এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২১ জুলাই ২০২৩): আমার, আপনার মাধ্যমে অন্যের হিদায়াত

এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২১ জুলাই ২০২৩): আমার, আপনার মাধ্যমে অন্যের হিদায়াত 
ড. ওমর সুলাইমান । ইয়াকীন ইনস্টিটিউট । অনলাইন খুতবা 

এই শুক্রবার বোস্টনে ছিলাম। জুমআর নামাজে গিয়ে দেখি খুতবা শেষ, নামাজ শুরু হয়ে গেছে। পরে আরেকটা জামাত ছিল, কিন্তু সেটার জন্য আর অপেক্ষা না করে নামাজ পড়ে চলে আসি। ফিরে এসে পরে অনলাইনে ড. ওমর সুলাইমানের ওই শুক্রবারের জুমআর খুতবাটা শুনলাম। সেটার সারমর্মই এখন লিখছি। নিচে রেকর্ডিংটার লিংক দিয়ে দিচ্ছি, আমার এই লেখা না পরে ১৭ মিনিটের ওই ভিডিওটা দেখে নিলেই মনে হয় ভালো হবে।

ইমাম শুরু করলেন এই বলে যে নামাজ শেষে এক ব্যক্তি শাহাদা নিয়ে মুসলিম হবে। কিন্তু উনি কানে শোনেন না। ইমাম মন্তব্য করলেন ইসলামের মেসেজ, কুরআন এতটাই হৃদয়স্পর্শী যে, কেউ হয়তো চোখে দেখে না, হয়তো কানে শোনে না, কিন্তু তাও সময়, কাল, কালচারের গণ্ডি পেরিয়ে তা সবদিকে ছড়িয়ে পরে। তারপর ইমাম কুরআনের রেফারেন্স দিলেন [সূরা আল-হিজর, সূরা নম্বর ২২, আয়াত ৪৬] যেখানে আল্লাহ তা'য়ালা প্রশ্ন করছেন, আর অর্থ অনেকটা এইরকম: তারা কি জমিনে [ঠিকমতো] ভ্রমণ করেনি যে তাদের অন্তরসমূহ উপলব্ধি করতো, আর কানগুলো শুনতো? এরপরের অংশে আল্লাহ তা'য়ালা বলছেন: আসলে সত্য হচ্ছে তাদের চোখ অন্ধ নয়, বরং অন্ধ হচ্ছে তাদের বুকের মধ্যে থাকা হৃদয়/অন্তর গুলো। 

এরপর ইমাম বললেন আমাদের অনেকেই দুইটা হাদিস শুনেছি। কিন্তু এগুলোর কনটেক্সট বা কোন পটভূমিতে রাসূল (সাঃ) তা বলেছেন,  সেগুলো হয়তো জানি না। এর প্রথমটা হচ্ছে, যেখানে রাসূল (সাঃ) বলেছেন, কারো মাধ্যমে [অন্য] কেউ হেদায়াত প্রাপ্ত হলে সেটা তার নিজের জন্য একটা উপত্যকা ভর্তি লাল উটের চেয়েও ভালো। দ্বিতীয়টা হচ্ছে: তোমরা আমার কাছ থেকে যা শুনছো, তার থেকে একটা আয়াত হলেও তা অন্যের কাছে প্রচার করো। ইমাম বললেন, এই দুইটা হাদীসই আপনার, আমার মাধ্যমে অন্যের হেদায়াতের কথা, ইসলাম প্রচারের কথা বলছে। প্রথম হাদিসটা খায়বারের কয়েকদিন ব্যাপি যুদ্ধের পটভূমীতে রাসূল (সাঃ) বলেছেন। তার আগেরদিন রাসূল (সাঃ) বলেছিলেন তিনি পরের দিন এমন একজনকে (যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব) ব্যানার/ঝান্ডা দিবেন, যিনি কিনা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসেন, আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলও সেই ব্যক্তিকে ভালোবাসেন। আবু বকর (রাঃ), উমর (রাঃ), উসমান (রাঃ), আলী (রাঃ) সহ বাকি সব সাহাবীরা কে সেই ব্যক্তি হবেন সেই চিন্তায়, আশায় রাত পার করলেন। পরেরদিন রাসূল (সাঃ) আলী (রাঃ) কে সেই ব্যক্তি হিসাবে মনোনীত করলেন, সম্মানিত করলেন। দায়িত্ব পেয়ে আলী (রাঃ) যখন প্রশ্ন করলেন তিনি যুদ্ধ পরিচালনা করার সময় কি শত্রু ইসলাম কবুল করা না পর্যন্ত, অথবা তাদের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন? তখন রাসূল (সাঃ) না-সূচক মন্তব্য করে নাকি বলেছিলেন এমনভাবে যুদ্ধ করতে যেন তাদের কেউ স্বেচ্ছায় ইসলাম কবুল করে, আর তখন বলেছিলেন, কারো মাধ্যমে কেউ ইসলাম কবুল করে হিদায়াত প্রাপ্ত হলে সেটা তার জন্য একটা লাল উট দিয়ে ভর্তি উপত্যকা থেকেও ভালো। 

ইমাম বললেন, এই লাল উট খুবই বিরল, দামি। উপত্যকা ভর্তি লাল উট - অনেকটা রূপক অর্থে বলা যেটা দুনিয়ার সব ধন সম্পত্তি বুঝতেই ব্যবহার হয়েছে। ইমাম বললেন, চিন্তা করে দেখতে যে যেখানে একজন নিরপরাধ মানুষকে প্রাণে বাঁচানো অনেক সওয়াবের কাজ, সেখানে একজনকে আখিরাতের অনন্ত আজাব থেকে বাঁচানো আরো অনেক বড়ো প্রাপ্তি। 

দ্বিতীয় হাদিসটা বিদায়ী হজ্জের ভাষণে উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে রাসূল (সাঃ) বলেছিলেন। রাসূল (সাঃ) কাছ থেকে শিখে, শুনে একটা আয়াত হলেও সেটা অন্যের কাছে, অনুপস্থিতদের কাছে প্রচার করতে বলেছিলেন।

এরপর ইমাম বললেন, আমরা হয়তো ভাবি ইসলাম প্রচার করার জন্য অন্য আলেম, উলামা, দা'য়ীরা আছেন, আমাদের জ্ঞানইবা কতটুকু যে আমরা সেটা প্রচার করবো?  আরো বললেন, আল্লাহ তা'য়ালা স্বয়ং রাসূল (সাঃ) কে [তাঁর চাচা, আবু-তালিব সম্পর্কে] কুরআনে বলেছেন [সূরা কাসাস, সূরা নম্বর ২৮, আয়াত ৫৬], যার অর্থ অনেকটা এইরকম: আপনি যাকে ভালোবাসেন [যাকে চান] তাকেই  হিদায়াত করতে পারবেন না, বরং আল্লাহ যাকে চান তাকে হিদায়াত দেন, আর তিনিই জানেন কে সঠিক পথে আছে। ইমাম বললেন, আপনি কারো হিদায়াত চান না, কিন্তু তাকে ভালোবাসেন - সেটা হতে পারে না। এরপর ইমাম বললেন, আল্লাহ তা'য়ালা হিদায়াত দেয়ার মালিক, আবার তিনিই তো দোয়া কবুলের মালিক। এরপর প্রশ্ন করলেন, আপনার অফিসের কলিগ, প্রতিবেশী, কিংবা অনেকদিন আগে ফেলে আসা সেই অমুসলিম বন্ধু - তার জন্য কি কখনো আপনি সিন্সিয়ারিলি আল্লাহ তা'য়ালার কাছে তার হেদায়াতের জন্য দোয়া করেছেন? হয়তো করেছেন, হয়তো করেন নাই। কিন্তু আপনার আশেপাশের মানুষ, আপনার বন্ধু-বান্ধব যদি আপনাকে দেখে, আপনার সান্নিধ্য পেয়ে ইসলাম সম্পর্কে আগ্রহী না হয়, তাদের যদি ইসলামের প্রতি ভালো মনোভাব তৈরী না হয়, তাহলে আপনার নিজেকে নিজের ইসলাম নিয়ে কঠিন প্রশ্ন করা প্রয়োজন।

আমাদের প্রত্যেকের উচিত আরো বেশি করে জানা, পড়াশুনা করে ইসলাম ঠিকভাবে পালন করা, আখলাক-চরিত্র ঠিক করে চলা, যাতে আমরা শুধু নিজেরা সঠিক পথের সন্ধান না, অন্যের সঠিক পথ/হিদায়াত পাওয়ার কারণ হতে পারি। 

খুতবার রেকর্ডিং-এর লিংক: https://www.youtube.com/live/ibSeFW0zT9A?feature=share

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ