এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২৪ মার্চ ২০২৩): ইবাদতে মন বসানো, সত্যিকার উদযাপন মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি।
এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২৪ মার্চ ২০২৩): ইবাদতে মন বসানো, সত্যিকার উদযাপন
মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি।
[সাইডনোট: এই মসজিদে এশার নামাজের সাথে সাথেই তারাবি শুরু করে না। সুন্নত পড়ার পর, ইমাম প্রথমে ৫-১০ মিনিটের একটা মিনি লেকচার দেন, তারপর অন্য একজন ক্বারী তারাবি শুরু করেন। রোজার মধ্যে প্রথম জুমুআ। শুক্রবার সপ্তাহের কাজের দিন হলেও অনেক মানুষ এসেছিলেন। ভিড় ঠেলে, তার উপর আমি দেরি করে ফেলায় খুতবার প্রথম অংশ মিস করে ফেলেছি। তাই আজকের লেখায় প্রথমে তার আগেরদিনের এশার পর মিনি লেকচার আর জুমআর দ্বিতীয় অংশের খুতবার সারমর্ম একসাথে লেখার চেষ্টা করছি।]
ইমাম বললেন সূরা বাকারার একটা আয়াত আছে [সূরা নম্বর ২, আয়াত ৬১] যেটা বনি-ইসরাইলিদের জন্য সুখকর না, কিন্তু আমরা মুসলিমরা তা থেকে অনেক কিছু শিখতে পারি, নিজেদের সাথে তুলনা করে ভেবে দেখতে পারি আমাদের অবস্থাটা কি। ওই আয়াতে আল্লাহ তা'য়ালা মুসা (আঃ) আর তার কাওম, বনি-ইসরাইলিদের মধ্যে কথোপকথন বর্ণনা করছেন। মুসা (আঃ) যখন বনি-ইসরাইলিদের ফিরাউনের অত্যাচার থেকে বের করে আনলেন, তারা নিজ চোখে ফিরাউনকে তার সঙ্গীদের নিয়ে পানিতে ডুবে যেতে দেখলো, তারপর যখন মরুভূমিতে তাদের নিয়ে চলার সময় আল্লাহ তা'য়ালা তাদের কোনো কষ্ট না করেই 'মান্না' আর 'সালওয়া' খাওয়ার ব্যবস্থা করলেন - তারপরও বনি ইসরাইলিরা কৃতজ্ঞ হলো না। তারা তাদের আগের, অত্যাচারিত হওয়ার সময়ের খাবার-দাবার মিস করতে লাগলো। ঐ প্রসঙ্গে ওই আয়াতে আল্লাহ তা'য়ালা রাসূল (সাঃ) কে মনে করিয়ে দিচ্ছেন, যার অর্থ অনেকটা এই রকম: "স্মরণ করো যখন তোমরা (বনি-ইসরাইলিরা) বলেছিলে, হে মুসা, আমরা এই একই খাবারে আর ধৈর্য্য রাখতে পারবো না, তাই আমাদের জন্য তোমার রবের কাছে দোয়া করো, যাতে তিনি মাটি থেকে উৎপাদন করেন তার শাকসব্জি, শশা-কাকুর, গম, ডাল, পেঁয়াজ। তিনি [মুসা (আঃ) উত্তরে] বললেন, তোমরা কি বিনিময়/পরিবর্তন করতে চাও তা যা নগন্য তার সাথে যা উত্তম?" - ইমাম খেয়াল করতে বললেন, বনি-ইসরাইলিরা কিন্তু বলেনি যে আমাদের রবের কাছে দোয়া কোরো, বরং বলেছে আমাদের জন্য "তোমার রবের" কাছে দোয়া করো। এছাড়া এটাও পরিষ্কার যে, ওদের যা আছে, তাতে তারা সন্তুষ্ট নয়, বরং তাদের মন পড়ে রয়েছে আগের ঐসব জিনিসের প্রতি।
ইমাম বললেন, এইযে অন্য কিছুতে "মন পড়ে থাকা" - এটা থেকে আমরাও মুক্ত না। বললেন, এই মুহূর্তে নামাজে এসেও হয়তো আমাদের কারো মন অন্য কিছুতে পড়ে আছে। আমরা মসজিদে উপস্থিত থেকেও আসলে মসজিদে উপস্থিত নই। কেউ হয়তো মোবাইল ফোন ঘাঁটছি, কেউ হয়তো কাজের চিন্তা করছি। আমাদের মন যা চাচ্ছে, আমাদের যেটা বাসনা - আমরা আসলে সেটাতেই পড়ে আছি। [সাইড নোট: ঠিক ওই মুহূর্তে আমার পাশের জন আসলেই মোবাইল টিপছিল, আর আমিও তার কিছুক্ষন আগেই কাজের একটা ঝামেলা নিয়ে চিন্তা করছিলাম!]। বনি ইসরাইলিদের মতো আমরাও কিন্তু আল্লাহ তা'য়ালা আমাদের যেটা এইমুহূর্তে দিচ্ছেন, তাতে শুকরিয়া না করে, তার প্রতি মনোনিবেশ না করে, আমরা অন্য যেটা যা চাচ্ছি, সেটাই নিয়ে ভাবছি। তার পরিবর্তে ইবাদতে এই "মন লাগানোর, মন ফিরানোর" চেষ্টা আমাদের করতে হবে।
----
রমাদান বা রোজা মাসে আল্লাহ তা'য়ালা কুরআন নাজিল করলেন, উদযাপন করতে রোজা বা সিয়াম পালন করতে নির্দেশ করলেন, যেন আমরা আল্লাহকে স্মরণ করতে পারি, তাক্বওয়া অর্জন করতে পারি। রাসূল (সাঃ) সপ্তাহের অন্য দিন ছাড়াও বিশেষ ভাবে সোমবার রাখতেন। তাঁকে সোমবার কেন রোজা রাখেন জিজ্ঞেস করায় তিনি নাকি উত্তরে বলেছিলেন কেননা তিনি সোমবার জন্মেছিলেন। অর্থাৎ, এক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, উদযাপন করতে তিনি রোজা রাখছেন। ইমাম বললেন, তাই রোজা রাখা একধরণের উদযাপন, খুশির কারণ। আমরা যদি মনে করি রোজা রাখা কষ্টের, তাহলে আমরা ভুল বুঝছি। না খেয়ে থাকার কিছু কষ্ট হলেও এতে আল্লাহ তা'য়ালার সন্তুষ্টির জন্য আমাদের খুশি হওয়া উচিৎ। এই ত্যাগের মধ্যে আনন্দ আছে। এরপর ইমাম বললেন, এই যে ত্যাগ, অল্পতে সন্তুষ্ট থাকা, খুশি থাকা - এটা একটা বিরাট শিক্ষা। আমরা যেন আমাদের সন্তানদের এই শিক্ষাটা দেই। তারা যেন মা-বাবা হিসাবে আমাদেরকে রোজা রেখে খুশি থাকতে দেখে, দান-খয়রাত করে আমরা যেন আনন্দ পাই, অন্যের কষ্ট লাঘবে যে স্বর্গীয় সুখ আছে - এটা যেন আমাদের সন্তানরা আমাদের মধ্যে দেখতে পায়। ইমাম সাবধান করলেন, আমরা উল্টোটা যেন না করি। আমরা যেন আমাদের সন্তানদের সব কিছু, সব-সময় দিয়ে রেখে, কিছু চাওয়া মাত্র কিনে দিয়ে এই ভ্রান্তির মধ্যে না রাখি যেন কোনো কিছু পাওয়াতেই শুধু আনন্দ। অল্পতে খুশি থাকার, সন্তুষ্ট থাকার এই শিক্ষাটা জীবনে চলার জন্য খুবই দরকারি।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন