এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২৫ অগাস্ট, ২০২৩): আলহামদুলিল্লাহ, জুমুআর খুতবা আর গুহার কাহিনী
এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২৫ অগাস্ট, ২০২৩): আলহামদুলিল্লাহ, জুমুআর খুতবা আর গুহার কাহিনী
শেখ হামজা আব্দুল মালিক । মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি।
[সাইড নোট: আজকের ইমাম গেস্ট ইমাম। তাঁর নাম: শেখ হামজা আব্দুল মালিক। তিনি টেনেসি রাজ্যের মেম্ফিস শহর থেকে এসেছেন। মিশরের কায়রো শহরের বিখ্যাত ইসলামী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাডুয়েশন করেছেন, কুরআনে হাফেজ। নিচে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ইনস্টিটিউট আর তাঁর পরিচিতির লিংক দিয়ে দিচ্ছি। আজকের খুতবাটা একটু স্পেশাল ছিল, কারণ আমাদের বাসায় বেড়াতে আসা বড় মামী, ছোট খালাসহ মা, রীম বাচ্চারা সবাই মিলে জুমাতে গেলাম, খুতবা শুনলাম। আলহামদুলিল্লাহ !]
ইমাম একটা প্রশ্ন করে খুতবা শুরু করলেন। বললেন, আমরা খুতবার শুরুতে তাঁর পড়া দোয়া খেয়াল করে শুনে থাকলে দেখবো যে তাতে তিনি 'আলহামদুলিল্লাহ' বলে শুরু করেছেন। আরো বললেন, প্রতি শুক্রবার সারা পৃথিবীতে কোনো না কোনো স্থানে যখনই জুমুআর সময় হয়, তখনই মিম্বরে দাঁড়িয়ে ইমাম, হয় 'আলহামদুলিল্লাহ' আর নাহয় তারই অন্য কোনো একটা ভার্সন বলে খুতবা শুরু করেন। এর কারণ কি? এটা তো কোনো কাকতালীয় বিষয় হওয়ার কথা না। এটা বলে তিনি উত্তরে বললেন, এর মূল কারণ রাসূল (সাঃ) আমাদের কিভাবে জুমুআর খুতবা দিতে হয়, শুরু করতে হয়, সেটা শিখিয়ে দিয়ে গেছেন। আর তাই সবাই এইভাবেই খুতবা শুরু করেন। এর পর আবার জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু সেটাই বা কেন?
এর উত্তরে বললেন, রাসূল (সাঃ) এক সহীহ হাদিসে আরো বলে গেছেন, শুক্রবার যেন আমরা সূরা কাহাফ [সূরা নম্বর ১৮] পড়ি। ইমাম বললেন, সূরা কাহাফের প্রথম আয়াত, সেটাও শুরু হয়েছে 'আলহামদুলিল্লাহ' দিয়ে। আর এই আয়াতের প্রথম অংশেই আল্লাহ তা'য়ালা নিজেই সেটার উত্তর দিয়ে দিয়েছেন। আয়াতটা, উচ্চারণ-আর শব্দের অর্থে এইরকম :
আলহামদুলিল্লাহ - সকল প্রশংসা, ধন্যবাদ, ক্রেডিট আল্লাহ'র
হিল্লাযী - যিনি
আন যালা - অবতীর্ণ করেছেন
আ'লা - উপর
আব্দিহি - তাঁর দাসের
ল.. কিতাবা - [the book] সেই কিতাব/বই [কুরআন]
"সকল প্রশংসা, ধন্যবাদ, ক্রেডিট আল্লাহ তা'তায়ালার যিনি তাঁর দাসের (রাসূল (সাঃ)) উপর অবতীর্ন করেছেন সেই বই।"
এরপর ইমাম মুসা (আঃ) -এর ঘটনা বললেন। মুসা (আঃ) তুর পর্বতে উঠে ৪০ দিন অপেক্ষা করার পর ওহী পেয়েছিলেন। জানা যায়, তিনি প্রথমে ৩০ দিন রোজা রেখেছেন, প্রতি রাতে কিয়ামুল-লাইল বা রাতের নামাজ পড়েছেন আর ৩০ দিনের পর, আমরা যেভাবে ২৯/৩০ দিন রোজার পর ঈদের প্রস্তুতি নেই, একইভাবে মুসা (আঃ) তাঁর ঈদের - অর্থাৎ আল্লাহ'র ওহী পাওয়ার আশায় প্রস্তুতি নেয়ার জন্য দাঁত মিসওয়াক করে তৈরী হচ্ছিলেন। আল্লাহ তা'য়ালা নাকি তখন তাঁকে বলেন, তিনি কী জানেন না যে রোজাদারের মুখের গন্ধ তাঁর কাছে মাস্কের সুগন্ধির চেয়েও প্রিয়। এই বলে নাকি মুসা (আঃ) কে আরো ১০ দিন রোজা রাখতে বলেন। আর সেই হিসাবেই মোট ৪০ দিনের প্রস্তুতির পর, আল্লাহ তা'য়ালা অবশেষে মুসা (আঃ) কে ওহী বা কিতাব দেন। ইমাম বললেন, আর আমাদের রাসূল (সাঃ) কে আল্লাহ তা'য়ালা সময়ে সময়ে নিজেই ওহী দিয়েছেন, যদিও সেই ওহীর, প্রতি আয়াতের ওজন অনেক বেশি ছিল, আল্লাহ তা'য়ালা রাসূল (সাঃ) কে প্রস্তুত করে নিয়েছিলেন। তারপরও ওহী নাজিলের সময় রাসূল (সাঃ) এর অনেক কষ্ট হতো। আর রাসূল (সাঃ)'র ওই কষ্টের বিনিময়ে আমরা খুব সহজেই এই কিতাব বা কুরআন পেয়ে গেছি। আর সেজন্যই আমরা "আলহামদুলিল্লাহ" বলি। ইমাম আরো স্মরণ করিয়ে দিলেন, দিনে পাঁচ ওয়াক্তের নামাজে প্রতি রাকাতের হিসাবে আমরা কমপক্ষে ১৭ বার "আলহামদুলিল্লাহ" বলি, কারণ সূরা ফাতিহার প্রথম আয়াত শুরু হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ বলে।
এরপর ইমাম বললেন, রাসূল (সাঃ) যে আমাদের প্রতি শুক্রবার সূরা কাহাফ পড়তে উপদেশ দিয়ে গেছেন, যে এই আমল করবে কবরে, আর আখিরাতে যখন কোনো আলো থাকবে না - তখন সেই ব্যক্তির ভেতর থেকে আলো বের হবে। আর এই সূরা কাহাফের ঘটনা গুহাবাসীর তরুণদেরকে নিয়ে। এরপর ইমাম গুহা নিয়ে আলাপ করলেন। বললেন, কুরআন নাজিল হয়েছিল রাসূল (সাঃ) যখন হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন ছিলেন। 'ইক্বরা' বা 'কিরাআত করুন', অর্থাৎ পাঠ করুন - বলে প্রথম আয়াত যখন জিব্রাইল (আঃ) নিয়ে আসেন, তখন "আমি তো পড়তে জানি না" বলে রাসূল (সাঃ) উত্তর দিলে জিব্রাইল (আঃ) তাঁকে সজোরে চেপে ধরেন। এইভাবে পরপর তিনবার 'ইক্বরা' বলে চেপে ধরলে রাসূল (সাঃ) একই উত্তর দেন। একসময় তাঁর মনে হয় তিনি দম বন্ধ হয়ে মারা যাবেন। তখন তৃতীয়বারের সময় জিব্রাইল (আঃ) আয়াতের পরের অংশ বলে উঠেন [সূরা আল-আলাক, সূরা নম্বর ৯৬, আয়াত ১]:
'ইক্বরা - পড়ুন
বিসমি - নামে
রাব্বিকা - আপনার রবের
ল্লাযি -যিনি
খালাক্ব - সৃষ্টি করেছেন
অর্থ: পড়ুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।
ইমাম মন্তব্য করলেন, এই তিন তিন বার সজোরে চাপ দিয়ে জিব্রাইল (আঃ) যেন রাসূল (সাঃ)'র অন্তরে যেন ওহী গেঁথে যায়, তারই ব্যবস্থা করছিলেন। আর এরপর 'বিস্মিরাব্বিকাল্লাযী' - বলে যেন শিখিয়ে দিলেন, আল্লাহ'র সাথে যখন আমাদের সরাসরি যোগাযোগ থাকবে, তখন আমাদের পক্ষে যেকোনো কিছুই করা সম্ভব।
এরপর ইমাম দ্বিত্বীয় গুহার উদাহরণ দিলেন। যখন রাসূল (সাঃ) আবু বকর (রাঃ) কে নিয়ে হিজরত করে মদিনায় যাওয়ার সময় কুরাইশদের হাত থেকে বাঁচতে যখন জাবালে সুর - এর এক গুহায় আশ্রয় নিলেন - তার আগে তিনি কুরাইশদের বোকা বানাতে সব চেষ্টাই করেছেন। আলী (রাঃ) কে তাঁর বিছানায় শুইয়ে রেখে এসেছেন। মদিনা মক্কার উত্তরে হলেও দক্ষিণে জাবালে সুরের দিকে রওনা হয়ে তারপর উত্তরে অনেক পথ ঘুরে মদিনায় যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। আবু বকর (রাঃ)'র মেয়েরা রাসূল (সাঃ) আর তাঁদের বাবার দক্ষিণ দিকে যাওয়ার পথ মুছে দিতে চেষ্টা করেছেন - কিন্তু তা'ও লাভ হয় নাই। কুরাইশরা ঠিকই জাবালে সুরে তাঁদের খোঁজ পেয়ে গেছে। যখন আবু বকর বলেই বসলেন যে কুরাইশরা শুধু একটু নিচের দিকে তাকালেই তাঁদের দেখে ফেলবে, তখন রাসূল (সাঃ) উত্তরে আবু বকর (রাঃ) কে আশস্ত করেছেন, তাঁদের সাথে আল্লাহ আছেন। আর এই ঘটনা পরে আল্লাহ তা'য়ালা কুরআনেও বলেছেন: সূরা তাওবা, সূরা নম্বর ৯, আয়াত ৪০, যার অর্থ: যদি তোমরা তাঁকে (রাসূল সাঃ) সাহায্য নাও করো, আল্লাহ তাঁকে ইতিমধ্যেই সাহায্য করেছেন, যখন অবিশ্বাসীরা তাঁকে তাড়িয়ে দিয়েছিল, আর তিনি দুইজনের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন গুহার মধ্যে আর তাঁর সঙ্গীকে বলেছিলেন: "চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন"। ইমাম বললেন, ঘরের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল যে মাকড়সার জালের ঘর, সেই দুর্বল ঘরের সাহায্যেই আল্লাহ তা'য়ালা তাঁর রাসূলকে (সাঃ) রক্ষা করলেন। ইমাম আবারো বললেন, যদি আল্লাহ'র সাথে কারো যোগাযোগ থাকে, তাহলে কেউই কারো ক্ষতি করতে পারবে না।
এরপর ইমাম তৃতীয় গুহার ঘটনা বললেন: সূরা কাহাফের সেই তরুণ গুহাবাসীদের গল্প। যারা ঈসা (আঃ) 'র অনুসারী মুসলিম ছিল। ঈসা (আঃ)'র মৃত্যুর পর যখন তাঁর প্রচারিত ধর্ম বদলে যেতে লাগলো, তখন এই তরুণরা, ঈসা (আঃ)-র প্রচারিত আল্লাহ'র একত্ববাদে বিশ্বাস ঘোষণা করলো। অত্যাচার, মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তাঁরা এই ঘোষণা দিলো। আর তাঁরা আল্লাহ'র সাহায্য চাইলে আল্লাহ তাঁদের গুহায় ঘুম পাড়িয়ে দিলেন। ৩০০ বছরের পর ঘুম ভাঙলে তাঁরা যখন বের হয়ে আসেন, তখন সমাজে ঈসা(আঃ)'র প্রচারিত মূল ধর্ম আর নাই, অনেক বদলে গেছে। ঈসা (আঃ) কে ক্রুশবিদ্ধ করে মেরে ফেলা হয়েছে - ইত্যাদি অনেক বিতর্ক। ইমাম বললেন, সেই তরুণদেরকে দিয়ে আল্লাহ তা'য়ালা যেন এটাই দেখতে চাইলেন যে তিনি চাইলে কাউকে মৃত্যু না দিয়েও সরিয়ে দিতে পারেন। কুরআনে যেমন বলা আছে, ঈসা (আঃ) কে মেরে ফেলা হয় নাই - তাঁকে আল্লাহ তা'য়ালা তুলে নিয়ে গেছেন - তিনি শেষ জমানায় আবারো আসবেন - এ যেন তারই এক চাক্ষুস উদাহরণ।
খুতবার দ্বিতীয় অংশে ইমাম আবারো বললেন, আল্লাহ'র সাথে কারো যোগাযোগ থাকলে তাকে আল্লাহ কোনো না কোনোভাবে সাহায্য করবেনই। এরপর তিনি মুষ্টিযোদ্ধা/বক্সিং লেজেন্ড মোহাম্মদ আলীকে নিয়ে বললেন। কীভাবে মোহাম্মদ আলী তাঁর মৃত্যুর অনেক আগেই তাঁর মৃত্যুর পর মেমোরিয়াল সার্ভিস প্ল্যান করে রেখেছিলেন। তিনি জানতেন তাঁর মৃত্যুর পর অনেক মানুষ হবে, আর তাই তিনি সেটা যেন ইসলামের দাওয়াতের একটা উপলক্ষ হয়, আর তাতে যেন সবার প্রথম কুরআন পড়া হয়, সেজন্য প্ল্যান করে রেখেছিলেন। ইমাম তিনি কিভাবে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এই ব্যাপারে ফোন কল পেয়েছিলেন, তার অনেক বছর পর, মোহাম্মদ আলীর মৃত্যুর পর সেই মেমোরিয়ালের তিনি কুরআন পড়েছিলেন, সেটার স্মৃতিচারণ করলেন। পড়া শেষে তাঁরা আমেরিকা ফিরে কিভাবে টেনেসি অঙ্গরাজ্যের মেমফিস শহরে একটা স্কুল খুলে তাতে কুরআন শিক্ষা দিচ্ছেন, কিভাবে সেটা শহরের ওই অংশের মানুষদের বদলে দিচ্ছে সেটা সংক্ষেপে বললেন। স্কুল চালানোর জন্য সবার সাহায্য-সহযোগিতা, দোয়া চাইলেন।
ইমামের পরিচিতি, আর তাঁর প্রতিষ্টিত মিরাজ একাডেমি ইনস্টিটিউটের লিংক:
https://www.miraajacademy.org/discover/
খুতবার রেকর্ডিং লিংক: https://fb.watch/mHeURIq5ZF/
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন