এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৩ অক্টোবর ২০২৩): প্রসঙ্গ ফিলিস্তিন

এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৩ অক্টোবর ২০২৩): প্রসঙ্গ ফিলিস্তিন
ইমাম শিবলী । ইসলামিক সোসাইটি অফ সেন্ট্রাল জার্সি, নিউ ব্রান্সউইক টাউনশিপ, নিউ জার্সি 
ড. ওমর সুলাইমান । ইয়াকীন ইনস্টিটিউট 

[সাইডনোট: ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে দেশে যতটা সহজভাবে প্রতিবাদ করা যায়, এই দেশে ঠিক তার উল্টো। প্রকাশ্যে সমর্থন জানালে তো 'জঙ্গি' টাইটেল পাওয়ার অনেক সম্ভাবনা। ধ্বংস আর হত্যাযজ্ঞের খবর দেখে দেখে মানসিক অশান্তির মাঝেও মসজিদে জুমআর খুতবা আর ড. ওমর সুলাইমানের লেকচার শুনে কিছুটা শান্তি, সাহস পেলাম।]

ইমাম বললেন, আজকের জুমুআ সারা বিশ্বের মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে কঠিন জুমুআ। ফিলিস্তিনে চলা যুদ্ধে কে সঠিক, আর কে বেঠিক সেই তর্কে উনি যাবেন না - কারণ আমরা সবাই কে ঠিক সেটা জানি, বললেন: উনি রাসূল (সাঃ)'র জীবনী থেকে একটা দোয়া নিয়ে আলোচনা করবেন - যেটা আমাদের সবার জন্য কাজে লাগবে।

ইমাম বললেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন তাঁর স্ত্রী খাদিজা, চাচা আবু তালিবকে হারিয়ে অসহায়, মক্কার কুরাইশদের অত্যাচারে অতিষ্ট - তখন তাই'ফের গোত্র প্রধানদের কাছে তাঁর মেসেজ নিয়ে, আশা নিয়ে যান। কিন্তু তারা সেই মেসেজ তো গ্রহণ করে নাইই, বরং তাঁকে তাড়িয়ে দেয় - পাথর মেরে রক্তাক্ত করে আহত করে। ওই অবস্থায় - একদিকে তাই'ফের অবন্ধুসুলভ লোকজন, আরেকদিকে মক্কার কুরাইশ শত্রু, যারা তাঁকে মেরে ফেলতে দেরি করবে না  - তাঁর কোনোদিকে যাওয়ার জায়গা নাই, কোনো সাহায্যকারী নাই - এই অবস্থায় তিনি তাই'ফ আর মক্কার মাঝে এক জায়গায় আল্লাহ তা'য়ালার কাছে যেই দোয়া করেন, সেটা অনেকটা এই রকম: "ও আমার রব, তোমার কাছেই আমি আমার দুর্বলতার অভিযোগ করি, সাহায্যের অভাবের আর অপমানের অভিযোগ করি। ও পরম করুনাময়, অশেষ দয়ালু, তুমি দুর্বলের রব আর আমার রব। তুমি এ কার কাছে আমাকে রেখে গেলে? এক দূরের লোকের কাছে যে কিনা আমাকে বৈরীভাবে গ্রহণ করে? অথবা এক শত্রুর কাছে যাকে তুমি আমার উপর শক্তি দিয়েছো? যতক্ষণ না পর্যন্ত তুমি আমার উপর অখুশি না হও, আমি এদের কাউকেই মুখোমুখি হওয়ার পরোয়া করি না।আমি তারচেয়ে বরং তোমার দয়ার উপর বেশি খুশি হবো। আমি তোমার মুখের আলোর [light of your face] কাছে আশ্রয় চাই, যার মাধ্যমে সব অন্ধকার দূর হয়ে যাবে আর এই দুনিয়া আর আখিরাতের জীবন তাদের ঠিক পথ পাবে, আর আমার উপর তোমার ক্রোধ আর রাগের বিপক্ষে [আশ্রয় চাই]। তোমার কাছেই আমি নিজেকে সপি, যত্তক্ষন না আমি তোমার খুশি অর্জন করতে না পারি। তোমার সাহায্য ছাড়া সবকিছুই শক্তিহীন।"

ইমাম বললেন, গাজার ফিলিস্তিনিদের যাওয়ার কোনো জায়গা নাই। তাদের জন্য সব দরজা বন্ধ। কিন্তু আল্লাহ তা'য়ালার দরজা সবসময়ই খোলা আছে। তাঁর কাছেই আমাদের সবার ফিরে যেতে হবে। 

**** ড. ওমর সুলাইমানের লেকচার আর খুতবার সারমর্ম ***  

সূরা ফুসসিলাত-এ [সূরা নম্বর ৪১: আয়াত ৩০] আল্লাহ তা'য়ালা বলছেন, "নিশ্চয়ই যারা বলে 'আল্লাহ'ই আমাদের রব' আর তারপর অবিচল থাকে, তাঁদের উপর ফেরেশতারা নেমে আসে আর বলে: 'তোমরা ভয় করো না, আর দুঃখ (বা চিন্তা) করো না; এবং তোমরা জান্নাতের সুসংবাদে খুশি হও, যা তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল' "। ইমাম বললেন, ফিলিস্তিনের যাঁরা আজকে শহীদ হচ্ছে, এই আয়াত তাঁদের জন্য। খেয়াল করতে বললেন, তাঁদেরকে 'ভয়' করতে না করা হয়েছে। বেঁচে থাকতে তারা বোমা, গুলি, হামলার আতংঙ্ক আর ভয় নিয়ে প্রতিদিন বেঁচে ছিল। কিন্তু যখন তাঁদের মৃত্যু হলো, এখন তাঁদের আর কোনো 'ভয়' নাই। তাঁদের দুশ্চিন্তার আর কোনো কারণ নাই। বেঁচে থাকতে তাঁরা জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিল, আর এখন সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করা হবে। 

আর যারা এখনো বেঁচে আছে,  তাঁদের জন্য সূরা আ'লে ইমরান-এ [সূরা নম্বর ৩, আয়াত ১৩৯] আল্লাহ তা'য়ালা অনেকটা একইভাবে বলছেন: "তোমরা ভেঙে পড়ো না আর দুঃখ (বা চিন্তা) করো না, তোমরাই সমুন্নত (বা বিজয়ী) হবে যদি তোমরা ঈমানদার হও"। ইমাম খেয়াল করতে বললেন, এইখানে 'ভেঙে পড়তে', 'হতাশ হয়ে' যেতে আল্লাহ না করেছেন। এই আয়াত [খুব সম্ভবত, যদি আমি ভুল শুনে না থাকি] নাজিল হয় উহুদ যুদ্ধে মুসলিমরা পরাজিত হওয়ার পর। যখন অনেক সাহাবী শহীদ হন, তাঁদেরকে দাফন করতে করতে ভেঙে পড়া মুসলিমদের তখন এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তা'য়ালা আশ্বস্ত করেন।    

ইমাম শুরু করলেন একটা সেন্টিমেন্ট বা মনোভাব আলোচনা করে। বললেন, [বিশেষ করে পাশ্চাত্যের দেশ গুলো, কিংবা আমেরিকাতে] মুসলমানরা আজকে একাকী বোধ করছে। আমরা যাদেরকে, যেই সব রাজনীতিবিদ, সেলিব্রেটি, মিডিয়া কিংবা বড় বড় কর্পোরেট মালিকদের ভাবতাম তারা বোধহয় ফিলিস্তিনের অসহায়, নিপীড়িত লোকজনের পক্ষে কিছুটা সহানুভূতিশীল, তাদেরকেই যখন দেখি অন্যপক্ষের হয়ে কথা বলতে, সমর্থনের নামে গণহত্যার সার্টিফিকেট দিতে - তখন আমাদের নিজেদের খুব অসহায় আর একাকী লাগে। ইমাম বললেন, কিন্তু এই পরিস্থিতি আজকে নতুন না। আল্লাহ'র কুরআন আর রাসূলুল্লাহ (সাঃ)'র সুন্নাহ থেকে ঠিক একই রকম পরিস্থিতির  বর্ণনা আছে। আর সেগুলো থেকেই আমাদের শিক্ষা, শক্তি নিতে হবে। আজকের ফিলিস্তিনিদের যখন চারপাশ থেকে অবরোধ করে রাখা হয়েছে, খাবার, পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি সব বন্ধ করে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে - এই পরিস্থিতির সাথে ইমাম মদিনার খন্দকের যুদ্ধের মিল দেখালেন। বললেন, যখন প্রায় ১০ হাজার আরব (মক্কার কুরাইশী আর অন্যান্য গোত্রের লোকজন) মুসলিমদের ঘিরে ফেলেছিল, সব সরবরাহ বন্ধ করে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলো - তখন তাদের আর মুসলিমদের নিশ্চিহ্ন হওয়ার মাঝে শুধু একটা প্রতিরোধের খাঁদ বা খন্দক বাধা ছিল। 
রাসূল (সাঃ) নিজেই না খেয়ে এতটাই দুর্বল আর ক্ষুধার্ত ছিলেন যে এক সাহাবীর বর্ণনায় পাওয়া যায় তাঁকে তিনি পেটে পাথর বেঁধে চলতে দেখেছিলেন। বেশি খেয়ে না, বরং ক্ষিধার চোটে তাঁর (সাঃ) পেট ফেঁপে গিয়েছিল। দিন-রাত না ঘুমিয়ে তিনি সহ সবাই সেই খন্দকের পাহারায় ডিউটি দিয়েছেন। একটু বিচ্যুতি হলেই শত্রু ঢুকে গিয়ে তাঁদের নিশ্চিহ্ন করে দিবে। এই অবস্থায় মদিনার ভেতরের মুনাফিকরা মুসলিমদেরকে বলে উঠে, যেটা আল্লাহ তা'য়ালা সূরা আ'লে ইমরানে [সূরা ৩, আয়াত ১৭৩] উল্লেখ করেছেন: " 'নিশ্চয়ই সব লোক তোমাদের বিরুদ্ধে জড়ো হয়েছে, কাজেই তাদেরকে ভয় করো', কিন্তু এটা তাঁদের (মুসলিমদের) ঈমান বৃদ্ধি করে দিলো, আর তাঁরা বললো 'আল্লাহ'ই আমাদের জন্য যথেষ্ট, আর তিনিই উত্তম ভরসার জায়গা' " 

ইমাম বললেন, বদরের যুদ্ধে আল্লাহ তা'য়ালা ফেরেশতা পাঠিয়ে মুসলিমদের সাহায্য করেছিলেন। অনেক বর্ণনায় পাওয়া যায় মুসলিমরা, এমনকি কাফেররাও নাকি নিজেদের চোখে সেই ফেরেশতাদের দেখেছিলো। কিন্তু খন্দকের যুদ্ধে, অবরুদ্ধ অবস্থায় মুসলিমরা ফেরেশতাদের নেমে আসতে দেখে নাই। তারপর'ও আল্লাহ এই আয়াতে বলছেন, বাহিরে শত্রু দিয়ে ঘেরাও থাকার পর, আর ভেতরের মুনাফিকদের কথায় উল্টো তাঁদের ঈমান বৃদ্ধি পেয়েছিল।  বছরের পর বছর শোষিত হওয়ার পর, আজকে যখন ফিলিস্তিনের অসহায় মানুষদের বিরুদ্ধে অন্যেরা এক জোট হয়েছে, প্রতিনিয়ত বোমা হামলায় তাঁদের নিশ্চিহ্ন হওয়ার আশংকা হচ্ছে, তখনও তাঁরা ঈমানে অবিচল। তাঁরা হারতে রাজি না, পালিয়ে যেতেও রাজি না। 

ইমাম বললেন, এই অবস্থায় আমাদের করণীয় কী সেটা ভাবতে হবে। যার যেই প্লাটফর্ম আছে, সেটা ব্যবহার করেই এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। তাতে হয়তো কিছু ক্ষতির আশংকা থাকবে। কিন্তু তাতে কি? যেখানে ফিলিস্তিনিরা প্রতিদিন মারা যাচ্ছে, সেখানে এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করে আমরা নাহয় কিছু সাময়িক ক্ষতির সম্মুখীন হলামই। কল্পনা করে দেখতে বললেন, আখিরাতে ফিলিস্তিনে মারা যাওয়া ঐসব শহীদদের সামনে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, আর তাঁরা আমাদের এই সামান্য প্রতিবাদের জন্য ধন্যবাদ দিচ্ছেন! 

ড. ওমর সুলাইমানের খুতবার রেকর্ডিং: https://www.youtube.com/live/Zvv6vSTzmgM?si=PfDsKyHMGr5cRSoJ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

পর্ব - ৬ । সিরাহ বছর: ৪ । কুৎসা রটনার কুরআনিক জবাব ও অন্ধ সাহাবীর ঘটনা

শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৮ জুলাই, ২০২৫): রাসূলের (সাঃ)'র 'অপরিচিত' সাহাবীরা (রাঃ)

শুক্রবারের জুমুআর খুতবার সারমর্ম (১১ নভেম্বর, ২০২২): যে ভালো কাজগুলো ধ্বংসের কারণ