এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২৮ এপ্রিল ২০২৩): মৃত্যুই নিশ্চিত, বাকি সবকিছু অনিশ্চিত

এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২৮ এপ্রিল ২০২৩): মৃত্যুই নিশ্চিত, বাকি সবকিছু অনিশ্চিত
ইমাম সাফওয়ান ঈদ, মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি। 

[সাইড নোট: এই কয়েকদিনের মধ্যে দুই জন আলেমের মৃত্যু হয়েছে। একজনের নাম সিদি মুয়াজ আল-নাস, আরেকজন শেখ আব্দুল্লাহ কামেল। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আমি যদিও তাঁদের কাউকেই চিনতাম না, কিন্তু যাঁদের চিনি, যেমন ড. ওমর সুলাইমান, উনার ফেইসবুক পোস্ট, কিংবা মসজিদের হোয়াটসআপ গ্রুপে বিভিন্ন মেসেজ দেখে মনে হলো, এঁরা দুইজনই বেশ পরিচিত ছিলেন, সবাই তাঁদের পছন্দ করতেন। শেখ আব্দুল্লাহ কামেল সম্ভবত নিউ জার্সির কোনো এক মসজিদের ইমাম ছিলেন। এই রোজায় তারাবী সহ অনেক মানুষের ঈদের নামাজের ইমামতি করেছেন। উনি সম্ভবত চোখে দেখতেন না। তিনি নাকি আবার এর মধ্যেই বাবা হয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী তাদের নিজের দেশে একটা ছেলের সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। কিন্তু সেই ছেলেকে আর কোলে নেয়া হয় নাই, তার আগেরই ঘুমের মধ্যে তিনি মারা গেছেন। এই দুইজনের বয়সই ৩০-৪০ এর মধ্যে ছিল। খুতবায় ঘুরে-ফিরে ইমাম মৃত্যু, এঁদের হঠাৎ চলে যাওয়া, আমরা কিভাবে মৃত্যু প্রস্তুতি নিতে পারি - ইত্যাদি নিয়েই আলাপ করেছেন।]

ইমাম সূরা আল-হিজর এর কয়েকটা আয়াত [সূরা নম্বর ১৫, আয়াত ৯৭-৯৯] নিয়ে আলাপ করলেন, যেখানে আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর রাসূল (সাঃ) কে বলছেন, যার অর্থ অনেকটা এইরকম: "নিশ্চয়ই আমরা জানি যে তোমার অন্তর সংকুচিত/পীড়িত হয় তাদের কথাতে। সুতরাং, তোমার রবের পবিত্রতা আর প্রশংসা ঘোষণা করো, আর সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হও। এবং তোমার রবের ইবাদত করো যতক্ষণ না পর্যন্ত তোমার কাছে নিশ্চয়তা আসে।"  ইমাম বললেন, তাফসীর কারীরা এই "নিশ্চয়তা আসা" বা "ইয়াকিন আসা" বলতে আল্লাহ তা'য়ালা মৃত্যু আসাকে বুঝিয়েছেন বলে ব্যাখ্যা করেছেন। যেন আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর রাসূল (সাঃ) কে বলছেন, তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর নিন্দুক, শত্রু, আর অবিশ্বাসীদের কথায় তিনি কষ্ট পাবেনই। এ থেকে বাঁচার উপায় আল্লাহর ইবাদতে মনোযোগী হওয়া আর মৃত্যুর আগে বাকি সবকিছুই অনিশ্চিত, কেবল মৃত্যুই "ইয়াকীন" বা নিশ্চিত যা তাঁকে পরিপূর্ণ মুক্তি দিতে পারে।  

ইমাম বললেন, আল্লাহ তা'য়ালা কুরআনে অন্য জায়গায় বলেছেন [সূরা আল-হাজ, সূরা নম্বর ৫ -এর অংশবিশেষ]: "তোমাদের মধ্যে কেউ কম বয়সে মারা যাবে, আর কেউ এতো বৃদ্ধ বয়সে মারা যাবে যে তার কোনো জ্ঞানই থাকবে না, যা আগে তার ছিল।" - যা ডিমেনশিয়া, এমনেশিয়াকে বা স্মৃতিভ্রষ্টতাকে বুঝাচ্ছে। এক পর্যায়ে ইমাম বললেন, আল্লাহ'র কাছে আমাদের মধ্যে কে কম বয়সে মারা গেলো, আর কে বেশি বয়সে মারা গেলো - সেটা মুখ্য হবে না। আমরা কে কী আমল নিয়ে আল্লাহ তা'য়ালার সামনে দাঁড়াবো, সেটাই আসল হবে।  আল্লাহ তা'য়ালা কুরআনে বলেছেন, সুরঃ আন-নাহল [সূরা নম্বর ১৬, আয়াত ৯৭- এর অংশ], যার অর্থ: "নিশ্চয়ই আমরা প্রতিদান দিবো (বিশ্বাসী পুরুষ কিংবা নারীকে) তাদের উত্তম আমলের ভিত্তিতে, যা তারা করতো।"  ইমাম আরো বললেন, খেয়াল করতে, এইখানে আল্লাহ তা'য়ালা বলছেন তাদের "উত্তম" আমলের ভিত্তিতে।  অর্থাৎ, আমাদের করা সব আমলের মধ্যে যেটা সবচেয়ে উত্তম, তার ভিত্তিতেই আল্লাহ তা'য়ালা আমাদের পুরস্কৃত করবেন। কাজেই, পরিমান বা সংখ্যার দিকে না বরং আমাদের আমলের গুণগত মানের দিকে আমাদের মনোযোগী হতে হবে। আমাদের আমলের 'শিখর' যেটা, সেটার ভিত্তিতেই আমাদের পুরস্কৃত করা হবে, বাকি গুলো আল্লাহ তা'য়লা মাফ করে দিবেন। আমাদের অনেকেই জীবনযাপন করি, ইবাদত করি কিন্তু আল্লাহ'র কাছে পরিপূর্ণভাবে নিজেকে সমর্পন করে দিয়ে, ইখলাসের বা সিন্সিয়ারিটির সাথে আমল করি না। 

ইমাম বললেন, তিনি তাঁর অভিজ্ঞতায় দেখেছেন, মানুষ তার ভালো আমলের শিখরে পৌঁছায় সাধারণত দুই ভাবে: এক) সে কোনো একটা বড় ধরণের গুনাহ করে যখন উপলব্ধি করে তওবা করে ফিরে আসে, অথবা দুই) কোনো সাংঘাতিক বিপদে পরে আল্লাহর কাছে মাফ চেয়ে সাহায্য চায়, আর আল্লাহ তাকে তার সেই বিপদ থেকে উদ্ধার করেন - তখন। আল্লাহ তা'য়ালাই অনেক সময় মানুষকে নাড়া দিয়ে ঠিক পথে ফিরিয়ে আনেন। ইমাম বললেন, যদিও আমরা চাই না আল্লাহ আমাদের বড় কোনো গুনাহ কিংবা বিপদে ফেলুন, আমরা তাঁর কাছে 'আফিয়া' চাই, 'আফিয়া'র মধ্যে থেকেই হেদায়াত চাই। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই মৃত্যু সামনে না আসা পর্যন্ত আমাদের সত্যিকার উপলব্ধি হয় না।  ইমাম বললেন, আল্লাহ তা'য়ালা কুরআনে সূরা আল-জুমুআয় তাঁর রাসূলকে (সাঃ) বলতে বলছেন [সূরা নম্বর ১৬, আয়াত ৮], "বলো, নিশ্চয়ই যে মৃত্যু থেকে তোমরা পালিয়ে বেড়াও, তা তোমাদেরকে খুঁজে নিবে, আর তোমাদেরকে ফেরত পাঠানো হবে দৃশ্য আর অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতার কাছে, যিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দিবেন, যা তোমরা করতে।"  

ইমাম একটা হাদিস বললেন, যেখানে রাসূল (সাঃ) নাকি বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ'র সাথে দেখা করতে  ভালোবাসবে, আল্লাহ তা'য়ালাও তাদের সাথে দেখা করতে ভালোবাসবেন। মৃত্যু ভয়ে ভীত এক লোক নাকি পরে বলছিলেন, আমি পরকালের জন্য খুব বেশি কিছু প্রস্তুত করি নাই, বেশি বেশি সালাত কিংবা রোজা রাখি নাই,  কিন্তু আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) কে ভালোবাসি। তখন রাসূল (সাঃ) বলেছেন, প্রত্যেকেই (আখিরাতে) তার সাথে থাকবে যাকে সে ভালোবাসতো। কাজেই আমাদের আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে (সাঃ) ভালোবাসা শিখতে হবে, চর্চা করতে হবে।       

সবশেষে ইমাম বললেন, আমাদেরকে আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর কাছে ফিরিয়ে নেয়ার আগেই আমাদের উচিত তাঁর দিকে ফিরে যাওয়া, আমাদের হিসাব নেয়ার আগেই আমাদের নিজেদের উচিত নিজেদের হিসাব নেয়ার। তিনি মারা যাওয়া ওই দুই আলেমের জন্য দোয়া করলেন, আল্লাহ যেন তাঁদের বেহেশতবাসি করেন, তাঁদের পরিবারকে শোক সহ্য করার, ধৈর্য্য ধরার তৌফিক দেন, আমাদেরকেও যেন তাঁদের পরিবারকে সাধ্যমতো সাহায্য-সহযোগিতা করার সুযোগ দেন।

[সবশেষ সাইডনোট: ইমাম খুতবায় আরো বেশ কিছু আয়াত উদ্ধৃতি দিয়ে কাফির বা অবিশ্বাসীদের বৈশিষ্ট, বনি-ইসরাইলিদের 'বেহেশত' শুধু তাদের দাবি করার উত্তরে আল্লাহ কী বলেছিলেন, ইত্যাদি আরো  কিছু বিষয় আলাপ করেছেন। আমি খুতবার রেকর্ডিং -এর লিংক দিয়ে দিচ্ছি, কেউ চাইলে দেখে নিতে পারেন। আর ওই দুই আলেমের পরিবারের সাহায্যের জন্য তৈরী করা ফান্ড রেইজিং -এর লিংক দিয়ে দিচ্ছি, কেউ ডোনেট করতে চাইলে যেন করতে পারেন।]:

খুতবার রেকর্ডিং লিংক: https://fb.watch/kds6GpfDjb/

সিদি মুয়াজ-আন-নাসের পরিবারের জন্য ফান্ড রেইজিং পেইজের লিংক: 
https://www.launchgood.com/campaign/support_from_sidi_mouaz_alnass

শেখ আব্দুল্লাহ কামেলের পরিবারের জন্য ফান্ড রেইজিং পেইজের লিংক:
https://www.gofundme.com/f/shkamelfund

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ