এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (৭ এপ্রিল ২০২৩): আব্দুল্লাহ (আল্লাহ'র দাস)

এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (৭ এপ্রিল ২০২৩): আব্দুল্লাহ (আল্লাহ'র দাস)
মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি।

[সাইডনোট: আজকেও খুতবার সারমর্ম ছাড়াও এর আগেরদিন এশার নামাজের পর ইমামের দেয়া হালাকা বা ছোট লেকচারের বিষয়টা - দুটোই খুব ইন্টারেটিং ছিল: দুটাই "আব্দুল্লাহ" বিয়ষক। প্রথমটা আব্দুল্লাহ বা আল্লাহর বান্দা/বান্দি/দাস/দাসী - এই আইডিয়া নিয়ে, আর পরেরটা ব্যক্তি আব্দুল্লাহকে দেয়া ওমর (রাঃ)'র উপদেশ নিয়ে।]

ইমাম বললেন আমরা যখন সূরা ফাতিহা পড়ি [সূরা নম্বর ১, আয়াত ১-৪], খেয়াল করে দেখতে তখন যেন আল্লাহ তা'য়ালা নিজের সম্পর্কে তৃতীয় বাচ্যে বলছেন, তিনি যেন সামনে উপস্থিত নাই। যেমন: আল্লাহ বলছেন, "আলহামদুলিল্লাহ হিরাব্বিল আলামিন, আর-রাহমানির রাহিম, মালিকিয়াও মিদ্দিন": অর্থাৎ: সকল প্রশংসা (এবং ধন্যবাদ) আল্লাহ'র যিনি বিশ্বভ্রমান্ডের রব, তিনি পরম করুনাময়, অশেষ দয়ালু। বিচার দিনের মালিক -- এসবই তৃতীয় বাচ্যে।  কিন্তু তারপর যখনই আমরা সূরা ফাতিহাতে বলি [সূরা নম্বর ১, আয়াত ৫] , "ইয়্যাকানাবুদু ওয়া ইয়্যাকানাস তাঈন", অর্থাৎ: আমরা কেবল তোমারই ইবাদত (বা দাসত্ব) করি, কেবল তোমারই সাহায্য চাই - তখনই আল্লাহ তা'য়ালা যেন তৃতীয় বাচ্যে না বলে দ্বিতীয় বাচ্যে বলছেন যে তিনি সামনেই আছেন, এই "তোমারই" বলে আল্লাহ তা'য়ালা  যেন বলছেন তিনি আমাদের সাথেই আছেন। ইমাম খেয়াল করতে বললেন, ইবাদত বা দাসত্বের কথা আসতেই যেন তিনি সামনে চলে আসলেন। 

ইমাম আরেকটা উদহারণ দিলেন, সূরা আল-ইসরা [সূরা নম্বর ১৭, আয়াত ১] তে আল্লাহ আমাদের রাসূল (সাঃ) কে মিরাজে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন এই ভাবে, আর অর্থ অনেকটা এইরকম: মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি তাঁর "আব্দ" বা দাসকে রাতে ভ্রমণ করালেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা।  ইমাম বললেন মনে রাখতে ইসরা (ভ্রমন) ও মিরাজ (উর্ধাকাশে উঠা) ঘটেছিলো 'তায়িফের' ঘটনার পরপর যখন আমাদের রাসূল (সাঃ) সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় ছিলেন, তিনি তাঁর স্ত্রী খাদিজা আর চাচা আবু তালিবকে হারিয়ে অসহায়, তায়িফ নগরীতে সমর্থন পাবার আশায় গিয়েও ব্যর্থ, শুধু তাই না পাথরের আঘাতে রক্তাক্ত হয়েছিলেন। এর পরপরই মিরাজের অলৌকিক ঘটনা ঘটে। ইমাম বললেন, খেয়াল করতে এইযে রাসূল (সাঃ) কে সান্তনা দিতে আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর কাছে নিয়ে গেলেন, রাসূল (সাঃ) কে তিনি কী হিসাবে পরিচয় করিয়ে দিলেন? তাঁর "আব্দ"বা দাস হিসাবে। ইমাম বললেন যেই আরব সমাজে তখন বলতে গেলে দাসদেরকে কোনো অধিকারীই দেয়া হতো না, তখনই আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বান্দাকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন তাঁর 'দাস' হিসাবে। আর আল্লাহ'র দাস সেই তখন থেকেই সম্মানের। আরব মুশরিকরাও এই আল্লাহ'র দাস বা "আব্দুল্লাহ" যে সম্মানের - এই ব্যাপারটা জানতো। 

ইমাম বললেন, আল্লাহ তা'য়ালা যেন বলছেন, যখনই তাঁর বান্দারা তাঁর 'ইবাদ' বা দাস-দাসী হিসেবে নিজেকে সপে দিবে, তখনই তিনি তাদের সাথে থাকবেন। এরপর ইমাম সাম্প্রতিক ফিলিস্তিনের ঘটনা উল্লেখ করে বললেন, ফিলিস্তিনিরা আজকে অত্যাচারিত। তাদের যেন কোনো শক্তিই নাই। মুসলিমদের কোনো শক্তি নাই, কিছু বলার নাই, বিজয়ের কোনো সম্ভাবনা যেন নাই। ইমাম বললেন, যখন থেকেই রাসূল (সাঃ) আমাদের মাঝ থেকে চলে গেছেন, তখন থেকেই আমরা নামতে শুরু করেছি; আর কখনোই সেইদিনের সাফল্য বা গৌরব আর পাবো না। কিন্তু মনে রাখতে বললেন, কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা কয়েক জায়গায় উল্লেখ করেছেন [সূরা আল-আরাফ, সূরা নম্বর ৭, আয়াত ১২৮] "শেষ, উত্তম পরিনাম মুত্তাকীদের জন্য", এমনকি  রাসূল (সাঃ) কে আল্লাহ সান্তনা দিয়েছেন [সূরা আদ-দোহা, সূরা নম্বর ৯৩, আয়াত ৫]: "নিশ্চয়ই আপনার জন্য আখিরাত/পরকাল পূর্ববর্তী কাল (বা বর্তমান সময়ের) থেকে অনেক উত্তম"। কাজেই, একদিন ফিলিস্তিনিদের বিজয় হবেই। 

ইমাম সবশেষে বললেন, আজকের দিনে আমরা সবাই বড় বেশি 'আইডেন্টিটি' বা আত্মপরিচয় নিয়ে চলি। আমরা কেউ অমুক দেশের, নাহয় তমুক জাতির, কিংবা কেউ অমুক মতবাদের নাহয় তমুকের অনুসারী। এইসব বাদ দিয়ে যখন আমরা সবাই একসাথে আল্লাহ'র 'ইবাদ' বা দাস-দাসী হিসাবে নিজেদের পরিচয় দিতে পারবো,  কেবল তখনই আল্লাহর সাহায্য আসবে আর আমাদের সবার প্রকৃত মুক্তি মিলবে। ইমাম নিপীড়িত মুসলিম উম্মাহ'র, ফিলিস্তিনিদের জন্য দোয়া করে, তাঁদের বিজয় আর আল-আকসা মসজিদের পবিত্রতা রক্ষার দোয়া করে খুতবা শেষ করলেন। 

[শেষ কথা: ১) আজকে লেখা এর মধ্যেই বড় হয়ে গেছে,  তাই গতদিনের হালাকার আলোচনার সারমর্ম এখন আর লিখছি না। শুধু এইটুকু বলে যাই, ওমর (রাঃ) তাঁর ছেলে 'আব্দুল্লাহ-বিন-ওমর' কে কীভাবে জীবনে ব্যালান্স করে চলতে হয়ে - সেই ব্যাপারে খুব সুন্দর একটা উপদেশ দিয়েছিলেন। ইমাম একটা আয়াতের ব্যাখ্যায় এই উদহারণটা  দিয়েছিলেন। আমার খুব সুন্দর লেগেছে। খুবই প্রাকটিক্যাল একটা উপদেশ। দু'একদিন পরে লিখবো ইনশাআল্লাহ। আর ২) ইমাম খুতবায় আরো বললেন, রাসূল (সাঃ) নাকি বলেছেন, দুইটা নাম খুব সুন্দর: একটা হচ্ছে "আব্দুল্লাহ", আর আরেকটা হচ্ছে "আব্দুর রহমান"! ]          

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ