এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (৫ মে ২০২৩): "আল-বির" বা পুণ্যতা ইমাম হামাদ আহমেদ শেবিল। ইসলামিক সোসাইটি অফ সেন্ট্রাল জার্সি, নিউ ব্রান্সউইক টাউনশিপ, নিউ জার্সি
এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (৫ মে ২০২৩): "আল-বির" বা পুণ্যতা
ইমাম হামাদ আহমেদ শেবিল। ইসলামিক সোসাইটি অফ সেন্ট্রাল জার্সি, নিউ ব্রান্সউইক টাউনশিপ, নিউ জার্সি
খুতবার শুরুতে ইমাম "ফেরেশতা জিব্রাইল (আঃ)-এর হাদিস" হিসাবে বিখ্যাত ঘটনাটাকে উল্লেখ করলেন [ইমাম আন-নাওয়াউই সংকলিত ৪০ হাদিসের ২ নম্বর হাদিস], যেখানে জিব্রাইল (আঃ) মানুষের বেশে রাসূল (সাঃ) কাছে এসে তাঁকে ইসলাম, ঈমান আর ইহসান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। ইমাম বললেন, "ইহসান" হচ্ছে আল্লাহ তা'য়ালার এমনভাবে ইবাদত করা যেন আমরা তাঁকে দেখতে পাচ্ছি। আর সেটা করা সম্ভব না হলে, নূন্যতম পক্ষে আল্লাহ আমাদেরকে দেখছেন- এমন বিশ্বাসে তাঁর ইবাদত করা। ইমাম বললেন, আর ইহসানের পরের ধাপ হচ্ছে 'আল-বির' - যেটার অনুবাদ করা হয় "পুণ্যতা" হিসাবে। এরপর ইমাম 'আল-বির' কিভাবে আমরা অর্জন করতে পারি, সেটা অর্জন করার শর্ত কী সেই বিষয়ে কুরআনের আয়াতের রেফারেন্স দিয়ে আলাপ করলেন।
ইমাম মজা করে জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কোন জিনিষটা সবচেয়ে ভালোবাসি? প্রশ্ন করে আবার নিজেই বললেন, আমরা যেন আবার না বলি, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে, কিংবা নিজের স্বামী-স্ত্রী কিংবা সন্তানদের। আমরা হয়তো এসব ভালোবাসি ঠিকই, কিন্তু নিজেদের অর্থ-সম্পদও তাদের থেকে কম ভালোবাসি না। আর আমাদেরকে যখন এই অর্থ-সম্পদ যখন আল্লাহর রাস্তায় খরচ করতে বলা হয়, তখন আমরা হয়তো মসজিদে দেই, বা কোনো দাতব্য কাজে দান করি, কিন্তু নিজেদের আত্মীয়-স্বজনদের ব্যাপারে আমরা বড়ই উদাসীন। তাদের জন্য খরচ করতে আমরা খুব একটা চাই না। কিন্তু কুরআনে বরং তাদের ব্যাপারে খরচ করতেই সবচেয়ে আগে বলা হয়েছে।
এরপর ইমাম সূরা বাকারার আয়াত [সূরা নম্বর ২, আয়াত ১৭৭] তেলাওয়াত করলেন, যেটার অর্থ অনেকটা এই রকম: "'আল-বির' বা পুণ্যতা শুধুমাত্র পূর্ব বা পশ্চিমে তোমাদের মুখ ফেরানোতে নেই, বরং 'আল-বির' বা পুণ্যতা হচ্ছে যখন কেউ বিশ্বাসস্থাপন করে আল্লাহ ও আখিরাতের (শেষ বিচার) দিনে, এবং ফেরেশতা এবং কিতাবের এবং নবীদের প্রতি, আর অর্থ-সম্পদ দান করে - যদিও তা সে ভালোবাসে - আত্মীয়-স্বজনদের, এতিমদের, অভাবীদের, পথিকদের আর ভিখারীদেরকে, আর দাসমুক্ত করতে খরচ করে, আর সালাত কায়েম করে আর জাকাত প্রদান করে, এবং প্রতিশ্রুতি করার পর তা পূরণ করে, আর ধৈর্যধারণ করে যখন অর্থকষ্টে কিংবা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, কিংবা যুদ্ধ-সংগ্রামে। তারাই তো সত্য অবলম্বনকারী, আর তারাই মুত্তাকী (বা খোদাভীরু)।"
ইমাম খেয়াল করতে বললেন, এই আয়াতে আল্লাহ নিজেই বলে দিচ্ছেন যে আমরা নিজেদের অর্থ-সম্পদ ভালোবাসি। কিন্তু এই ভালোবাসার জিনিস আল্লাহর রাস্তায় দান করতে পারাটাই আসল বিশ্বাসীদের লক্ষণ। আরো খেয়াল করতে বললেন, এই দানের লিস্টে প্রথমেই নিজেদের আত্মীয়-স্বজনদের কথা এসেছে। আর নামাজ বা সালাত আদায় করার কথা এসেছে পরে, আর তারও পরে এসেছে জাকাত দেয়ার কথা। ইমাম মজা করে বললেন, আমেরিকাতে আসার পর আমাদের কাউকে আত্মীয়-স্বজনদের কথা জিজ্ঞেস করলে হয়তো বলবে: আমরা তাদের দেশে রেখে এসেছি, এর পরে আর তেমন কোনো সম্পর্ক নাই, আর শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের কথা তো জিজ্ঞেস করার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু না, এই আয়াতে আল্লাহ তা'য়ালা আমাদেরকে আদেশ করছেন, আত্মীয়-স্বজনদের জন্য সবার আগে খরচ করতে হবে।
এরপর ইমাম সূরা আলে-ইমরানের একটা আয়াত তেলাওয়াত করলেন [সূরা নম্বর ৩, আয়াত ৯২], যার অর্থ অনেকটা এইরকম: "নিশ্চয়ই তোমরা 'আল-বির' বা পুণ্যতা অর্জন করতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা খরচ/দান করো তা থেকে যা তোমরা ভালোবাসো। আর তোমরা যা-ই খরচ/দান করো না কেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ সে সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই জানেন।" ইমাম বললেন, আমরা দান করার সময় প্রায়ই নিজেদের ব্যবহৃত, আর কাজে লাগে না - সাধারণত এমন জিনিসই দান করি। কিন্তু না, দান করার সময় নিজেদের সবচয়ে ভালো জিনিসটা থেকে আমাদের দান করতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সেটা উপলব্ধি করার তৌফিক দিন। আমিন।
[সাইড নোট: জিব্রাইল (আঃ) -এর ওই ঘটনা সম্পর্কে আগেও কোনো এক খুতবায় ইমাম আলাপ করেছিলেন। সেটা লিখেছিলাম। নিচে আগের লেখাগুলোর লিংক দিয়ে দিচ্ছি। আর সম্পূর্ণ অন্য একটা টপিক নিয়ে একটু বলি: এশার নামাজের পর 'হালাকা'য় সেদিন ইমাম সাফওয়ান ঈদ বলছিলেন, রাসূল (সাঃ) তো আমাদের অনেক দোয়াই শিখিয়ে দিয়ে গেছেন। কিন্তু উনি (সাঃ) নিজে সবচেয়ে বেশি কোন দোয়া করতেন সেটা কী আমরা জানি? ইমাম বললেন, সেই দোয়াটা আমরা কমবেশি সবাই জানি, আর তা হচ্ছে : "রাব্বানা আ'তিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানা, ওয়াফিল আখিরাতি হাসানা, ওয়াকিনা আযাবান্নার" - আর অর্থও আমরা জানি: ও আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়ায় 'হাসানা' বা যা ভালো তা থেকে দিন, আর আখিরাতেও 'হাসানা' বা যা ভালো তা থেকে দিন, আর আমাদেরকে [জাহান্নামের] আগুনের আযাব থেকে রক্ষা করুন। ইমাম বললেন, এই দোয়াটা যে কতটুকু সম্পূর্ণ তা যেন আমরা একটু ভেবে দেখি। এই দুনিয়াতে আর আখিরাতে 'হাসানা' প্রাপ্তি হলে আর আগুনের আযাব থেকে রক্ষা পেলে আমাদের আসলে আর কিছু কী চাওয়ার আছে? আরো বললেন, আল্লাহ তা'য়ালার সবচেয়ে প্রিয় বান্দা, তাঁর রাসূল (সাঃ) যখন তাঁর এই দোয়া করার আসলে কোনো দরকার নাই, তাও নিজের মর্যাদা বৃদ্ধিতে এই দোয়া তিনি সবচেয়ে বেশি করেছেন, আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছেন - কাজেই আমাদের জন্য সিন্সিয়ারলি এই দোয়া করার গুরুত্ব কতটুকু তা সহজেই অনুমান করা যায়।]
https://banglakhutba.substack.com/
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন