এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (৬ অক্টোবর, ২০২৩): জীবন আর তার উপকরণ
এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (৬ অক্টোবর, ২০২৩): জীবন আর তার উপকরণ
ইমাম সাফওয়ান ঈদ। মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি
[সাইডনোট: জুমুআর নামাজে দেরি করে পৌঁছেছি। যতটুকু শুনেছি, ততটুকুর সারমর্ম লেখার চেষ্টা করছি।তবে রিসেন্টলি কিছু ইন্টারেষ্টিং জিনিস শুনলাম/জানলাম, যেগুলো তারপর সংক্ষেপে লিখে দিচ্ছি।]
ইমাম কুরআনে মুসা (আঃ) আর ফিরাউনের কথপোকথনের রেফারেন্স দিয়ে বললেন, যখন ফিরাউন মুসা (আঃ) ও তাঁর ভাই হারুন (আঃ)-কে তাঁদের রব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, উত্তরে মুসা (আঃ) বলেছিলেন [সূরা ত্ব-হা: সূরা নম্বর ২০, আয়াত ৫০]: "আমাদের রব তিনি যিনি সব সৃষ্টির কাঠামো দিয়েছেন, আর তারপর তাদেরকে পথ দেখিয়েছেন"। ইমাম বললেন, আল্লাহ তা'য়ালা প্রত্যেক সৃষ্টির জীবনযাপনের জন্য উপকরণ দিয়ে দিয়েছেন। তিনি চিন্তা করে দেখতে বললেন, একটা গাছের বীজ যখন মাটিতে পড়ে, তারপর সেই মাটি থেকে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পায়, আর তারপর আকাশ থেকে যে বৃষ্টি হয়, তাতেই সেই বীজ থেকে প্রথমে চারা হয়, তারপর ধীরে ধীরে বেড়ে উঠে পরিপূর্ণ গাছে পরিণত হয়। তারপর একসময় সেই গাছের পাতা ঝরে যায়, এক সময় গাছটা মারা যায়। আল্লাহ তা'য়ালা এইভাবেই একটা গাছের জীবনচক্রের পথ দেখিয়ে দেন, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গাইড করেন।
এরপর ইমাম বললেন, আমরা পরিপূর্ন "জীবন" বলতে শুধু পার্থিব জীবনে সাফল্য, পাওয়া আর জমানোর কথা ভাবি। কিন্তু ইসলামে পরিপূর্ন জীবনের কনসেপ্ট একটু ভিন্ন। ইমাম বললেন, তাঁর মতে ইসলামে বাদ বা ছেড়ে দেয়ার মধ্যেই জীবনের প্রাপ্তি [সাইড নোট: ইমামের উক্তিটা ছিল: in Islam, addition is by subtraction]। ইমাম ইসলামের মূল ভিত্তি যেই স্তম্ভগুলো, সেগুলোর কথা চিন্তা করে দেখতে বললেন। উদাহরণ দিয়ে বললেন, প্রথম স্তম্ভ যেই ঈমান, সেই ঈমান যে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" কালেমা - সেটাও শুরু হয়েছে বাদ দেয়ার মাধ্যমে: আমরা শুরুতেই বলে দিচ্ছি আর কোনো 'ইলাহ' নাই, আর তারপর যোগ করছি একমাত্র আল্লাহ ছাড়া। ইমাম আরো বললেন সিয়াম বা রোজার কথা চিন্তা করতে: সেখানেও আমরা খাবার, পানি সহ অন্যান্য জিনিস বাদ বা ত্যাগ করার মাধ্যমেই তাকওয়াতে বৃদ্ধি পাওয়ার চেষ্টা করছি। একইভাবে জাকাতে নিজের জমানো টাকার একটা অংশ দান করে আমরা শুদ্ধি আর সম্পদে বৃদ্ধি, বরকতের আশা করছি। কাজেই, ইসলামে এই ছেড়ে দেয়া, ত্যাগ আর বাদ দেয়ার মাধ্যমেই পরিপূর্ণ জীবন পাওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
এরপর ইমাম খুতবার শুরুতে বলা গাছের উদাহরণ দিয়ে বললেন: আমাদের জীবনের ক্ষেত্রে সেই বীজ হচ্ছে অন্তরে ভালো চিন্তা, নেক নিয়ত। তারপর তাকে পুষ্টি দেয়ার জন্য, পরিবেশ তৈরী করার জন্য আমাদের উচিত সৎ সঙ্গ বেছে নেয়া। আর সব শেষে আকাশ থেকে নেমে আসা বৃষ্টির আমাদের জন্য হচ্ছে আকাশ থেকে নেমে আসা কুরআনের আয়াত। এই তিন জিনিস জীবনে ধারণ করলেই আমরা সত্যিকার অর্থে বেঁচে থাকবো, জীবন পরিপূর্ণ হবে।
** রিসেন্টলি শোনা বা পড়া কিছু ইন্টারেটিং জিনিস **
ড. ওমর সুলাইমানের একটা লেকচারে উনি বলছিলেন, কেউ যদি আল্লাহ'র সম্পর্কে ঠিক মতো জানে, আর একই ভাবে রাসূল (সাঃ)'র জীবনী সম্পর্কে ঠিকমতো জানে, তাহলে তার মনে আল্লাহ কিংবা তাঁর রাসূল সম্পর্কে আসা যেকোনো সন্দেহ কিংবা প্রশ্নের উত্তর সে খুব সহজে পেয়ে যাবে। আরো বলছিলেন, সূরা বাকারার শুরুতেই আল্লাহ তা'য়ালা 'গায়েবে' বিশ্বাসীদের প্রশংসা করেছেন। এই গায়েব হচ্ছে যা আমরা দেখতে পাই না: যেমন আল্লাহ তায়ালা, ফেরেশতা, জান্নাত, জাহান্নাম কিংবা পরকাল ইত্যাদি। রাসূল (সাঃ)'র সময় তাঁর সাহাবীরা রাসূল (সাঃ) কে সামনাসামনি দেখেছেন। কিন্তু আমাদের সময় রাসূল (সাঃ) কে যেহেতু আমরা দেখতে পাচ্ছি না, তিনি আমাদের কাছে সেই গায়েবেরই অংশ। তাঁকে না দেখে, তাঁর সম্পর্কে শুধু জেনেই তাঁকে ভালোবাসায়, তাঁকে মানায় আমরা অনেক বড় আমল করছি। সেটা ভেবে আমাদের খুশি হওয়ার কথা।
শেখ ইয়াসির ক্বাদি'র রাসূল (সাঃ)'র জীবনী বা সীরাহ লেকচারে ৫৩ এপিসোডে [লিংক নিচে দিচ্ছি] মদিনার ইহুদি বানু-নাদির গোত্রের কাহিনী আছে। সেখানে তিনি আলোচনা করেন কিভাবে বানু-নাদির মদিনার সনদের চুক্তির বিপক্ষে কাজ করে, আর রাসূল (সাঃ) কে মারার চেষ্টা/পরিকল্পনা করে। আর পরে শাস্তি হিসাবে যখন তাদের মদিনা ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়, তখন তারা তা না মেনে তাদের দুর্গে অবস্থান নিলে মুসলিমরা তাদের ঘেরাও করে রাখে। তারা আশা করেছিল, মদিনার বাহিরের অন্য ইহুদি গোত্ররা তাদের সাহায্যে মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করতে এগিয়ে আসবে। আর মদিনার ভেতরের কিছু মুনাফিক তাদের সাহায্য করার, দরকার হলে তাদের সাথে মদিনা ছেড়ে চলে যাওয়ায়, এমনকি তাদের সাথে এক হয়ে যুদ্ধ করার প্রতিশ্রুতিও দেয়। কিন্তু পরে কোনো পক্ষই এগিয়ে আসে না। আর মুসলিমরা তাদেরকে ঘেরাও করে রাখা অবস্থায়, কৌশলের অংশ হিসাবে, তাদের বাগানের কিছু গাছ কেটে ফেলে। কিছু সাহাবী তখন অস্বস্তিতে পড়ে যান এইটা ভেবে যে এটা করা ঠিক হচ্ছে কিনা। পরে ইহুদিরা আত্মসমর্পণ করলে তাদের সবকিছু নিয়ে চলে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়। আর যারা ইসলাম কবুল করে মুসলিম হয়, তাদেরকে তাদের সম্পত্তি সহ থাকার সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু তারা যাওয়ার আগে তাদের নিজেদের হাতে বানানো বাড়ি, দুর্গ ভেঙে দিয়ে যায়। ওরা মদিনা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর মুসলিমরা তাদের জমি আর বাগানের মালিক হয়। সেই সম্পদ মক্কা থেকে হিজরত করে আসা মুহাজির, মদিনায় যাদের কিছু ছিল না তাদের দেয়া হয়। আর এইসব ঘটনার প্রেক্ষিতে, অনেক কিছু প্রকাশ করে দিয়ে আল্লাহ তা'য়ালা সূরা হাশর নাজিল করেন। গাছ কেটে ফেলা, মদিনার মুনাফিকদের প্রতিজ্ঞা করেও পরে ইহুদিদের সাহায্য না করা, ছেড়ে যাওয়ার আগে বাড়ি, দুর্গ ভেঙে যাওয়া, কিংবা আনসারদের না দিয়ে মুহাজিরদের সম্পত্তি দেয়া - ইত্যাদি সব ঘটনার ব্যাখ্যা ওই সূরায় আছে। শেখ ইয়াসির ক্বাদি বলছিলেন, এই সূরা হাশর কিয়ামতের হাশরের ঘটনা না, বরং বানু-নাদিরের ঘটনা ব্যাখ্যা করে। ঘটনা গুলো জানার পর এখন সূরা হাশর অর্থ সহ পড়লে অন্যরকম একটা অনুভূতি হবে।
লিংক : https://youtu.be/0wCxb_pJTBk?si=YA2r6yKf7B-Cm3yc
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন