এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ অগাস্ট, ২০২৩): অন্ধকার(সমূহ) থেকে আলো
এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ অগাস্ট, ২০২৩): অন্ধকার(সমূহ) থেকে আলো
ইমাম ফোডে, মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি।
[সাইডনোট: আজকের খুতবার বিষয়টা একটু জটিল ছিল। একটু অ্যাবস্ট্রাক্ট বা আধ্যাতিক। এখন এর সারমর্ম লিখতে গিয়ে আমি বারবার খুতবার রেকর্ডিং দেখছি - তাও মনে হচ্ছে ঠিকমতো লিখতে পারছি না। নিচে লিংক দিয়ে দিচ্ছি, দেখে নিলে সবচেয়ে ভালো হবে। মূল ভাষ্য, চুম্বক অংশ লিখার চেষ্টা করছি। ]
ইমাম খুতবা শুরু করলেন বলে যে যুগে যুগে যত নবী-রাসূল এই দুনিয়ায় আল্লাহ তা'য়ালা পাঠিয়েছেন - তাদের সবার মিশন মূলত একটাই, মানুষদের 'এনলাইটমেন্ট' (enlightment) বা বোধোদয় বা হেদায়াত করতে সাহায্য করা। উদাহরণ দিয়ে ইমাম বললেন, কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা বলছেন [সূরা ইব্রাহীম: সূরা নম্বর ১৪, আয়াত ৫], যার অর্থ: "নিশ্চয়ই আমরা মুসাকে আমাদের নিদর্শন দিয়ে এই বলে পাঠিয়েছি যে: "তোমার জাতিকে অন্ধকার [সমূহ] থেকে আলোর দিকে বের করে আনো"। ইমাম বললেন, মুসা (আঃ) -এর দায়িত্ব ছিল মিশরে তাঁর জাতিকে সাহায্য করা। আর আমাদের রাসূল (সাঃ), শেষ নবী হিসাবে পুরা মানবজাতির উপর দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে প্রেরিত হয়েছেন। কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা বলছেন [সূরা ইব্রাহিম, সূরা নম্বর ১৪, আয়াত ১]: "আলিফ, লাম, র; এই সেই কিতাব, যা আমরা তোমার কাছে অবতীর্ণ করেছি, যেন তুমি মানুষকে অন্ধকারসমূহ থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারো, তাদের রবের অনুমতিক্রমে, পরাক্রমশালী-প্রশংশিত (আল্লাহ)'র পথে।"
ইমাম বললেন, এই অন্ধকার থেকে আলোর পথে বের করে আনার একটা পদ্ধতি আছে। আর নবী-রাসূলের দেখানো সেই পথ আর পদ্ধতিই হচ্ছে শরিয়া। আরো বললেন, সূরা আল-আনামে আল্লাহ আরো বলছেন [সূরা নম্বর ৬, আয়াত ১]: "সকল প্রশংসা আল্লাহ'র যিনি আসমানসমূহ আর পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, আরো বানিয়েছেন অন্ধকারসমূহ (জুলুমাতি) আর আলো (নূর)।"
ইমাম একটা সহীহ হাদিস বললেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন - যেটা অনেকটা এইরকম: নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সব সৃষ্টি অন্ধকারে করেছেন, তারপর তাতে তাঁর আলো ফেলেছেন। আর যারাই তাঁর আলো পেয়েছে, তারাই পথপ্রাপ্ত আর যারা পায় নাই - তারা পথভ্রষ্ট। ইমাম বললেন এই হাদিস থেকে একটা ব্যাপার স্পষ্ট যে তিনটা ধাপ আছে: আল্লাহর সৃষ্টি, অন্ধকার আর আলো। অন্ধকারের মধ্য দিয়েই কিংবা সেটা পার হয়েই একমাত্র আলোর সন্ধান পাওয়া সম্ভব। এরপর বললেন, আর এই অন্ধকারে পথ নিজে থেকে খুঁজে পাওয়া যায় না। আল্লাহ তা'য়ালা নবী-রাসূল পাঠিয়ে এই পথ খুঁজে পাওয়ার পথ দেখিয়ে দিয়েছেন।
মানুষমাত্রই আমরা ভুল করবো, আমাদের কথা-কাজ দিয়ে আমরা অন্ধকারকে আমাদের জীবনে নিয়ে আসবো। কিন্তু সেই অন্ধকার দূর করার উপায় আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর নবী-রাসূলদের মাধম্যে আমাদের শিখিয়েছেন। ভুল করলে 'কাফফারা' দেয়া, 'ইস্তেগফার' বা মাফ চাওয়ার মাধ্যমে আমরা অন্ধকারকে দূরে ঠেলে দিয়ে অন্তরে আলো আনার ব্যবস্থা করতে পারবো। নিয়মনীতি (শরিয়া) মেনে চললে তা সহজ হবে। ইমাম বললেন, শরিয়া কঠিন নয় বরং তা আমাদের অন্ধকারের বোঝা, দাসত্ব থেকে মুক্তি দিতেই সাহায্য করে।
ইমাম বললেন, একটা লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, কুরআনে অনেকবার অন্ধকার আর আলোর কথা এসেছে। কিন্তু কুরআনে 'অন্ধকার (জুলুমাত)' বহুবচনে উল্লেখ হলেও, 'আলো (নূর)' কিন্তু সবসময়ই একবচনে এসেছে। এ যেন এটা বোঝাতেই যে সৃষ্টিজগতে অনেক ধরণের অন্ধকার বা ভুল পথ আছে, কিন্তু সত্য বা আলো একটাই।
এই সত্য নিজে থেকে চিন্তা করে এমনি এমনি পাওয়া যায় না। এটা মাথা খাটিয়ে পাওয়ার জিনিস না, অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করার বিষয়। রাসূল (সাঃ) নাকি বলেছেন: ঈমান কারো অন্তরে প্রবেশ করলে তার অন্তর প্রশস্ত হয়। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করেছিলেন কী করে আমরা বুঝবো যে আমাদের অন্তর প্রশস্ত হচ্ছে, অর্থাৎ আমরা ঈমানের পথে আছি? উত্তরে নাকি রাসূল (সাঃ) তিনটা লক্ষণের কথা বলেছেন। ইমাম সেগুলো বলার আগে মন্তব্য করলেন, আপনি নিজেই এই তিনটা বিষয় নিয়ে ভাবলে খুব সহজেই বুঝতে পারবেন আপনি ঈমানের পথে আছেন কিনা, নাকি আপনার আরো কাজ বাকি আছে। তিনটা লক্ষণ হলো: ১) সে নিজেকে 'ছলচাতুরির বাসা' বা দুনিয়া থেকে গুটিয়ে নিবে, ২) পরকালের দিকে মনোযোগী হবে আর ৩) মৃত্যু আসার আগেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিবে। ইমাম শেষ পয়েন্টে আরো মন্তব্য করলেন, যদি আপনি দেখেন আপনার মনে আপনি মৃত্যুর চিন্তা এড়িযে চলছেন - তাহলে বুঝতে হবে আপনার ঈমানের ব্যাপারে আরো কাজ করতে হবে।
ইমাম দুই সাহাবীর উদাহরণ দিলেন: বিলাল (রাঃ) আর আম্মার (রাঃ)। দুই জনের মৃত্যু দুইভাবে হয়েছে। প্রথমজনের মৃত্যুশয্যায় আর দ্বিতীয়জনের যুদ্ধক্ষেত্রে। কিন্তু দুই জনের অন্তরের অবস্থা একই ছিল বোঝাতে ইমাম বললেন, দুই জন্যই নাকি তাঁদের শোকাহত পরিবার/বন্ধুদের বলেছিলেন, দুঃখ করতে না, কারণ মৃত্যুর মাধ্যমে তাঁরা তাঁদের প্রিয় মানুষের সাথে [রাসূল (সাঃ)-এর সাথে] মিলিত হতে যাচ্ছেন।
[সবশেষ: স্কুল বন্ধ থাকায়, ইজিয়ানকে নিয়ে এই শুক্রবার জুমুআ পড়তে গেছি। শেষ করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা বলতো কী নিয়ে ইমাম আজকের 'লেকচার' দিলেন ? উত্তরে সে বললো: লাইট আর ডার্কনেস! সবাই ওর আর আমার পরিবারের বাকি সবার জন্য দোয়া করবেন প্লিজ।]
খুতবার রেকর্ডিংয়ের লিংক: https://fb.watch/mwUipTp9ts/
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন