এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৩): এক মুসলিমের উপর অন্য মুসলিমের ৬ হ্বক
ইমাম মুয়াজ । ইসলামিক সোসাইটি অফ সেন্ট্রাল জার্সি, নিউ ব্রান্সউইক টাউনশিপ, নিউ জার্সি
ইমাম সারা খুতবা শুধু একটা হাদিসের উপর আলাপ করলেন। রাসূল (সাঃ)'র একটা সহীহ হাদিস আছে যেখানে তিনি বলেছেন প্রত্যেক মুসলিমের অন্য মুসলিমের উপর ৬ টা হ্বক আছে। আর তা হচ্ছে: ১) দেখা হলে সালাম দেয়া ২) দাওয়াত দিলে তা গ্রহণ করা, ৩) উপদেশ বা নসীহা চাইলে সিন্সিয়ারিলি উপদেশ দেয়া, ৪) হাঁচি দিয়ে 'আলহামদুলিল্লাহ' বলতে শুনলে 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' বলা, ৫) অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া আর ৬) মারা যাওয়ার পর জানাজায় শরিক হওয়া। পরে পুরা খুতবা তিনি এই প্রত্যেকটা পয়েন্টের উপর আলাদা আলাদা আলাপ করলেন, এগুলোর পেছনে কী হিক্বমা আছে তা আলোচনা করলেন। আর প্রতিটা পয়েন্ট বলেন, তারপর পরের পয়েন্ট বলার আগে আবারো আগের সবগুলো পয়েন্ট আবারো মনে করিয়ে দেন। তিনি বলেই ফেললেন, তিনি এটা করছেন যেন আমাদের মাথায় পয়েন্টগুলো গেঁথে যায়। আমি নিচে প্রত্যেকটা পয়েন্টের মূল কথাগুলো খুব সংক্ষেপে লিখছি।
১) দেখা হলে সালাম দেয়া: ইমাম বললেন, শুধু পরিচিত না, অপরিচিত মুসলিমদের দেখা হলেও সালাম দিতে হবে। এই সালাম এমনভাবে দিতে হবে যেন আপনি আসলেই তার উপর 'সালাম' বা শান্তি বর্ষিত হোক, সেটা চাচ্ছেন। আপনার যা-যা নেয়ামত আছে, তারও সেটা হোক, এমনভাবে চেয়েই তার শান্তি চাইতে হবে। ইমাম বললেন, আমরা মসজিদে এসে শুধু নামাজ পড়লেই হবে না, নাম জেনে, নাম ধরে সালাম দিয়ে একে অপরের কুশলাদি জিজ্ঞেস করতে হবে - তবেই ভাতৃত্ববোধ জেগে উঠবে।
২) দাওয়াত দিলে তা গ্রহণ করা: ইমাম বললেন, আমরা ইদানিং এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি যে কেউ দাওয়াত দিলে খুশি না হয়ে বরং ভয় পাই, বিরক্ত হই। ইমাম বললেন, আল্লাহ তা'য়ালা আমাদের পরিচিত বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, কাজের সহকর্মী সবাইকে এমনি এমনি আমাদের জীবনে দেন নাই। এরা আমাদের জীবনে নেয়ামত। এদের সাথে সময় কাটানোর জন্য, কেউ দাওয়াত দিলে এই হাদিস চিন্তা করে হলেও যদি আমরা দাওয়াতে যাই, তাহলে সেটাও আল্লাহ'র ইবাদত হবে।
৩) উপদেশ চাইলে সিন্সিয়ারিলি উপদেশ দেয়া: কেউ উপদেশ চাইলে, কোনো সমস্যার কথা বললে, সেটা এড়িয়ে না গিয়ে বরং মনোযোগ দিয়ে শুনে সেটার সমাধানে সিন্সিয়ারিলি উপদেশ দিতে হবে, বুদ্ধি দেয়ার চেষ্টা করতে হবে। মনে রাখতে হবে কেউ উপদেশ চাইতে আসলে, সেটা আল্লাহ'র কাছ থেকে আসা সন্মান। একইভাবে, নিজের কোনো সমস্যায় উপদেশ চাইতেও লজ্জিত বা কুন্ঠাবোধ করলে চলবে বা। ইমাম বললেন, আজকের যুগে আমরা কেউই নিজেদের সমস্যার কথা বলতে চাই না, আর তাতে করে আমরা একা হয়ে পড়ছি। ইসলামে একে-অপরকে সাহায্য করার উপর, একসাথে সমস্যা মোকাবেলার উপর অনেক জোর দেয়া হয়েছে।
৪) হাঁচির পর কেউ 'আলহামদুলিল্লাহ' বললে উত্তরে 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' বলা: ইমাম বললেন, কেউ হয়তো ভাবতে পারে, এইটা আবার কেমন উপদেশ! কিন্তু এর পেছনের মূল কারণ বা হিক্বমা হচ্ছে, অন্যের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রাখা। আরো বললেন, আদম (আঃ) কে আল্লাহ সৃষ্টির পর রূহ প্রবেশ করানোর পর, তাঁর প্রথম 'একশন'-ই ছিল হাঁচি। আর তারপর আদম (আঃ) 'আলহামদুলিল্লাহ' বললে স্বয়ং আল্লাহ তা'য়ালা নাকি উত্তরে 'ইয়ারহামুকাল্লাহ' বলেছিলেন।
৫) অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া: ইমাম পরিষ্কার করলেন, কেউ ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হলে, কিংবা নিজের ক্ষতি হতে পারে এমন আশংকার ক্ষেত্রে এই উপদেশ প্রযোজ্য না। কিন্তু সাধারণভাবে কেউ অসুস্হ হলে খুবই নিঃসঙ্গবোধ করে, আর তখন তাকে দেখতে গেলে তার অনেক ভালো লাগে। এটা খুবই সওয়াবের কাজ।
৬) মারা গেলে জানাজায় শরিক হওয়া: এই পয়েন্ট বলতে গিয়ে ইমাম কিছুটা ইমোশনাল হয়ে পড়েছিলেন। ইমাম বললেন, পরিচিত কেউ হলে তো অবশ্যই, অপরিচিত হলেও কেউ মারা গেলে তার জানাজায় শরিক হতে হয়; জানাজা আর দাফনের মিছিলে যোগ দিতে হয়। ইমাম একটা হাদিস বললনে, রাসূল (সাঃ)'র মসজিদ পরিষ্কার করতেন যে মহিলা, এক রাতে তিনি মারা গেলে রাসূল (সাঃ) কে জানানো হয় নাই। কিন্তু তিনি পরেরদিন মসজিদে এসে ওই মহিলাকে দেখতে না পেয়ে সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করলে যখন জানতে পারেন যে এটা সামান্য/স্বাভাবিক ঘটনা ভেবে তাঁকে বিরক্ত না করার জন্য সাহাবীরা তাঁকে বলেন নাই, তিনি নাকি বিরক্ত হন, আর সাথে সাথেই ওই মহিলার কবর দেখাতে বলেন। রাসূল (সাঃ) সেখানে গিয়ে আবারো জানাজা পড়েন। ইমাম বললেন, কেউ মারা গেলে তার জন্য বেশি বেশি সদকা দিলে, বিশেষ করে তাঁর সন্তানরা ভালো কাজ, সদকা করলে মুর্দার কাছে সেটা পৌঁছায়, কবরে তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
ইমাম সবশেষে বললেন, খুব ছোট হলেও, এই হাদিসের আমলগুলো খুবই জরুরি। আমাদের সবার যথাসাধ্য এইগুলো আমল করার চেষ্টা করতে হবে।
[সাইডনোট: খুতবা শোনার সময় আমার মনে হচ্ছিলো, আমি এই হাদিসটা আগে কোথাও শুনেছি, আর হয়তো লিখেছিলামও। পরে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে পেয়েও গেছি। খুতবায় না, ড. ওমর সুলাইমানের একটা লেকচারে শুনেছিলাম। কোনো এক শুক্রবারের জুমুআ মিস করে, পরে ওই লেকচার সম্পর্কে লিখেছিলাম। পুরানো সেই লেখাটার লিংক শেয়ার করছি: https://banglakhutba.substack.com/p/22-06-05]
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন