এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৩): রাসূল (সাঃ)'র প্রতি ভালোবাসা

এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৩): রাসূল (সাঃ)'র প্রতি ভালোবাসা  
ইমাম মেন্দেস; ইমাম সাফওয়ান ঈদ। মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি

[সাইডনোট: এখন আরবি রবিউল আউয়াল মাস চলছে। রাসূল (সাঃ)'র জন্ম এই মাসে। প্রায় সব মসজিদেই আমার ধারণা খুতবায় রাসূল (সাঃ)'র জীবনীর উপর আলোচনা হচ্ছে। আমি যেই মসজিদে যাই, এশার নামাজের পর, সেই মসজিদের ইমাম, ইমাম সাফওয়ান ঈদ ৫-১০ মিনিটের কিছু আলোচনা, রিফ্লেকশন করেন। গত কয়েক আলোচনায়ও রাসূল (সাঃ)'র কিছু হাদিস নিয়ে আলোচনা করেছেন। কীভাবে রাসূল (সাঃ) কে ভালোবাসা যায়, সেটা বললেন। গতকালকের জুমুআর খুতবা একজন গেস্ট ইমাম দিলেন, উনার নাম ইমাম মেন্দেস। উনিও রাসূল (সাঃ)'র প্রতি ভালোবাসার উদাহরণ দিলেন। ঐ আলোচনা গুলো এক করে আজকের লেখা লিখছি। প্রতি আলোচনা থেকেই কিছু না কিছু নতুন জিনিস জানা যায়, শেখার আছে। 

** গতকালকের খুতবার মূল ভাষ্য ***

ইমাম মেন্ডেস বললেন, রাসূল (সাঃ) কোনো এক খুতবা দিচ্ছিলেন, এমনসময় এক লোক দাঁড়িয়ে তাঁকে অনেকটা থামিয়েই প্রশ্ন  করেন: হে আল্লাহ'র রাসূল (সাঃ),  ওই ঘন্টা/সময় (অর্থাৎ কিয়ামতের সময়) কখন? রাসূল (সাঃ) উত্তর না দিয়ে খুতবা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ওই লোক আবারো একই প্রশ্ন করেন। এইভাবে তিনবার প্রশ্ন করলে, রাসূল (সাঃ) থেমে এইবার উল্টো তাকে প্রশ্ন করেন: ওই সময়ের জন্য আপনি কী প্রস্তুত করেছেন?  - এই পর্যায়ে ইমাম বললেন, খেয়াল করতে যে, রাসূল (সাঃ) সরাসরি উত্তর না দিয়ে, অর্থাৎ, কিয়ামতের সময় কখন সেটা আল্লাহ তা'য়ালা কাউকে জানান নাই, আল্লাহ তা'য়ালা ছাড়া কেউ সেটা জানেন না - সেটা না বলে বরং প্রশ্ন ঘুরিয়ে যেটা বেশি জরুরি সেটার প্রতি ফোকাস করিয়ে দিলেন। তখন উত্তরে ওই লোক নাকি বললেন, তিনি বেশি প্রস্তুতি নেন নাই, নামাজ, কিংবা রোজা কোনোটাই বেশি করে করেন নাই, কিন্তু আল্লাহ তা'য়ালা আর তাঁর রাসূলের (সাঃ) প্রতি তার ভালোবাসা কোনো কমতি নাই। এই পর্যায়ে ইমাম আবারো মন্তব্য করলেন: খেয়াল করে দেখতে যে, অনেক লোকের মাঝে থেকেও ওই লোক সৎ, সরাসরি উত্তর দিয়েছেন - কে কী ভাববে সেটা না, বরং কিয়ামতের ব্যাপারে তাঁর সত্যিকার প্রশ্ন আর জানার আগ্রহ থেকেই তিনি প্রশ্ন করেছেন, উত্তর দিয়েছেন। ইমাম বললেন, আমরা যদি "লোকে কে কি ভাববে" ভেবে সব কাজ, কথা বলি - তাহলে আমরা স্বাধীন ভাবে না থেকে বরং পরাধীন ভাবে বেঁচে থাকবো।  ইমাম জালালউদ্দীন রুমি'র এক বিখ্যাত উক্তির রেফারেন্স দিয়ে বললেন: এ যেন ঈগল হিসাবে ডানা মেলে আকাশে উড়ে বেড়িয়ে বেঁচে থাকার সুযোগ থাকার পরেও মুরগি হয়ে মাটিতে ঠুকরে বেঁচে থাকা!

যাই হোক, ওই লোকের উত্তর শুনে রাসূল (সাঃ) নাকি বলেছিলেন, কিয়ামতের দিন যে যাকে ভালোবাসে, সে তার সাথেই থাকবে। ইমাম বললেন, রাসূল (সাঃ) আমাদেরকে যেন একপ্রকার শর্ট-কাট শিখিয়ে দিয়ে গেছেন। রাসূল (সাঃ) কে ভালোবাসতে পারলে আমরা কিয়ামতের দিন তাঁর সান্নিধ্যেই থাকবো। আর তাঁকে ভালোবাসতে হলে, তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট, তাঁর জীবনী, আমাদের জন্য তাঁর করা ত্যাগ সম্পর্কে জানতে হবে। 

** এশার নামাজের পর আলোচনার মূল ভাষ্য ***        

গত এক খুতবায় ইমাম এই হাদিসটা বর্ণনা করেছিলেন। রাসূল (সাঃ) একটা সহীহ হাদিসে বলেছেন: "তাঁর অনেক নাম আছে। তিনি মুহাম্মদ (সাঃ), তিনি আহমদ, তিনি আল-মাহি (ইরেজার বা যিনি সব মুছে দেন) - যার মাধ্যমে আল্লাহ দুনিয়া থেকে সব কুফরী মুছে দেন।" -- এই হাদিস বলে ইমাম বললেন [যেটা সেই আগের  খুতবায়ও বলেছিলেন], কুরআনে আল্লাহ তা'য়ালা ঈসা (আঃ)'র উক্তি উল্লেখ করেছেন যে তাঁর (ঈসা (আঃ) পর একজন রাসূল আসবেন, যাঁর নাম হবে 'আহমদ'। 

[এইটুকু বলার পর ইমাম যেই রিফ্লেকশনটা করলেন - সেইটাই আমার খুব ভালো  লেগেছে।]

 ইমাম বললেন, এই যে 'আল-মাহি', যার মাধম্যে আল্লাহ সব কুফরী বা অবিশ্বাস মুছে দেন - এই কথাটা মানুষের অন্তরের জন্যও প্রযোজ্য। আমাদের মধ্যে যাদের হয়তো ঈমান বা বিশ্বাস দুর্বল, আমরা হয়তো কারো জন্য 'হেদায়াত' চাচ্ছি - তাদের জন্য রাসূল (সাঃ)'র জীবনী জানা খুবই জরুরি।  রাসূল (সাঃ) সম্পর্কে কেউ যদি ভালো ভাবে জানে,  তখন তাঁর প্রতি অন্তরে ভালোবাসা জন্মাবে - আর তখন আপনা-আপনিই কারো অন্তরের অবিশ্বাস বা কুফরী মুছে যাবে, আল্লাহ'র প্রতি ঈমান দৃঢ় হবে। ইমাম আরো মন্তব্য করলেন, কেউ হয়তো নতুন 'শাহাদা' নিয়ে ঈমান এনেছে, কিংবা কাউকে দাওয়াত দেয়ার সময় আমরা অনেক সময়ই ভাবি তাকে কী দিবো? কুরআন, অন্যান্য বই, নাকি নামাজ-শিক্ষার বই? ইমাম বললেন, আমাদের উচিত প্রথমেই তাদেরকে "রাসূল (সাঃ)'র কাছে নিয়ে যাওয়া", পরিচয় করিয়ে দেয়া - তারপর বাকি জিনিস আপনা-আপনিই হবে। 

এই মন্তব্য করে এর আগে আরেকটা কাহিনী গল্প করেছিলেন। রাসূল (সাঃ)'র 'স্ক্রাইব' বা সাথে থেকে কুরআন শুনে লিখে রাখতেন যেই ব্যক্তি - তাঁর নাম নাকি ছিল হানযালা (রাঃ)। সেই  (রাঃ) একদিন নাকি আবু বকর (রাঃ)'র কাছে এসে বললেন, "হে আবু বকর! হানযালা (অর্থাৎ নিজের কথা) তো নিফাক করে ফেলেছে" - অর্থাৎ তিনি মুনাফিক হয়ে গেছেন! অর্থাৎ তার মুখে বিশ্বাস, আর অন্তরে অবিশ্বাস ঢুকে পড়েছে - তিনি তাঁর ঈমানে সিনসিয়ার নন। এরপর হানযালা ব্যাখ্যা করলেন, তিনি যখন রাসূল (সাঃ)'র সাথে থাকেন, তখন তাঁর ঈমান অনেক উঁচুতে থাকে, যেন তিনি জান্নাত, জাহান্নাম, পরকাল সব চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন, কিন্তু বাসায় ফিরে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লে, তিনি তখন আর দেখেন না - তাঁর মনে পড়ে না। আবু বকর (রাঃ) নাকি দুই-এক কথা বলেই তাকে রাসূল (সাঃ)'র কাছে নিয়ে গেলেন।

এর উত্তরে রাসূল (সাঃ) কী বলেছিলেন, সেটা বলার আগে ইমাম খেয়াল করিয়ে দিলেন - আবু বকর (রাঃ) কিন্তু হানযালাকে সান্তনা দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি সেটা না করে আক্ষরিক অর্থেই হানযালাকে "রাসূল (সাঃ)'র কাছে" নিয়ে গেছেন।       

এর উত্তরে রাসূল (সাঃ) নাকি "ঠিক বা ভুল", "এইরকম হয়" - এজাতীয় কিছু না বলে বলেছিলেন: "ঘন্টার পরিবর্তে ঘন্টা"। যার অর্থ ইমাম ব্যাখ্যা করলেন এই সমস্যা থেকে বাঁচতে: এক ঘন্টা দুনিয়ার কাজের পরই যেন আমরা পরকাল, আখিরাত ইত্যাদি নিয়ে ভাবি। সেটা যে পরের এক ঘন্টা ধরে ভাবতে হবে সেটা না। অর্থাৎ, সারাদিনের কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমাদের সবসময়ই আল্লাহ কে স্মরণ করতে হবে, আখিরাত, জান্নাত-জাহান্নাম ইত্যাদি নিয়ে ভাবতে হবে। ইমাম মন্তব্য করেন, আমরা নিজেরাই নিজেদের চিন্তা-ভাবনার বিচার করে ভাবতে হবে, আমরা সারাদিন কী করে, কি চিন্তা করে কাটালাম। তারপর সেই হিসাবে নিজেদের ঠিক করে নিতে হবে। 

আর এই মনে করার বা জিকিরের ব্যাপারে ইমাম মন্তব্য করলেন,  আমরা তাশদীদ -তাহলীল -তাহমিদ করার পাশাপাশি রাসূল (সাঃ )'র উপর দুরুদ পড়তে পারি। বাসায় সবাই মিলে একটা সময় ঠিক করে, সপ্তাহে একদিন হলেও রাসূল (সাঃ) উপর দুরুদ পড়তে পারি, তাঁর হাদিস নিয়ে আলোচনা করতে পারি। বাচ্চাদের ঠিকমতো গড়ে তোলার ব্যাপারে মন্তব্য করলেন, রাসূল (সাঃ)'র জীবনী - বাচ্চাদের সংস্করণ পাওয়া যায় - যেগুলো কিনে দিয়ে তাদের পড়তে দিতে পারি। এইরকম ছোট ছোট পরিবর্তন করে কারো বাসায় এইরকম পরিবেশ তৈরী করলে সেটা আপনা-আপনিই ঈমানে ভরপুর বাসা হয়ে উঠবে (ইনশাআল্লাহ)।

[সাইডনোট: ওই মসজিদেই একটা নোটিস টাঙানো আছে, যেটা কাকতালীয় ভাবে সেই-দিনই দেখলাম। নামাজে দুরুদে ইব্রাহিম পড়ার সময়, আমরা যেন ঠিক ভাবে "আল্লাহুম্মা সাল্লি আ'লা মুহাম্মদ, ওয়া আ'লা আলি মুহাম্মদ" বলি; ভুল করে সংক্ষেপে  "...ওয়া লা আলি মুহাম্মদ" যেন না বলি। কারণ: আরবিতে আ'লা মানে উপর [যেমন, আসসালামু আ'লাইকুম - মানে আপনার 'উপর' সালাম বর্ষিত হোক; আর "আলে" বা "আলি" মানে পরিবার]।  কিন্তু আরবিতে  "ওয়া লা"  মানে "এবং না" - কাজেই  "আল্লাহুম্মা সাল্লি আ'লা মুহাম্মদ, ওয়া আ'লা আলি মুহাম্মদ" - যার প্রকৃত অর্থ: "হে আল্লাহ, মুহাম্মদের উপর সালাম, এবং তাঁর  পরিবারের উপরও সালাম (বর্ষণ করুন)" -   না বলে ".... ওয়া লা আলি মুহাম্মদ" বললে উল্টো মানে দাঁড়াবে: হে আল্লাহ, মুহাম্মদের উপর সালাম, এবং (কিন্তু) তার পরিবারের উপর সালাম নয়! তাই, দুরুদ পড়ার সময় উচ্চারণ ঠিক করে পড়তে হবে।  সেটা সম্ভব না হলে, অন্তত অর্থ জেনে, ওই অর্থ মনে করে দুরুদ পড়তে হবে।]

সবশেষ: গত জুমুআ'র নামাজের পর এক ছেলে শাহাদা নিয়ে মুসলিম হলো। ইমাম মেন্ডেস তার নাম, বয়স আর তার ইসলাম গ্রহণ করার কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বললো: তার নাম গেব্রিয়েল। বয়স ১৬। সে ইসলাম গ্রহণ করছে কারণ তার কাছে মনে হয়েছে এটাই ঠিক, আর সে খ্রিষ্ট ধর্মের ট্রিনিটি বা ত্রি-তত্ত্ব ভুল মনে করে! ইমাম বললেন, জিব্রাইল (আঃ)'র নামে ওর নাম গাব্রিয়েল! আরো বললেন, ঠিক ৩০ বছর আগে তিনিও  ১৭ বছর বয়সে তার মতোই একই ভাবে খ্রিস্ট ধর্ম বদলিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। গেব্রিয়েল মাত্র ১৬ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করে তাঁকে ১ বছর আগেই হারিয়ে দিল! এরপর ইমাম তাকে কালেমা পড়ালেন। প্রতিটা শাহাদার ঘটনা আমাকে শিহরিত করে! 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ