এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (৭ জুলাই ২০২৩): হজ্জ্ব নিয়ে অভিযোগ ও আমার হজ্জ্ব-এর অভিজ্ঞতা - ১

এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (৭ জুলাই ২০২৩): হজ্জ্ব নিয়ে অভিযোগ ও আমার হজ্জ্ব-এর অভিজ্ঞতা - ১
দক্ষিণ ফুলার রোড আবাসিক এলাকা মসজিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা 

৭ জুলাই শুক্রবার সকালে মদিনা থেকে ঢাকায় ফিরে বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতেই প্রায় সাড়ে বারোটা বেজে গিয়েছিল। জুমুআ দেড়টায়, কিন্তু এই এক ঘন্টার মধ্যেই বাসার সবার সাথে হজ্জের সব গল্প যেন করে ফেলতে চাচ্ছিলাম। কিছু বাজে অভিজ্ঞতা, ট্রাভেল এজেন্সির অব্যবস্থাপনা, বুড়ো মানুষদের কেন যে হজ্জে পাঠায় - আমার ইত্যাদি নানান অভিযোগ! এরপর যখন পাড়ার মসজিদে একটু দেরি করে জুমআ পড়তে গেলাম, খুতবা শুনে মনে হলো যেন ইমাম আমার জন্যই খুতবাটা দিচ্ছেন। তিনি আক্ষরিক অর্থেই বললেন: অনেকে হজ্জ্ব থেকে ফিরে এসে অনেক অভিযোগ করেন। কিন্তু এটা করা ঠিক না। এই অভিযোগ প্রকারান্তরে হজ্জের বিরুদ্ধেই অভিযোগ। আরো বললেন, আপনি কি চিন্তা করে দেখেছেন যে এই কষ্টের বিনিময়ে আল্লাহ তা'আলা আপনাকে কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন? আপনার হজ্জ্ব যদি কবুল হয়, তাহলে আপনাকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচিয়ে জান্নাতের সুসংবাদ তিনি দিয়েছেন। ভাবুন তো, হজ্জের এই একটু কষ্টের বিনিময়ে আল্লাহ তা'য়ালা আপনাকে কত বড় (আখিরাতে জাহান্নামের) কষ্ট থেকে বাঁচিয়ে দিচ্ছেন! 

এরপর একটা গল্প বললেন যেটা অনেকটা এইরকম: আলী (রাঃ) অনেক ভালো যোদ্ধা ছিলেন। তিনি নাকি কোনো এক যুদ্ধে এক শত্রুকে কোনোভাবেই পরাস্ত করতে পারছিলেন না। এই সামনাসামনি যুদ্ধে যেই পরাস্ত হবে, তারই নির্ঘাত মৃত্যু। এক পর্যায়ে আলী (রাঃ) সেই শত্রুকে ধরাশায়ী করলেন। ওর বুকের উপর বসে যেই না তলোয়ার চালাবেন, ঠিক তখন ওই শত্রু শেষ চেষ্টা হিসাবে আলী (রাঃ)-র মুখে থুতু মেরে দিল। আলী (রাঃ) আর তলোয়ার না চালিয়ে সরে বসলেন, আর ওই শত্রুকে ছেড়ে দিয়ে বললেন চলে যেতে। শত্রু তো অবাক, সে নাকি জিজ্ঞেস করেই বসলো যে কেন তিনি তাকে মারলেন না? উত্তরে আলী (রাঃ) নাকি বলেছিলেন, আমি তোমার সাথে এই মারামারি করছিলাম আল্লাহ তা'য়ালার জন্য। কিন্তু তুমি যখন আমার মুখে থুতু মেরে দিলে, তখন আমার মনের মধ্যে একটা ঘৃণা তৈরী হলো। এরপর আমি তোমাকে মেরে ফেললে সেটা আমার সেই ঘৃণার প্রতিশোধ হতো, আমার নিজের জন্য হতো, আল্লাহ তা'য়ালার জন্য হতো না। তাই ছেড়ে দিয়েছি। এই কথা শুনে সেই শত্রু নাকি ভাবলো, আমি কার জন্য লড়াই করছি? এই মুসলিমদের তো আল্লাহ আছেন, কিন্তু আমি কার কাছে ফিরে যাবো? এই ঘটনা তার মনে এতটাই দাগ কেটেছিল যে সে পরে মুসলিম হয়ে গিয়েছিলো। সুবহানাল্লাহ!

এই গল্পটা বলে ইমাম বললেন, একজন মুসলিমের প্রত্যেকটা কাজ, কথা হওয়া উচিত আল্লাহ তা'য়ালার জন্য। ইমাম প্রশ্ন করলেন: আপনি হজ্জ্ব কার জন্য করেছেন? কার জন্য কষ্ট করেছেন? আল্লাহ তা'য়ালার জন্য করে থাকলে, তাঁর প্রতিশ্রুত প্রতিদান পাবার আশায় করে থাকলে আপনার তো এতো অভিযোগ থাকার কথা না। জুমুআর পরে আমি ইমামকে এই কথাগুলো বলার জন্য আলাদা করে গিয়ে একটা ধন্যবাদ দিয়ে আসছি। এরপর ঠিক করেছি আমি হজ্জ্ব নিয়ে নেগেটিভ আর কোনো কথা বলবো না। অভিযোগ করবো না। তারপরেও অভিজ্ঞতা শেয়ার করবো যাতে করে ভবিষ্যতে কেউ হজ্জে গেলে যেন কিছুটা ভালো প্রস্তুতি নিয়ে যেতে পারেন। কিছু অত্যন্ত জরুরি টিপস জেনে গেলে অনেক কষ্ট হয়তো এড়ানো যাবে। আরো কিছু ঐতিহাসিক, প্রাসঙ্গিক তথ্য ছবিসহ দেয়ার চেষ্টা করবো, যেইগুলি জানলে হজ্জে গেলে আশাকরি সুবিধা হবে। এক লেখায় পুরো অভিজ্ঞতা শেয়ার করা যাবে না, তাই কয়েক পর্বে লিখবো, ইনশাআল্লাহ। 

আজকের লেখায় হজ্জের জন্য কী কী জিনিস সাথে নিয়ে যাওয়া উচিত, তার একটা লিস্ট দিচ্ছি।  এই গুলো আমি বিভিন্ন জন (যেমন বন্ধু অনুজ, সজীব ভাইয়া, রুশাদ ভাইয়া আর আম্মা-আব্বার কাছ থেকে) জেনে গিয়েছিলাম।  আর কিছু জিনিস মক্কায় পৌঁছে ঠেকে কিংবা অন্যদের দেখে শিখেছি :

  • দুই জোড়া ভালো, দামি দুই-ফিতা-ওলা স্যান্ডেল। হজ্জে প্রচুর হাঁটতে হয়, কাজেই একদম নতুন স্যান্ডেল না কিনে, আগে থেকে কিনে কিছুদিন ব্যবহার করে অভ্যস্ত হওয়া উচিত। জুতা নেয়ার কোনোই দরকার নাই। কমপক্ষে দুইজোড়া স্যান্ডেল, কারণ একটা স্যান্ডেল হারালে, আরেকটা ব্যাকআপ। অনুজের সাজেস্ট করা একটা রাবারের স্যান্ডেল পড়েই আমি সব জায়গায় গিয়েছি। খুবই আরামের আর টেকসই একটা স্যান্ডেল।

  • কয়েকজোড়া মোটা মোজা। মক্কায় কাবার চারপাশে তাওয়াফ করার সময়, কিংবা সাফা-মারওয়া সা'ই করার সময় অনেকেই স্যান্ডেল পায়ে দিয়েই করে সেগুলো থাকেন! জি ঠিকই পড়েছেন: স্যান্ডেল পায়ে দিয়েই অনেকেই তাওয়াফ আর সা'ই করে। কিন্তু আজান হলেই সবাই স্যান্ডেল খুলে নামাজ পড়ে। আপনি স্যান্ডেল পড়ে তাওয়াফ, সা'ই না করতে চাইলে অবশ্যই মোটা মোজা পড়ে করবেন, খালি পায়ে না করাই ভালো। কারণ মূলত দুইটা। এক, হারাম শরীফের ভেতরে হলে সমস্যা নাই, কারণ ফ্লোর মার্বেল পাথরের তাই এতটা গরম হয় না  - কিন্তু আপনি কোনো কারণে বাইরে থাকলে, আজান হলে রাস্তার উপরই নামাজ পড়তে দাঁড়িয়ে যেতে হতে পারে। রোদের তাপে রাস্তা যেন পুরা উত্তপ্ত কড়াই হয়ে থাকে। ভারী জায়নামাজ না হলে, খালি পায়ে দাঁড়ালে আপনার পা পুড়ে ফোস্কা পরে যাবে। আর দুই, অনেক সময় হারাম শরীফের ফ্লোরে খেজুরের বিচি, কিংবা প্লাস্টিকের কাপের ভাঙা টুকরা, কিংবা অন্য কিছু থাকতে পারে। এতো মানুষের ভিড়ে সেগুলো দেখা যায় না, খালি পায়ে সেগুলোতে পাড়া পড়লে, পায়ে ঢুকে রক্ত বের হয়ে যেতে পারে।

  • কোমরের একটা ব্যাগ-ওলা ট্রাভেল বেল্ট। ইহরামের কাপড় কোমরে বেঁধে রাখতে, আর জরুরি কাগজ, টাকা-পয়সা সাথে রাখতে খুবই জরুরি একটা জিনিস। রীম আমাকে আমাজন থেকে একটা কিনে দিয়েছিলো। সারা ট্রিপে এটা আমার খুবই কাজে লেগেছে। 

  • জায়নামাজ। খুব ভারী না, তবে একদম পাতলাও হওয়া উচিত না। আপনাকে আজান হলেই যেকোনো জায়গায় নামাজ পড়তে হতে পারে। এমনকি হারামের ভেতরে পড়লেও একটা জায়নামাজ সাথে রাখবেন। কেননা মনে রাখবেন, মানুষজন স্যান্ডেল পায়ে দিয়েই তাওয়াফ, সা'ই করে। কাজেই আপনার নামাজের সেজদার জায়গা পরিষ্কার নাও থাকতে পারে, তখন এই জায়নামাজ কাজে লাগে।   

  • পাতলা, কিন্তু টেকসই সাদা ছাতা। হোটেল থেকে কাবা যেতে, কিংবা মিনা, আরাফাতে, কিংবা জামারাতে পাথর মারতে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে যাওয়ার সময় মাথার উপর রোদ থেকে বাঁচতে এর বিকল্প নাই। 

  • পিঠে ঝোলানোর পাতলা ব্যাগ, আর তাতে স্যান্ডেল রাখার জন্য পলিথিন, টয়লেট পেপার, আর হাত ধোয়ার জন্য ছোট ছোট করে টুকরা করে রাখা গন্ধহীন (কাপড় ধোয়ার বল) সাবান। মক্কা, মদিনা, মিনা কিংবা আরাফার ময়দান - কোনো জায়গার টয়লেটেই কোনো টয়লেট পেপার থাকে না। তাছাড়া টয়লেট থেকে বের হয়ে হাত ধোয়ার বেসিন একটু দূরে থাকে, সেখানে অনেকসময় সাবান নাও থাকতে পারে। কাজেই আপনার সাথে রাখা টয়লেট পেপারই ভরসা। আর ছোট ছোট করে টুকরা করে রাখা সাবান দিয়ে টয়লেটেই হাত ধুয়ে (বাকি টুকরা ফেলে দিয়ে) আপনি বের হয়ে যেতে পারবেন।

  •  একটা পাতলা শাল বা চাদর। বিশ্বাস করুন, হারামের ভেতরে, বিশেষ করে সাফওয়া-মারওয়ার করিডোর এসির কারণে যথেষ্ট ঠান্ডা থাকে। আপনি তাওয়াফ শেষ করে ঘেমে সাফওয়া-মারওয়া তে যখন সা'ই করবেন, কিংবা অন্য সময় এমনিতেই হারামের ভেতরে বসে ইবাদতি করার সময় একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে না বসলে ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। 

  • ওরস্যালাইন। আপনার প্রচুর ঘাম হবে, আবার শুকাবে। কিন্তু  শুধু পানি খেলে শরীর থেকে ঘামের সাথে যেই লবন বেরিয়ে যাবে, সেটা পূরণ হবে না। আপনি দুর্বল হয়ে পড়বেন। ওরস্যালাইন খেয়ে সেটা পূরণ করলে দেখবেন চাঙ্গা লাগছে। 

  • আন্টি-বায়োটিক ঔষধ। বিশেষ করে ZMax ৫০০mg অন্তত ৩ কোর্স (১৫ টা ট্যাবলেট) আর টনসিলের জন্য (গলা ব্যথার জন্য) এমোক্সিসিলিন ১gm এক কোর্স (দিনে ২ টা করে ৭ দিন, মোট ১৪ টা ট্যাবলেট) সাথে রাখবেন। আমি এমোক্সিসিলিন নিয়ে না যাওয়ায় পরে দাম দিয়ে মক্কার ফার্মেসি থেকে কিনতে হয়েছে। হেঁটে গায়ে ব্যথা হবে, তার জন্য ACE বা প্যারাসিটামল টাইপ ঔষধ, সর্দির জন্য হিস্টাসিন, আর পেট ফেঁপে যাওয়া, কিংবা বুক জ্বালা-পোড়া থেকে বাঁচার জন্য ওমিপ্রাজল, অমিডন আর এন্টাসিড প্লাস জাতীয় ঔষধ সাথে রাখবেন। গরম-ঠান্ডার কম্বিনেশন, জমজমের ঠান্ডা পানি খেয়ে আর এতো মানুষের ভিড়ে হাঁচি, কাশিতে আপনার অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সাথে ঔষধ রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। 

  • ভ্যাসেলিন। দুই উরুর মাঝখানে ভ্যাসেলিন না দিয়ে হাঁটলে ঘষা খেয়ে নির্ঘাত ঘা-চুলকানি হবে। পুরুষদের অনেকেই হজ্জে গিয়ে আন্ডারওয়ার পড়া বাদ দিয়ে দেন - সেটাও খারাপ আইডিয়া না। 

  • মেলামাইন -এর একটা প্লেট আর চামচ। অনেক সময় ওরা বক্সে খাবার দেয়। খাবারের পরিমাণও বেশি থাকে। তখন একটা প্লেট আর চামচ থাকলে খেতে সুবিধা হবে। আমি এইগুলো সাথে নিয়ে যাই নাই, পরে খুব আফসোস হয়েছে। 

  • পাতলা একটা গামছা। গোসল কিংবা ওযুর পর সেটা ব্যবহার করা অনেক সুবিধা। চট করে শুকিয়ে যায়, আর পাতলা হওয়ায় ব্যাকপ্যাকে নিয়ে ঘুরতেও অসুবিধা হয় না। এইটাও আমি নেই নাই, খুব মিস করেছি।  

  • ২-৩ সেট পাতলা পায়জামা-পাঞ্জাবি, লুঙ্গি আর ঘুমানোর গেঞ্জি। শার্ট প্যান্ট সাথে নেয়ার কোনো দরকার নাই। শার্ট-প্যান্ট আপনি চাইলে পড়তে পারেন, কিন্তু কেউই তেমন একটা পড়ে না। আমি শুধু-শুধুই ২-৩ সেট শার্ট-প্যান্ট নিয়ে পুরো ট্রিপে স্যুটকেসে খামাখাই ওজন বাড়িয়ে টেনে নিয়েছি, দরকার ছিল না। 

  • যদি সম্ভব হয়, চুল ছোট করার ট্রিমার মেশিন, ভালো কয়েকটা রেজর আর মহিলাদের চুল কাঁটতে একটা ছোট কাঁচি সাথে নিয়ে যাবেন। উমরাহর পর চুল ছোট করতে, কিংবা হজ্জের কুরবানীর পর মাথার চুল চেঁছে ফেলতে সেলুনে অনেক লম্বা লাইন হয়, দাম'ও বেশি রাখে। এইসব জিনিস নিজের থাকলে হোটেলে কিংবা মিনার তাঁবুর পাশে টয়লেটে নিজেই এই কাজটা করে ফেলে সময় আর টাকা দুইই বাঁচানো সম্ভব। আমি তাই-ই করেছিলাম।
এই মুহূর্তে আর কিছু মনে পড়ছে না। পরে মনে পড়লে যোগ করে দিবো। আর আগে হজ্জে গিয়েছেন, অভিজ্ঞতা আছে এমন কেউ আরো কিছু সাজেস্ট করলে কমেন্টে করবেন প্লিজ, আমি যোগ করে দিবো। 

সবশেষ: আমি ৯ তারিখ রবিবার বিকালে ঠিকঠাক মতো বাসায় ফিরে চলে আসছি, আলহামদুলিল্লাহ! এতো কম সময়ে এতো ট্রাভেল করার কারণেই হয়তো বাংলাদেশ আর আমেরিকা দুই দেশের ইমিগ্রেশন অফিসার কিছু বেশি প্রশ্ন করেছে, কিন্তু ঝামেলা করে নাই। ঝামেলা করেছে আমেরিকার কাস্টমস অফিসার। সাথে নিয়ে আসা আম্মার রান্না করা কুরবানীর মাংস ব্যাটা ফেলে দিয়েছে! আবার মাছ আর মিষ্টি সাথে থাকলেও সেগুলোর ব্যাপারে কিছু বলে নাই। যাক, সবর করলাম। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ