা এমন একটা দুর্যোগ দেখে প্রশ্ন করে বসি, কিন্তু আল্লাহ তা'য়ালা যে তার আগে বেশিরভাগ সময়ই আমাদের রহমত দিয়ে বাঁচিয়ে রাখছেন, সেটা নিয়ে কোনো কথা বলি না। এরপর তিনি বললেন, কারো আখিরাতে বিশ্বাস না থাকলে এই কষ্ট মেনে নেয়া কঠিন হবে। বললেন ভেবে দেখতে যে আখিরাতে যখন মুসা (আঃ) এর ঘটনার সেই মারা যাওয়া বাচ্চাকে তাঁর মা-বাবার  সাথে বেহেশতে এক করা হবে, অন্তহীন সুখ-সাচ্ছন্দ দেয়া হবে, তখন কী আল্লাহ তা'য়ালা তার সাথে ন্যায় আচরণ করবেন? না, বরং তার চেয়ে আরো বেশি দয়া দেখবেন, ঠিক না? 

সবশেষে উপস্থাপক বললেন, তার নয় বছরের ভাতিজি যখন তাকে এই ভূমিকম্প নিয়ে প্রশ্ন করবে, তখন তাকে তিনি সহজ করে কি বলবেন? উত্তরে ইমাম বললেন, তিনি  বলবেন, আমাদের রাসূল (সাঃ) এর একটা হাদিস আছে, যেখানে তিনি বলেছেন, দুনিয়াতে সবচেয়ে ভুক্তভোগী, কষ্ট পাওয়া মানুষগুলোকে যখন বেহেশতে একবারের জন্য 'ডুব' দিয়ে আনিয়ে জিজ্ঞেস করা হবে তাদের কোনো কষ্ট ছিল কিনা, তার আল্লাহ'র নাম শপথ করে উত্তরে বলবে তাদের কোনো কষ্টই কোনোদিন হয় নাই। ইমাম বললেন, তার মানে এই না যে তারা মিথ্যা বলবে, বেহেশতের আরাম-স্বাচ্ছন্দ এতটাই থাকবে যে তারা দুনিয়ার সব কষ্ট ভুলে যাবে। আমরা দোয়া করবো, বিশ্বাস করবো, যে এই ভূমিকম্পে যেইসব নারী-পুরুষ, শিশু মারা গেছে, আল্লাহ তা'য়ালা শেষ বিচারের দিন সবাইকেই 'শহীদ'-র মর্যাদায় আবার জীবিত করবেন। আর আমরা এই ঘটনা থেকে হেদায়াত নিবো, আল্লাহ'র কাছে মাফ চাবো। 

পডকাস্টের মূল লিংক: https://youtu.be/B1L6j6XvHT0

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ