এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (৩১ মার্চ ২০২৩): কুরআনের সাথে সত্যিকার সম্পর্ক - মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি।

এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (৩১ মার্চ ২০২৩): কুরআনের সাথে সত্যিকার সম্পর্ক 
মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি।

ইমাম বললেন আমরা যখন কুরআন খুলে বসি তখন কী আমরা বুঝি যে আসলে আমরা যেন একজন শিক্ষকের সামনে কুরআন খুলে বসলাম? এই শিক্ষক আর কেউ না, স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা নিজেই - যার ঘোষণা তিনি সূরা আর-রহমানে [সূরা নম্বর ৫৫, আয়াত ১-৪]  দিয়েছেন যার অর্থ অনেকটা এই রকম: "আর-রহমান (অশেষ দয়ালু), যিনি কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন, মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তাকে 'বায়ান' বা ভাব-প্রকাশ করার শিক্ষা দিয়েছেন"। ইমাম বললেন কিন্তু আফসোসের ব্যাপার আমরা অনেকেই কুরআন খুলি, পড়ি, কিন্তু বুঝি না। আবার অনেক সময় খুলি, পড়ি - কিন্তু পড়ার উদ্দেশ্য হয় কোনো একটা বিতর্কের ব্যাপারে ফয়সালা করতে, কিংবা নিয়ম শিখতে অথবা হয়তো সওয়াবের আশায়। কিন্তু উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ছিল দৈনন্দিন জীবনের দিক-নির্দেশনার জন্য, আল্লাহ তা'য়ালা আমাদেরকে কী বলছেন সেটা জানার জন্য।  

ইমাম বললেন, তিনি দশ বছর আগে নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তাঁর মিশন হবে যে তিনি চেষ্টা করবেন কুরআনকে দৈনন্দিন জীবনের আলাপের অংশ করতে, চায়ের টেবিলের কথোপকথনের বিষয় করতে। আর তাই তিনি তাঁর কুরআনের ক্লাসে চেষ্টা করেন খুব সহজভাবে, কুরআনের যেকোনো একটা আয়াত নিয়ে এমনভাবে আলাপ করতে যেন তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা সেটাকে জীবনের সাথে মিলিয়ে নিয়ে বুঝতে পারে [নিচে সাইডনোটে একটা উদাহরণ দিচ্ছি]। 

ইমাম বললেন রাসূলের সাহাবীরা অনেকেই কুরআনের হাফিজ ছিলেন না। ওমর (রাঃ)'র নাকি প্রায় ৮ বছর লেগেছিল কুরআনে হাফিজ হতে। আর বিখ্যাত সেনাপতি খালিদ-বিন-ওয়ালিদ নাকি কুরআনে হাফিজ হতে পারেনই নাই। কিন্তু তাঁদের প্রত্যেকেই কুরআনের শিক্ষা-দীক্ষা অন্তরে ধারণ করতে পেরেছিলেন। ইমাম বললেন, তার কারণ তাঁরা কুরআন বুঝতে পারতেন। তাঁরা "কে" এই কুরআনের শিক্ষক সেটা অনুধাবন করে নিয়েছিলেন বলেই সেটা করতে পেরেছিলেন।   

ইমাম বললেন আমরা সওয়াবের আশায় বেশি বেশি কুরআন পড়ি কিন্তু মনে রাখতে হবে আল্লাহ তা'য়ালা সূরা তাকাসুরে [সূরা নম্বর ১০২, আয়াত ১] বলেছেন, যার অর্থ: "বেশি বেশি 'জমানোর' প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে অমনোযোগী/মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে"। কাজেই, কুরআন পড়ায় অবশ্যই সওয়াব আছে, কিন্তু না-বুঝে শুধু পড়ে গেলে তাতে খুব লাভ হবে না। কুরআন নিয়ে চিন্তা করতে হবে, এর একটা আয়াত নিয়েই ভাবতে হবে। মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তা'য়ালার কাছে হয়তো আমাদের একটা সিনসিয়ার বা ইখলাস নিয়ে করা 'আমল' বা কাজই যথেষ্ট হবে। 

আরো বললেন, আল্লাহ তা'য়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এমনভাবে যে সে ভুল করবেই। কিন্তু ভুল করে অনুতপ্ত হয়ে "ভাঙা মন" নিয়ে আল্লাহর কাছে তওবা করে হাজির হলে তিনি মাফ করবেনই। মনে রাখতে হবে, সব শেষে (মৃত্যুর পর) আল্লাহ তা'য়ালার কাছে হাজির হওয়ার দুইটা উপায়: এক, অহংকারী হয়ে, আরেক নিজের দোষ-দুর্বলতা স্বীকার করে নিয়ে, আল্লাহ তা'য়ালার মাফ আর রহমতের আশায়, নিজেকে সপে দিয়ে। প্রথম অবস্থায় (অহংকারী হয়ে) হাজির হওয়ার মধ্যে মুক্তি নেই, বরং প্রকৃত মুক্তি দ্বিতীয় অবস্থায় (মুসলিম হয়ে) হাজির হওয়ায়।

[সাইড নোট/ডিসক্লেইমার: সূরা তাকাসুরের [সূরা নম্বর ১০২, আয়াত ১] ওই আয়াত: "বেশি বেশি 'জমানোর' প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে অমনোযোগী/মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে" -এর পরের আয়াতই হচ্ছে "যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপস্থিত হও"। সবসময় এই আয়াতের ব্যাখ্যায় দুনিয়ার সম্পদ জমানোর চিন্তা কবরে না যাওয়া পর্যন্ত মানুষকে ভুলিয়ে রাখবে - এইভাবে বলা হয়, ব্যাখ্যা করা হয়। এই প্রথম শুনলাম ইমাম সেটাকে না-বুঝে কুরআন পড়ে শুধু সওয়াব জমানোর চিন্তার সাথে মিলালেন! এটা শুনে একটা ধাক্কা খেয়েছি, অবাক হয়েছি। আর এই ইমামের একটা কুরআনের ক্লাস একদিন করার সুযোগ আমার হয়েছিল। সেখানে ইমাম সূরা ইব্রাহিমের দুইটা আয়াত [সূরা নম্বর ১৪, আয়াত ২৪-২৫] যার অর্থ: "Have you not seen how Allah has set forth a parable: A good word is like a good tree, having its root firm and its branches in the sky. It brings its fruits at all times with the will of its Lord. Allah sets forth the parables for the people, so that they may take lesson." - এটা নিয়ে প্রায় এক ঘন্টা আলাপ করেছিলেন। তিনি উদাহরণ দিয়েছিলেন কিভাবে আমরা এখন মেসেজে মনের ভাব প্রকাশ করতে কথায় না লিখে বিভিন্ন "ইমোজি" ব্যবহার করি, কিভাবে একটা ছবি অনেক ইমোশন প্রকাশ করে, ইত্যাদির সাথে কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ তা'য়ালা কিভাবে বিভিন্ন উপমা (parable) ব্যবহার করে, কম শব্দে অনেক কিছু প্রকাশ করেছেন, এই আয়াত দুটো পড়ার পর কিভাবে এখন থেকে একটা গাছ দেখলে, কিংবা প্রকৃতিতে ভ্রমণ করে কিভাবে আমরা কুরআনকে আরো বেশি করে উপলব্ধি করতে পারবো - ইত্যাদি নিয়ে আলাপ করেছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, একটুও বিরক্ত লাগে নাই। তবে স্বীকার করছি, অনেক সময়ই এই ইমামের অনেক কথা মাথার উপর দিয়ে যায়। কাজেই, আমার বোঝার ভুল হতেই পারে, তাই এই লেখা বা অন্য যেকোনো লেখায় সেটা মাথায় রেখে পড়ার অনুরোধ থাকল।]   

    

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ