আব্দুল্লাহ - পার্ট ২

আব্দুল্লাহ - পার্ট ২

এই মসজিদে তারাবির নামাজের আগে ইমাম ঐদিনের যে সূরা তেলাওয়াত করা হবে, তার কোনো একটা আয়াত নিয়ে সংক্ষেপে আলাপ করেন। সেদিনের আয়াতটা ছিল, সূরা ইসরার [সূরা নম্বর ১৭, আয়াত ২৬-২৭] আয়াত, যার অর্থ অনেকটা এইরকম: "নিকটাত্মীয়কে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দাও, এবং অভাবীকে, ভ্রমণকারীকে। আর অপব্যয়/অপচয় কোরো না। নিশ্চয়ই অপব্যয়/অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি বড়ই অকৃতজ্ঞ"। 

ইমাম বললেন, এইখানে আল্লাহ তা'য়ালা শয়তানের ব্যাপারে অকৃতজ্ঞ বলতে "কাফুর" শব্দ ব্যবহার করেছেন। আমরা সচরাচর "কাফুর" বা "কাফের" বলতে অবিশ্বাসী মনে করি। কিন্তু এই শব্দের অন্য অর্থ - অকৃতজ্ঞ বোঝাতেও ব্যবহার হয়। তিনি খেয়াল করতে বললেন,  শয়তান কিন্তু অবিশ্বাসী ছিল না। সে আল্লাহ তা'য়ালার আদেশ অমান্যকারী ছিল। তার প্রতি আল্লাহ তা'য়ালার নেয়ামতের অস্বীকারকারী ছিল। জ্বীন হওয়া সত্ত্বেও তাকে আল্লাহ তা'য়ালা ফেরেশতার মর্যাদা দিয়েছিলেন, কিন্তু সেইসব ভুলে সে নিজেকে মাটির তৈরী মানুষের চেয়ে ভালো মনে করেছিল,  সে আল্লাহ তা'য়ালার আদেশ অমান্যকারী ছিল, মাটির তৈরী আদম (আঃ) কে সেজদা করতে রাজি হয় নাই।

এরপর ইমাম বললেন, ওই আয়াতে আল্লাহ তা'য়ালা  আমাদেরকে গরিব আত্মীয়, মিসকিন, মুসাফিরদেরকে সাহায্য করতে বলছেন। আরো বলছেন অপচয়, অপব্যয় করতে না। ইমাম প্রশ্ন করলেন, কিন্তু আমরা কী বলতে পারবো, কিংবা কখনো ভেবে দেখেছি যে আল্লাহ তা'য়ালা কেন অপচয়কারীদেরকে শয়তানের "ভাই" বললেন?  আর এর পরপরই শয়তানের বৈশিষ্ট - যে সে বড়ই অকৃতজ্ঞ - সেটা বললেন?

ইমাম ব্যাখ্যা করলেন, যখন আমরা গরিব আত্মীয়, মিসকিনদের, মুসাফিরদের সাহায্য করবো না, তাদের 'প্রাপ্য' বুঝিয়ে দিবো না, তখন সমাজে ব্যালান্স নষ্ট হবে, গরিবরা ধনীদের ঈর্ষা করতে থাকবে, অন্যদিকে ধনীরা গরিবদের পছন্দ করবে না, বোঝা মনে করবে। তার উপর যদি যাদের অর্থ-সম্পদ আছে, তারা যদি দেখিয়ে দেখিয়ে অপচয়, অপব্যয় শুরু করে - সেটা অবস্থা আরো খারাপ করবে। একসময় মানুষ তার যা আছে, তাতে সন্তুষ্ট না থেকে,  আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে, অন্যের যা আছে - সেটা নিয়ে আফসোস শুরু করবে, ঈর্ষা করা শুরু করবে - ফলে শয়তানের মতো সেও একসময় "কাফুর' বা অকৃতজ্ঞ হয়ে যাবে, যেন সে শয়তানের 'ভাই'।

এরপর ইমাম অপচয়-অপব্যয়ের আরেকটা উদাহরণ দিয়ে আরো ব্যাখ্যা করলেন। বললেন, ধরা যাক, কোনো মেয়েকে আল্লাহ খুব সুন্দরী করে তৈরী করেন নাই, কিংবা কোনো ছেলেকে আল্লাহ তা'য়ালা অনেক অর্থ-বিত্ত দেন নাই। ঐরকম একটা মেয়ে, কিংবা ছেলে যখন আজকে সোশ্যাল মিডিয়াতে গিয়ে দেখে তার সমসাময়িক বাকিরা দেখিয়ে দেখিয়ে অপব্যয় করছে, তাদের সৌন্দর্য বা বিত্ত "শো-অফ" করছে, তখন তাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই একটা হতাশা কাজ করবে, একসময় তাদের মনে প্রশ্ন আসবে "আল্লাহ তা'য়ালা আমাকে কেন এভাবে তৈরী করলেন", "আমাকে কেন আরো দিলেন না?" - আর এই চিন্তা থেকে একসময় মানুষ তার যা আছে, তাতে সন্তুষ্ট না থেকে, ঈর্ষান্বিত হয়ে অকৃতজ্ঞ হয়ে যাবে। 

সবশেষে ইমাম ওমর (রাঃ)'র তাঁর ছেলে, আব্দুল্লাহকে দেয়া একটা উপদেশ শেয়ার করলেন। ওমর (রাঃ) নাকি তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহকে একদিন রুটিতে নানাধরণের মাখন-মশলা লাগিয়ে, মাংস দিয়ে খেতে দেখে বলেছিলেন, সে যেন সবসময় এভাবে না খায় - বরং সে যেন কোনোদিন মাখন দিয়ে, কোনোদিন ঝোল-মশলা দিয়ে, কোনোদিন মাংস দিয়ে আর কোনোদিন শুধু এমনি এমনি রুটি খায়। কারণ তাতে তার মনে কৃতজ্ঞতা বোধ জন্মাবে। ইমাম আমাদেরকেও উপদেশটা কাজে লাগাতে বললেন, পরে একটু মজা করেই বললেন, আমরা যেন সবসময় দামি গাড়ি না চালিয়ে, মাঝে মধ্যে নিজেদের পুরানো 'টয়োটা' গাড়ি চালিয়ে, সবসময় দামি পোশাক না পড়ে, মাঝে মাঝে সাধারণ কাপড় পড়েও যেন মসজিদে আসি। আরো বললেন, আমাদের বন্ধু কারা সেটা চিন্তা করে দেখতে, কারো যদি গরিব বন্ধু না থাকে, তাহলে বিশেষভাবে যেন নিজেদের অবস্থা পর্যালোচনা করি। 

[সাইড নোট: আমার দাদির একটা স্মৃতি মনে পড়ে গেলো। দাদিকে বলতে শুনতাম, তিনি চান একবেলা খাবেন, আর আরেক বেলা না খেয়ে থাকবেন। তাতে করে নাকি তার একবেলা 'শোকর' করে আর আরেক বেলা 'সবর' করে দিন যাবে। দাদি সিলেটের দরগার ইমাম সাহেবের ওয়াজ-নসিহত খুব শুনতেন। হয়তো সেখান থেকেই এইরকম কিছু একটা শুনে এসেই বলতেন। দাদি আমাদেরকে এইসব বলার সময় ইমাম সাহেবের মতো হাত নেড়ে নেড়ে বলতেন, আমরা দেখে খুব মজা পেতাম। আল্লাহ নিশ্চয়ই ইমাম সাহেব আর দাদিকে বেহেশতবাসি করবেন, আমিন।]           

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ