এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৩): নিয়্যতেই কাজের বিচার

এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৩): নিয়্যতেই কাজের বিচার
ইমাম সাফওয়ান ঈদ । মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি

[সাইডনোট/ডিসক্লেইমার: ইমাম সাফওয়ান ঈদের খুতবা বরাবরই একটু গভীর হয়। সারমর্ম লিখতে বসলেই মনে হয় ঠিকমতো লেখা হচ্ছে না। নিচে খুতবার রেকর্ডিংয়ের লিংক দিয়ে দিচ্ছি, নিজে থেকে দেখে নিলেই সবচেয়ে ভালো হবে। আর আরেকটা কথা: সারমর্ম লিখছি ঠিকই, কিন্তু সেটা পড়ে আমাকে খুব প্রাক্টিসিং ভাবা, কিংবা ইসলামী লাইনে খুব পড়াশুনা করে ফেলছি, জেনে ফেলছি, আমল ভালো ইত্যাদি ভাবা খুবই ভুল হবে -- বরং উল্টাটা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আমার লিখতে ভালো লাগে,  এই লেখা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছি মাত্র।]

ইমাম শুরু করলেন কুরআনের একটা আয়াতের রেফারেন্স দিয়ে, যেখানে রাসূল (সাঃ) কে আল্লাহ তা'য়ালা ঈসা (আঃ)'র ঘটনা স্মরণ করতে বলছেন (যার অর্থ) [সূরা আস-সাফ, সূরা নম্বর ৬১, আয়াত ৬-এর প্রথম অংশ]: "যখন মরিয়ম পুত্র ঈসা বললেন "হে বনী ইসরাইল (ইসরাইলের সন্তানেরা)! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের প্রতি আল্লাহ'র কাছ থেকে প্রেরিত রাসূল, সত্বায়নকারী সেই তাওরাতের যা তোমাদের উপর আগে প্রেরিত হয়েছে, আর সুসংবাদ প্রদানকারী একজন রাসূলের যিনি আমার পরে আসবেন, আর যার নাম হবে 'আহমাদ'।"  ইমাম বললেন,  ঈসা (আঃ)'র মেসেজ কে 'গসপেল' বলা হয়, আর আক্ষরিক অর্থই 'সুসংবাদ'। 

[সাইডনোট: এই আয়াতে স্পষ্টতই ঈসা (আঃ) নিজেকে বনী ইসরাইলের কাছে আগত রাসূল হিসাবে নিজেকে বলছেন, পুরা মানবজাতির কাছে প্রেরিত নন। আরেকটা বিষয় নোমান আলী খানের কোন এক লেকচারে শুনেছিলাম, সম্ভবত কুরআনের বিস্ময় বা মিরাকেল বোঝাতে বলেছিলেন: কুরআনে অন্যান্য রাসূল, নবীরা যখনই তাদের কওমকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলেছেন, তখন 'হে আমার কওম (বা লোকজন)' বলে সম্বোধন করেছেন। কিন্তু ঈসা (আঃ)'র ক্ষেত্রেই শুধু এর ব্যতিক্রম। কুরআনে যখনই তাঁর কথা এসেছে, তিনি সবসময়ই 'হে বনী ইসরাইল' বলে তাদের সম্বোধন করেছেন। এর কারণ হিসাবে ব্যাখ্যা হচ্ছে, কাওম বা নিজের লোকজন বলতে তখন সাধারণত বাবা-দাদার বংশ বা গোত্রকে বোঝাতো। বাকি নবী-রাসূলের বাবা-দাদা থাকলেও ঈসা (আঃ)'র যেহেতু কোনো বাবা ছিলেন না - আমরা জানি তাঁর জন্ম অলৌকিক, আল্লাহ বলেছেন 'কুন্' বা 'হও' - আর তিনি হয়েছেন,  আর তাই -ই কুরআনের বিস্ময়কর 'নুয়ান্স' বা সূক্ষতা হলো, কোথাও তাঁকে 'হে আমার কাওম' বলে কাউকে সম্বোধন করার কথা বলা নাই !]  

এরপর ইমাম বললেন, একটা সহীহ হাদিস আছে, যেখানে রাসূল (সাঃ) বলেছেন, যার কিছু অংশের অর্থ অনেকটা এইরকম: "আমার অনেক নাম আছে, আমি মুহাম্মদ, আমি আহমদ, আমি আল-মাহি (যিনি মুছে দেন) যার মাধ্যমে আল্লাহ কুফরকে মুছে দেন..."।  ইমাম আরো বললেন, আরেকটা সহীহ হাদিস আছে, যেখানে রাসূল (সাঃ) বলেছেন, 'আমার আগমন আর সেই ঘন্টা [কেয়ামত হওয়া] হচ্ছে এই রকম" - বলে হাতের প্রথম দুই আঙ্গুল পাশাপাশি রেখে হাত উঁচিয়ে দেখিয়েছেন। অর্থাৎ, সৃষ্টির শুরু থেকে বিশ্বজগতের সময়ের হিসাবে দুটো ঘটনা খুবই কাছাকাছি হবে। ইমাম আরো বললেন, কুরআনে আল্লাহ তো আমাদের রাসূল (সাঃ) কে শেষ নবী, বা 'খাতামুন নাবিয়্যিন" হিসাবে বলেই দিয়েছেন।

এরপর ইমাম বললেন, রাসূল (সাঃ) কেয়ামতের লক্ষণ হিসাবে বলে গেছেন যে সেই সময় সবকিছু উল্টিয়ে যাবে। সমাজের উঁচু বা সম্মানিতরা নিচে নেমে আসবে, আর সমাজের ক্ষমতা নিচুদের হাতে চলে যাবে। কুরআনের আয়াতেও কেয়ামতের বর্ণনা দিতে আল্লাহ তা'য়ালা বলেছেন [সূরা আল-কারিয়া, সূরা নম্বর ১০১, আয়াত ৪-৫]: "সেদিন মানুষ হবে বিক্ষিপ্ত পতঙ্গ-এর মতো, পাহাড় হবে উড়ে যাওয়া বা ধুনিত তুলার/পশমের মতো"। অর্থাৎ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব যেই মানুষ, তার অবস্থা হবে সামান্য পতঙ্গের মতো, আর স্থিতিশীলতা আর শক্তির প্রতীক যেই পাহাড়, সেটা হবে পাতলা উড়ে যাওয়া তুলার মতো! - সব উল্টিয়ে যাবে। 

এরপর ইমাম বললেন, সেইদিন 'রিয়ালিটি' হবে মানুষের কাজ না বরং তার নিয়্যত বা কাজের পেছনের উদ্দেশ্য। সেটাই গণ্য হবে। জাগতিক সব কাজ, এমনকি আমরা যেই নামাজ পড়ি, বাকি যেসব ধর্মীয় আচার-আচরণ পালন করি, কোনো কিছুরই কোনো দাম থাকবে না, মূল্য থাকবে না - যদি না সেই সব ধর্মীয় আচার-আচরণ বা দৈনন্দিন কাজের পেছনে থাকা উদ্দেশ্য বা নিয়্যত ভালো না হয়। এরপর ইমাম সেই বিখ্যাত হাদিস আবারো বললেন, যেখানে রাসূল (সাঃ) বলেছেন: "ইন্নামাল আমালু বিন্নিয়াত" - নিশ্চয় আমল নিয়্যতের উপর [নির্ভর করে]।

ইমাম মন্তব্য করলেন, আমরা কি মনে করি? রাসূল (সাঃ)'র জীবনের শুরুতে তাঁর ঈমানের যেই লেভেল বা স্তর ছিল, তাঁর জীবনের শেষেও কী একই লেভেল বা স্তর ছিল? উত্তরে বললেন: অবশ্যই না। কুরআন নাজিলের পর থেকে ২৩ বছরের বিভিন্ন ঘটনা পরিক্রমায় আমাদের রাসূল (সাঃ)'র ঈমান বেড়েছে। আল্লাহ তাঁকে সেইভাবেই ধীরে ধীরে তৈরী করেছেন। আরেকটা হাদিস নাকি আছে,  ইসলাম প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর, রাসূল (সাঃ) যখন আবার মদিনায় ফিরে আসেন,  তখন রাসূল (সাঃ) একদিন রাতেরবেলায় একাকী জান্নাতুল বা'কী - বা মুসলিমদের কবরস্থানের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁকে দেখে এক সাহাবী তিনি কি করছেন জিজ্ঞেস করলে রাসূল (সাঃ) নাকি নিজের সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, "আল্লাহ তাঁর বান্দাকে  দুটো থেকে বেছে নিতে সুযোগ দিয়েছেন, দুনিয়ার সৌন্দর্য আর পরকালের শান্তি।" সাহাবী  তিনি কী বেছে নিতে ঠিক করেছেন জিজ্ঞেস করলে, উত্তরে নাকি রাসূল (সাঃ) বলেছেন: 'রফিক আল-আলা" যার অর্থ বন্ধু - সুউচ্চ! অর্থাৎ, রাসূল (সাঃ) আল্লাহ তা'য়ালা কে তাঁর সবচেয়ে সম্মানিত, আর সুউচ্চ 'বন্ধু' বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁকেই বেছে নিয়েছেন। 

ইমাম বললেন, দুনিয়ার এই জাগতিক প্রাপ্তির থেকে সেই আধ্যাতিক প্রাপ্তি যখন আমাদের কাছে বড় হবে, তখনই জীবনের সব সমস্যা, অসুবিধা আমাদের কাছে গৌণ মনে হবে। আমাদের  ডিপ্রেশন আর থাকবে না। জীবনের আসল অর্থ আমরা তখন বুঝতে পারবো।      

[সবশেষ সাইডনোট: ১) পরে জুমআর নামাজে ইমাম খুতবায় রেফারেন্স দেয়া [সেই কেয়ামতের দিনে পতঙ্গ-আর পাহাড়ের ঘটনা বলা সূরা]  সূরা-কারিয়া দিয়ে নামাজ পড়ালেন। ২) কয়েকদিন আগে  একটা GoFundMe পেইজ খুলে এক প্যারালাইজড বাবার জন্য সাহায্যের আবেদন করেছিলাম। খুবই সাড়া পেয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ। সবাইকে ধন্যবাদ। টার্গেট ফান্ডের আরেকটু বাকি আছে, কেউ যদি দিতে চান, তাহলে নিচের লিংকে গিয়ে দিতে পারেন, বিকাশ নম্বরও দেয়া আছে।]  

খুতবার রেকর্ডিং লিংক: https://fb.watch/neOZiUMNAM/
GoFundMe পেইজের লিংক: https://gofund.me/c9b46223

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ