এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৯ মে, ২০২৩): সার্ভিস, স্বেচ্ছাশ্রমের গুরুত্ব

এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৯ মে, ২০২৩): সার্ভিস, ভলান্টারি বা স্বেচ্ছাশ্রমের গুরুত্ব 
ইমাম সাফওয়ান ঈদ, মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি।


ইমাম খুতবা শুরু করলেন আমেরিকান সিভিল মুভমেন্টের নেতা, ড. মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র  -এর বিখ্যাত "I have a dream" - ভাষণের রেফারেন্স দিয়ে। বললেন ১৯৬৩ সালের ওই ভাষণ, যেখানে তিনি বর্ণবাদ বিরোধী, সাম্যের ডাক দিয়েছিলেন, সেই ভাষণ ছিল "March for Jobs and Freedom" বা  চাকরির সুযোগ আর মুক্তির জন্য মিছিলের অংশ, যেটা ওয়াশিংটন ডিসি তে হয়েছিল, যেখানে সেদিন কয়েক লক্ষ মানুষের সমাগম হয়েছিল। ইমাম বললেন, ড. কিং যখন সাম্যের ডাক দিয়েছিলেন - সেটাতে কোনো অসুবিধা ছিল না, কিন্তু যখনই তিনি সবার অর্থনৈতিক মুক্তি আর সুযোগের সমান অধিকার দাবি করেছিলেন - তখনই তিনি আমেরিকান সমাজের একশ্রেণীর জন্য বিপদজনক হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর "Dream" বা স্বপ্ন তখন কারো কারো মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। 

ইমাম বললেন, সবার অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য কাজ করা অত্যন্ত কঠিন একটা কাজ। কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা সূরা বালাদ -এ [সূরা নম্বর ৯০, আয়াত ১২ - ১৬] নিজেই প্রশ্ন করে আবার উত্তর দিয়েছেন, যার অর্থ অনেকটা এইরকম: "আপনি কি জানেন "নাকাবা" বা কষ্টসাধ্য পথ কি? তা হচ্ছে দাস মুক্তি, অথবা ক্ষুধার (বা দুর্ভিক্ষের) দিনে নিকটাত্মীয় এতীমকে খাওয়ানো,  অথবা দারিদ্র-ধূলিমাখা নিঃস্বকে খাওয়ানো।"

এরপর ইমাম বললেন ইউসুফ (আঃ) -ও স্বপ্ন দেখেছিলেন। কুরআনে উল্লেখ আছে সেই স্বপ্নে তিনি দেখেছিলেন, চাঁদ, সূর্য, তারা তাঁকে সেজদা করছে! পরের ঘটনাগুলি আমরা সবাই কমবেশি জানি। তাঁর ভাইরাই তাঁকে খুন করার উদ্দেশ্যে কুয়াতে ফেলে দেন, পরে একদল তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে কিন্তু দাস হিসাবে বেঁচে দেয়। সেখান থেকে তিনি মিশরের এক রাজার বাড়িতে চাকরের কাজ পান। ঘটনাক্রমে সেখান থেকে তিনি বিনা অপরাধে জেল খাটেন, পরে আবার মুক্তি পেয়ে তাঁর স্বপ্ন ব্যাখ্যা করার সক্ষমতার সুবাদে রাজার আস্থাভাজন হয়ে একসময় মিশর রাজ্যের রাজকোষের দায়িত্ব পান। তাঁর দূরদর্শিতার কারণে পরপর  কয়েক বছরের খরার সময়ও মিশর রাজ্য দুর্ভিক্ষ ছাড়াই পার করে, শুধু তাই না - তাঁর নেতৃত্বে আশেপাশের অঞ্চলের মানুষেরও উপকার হয়। পরে তিনি তাঁর ভাইদের, বাবার সাথে আবারো মিলিত হবার সুযোগ পান। ভাইরা তাদের দোষ স্বীকার করে, মাফ চায়, তিনি তাঁর হারানো পরিবার ফিরে পান। ইমাম বললেন, এই সব ঘটনার গুলোর মধ্যে যে জিনিষটা তাঁকে সবচেয়ে বেশি অবাক করে, যেটা আমরা প্রায়ই খেয়াল করি না - আর তা হচ্ছে পুরোটা সময় জুড়ে তাঁর দেয়া সার্ভিস। ভাইদের সাথে থাকার সময়, দাস হিসাবে রাজার প্রাসাদে কাজ করার সময়, এমনকি জেলে বন্দি থাকার সময়ও তিনি "সার্ভিস" দিয়ে গেছেন। বন্দি থাকাকালে বন্দিদের খাবার ভাগ করে দেয়াও তাঁর দায়িত্ব ছিল। আর পরে জেল থেকে বের হয়ে যখন তিনি রাজকোষের দায়িত্ব পান - তখনও তিনি সার্ভিস দিয়ে গেছেন।   

এরপর ইমাম রাসূল (সাঃ) এর মসজিদ পরিষ্কার করতেন যে মহিলা, [উম্ম মাহ্জান] তাঁর গল্প বললেন। সেই মহিলা সেচ্ছাশ্রম দিয়ে, কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই মদিনায় রাসূল (সাঃ) এর মসজিদ পরিষ্কার করতেন। ওই মহিলা কোনো এক রাতে স্বাভাবিক ভাবেই মারা গেলে সাহাবীরা এটা এমন জরুরি কিছু না ভেবে রাসূল (সাঃ) কে অবহিত না করেই তাঁর জানাজা, দাফনের ব্যবস্থা করেন। পরে কয়েকদিন ওই মহিলাকে না দেখতে পেয়ে যখন রাসূল (সাঃ) তাঁর খোঁজ করে জানতে পারেন তিনি মারা গেছেন, তখন সাথে সাথেই তিনি তাঁর সাহাবীদেরকে প্রশ্ন করেন কেন তাঁকে ঐ রাতেই ডেকে তোলা হলো না আর তাঁর  কবর কই জানতে চান। রাসূল (সাঃ) সেই কবর জিয়ারত করে সেখানে দোয়া করেন। ইমাম বললেন, এই হাদিস থেকে স্পষ্ট যে রাসূল (সাঃ) ভলান্টিয়ারদের সম্পর্কে খোঁজখবর রাখতেন, তাঁদের জন্য আলাদা ভাবে দোয়া করে গেছেন। ইমাম আরো বললেন, আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সাঃ) নিজ বাসায় কেমন ছিলেন জিজ্ঞেস করলে আয়েশা (রাঃ) বলেছেন তিনি (রাসূল (সাঃ)) বাসায় অনেক সার্ভিস দিতেন বা কাজ করতেন। 

ইমাম বললেন, আজকের দুনিয়ায়, এই যুগে আমরা সবকিছুই একটা লেনদেনের ব্যাপার করে ফেলেছি। আমরা আমাদের কাজের জন্য পারিশ্রমিক নেই, ঘন্টা ধরে আমাদের সময়ের দাম ঠিক করে নিয়ে কাজ করি। এটা করতে করতে কোনো বিনিময় ছাড়া, শুধু আল্লাহ তা'য়ালাকে খুশি করার জন্য যে কিছু কাজ করা যায় - সেটা প্রায়ই ভুলে বসছি। কিন্তু আমরা যখন কোনো ভলান্টিয়ারিং করবো, অন্যের জন্য ফ্রি সার্ভিস দিবো, তখন আমাদের আখিরাতে জান্নাতে যাওয়ার সুযোগ সুগম হবে। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ