এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩): বেহেশতের চাবি মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি।

এই শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩): বেহেশতের চাবি 
মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি।

ইমাম বললেন, রাসূল (সাঃ) -এর যেমন কিছু সুন্নাহ আছে, একই ভাবে আল্লাহ তা'য়ালারও কিছু "সুনান" বা রীতি আছে। যেমন, তাঁর একটা রীতি বা নিয়ম হচ্ছে অহংকারীদের জন্য তাঁর বেহেশতের দরজা বন্ধ থাকবে,  অন্যদিকে তাঁর বেহেশতের দরজার চাবি শুধুমাত্র "মন-ভাঙা" মানুষজনের জন্য বরাদ্দ থাকবে। উদাহরণ দিয়ে বললেন, শবে মেরাজে আল্লাহ তা'য়ালা যে তাঁর রাসূল (সাঃ) কে উপরে তুলে নিয়ে গেলেন, বেহেশত-দোজখ দেখালেন, অন্যান্য নবী-রাসূলের সাথে দেখা করলেন, আর পরে তাঁর সাথে সরাসরি কথা বললেন, ৫ ওয়াক্ত নামাজ ঠিক করে দিলেন - এসবই কিন্তু রাসূল (সাঃ) -র দুনিয়াতে তাঁর সবচেয়ে "মন-ভাঙা" থাকা অবস্থায়, দুঃখের সময় ঘটেছিলো। শবে মেরাজ ঘটনা ঘটেছিল তা'য়েফের ঘটনার পর পরই। কী হয়েছিল ওই তা'য়েফের সময়? [সাইড নোট: গত বছর পেনসিলভানিয়াতে থাকার সময়, এই বিষয়ে দেয়া মসজিদের ইমামের খুতবার সারমর্ম-র লিংক নিচে দিয়ে দিচ্ছি।]     

তা'য়েফের আগে ওই একই বছর রাসূল (সাঃ) -র স্ত্রী খাদিজা (রাঃ) মারা যান। খাদিজা (রাঃ) শুধু তাঁর স্ত্রী ছিলেন না, নবুওত পাওয়ার সময় তাঁর সাথে ছিলেন, তাঁকে সান্তনা, সাহস জুগিয়েছেন। ইসলামের প্রথম দিকে তাঁকে সমর্থন করেছেন। শুধু মানসিক, আধ্যাতিক সাহায্য-সমর্থন না, অর্থনৈতিক সাহায্যও করেছেন। তার আগে, ওই বছরেই রাসূল (সাঃ)-র পিতৃসম চাচা, তাঁর অভিভাবক, কুরাইশদের হাত থেকে তাঁকে প্রটেকশন দেয়া চাচা আবু-তালিবও মারা যান। তার উপর তিনি ইসলাম কবুল না করেই মারা যান। এই অবস্থায় রাসূল (সাঃ) বাধ্য হয়ে মক্কা ছেড়ে পাশের তা'য়েফ শহরে যান। কিন্তু সেখানেও সমর্থন পান না, উল্টো তাঁকে তাড়িয়ে বের করে দেয়া হয়। তা'য়েফের মুরুব্বিদের উস্কানি আর লেলিয়ে দেয়া বাচ্চা-কাচ্চাদের ছুঁড়ে মারা পাথরে রক্তাক্ত অবস্থায় রাসূল (সাঃ) -র মন ভেঙে যায়। আর ওই সময়ই রাসূল (সাঃ) কে অনেকটা যেন সান্তনা দিতেই আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর কাছে, 'মেরাজে' নিয়ে যান। 

ওই মন-ভাঙা অবস্থায় রাসূল (সাঃ) আল্লাহ'র কাছে যেই দোয়া করেছিলেন, ইমাম বললেন সেই দোয়াটা আমাদের জন্য একটা চরম শিক্ষণীয় বিষয়। রাসূল (সাঃ) নাকি দোয়া করেছিলেন যার অংশবিশেষ অনেকটা এই রকম: "ও আল্লাহ, আমি তোমার কাছে আমার দুর্বলতার অভিযোগ করি, (তায়েফের মানুষদের) প্রভাবিত করতে না পারার অপারগতার অভিযোগ করি, আমার অপমানিত হওয়ার অভিযোগ করি। ... যতক্ষণ তুমি আমার উপর রেগে নাই, (আমার এই অবস্থার জন্য) আমার কোনো আপত্তি নাই, কিন্তু তোমার "আ'ফিয়া" (সাচ্ছন্দ, সন্মান, সমস্যামুক্তি, শান্তি ইত্যাদি) আমার অধিক কাম্য।"  ইমাম বললেন, প্রথমত খেয়াল করতে যে রাসূল (সাঃ) তা'য়েফের মানুষদের বিরুদ্ধে না, বরং তাঁর নিজের দুর্বলতার, অপারগতার অভিযোগ করছেন। দ্বিতীয়ত, তাঁর অবস্থা ভালো করার জন্য কী সুন্দর করে দোয়া করছেন: আল্লাহ খুশি থাকলে তাঁর ওই খারাপ অবস্থায়ও আপত্তি নাই, কিন্তু আল্লাহ তা'য়ালার "আ'ফিয়া" তাঁর অধিক কাম্য। অর্থাৎ, আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হচ্ছে, আমাদের যার যেই অবস্থা আছে, যে যত পরীক্ষার মধ্যে দিয়েই যাচ্ছি না কেন, আল্লাহ'র তা'য়ালার কাছে মাফ চেয়ে, আ'ফিয়া চাইতে পারি। ইমাম আরো বললেন, মানুষজনের কাছে নিজের খারাপ অবস্থার কথা জানিয়ে সহানুভূতি পাওয়ার চেয়ে, অন্যকে দোষারোপ করার চেয়ে বরং সত্যিকার অর্থে যিনি সব সমস্যার সমাধান করতে পারেন, সেই আল্লাহ'র কাছে সরাসরি "নালিশ" করাতে কোনো অসুবিধা নাই। এটা বরং কারো ঈমানের জোরেরই ইঙ্গিত দেয়। 

ইমাম আরো বললেন, শবে মেরাজে আল্লাহ তা'য়ালা রাসূল (সাঃ) তাঁর উম্মতের জন্য প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার বিধান ঠিক করেন। পরে মুসা (আঃ) এর পরামর্শে রাসূল (সাঃ) -র কয়েকবারের অনুরোধে শেষে সেটা ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার  বিধানে পরিণত হয়।  ইমাম বললেন, নামাজ হচ্ছে আল্লাহ তা'য়ালার সাথে তাঁর বান্দাদের সরাসরি কথোপকথন। কাজেই অনুমান করা যায়, এই ৫০ ওয়াক্ত নামাজের বিধান দিয়ে আল্লাহ তা'য়ালা আসলে তাঁর বান্দাদের সাথে দিনে বেশি বেশি কথা বলার সুযোগ দিতে চাচ্ছিলেন। ইমাম বললেন, আমরা ইবাদতকে এখন অনেক বেশি "রিচুয়াল" বা আচার-অনুষ্ঠানে পরিণত করে ফেলেছি। আমাদের দোয়া এখন অনেক বেশি গতানুগতিক হয়ে গেছে। আমরা সত্যিকার অর্থে আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে, আমাদের "ভাঙা-মন" নিয়ে দোয়া করলে তিনি তা অবশ্যই কবুল করবেন। আল্লাহ'র তা'য়ালার কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে, নিজের অপারগতা, দুর্বলতা, ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে, তাঁর সাহায্য চাওয়ার এই সত্যিকার "কথা বলার" মানসিকতা আমাদের তৈরী করতে হবে।    

শবে মেরাজের উপর গত বছর পেনসিলভানিয়ার মসজিদের ইমামের দেয়া খুতবার সারমর্ম: https://banglakhutba.substack.com/p/6f4

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ