এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (৪ অগাস্ট ২০২৩): কেয়ামতের দিন সাত ধরণের ব্যক্তি

এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (৪ অগাস্ট ২০২৩): কেয়ামতের দিন সাত ধরণের ব্যক্তি 
ইমাম শিবলী । ইসলামিক সোসাইটি অফ সেন্ট্রাল জার্সি, নিউ ব্রান্সউইক টাউনশিপ, নিউ জার্সি 

ইমাম প্রথমের সাহাবী আবু হুরাইরা (রাঃ) সম্পর্কে বললেন।  আবু হুরাইরা (রাঃ) রাসূল (সাঃ) -র সরাসরি ছাত্র, যিনি কিনা আর অন্য কিছুই করতেন না। তাঁর কাজই ছিল রাসূল (সাঃ)-র সাথে সারাদিন থেকে তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন জিনিস শেখা। তিনি রাসূল (সাঃ) কে তাঁর নিজের জীবন থেকেও বেশি ভালোবাসতেন। শুরুর দিকে আবু হুরাইরা (রাঃ)'র মা তাদের বিরোধী ছিলেন, এমনকি তিনি রাসূল (সাঃ) কে অভিশাপও দিয়েছেন। কিন্তু এই ব্যাপারটা জেনে পরে রাসূল (সাঃ) দোয়া করার পর, আবু হুরাইরা (রাঃ)-র মা মুসলিম হন। এই পর্যায়ে ইমাম বললেন, আমরা যদি আমাদের সব কিছুর চেয়ে, এমনকি নিজের মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী-সন্তান থেকেও রাসূল (সাঃ) কে বেশি ভালোবাসতে না পারি, তাহলে আমাদের ঈমান 'রিনিউ' করতে হবে। 

[সাইডনোট - ১: আমি টেক্সাসে থাকতে শেখ ইউসুফ এস্টেট'র একটা লেকচারে এই ব্যাপারটা জানার পর,  প্রশ্ন-উত্তর পর্বে তাকে নোট লিখে জিজ্ঞেস করেছিলাম: এটা কী করে সম্ভব? আমাদের পক্ষে কী করে রাসূল (সাঃ) কে সবকিছুর থেকে বেশি ভালোবাসা সম্ভব? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, তিনি যখন খ্রিস্টান থেকে রিভার্টেড হয়ে মুসলিম হন, তখন তাঁর মনেও এই একই প্রশ্ন এসেছিলো। কিন্তু যতই তিনি রাসূল (সাঃ) র জীবনী পড়েছেন, তাঁর সম্পর্কে জেনেছেন, আমাদের রাসূল (সাঃ) ইসলাম ও তাঁর উম্মার জন্য কী করেছেন, কত ত্যাগ আর কষ্ট করেছেন - সেগুলো জেনেছেন, তার পর আর তাঁর কাছে এই ব্যাপারটা অসম্ভব মনে হয় নাই। তিনি সবাইকে রাসূল (সাঃ) জীবনী পড়তে উপদেশ দিয়েছিলেন, এমনকি ইংরেজিতে অনুবাদ করা একটা বই পড়তে সাজেস্ট করেছিলেন: The Sealed Necter ]

[সাইডনোট -২: আবু হুরাইরা (রাঃ)'র আসল নাম আসলে অন্য কিছু। তিনি বিড়াল খুব পছন্দ করতেন। তাঁর পরণের জুব্বার হাতের ভেতর থেকে একদিন এক বিড়াল বের হয়ে আসলে, রাসূল (সাঃ) তাঁকে মজা করে 'আবু হুরাইরা' - বা 'বিড়ালের বাবা' বলে সম্বোধন করেন। আর এরপর থেকেই তাঁর এই নাম হয়ে যায়।]

এরপর ইমাম আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত একটা হাদিস বলেন: রাসূল (সাঃ) বলেছেন, কেয়ামতের দিনে যখন আর কোনো ছায়া থাকবে না শুধু আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া, সাত ধরণের লোক (পুরুষ কিংবা মহিলা) তাতে আশ্রয় পাবে। এরপর ইমাম এক এক করে তাদের কথা বললেন, আর ব্যাখ্যা দিলেন: (১) ন্যায় পরায়ণ শাসক: ইমাম বললেন, রাসূল (সাঃ) আর খুলাফায়ে রাশেদীন (সঠিক পথ প্রাপ্ত) চার খলিফা: আবু বক্বর, উমর, ওসমান আর আলী (রাঃ) এই দলে নিশ্চিত ভাবে পড়েন। এছাড়াও শুধু শাসক না, যাদেরই অন্যের উপর কর্তৃত্ব আছে, এমনকি বাসার কর্তা,  - তারা ন্যায় পরায়ণ হলেও, এই দলে পড়বেন। 

(২) আল্লাহর ইবাদত করে বড় হওয়া ছেলে-মেয়ে: এই ব্যাপারে বাবা-মার ভূমিকা নিয়ে ইমাম আলাপ করলেন। ছোটবেলা থেকেই তাদের মসজিদে নিয়ে আসতে হবে, ইসলাম শিক্ষা দিতে হবে। 

(৩) যে ব্যক্তির হৃদয় মসজিদ মুখাপেক্ষী: ইমাম বললেন, এই ধরণের লোকজন মসজিদে সময় কাটাতে পছন্দ করে, শুধু নামাজ না,  মসজিদ-কেন্দ্রিক অন্য কাজ-কর্মেও জড়িত থাকে, মসজিদের উন্নয়নে খরচ করে। 

(৪) যে কোনো দুই ব্যক্তি যারা আল্লাহ'র উদ্দেশ্যে মিলিত হয়, আবার আল্লাহর উদ্দেশ্যেই আলাদা হয়ে যায়: এর ব্যাখ্যায় উদাহরণ দিয়ে ইমাম বললেন, কেউ হালাল কোনো কাজ বা ব্যবসার জন্য যখন অন্য কারো সাথে দেখা করে, আবার কাজ শেষ করে যে যার পথে চলে যায় - তারা এই কাতারে পড়বে। 

(৫) যে ব্যক্তি নিজেকে 'যিনা' থেকে রক্ষা করে: সুযোগ থাকলেও বলবে আমি আল্লাহ তা'য়ালা কে ভয় পাই। এই প্রসঙ্গে ইমাম ইউসুফ (আঃ) এর ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিলেন।

(৬) লুকিয়ে দান-খয়রাত করা ব্যক্তি: এমন ব্যক্তি যার "বাম হাত জানবে না তার ডান হাত কী দান করেছে" - অর্থাৎ শুধু আল্লাহ কে খুশি করার জন্য, লোক দেখানোর জন্য নয় যে ব্যক্তি দান-খয়রাত করবে। 

(৭) আল্লাহর স্মরণে যে ব্যক্তি নীরবে চোখে পানি ফেলবে: ইমাম বললেন, কোনো মন খারাপ করে না, হয়তো চুপচাপ বসে আছে, আর আল্লাহকে স্মরণ করছে (জিকির করছে) - যার চোখ এমনি এমনি তে ভিজে যায় - এমন ব্যক্তি এই দলে থাকবেন।   

সবশেষে ইমাম আমরা যেন এই সাত ধরণের লোকের অন্তর্ভুক্ত হই, সেই দোয়া করে খুতবা শেষ করলেন। 
হাদিসটার লিংক: https://sunnah.com/riyadussalihin:449

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ