রাসূল (সাঃ)'র চাচা হামজা (রাঃ) ও উহুদের যুদ্ধে তাঁর খুনি, আবীসিনিয়ার দাস ওয়াহ্শী:

রাসূল (সাঃ)'র চাচা হামজা (রাঃ) ও উহুদের যুদ্ধে তাঁর খুনি, আবীসিনিয়ার দাস ওয়াহ্শী:
এপিসোড ৪৯ - ৫০। নবী (সাঃ)'র সিরাহ । শেখ ইয়াসির ক্বাদী 

[সাইড নোট: এই শুক্রবার জুমুআর খুতবা অনেক দেরি করে পৌঁছানোয় ঠিকমতো শুনি নাই। যতটুকু শুনছি, ততটুকু ঠিক আসলে লেখার কিছু নাই। সেইজন্য ভাবলাম অন্য একটা বিষয় নিয়ে লিখি - যেগুলো আমি আগে জানতাম না। ইয়াসির ক্বাদীর রাসূল (সাঃ)'র জীবনী বা সিরাহর উপর একটা চমৎকার পডকাস্ট আছে, ইউটুবেও লেকচার আছে - সেগুলো থেকেই কয়েকদিন আগে শোনা একটা ঘটনাই আজকে লিখছি। নিচে লিংক দিয়ে দিচ্ছি।  বরাবরের মতো ডিসক্লেইমার: আমার শোনার ভুল হতে পারে। তাই, নিজ থেকে ভেরিফাই করে নেয়ার অনুরোধ থাকলো।]  

হামজা (রাঃ) সম্পর্কে রাসূল (সাঃ)'র আপন চাচা। ইসলাম প্রচার শুরু করার পর, রাসূল (সাঃ)'র অনেক শত্রু বা  প্রতিপক্ষ হয়ে যায়। এতিম হয়ে দাদা-চাচার কাছে বড়ো হওয়া রাসূল(সাঃ) তাঁর নিজের পরিবারের কাছেই বেশি সমর্থন পান নাই।  তাঁর আপন চাচা-ফুফুদের মধ্যে যেই কয়েকজন শুধু ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে হামজা (রাঃ) ছিলেন অন্যতম। হামজা (রাঃ) খুবই শক্তিশালী, প্রভাবশালী আর চৌকষ কুরাইশী যোদ্ধা ছিলেন। বলা হয় হামজা (রাঃ) আর উমর (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করার পর পরই ইসলাম শক্তিশালী হওয়া শুরু করে। এই হামজা (রাঃ) - উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। কিন্তু তাঁকে সম্মুখ যুদ্ধে পরাজিত করা হয় নাই। তিনি তলোয়ার চালনায় এতটাই দক্ষ ছিলেন যে সেটা নাকি সম্ভবও ছিল না।উহুদের যুদ্ধের আগে ঘটা বদরের যুদ্ধে হামজা(রাঃ) মক্কার কুরাইশদের এক প্রভাবশালী নেতা উতবা-ইবন রাবি'আ কে মেরে ফেলেন। সেই মৃত্যুর বদলা নিতে, আর রাসূল (সাঃ) কে শায়েস্তা করতে উতবা-ইবন-রাবি'আ'র মেয়ে হিন্দ-বিনতে-উতবা দাস ওয়াহ্শীকে উহুদের যুদ্ধে নিয়োগ দেন। ওয়াহ্শী, আবিসিনিয়া থেকে আসা দাস, যে কিনা দূর থেকে বল্লম বা বর্শা নিক্ষেপে পারদর্শী ছিলেন, তাকে বলা হয়: হামজা (রাঃ) এক মারতে পারলে তাকে পুরস্কার হিসাবে দাসত্ব থেকে  মুক্ত করে দেয়া হবে - এই প্রতিশ্রুতিতে তাকে উহুদে পাঠানো হয়। 


যুদ্ধে যে কারো মৃত্যু হতেই পারে। যদিও দূর থেকে, লুকিয়ে বর্শা মেরে খুন করায় কোনো বীরত্ব ছিল না, তারপরও এই মৃত্যু হয়তো স্বাভাবিক ভাবেই নেয়া হতো। কিন্তু তা হয় নাই এরপরের কিছু ঘটনায়। হামজা (রাঃ) কে মারার পর - যখন পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে আর মুসলিমরা পিছু হটতে থাকে - তখন এই হিন্দ-বিনতে-উতবা যুদ্ধের ময়দানে এসে হামজা (রাঃ)'র মৃতদেহ খুঁজে বের করে,  সে এতটাই প্রতিশোধ পরায়ণ ছিল যে হামজা (রাঃ)'র মৃতদেহের আঙ্গুল-নাক কেটে ফেলে,  আর পেট কেটে কলিজা বের করে কামড়িয়ে থুথু দিয়ে ফেলে দেয়। এইসব করার সময় সে যে চিৎকার দেয় - সেটা নাকি এতটাই তীব্র আর ভয়ানক ছিল যে অনেকের মনেই সেটা দাগ কাটে, অনেকদিন ছিল, আর এরপর এই হিন্দের নাম হয়ে যায় 'কলিজাখেকো'!

এরপর যখন রাসূল (সাঃ) হামজা (রাঃ)'র লাশের এই অবস্থা দেখেন, তিনি ফুঁপিয়ে খুব কাঁদেন। সেইসময় যুদ্ধে কেউ মারা গেলে তার পরিবারের লোকজন, বিশেষ করে মহিলাদের মাতম করে কান্নার রীতি ছিল। উহুদের প্রান্তরে অনন্যা শহীদের সাথে হামজা (রাঃ)'র লাশ দাফন করে পরে যখন মুসলিমরা মদিনায় ফিরে আসেন, তখন যুদ্ধে মারা যাওয়া 'আনসার' দের বাড়ি থেকে মাতমের আওয়াজ শুনে রাসূল (সাঃ) আফসোস করেন যে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করে আসা 'মুহাজির' হামজা (রাঃ)'র জন্য তো কান্না করার, মাতম করার কেউ নাই। এই কথা শুনে পরে কিছু আনসারী মহিলা রাসূল (সাঃ)'র বাড়ির সামনে জড়ো হয়ে হামজা (রাঃ)'র জন্য মাতম করতে থাকে। সেটা রাসূল (সাঃ)'র পছন্দ হয় না। পরে তিনি কেউ মারা গেলে তার জন্য মাতম করে কান্না করা নিষেধ করেন আর এরপরেই ইসলামে সেটা 'হারাম' হিসাবে গণ্য হয়।       


এর পরের ঘটনা গুলো আরো ইন্টারেষ্টিং। মুসলিমদের মক্কা বিজয়ের পর এই ওয়াহ্শী প্রথমে মক্কা থেকে দূরে তাইফ শহরে পালিয়ে যায়। পরে তাইফ শহর যখন মুসলিমরা জয় করে, তখন ওয়াহ্শী আত্মগোপনে চলে যায়। পরে সে শুনতে পায় যে ইসলাম কবুল করলে রাসূল (সাঃ) সবাইকে মাফ করে দেন। পরে এই ওয়াহ্শী আর হিন্দ - দুইজনই ইসলাম গ্রহণ করেন - তখন তাদের সব অতীত অপরাধ, গুনাহ মাফ হয়ে গেছে - এই বিবেচনায় কাউকেই আর শাস্তি দেয়া হয় না। রাসূল (সাঃ) শুধু দুইজনকেই বলেছিলেন যে তারা যেন তাঁর সামনে না আসে - কারণ তাতে তাঁর প্রিয় চাচার স্মৃতি মনে পড়ে যাবে। মুসলিমদের জন্য রাসূল (সাঃ) বেঁচে থাকতে তাঁর সামনে আসা যাবে না - এটাও ইয়াসির ক্বাদীর মতে একটা শাস্তি।

এরপর একটা কাহিনী ইয়াসির ক্বাদী বললেন: এই ওয়াহ্শী ইসলাম গ্রহণ করে সাহাবী হয়ে গেলেও তাঁর একটা বদ অভ্যাস ছিল। তিনি প্রায়ই মদ খেয়ে মাতাল হয়ে যেতেন। আর তখন শাস্তি হিসাবে ৪০ ঘা চাবুকের বাড়ি পড়তো।  শাস্তির পর তওবা করে কিছুদিন পরে তিনি আবারো একই ভুল করতেন। এটা প্রায়ই নাকি ঘটতো। উমর (রাঃ) নাকি এই ব্যাপারে একবার মন্তব্য করেছিলেন যে, হামজা (রাঃ) কে মেরে রাসূল (সাঃ) কে এতো কষ্ট দেয়া ব্যক্তিকে আল্লাহ তা'য়ালা দুনিয়াতেই অন্যভাবে শাস্তির ব্যবস্থা করবেন - এটাই স্বাভাবিক।

ইয়াসির ক্বাদীর মতে, সাহাবীরা মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে ভালো জেনারেশন তাতে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু তাঁদেরও ভুল ত্রুটি ছিল, রাসূল (সাঃ) সেগুলোর বিরুদ্ধে বিচার-শাস্তির ব্যবস্থাও করেছেন। কিন্তু তাঁদের একটা ব্যাপারে কোনো ত্রুটি ছিল না, আর সেটা হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ)'র আনুগত্য।      

সবশেষ: মক্কা-মদিনায় প্রায় সব কবরেই কোনো চিহ্ন নাই। কিন্তু ব্যতিক্রম হচ্ছে এই হামজা (রাঃ)'র কবর। উহুদের প্রান্তরে যেখানে তার কবর, সেই জায়গাটা বড় করে গ্রিলের দেয়াল দিয়ে ঘেরাও করে রাখা। নোটিস বোর্ড টাঙিয়ে বিভিন্ন ভাষায় কবর পূজা না করার ব্যাপারে সাবধান করা আছে। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে দূর থেকে কবরটা দেখা যায়। মদিনায় কেউ গেলেই এই জায়গায় সবাই যায়, আমিও গিয়েছিলাম, দেখছি। উহুদের যুদ্ধে রাসূল (সাঃ) নিজেও মারাত্মক আহত হন। এমনকি তাঁর মৃত্যুর গুঁজবও রটে যায়। পিছন হটে উহুদের পাহাড়ে আশ্রয় নেয়ার সময় তাঁকে বাঁচাতে কী করে আনসাররা এক এক করে শত্রুর সামনে নিজেদের বিলিয়ে দিয়ে শহীদ হন সেই ঘটনাও ওই পডকাস্টে আছে। 

লেকচারের ইউটুব লিংক: https://youtu.be/WGnJH5o2xj8?si=s0VDzeYq6FYKhqdI

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ