এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৪ এপ্রিল ২০২৩): মুসলিম, মু'মিন আর অন্যের প্রতি ব্যবহার
এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৪ এপ্রিল ২০২৩): মুসলিম, মু'মিন আর অন্যের প্রতি ব্যবহার
মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি।
[ডিসক্লেইমার: আজকের লেখা তিন ভিন্ন দিনের আলোচনার সারমর্ম। এরমধ্যে প্রথমটা শুধু গত খুতবার একটা চুম্বক অংশ, বাকিগুলো অন্যদিন তারাবির আগের হালাকা বা সংক্ষিপ্ত আলোচার মূল বিষয়বস্তু - খুব সংক্ষেপে লিখছি। বরাবরের মতো আগেই বলে নিচ্ছি, সবগুলো লেখাই আমার শুনে, বুঝে আর তারপর কিছু ইন্টারনেট ঘেঁটে রেফারেন্স বের করে লেখা, কিন্তু আমার বোঝার ভুল হতেই পারে। তাই, নিজেরা যাচাই করে নেয়ার অনুরোধ থাকলো।]
১. অন্যের সাথে ব্যবহার:
ইমাম বললেন আমাদের মধ্যে অনেকে খুব "পরহেজগার" হিসেবে পরিচিত। এতটাই ইবাদতে মশগুল যে অন্যের কী হলো তার কোনো খবর নাই, তাতে কিছু যায় আসে না। যেন তাদের "হৃদয়" পুরাটাই আল্লাহর জন্য বরাদ্দ। আপাত দৃষ্টিতে সেটা ভালো মনে হলেও, আসলে সেটা মোটেও ভালো না। ইসলাম আমাদের এই শিক্ষা দেয় না। আমরা যদি আল্লাহর সৃষ্টিতে আল্লাহর রহমত, কুদরত খুঁজে না পাই - তাহলে আমাদের মধ্যে সমস্যা আছে। কোনো মানুষকে দেখে - সে যে ধর্ম, বর্ণ, জাতি বা গোত্রের হোক না কেন, তার মধ্যে যদি আমরা আল্লাহর সৃষ্টির সৌন্দর্য খুঁজে না পাই, তার জন্য যদি আমাদের মনে কোনো দরদ না থাকে, তাহলে আমরা ভুল করছি। আমাদের আশেপাশের সবাইকে, সব মানুষকে আল্লাহর জন্য আমাদের ভালোবাসতে হবে। তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে, তাদের ভালো-মন্দের খোঁজখবর নিতে হবে।
২. সুলাইমান (আঃ) এর দোয়া:
সূরা সোয়াদ [সূরা নম্বর ৩৮, আয়াত ৩৪-৩৫]-এ আল্লাহ তা'য়ালা সুলাইমান (আঃ) এর একটা দোয়ার উল্লেখ করেছেন, যার অর্থ অনেকটা এই রকম: "নিশ্চয়ই আমরা সুলাইমানকে পরীক্ষা করেছিলাম, তার সিংহাসনের উপর একটা দেহ রেখে দিলাম, অতঃপর সে মুখ ফেরালো। সে বললো, 'হে আমার রব, আমাকে মাফ করো, আর আমাকে এমন রাজ্য দাও যা আমার পর আর কারো জন্য প্রযোজ্য হবে না, নিশ্চয়ই তুমিই মহাদাতা'"। [সাইডনোট: সত্যি বলতে এই আয়াত যখন আমি আগে পড়েছিলাম, তখন ভেবেছি একজন নবীর জন্য আল্লাহ তা'য়ালার কাছে দুনিয়ায় রাজ্য চাওয়ার দোয়াটা কেমন জানি, যেন মানায় না, সাথে যায় না। এর কারণ কী? কিন্তু উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করি নাই। সেদিন ইমাম যে ব্যাখ্যা দিলেন, তাতে পরিষ্কার হলো।] ইমাম বললেন, সুলাইমান (আঃ) এমন একজন নবী যাঁকে আল্লাহ তা'য়ালা নবূয়ত আর রাজ্য দুই-ই দিয়েছিলেন। দুটোই তাঁর জন্য পরীক্ষা ছিল। কিন্তু সুলাইমান (আঃ) রাজ্য পরিচালনার থেকে আল্লাহ'র ইবাদতে বেশি মনোযোগী হতে প্রায়ই নিজেকে গুটিয়ে নিতেন, লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যেতেন। এমন এক সময়ই সুলাইমান (আঃ) একবার দেখেন, তাঁর সিংহাসনে তার মতোই দেখতে একজন বসে আছেন। তখন তিনি উপলব্ধি করেন যে আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর আকৃতিতে একজন জ্বীনকে সিংহাসনে বসিয়ে রেখেছেন। তিনি তাঁর ভুল বুঝতে পারেন যে তাঁর জন্য রাজ্য পরিচালনা করা, তাঁর প্রজাদের প্রয়োজন মেটানো, দেখ-ভাল করার দায়িত্বও ইবাদত। আর তখনই তিনি তওবা করলেন (মুখ ফেরালেন) আর আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন যেন তাঁকে এমন রাজ্য দেয়া হয়, যার মতো আর কোনো রাজ্য আর কারো জন্য কোনোদিন প্রযোজ্য হবে না - এ যেন ভুল বুঝতে পেরে আল্লাহ তা'য়ালাকে বলা যে আমাকে আপনার ইবাদত করার আরো বড় সুযোগ দিন, যেন আমি আরো ভালো করে আপনার ইবাদত করতে পারি - সেটা মোটেও দুনিয়ার সুখ-সাচ্ছন্দ চাওয়ার জন্য নয়।
ইমাম বললেন, ইসলাম নির্বাসনে গিয়ে শুধু নিজে নিজে ইবাদত করার ধর্ম নয়। যদিও আমরা অনেকেই [বিশেষ করে বিদেশে] ইসলাম পালনকে 'প্রাইভেট' করে ফেলেছি। মনে রাখতে হবে, আমাদের কাজের মাধ্যমেই আমরা রাসূল (সাঃ) ঐতিহ্য, সুন্নাত ধারণ করি, প্রচার করি। আমাদেরকে দেখেই অন্যেরা ইসলাম সম্পর্কে জানবে। এ ব্যাপারে তাই আমাদের সাবধান থাকতে হবে।
৩. আমরা মুসলিম না মু'মিন?:
ইমাম সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন, আমরা মুসলিম নাকি মু'মিন? উত্তরে তিনিই বলে দিলেন, আমরা সবাই 'মুসলিম' - অর্থাৎ আল্লাহ'র ইচ্ছায় নিজেকে সমর্পনকারী। সাবধান করলেন, আমরা যেন নিজেদের মু'মিন দাবি না করি। কারণ, মু'মিন মানে হচ্ছে যার অন্তরে 'ঈমান' বা সত্যিকার 'বিশ্বাস' আছে। এটা অন্তরের ব্যাপার - যেটা আল্লাহ তা'য়ালা ছাড়া আর কেউ জানে না। এমনকি আমরা নিজেরাও নিজেদের অন্তরের সত্যিকার অবস্থা কিংবা ঈমানের ব্যাপারে জানি না। কাজেই, আমরা যেন সাবধান থাকি, কখনোই নিজেদের 'মু'মিন' বলে দাবি না করি। ইমাম একটা হাদিস বললেন, যেখানে এক সাহাবী যুদ্ধে এক শত্রুকে পরাস্ত করলেন। যেইনা তাকে শেষ করে ফেলবেন, সেই মুহূর্তে সেই শত্রু নাকি 'কালেমা' পড়ে ফেলে। কিন্তু সাহাবী ভাবেন সে বাঁচতেই এমনটা করছে, ভেবে তাকে মেরে ফেলেন। এই খবর যখন রাসূল (সাঃ) কাছে পৌঁছায়, তখন নাকি তিনি বারবার বলতে থাকেন, সেই সাহাবী কী ওই শত্রুর 'অন্তর' চিড়ে দেখেছেন যে সেখানে ঈমান ছিল কিনা? অর্থাৎ, কেন তিনি শত্রুর 'ঈমানের' ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে তাকে মেরে ফেললেন? ওই সাহাবী নাকি তখন লজ্জিত হয়ে বলেছেন, হায়, আমি যদি আজকে 'মুসলিম' হতাম। অর্থাৎ, মুসলিম হয়ে আগের ভুলগুলোর যদি মাফ পেয়ে যেতাম!
ইমাম এরপর সূরা হুজুরাতের [সূরা নম্বর ৪৯, আয়াত ১৪] আয়াত বললেন, যেখানে আল্লাহ তা'য়ালা আরব বেদুঈন যারা রাসূল (সাঃ) এর কাছে এসে 'আমান্না" - "আমরা ঈমান এনেছি" বলে ঘোষণা দিয়েছিলো, তাদের ব্যাপারে রাসূলকে বলতে বলছেন, যার অর্থ অনেকটা এইরকম: "মরুবাসীরা বলে, 'আমরা ঈমান এনেছি', বলো, না তোমরা ঈমান আনোনি, বরং বলো 'আমরা সমর্পন (আসলামনা - বশ্যতা) করছি'। ঈমান তোমাদের অন্তরে এখনো প্রবেশ করেনি। যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো, তাহলে তিনি তোমাদের কর্মফলের প্রতিদানে কোনো কমতি করবেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
ইমাম বললেন, ইসলাম অত্যন্ত সুন্দর দ্বীন। ইসলাম আমাদেরকে শিক্ষা দেয়, আমরা যেন কখনোই নিজেদের 'ঈমানের' ব্যাপারে নিশ্চিত না হই, কখনো নিজেদের মু'মিন দাবি করে না বসি, কিন্তু অন্যের 'ঈমানের' ব্যাপারে যেন কখনো প্রশ্ন না করি, বরং ধরেই নেই যে আরেকজনের 'ঈমান' সম্পূর্ণ আছে। অর্থাৎ, নিজেদের ব্যাপারে কঠোর, কিন্তু অন্যের ব্যাপারে অত্যন্ত নমনীয় হই। আমাদের প্রতিদিনই নিজেদের ঈমানের ব্যাপারে পরীক্ষা দিতে হবে। সেটা অন্যের প্রতি ব্যবহারে, নিজেদের কাজ-কর্মে, ইত্যাদি ছোট ছোট সব বিষয়েই দিতে হবে। নিজেদের ঈমানের ব্যাপারে আমরা আশা করতে পারি, কিন্তু নিশ্চিত হতে পারি না - এই আশা আর ভয়ের ব্যালেন্সে আমাদের চলতে হবে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন