এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১০ নভেম্বর, ২০২৩): দোয়ার শক্তি
এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১০ নভেম্বর, ২০২৩): দোয়ার শক্তি
ইমাম শিবলী । ইসলামিক সোসাইটি অফ সেন্ট্রাল জার্সি, নিউ ব্রান্সউইক টাউনশিপ, নিউ জার্সি
[সাইডনোট: জুমুয়ায় দেরিতে পৌঁছে যতটুকু শুনেছি, তাই লিখার চেষ্টা করবো। তার আগে এক রাতের এশার নামাজের পর ইমামের করা আলোচনাও লেখার চেষ্টা করবো। দুইটাই ফিলিস্তিনে চলা ঘটনাকে কেন্দ্র করেই। এছাড়াও আরেকটা জিনিস শেয়ার করি। কোনো দুর্যোগ হলে, এখন যেমন ফিলিস্তিনের সময়, এশার নামাজের শেষ রাকাআতে এঁরা দোয়া কুনুত পড়েন। সেজদায় যাওয়ার আগে দাঁড়িয়ে হাত তুলে দোয়া করেন। ইমামের আরবিতে দোয়া করতে করতে গলা ধরে আসে, প্রায়ই কেঁদে দেন। মসজিদে বাকি যারা আরবি বুঝেন তারাও কাঁদেন। আপনি আরবি না বুঝলেও, যেহেতু গাজায় কী ঘটছে তা জানেন, দেখছেন - আপনার চোখেও এমনিতে পানি চলে আসবে। আল্লাহ আমাদের দোয়া নিশ্চয়ই কবুল করবেন।]
ইমাম বললেন বদরের যুদ্ধে মুসলিমদের মোটেও প্রস্তুতি ছিল না। ২-৩ টা ঘোড়া আর উট সাথে ছিল, আর অস্ত্র, বর্মও বেশি ছিল না। অন্যদিকে কুরাইশদের সংখ্যা অনেক ছিল, অস্ত্র-শস্ত্র, ঘোড়া-উটের সংখ্যাও বেশি ছিল, মুসলিমদের যুদ্ধে জেতার বলতে গেলে কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। রাতে যখন বাকিরা ঘুমে, তখন রাসূল (সাঃ) আল্লাহ তা'য়ালার কাছে দোয়া করলেন। আল্লাহ তা'য়ালা দোয়া কবুল করে ফেরেশতা দিয়ে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। পরে এই প্রসঙ্গে আয়াত নাজিল হলো [সূরা আলে-ইমরান, সূরা নম্বর ৩, আয়াত ১২৩ - ১২৫], যার অর্থ অনেকটা এইরকম: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে বদরে সাহায্য করেছেন, কাজেই আল্লাহকে ভয় করো যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও। যখন আপনি [মুহাম্মদ (সাঃ)] মু'মিনদের বলছিলেন 'তোমাদের জন্য কি তোমাদের রব যথেষ্ট হবেন না যখন তিনি তিন হাজার ফেরেশতা দিয়ে তোমাদের সাহায্য করবেন?' (হ্যাঁ) অবশ্যই, যদি তোমরা ধৈর্য্য ধরো এবং আল্লাহকে ভয় করো, এবং তারা (শত্রুরা) ত্বরিৎ গতিতে তোমাদের উপর চড়াও হলেও, আল্লাহ তোমাদেরকে পাঁচ হাজার ফেরেশতা দিয়ে শক্তিশালী করবেন, যাদের প্রত্যেকে হবে চিহ্ন যুক্ত। এবং আল্লাহ এটা করেছেন শুধুমাত্র তোমাদের জন্য সুসংবাদ হিসেবে, যাতে তোমাদের অন্তরসমূহ আশস্ত হয়। অন্যথায়, বিজয় আসে একমাত্র আল্লাহ'র পক্ষ থেকে, (যিনি) মহা পরাক্রমশালী, মহাবিজ্ঞ।"
ইমাম আরো বললেন, একবার উমর (রাঃ) নাকি রাসূল (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূল আল্লাহ, আল্লাহ তা'য়ালার উপর আমরা ঈমান এনেছি। কিন্তু তিনি কি আমাদের কাছেই আছেন? তাঁর সাথে কথা বলতে হলে, দোয়া করতে হলে কী আমরা আস্তে আস্তে বলবো? নাকি তিনি দূরে আর আমাদের উঁচু স্বরে তাঁর কাছে কিছু চাইতে হবে? রাসূল (সাঃ) নাকি উত্তর দেন নাই, চুপ ছিলেন। পরে এই ব্যাপারে আল্লাহ তা'য়ালা কুরআনের আয়াত নাজিল করলেন [সূরা বাকারা, সূরা নম্বর ২, আয়াত ১৮৬], যার অর্থ এইরকম: "যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, (তখন বলুন) আমি নিশ্চয়ই নিকটে। আমি সাড়া দেই প্রার্থনাকারীর প্রার্থনায়। অতএব, তারাও সাড়া দিক, আমার উপর বিশ্বাস আনুক, তাতে হয়তো তারা সত্য পথের সন্ধান পাবে।"
এরপর ইমাম বললেন, আমরা যেন সিন্সিয়ারিলি আল্লাহ তা'য়ালার কাছে ফিলিস্তিনিদের জন্য দোয়া করি। কোনো সন্দেহ না রেখে, ইয়াকিন বা নিশ্চিত হয়ে দোয়া করি যে আল্লাহ আমাদের দোয়া কবুল করবেনই। ইমাম আরো বললেন, যখন আমরা দোয়া করতে যাই, শয়তান আমাদের কানে ওয়াসওয়াসা দেয়, আমাদের মনে হয়: এতো শক্তিশালী শত্রুর বিপক্ষে আমাদের দোয়া কী কোনো কাজে আসবে? এই দোয়া করে তাহলে কী লাভ? -- ইমাম সাবধান করে বললেন, এই ভেবে আমরা যেন দোয়া করা থেকে বিরত না থাকি, মুখ ফিরিয়ে না নেই। কারণ, আল্লাহ তা'য়ালা কুরআনে এদের সম্পর্কে সাবধান করে বলেছেন [সূরা আল-গাফির, সূরা নম্বর ৪০, আয়াত ৬০], যার অর্থ: "তোমাদের রব বলেছেন, 'আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দিবো। নিশ্চয়ই যারা অহংকার বশতঃ আমার ইবাদত থেকে বিরত থাকে, অবশ্যই তারা জাহান্নামে অপমানিত হয়ে প্রবেশ করবে' ।"
ইমাম বললেন, আমাদের দোয়া করতে থাকতেই হবে। দিনে-রাতে, একাকী, সেজদায় গিয়ে আরেকটু বেশি সময় দোয়া করতে হবে। হতাশ হয়ে বাদ দেয়া যাবে না।
** এশার নামাজের পর করা ইমাম সাফওয়ান ঈদের করা আলোচনা **
ইমাম বলছিলেন তিনি কোনো এক আর্টিকেলে পড়ছিলেন যে কোনো একটা বিতর্কে নাকি যেই পক্ষ বেশি বেশি 'শান্তি' উল্লেখ করবে -- তারাই বিতর্কে জিতবে, আর সেটা তারা ঠিক বা বেঠিক যেটাই হোক না কেন। ইমাম বললেন, কিন্তু মুসলিম হিসাবে আমাদের ফোকাস বিতর্কে জেতা না, বরং আল্লাহ'র সন্তুষ্টি আর সত্য প্রতিষ্ঠা করা। আর এই সত্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যদি অস্বস্তিতে পড়তে হয়, তাও সত্য বলতে হবে, সত্যের পক্ষে থাকতে হবে।
এরপর ইমাম উমর (রাঃ)'র রেফারেন্স দিয়ে বললেন: উমর (রাঃ) যখন খলিফা, তখন মুসলিমরা অনেক যুদ্ধে জিতছে, ইসলাম অনেক দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু এসব যুদ্ধে মুসলিমদের সেনাপতি খালিদ-বিন-ওয়ালিদ। [সাইডনোট: এই খালিদ-বিন-ওয়ালিদ একসময় কুরাইশদের হয়ে উহুদের যুদ্ধে মুসলিমদের বিপক্ষে ছিলেন।]। তাঁর নেতৃত্বে একের পর এক যুদ্ধে মুসলিমরা জেতা শুরু করলে সবাই বলাবলি করা শুরু করলো, খালিদ থাকাতেই নাকি মুসলিমরা জিতছে। কিন্তু উমর (রাঃ) ভাবলেন, এটা ঠিক হচ্ছে না, বিজয় আল্লাহ তা'য়ালার পক্ষ থেকেই আসে, এই সত্য থেকে লোকজন দূরে সরে যাচ্ছে। আর তাই, তিনি খালিদ-বিন-ওয়ালিদ কে সেনাপতির পদ থেকে, যুদ্ধ থেকে সরিয়ে দিলেন। ইমাম বললেন, জনমত, সমর্থন খালিদের পক্ষে থাকলেও, উমর (রাঃ) সত্যকে প্রাধান্য দিয়ে এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
উমর (রাঃ)'র আরেকটা ঘটনা শেয়ার করলেন। যখন শুধু মাত্র একজন দাসকে সাথে নিয়ে, খুব সাধারণ কাপড়-চোপড়ে উমর (রাঃ) জেরুজালেমের দায়িত্ব নিতে রওনা হলেন, তখন তাঁকে নাকি অনেকেই বলেছেন তিনি মুসলিম খেলাফতের খলিফা, সেসময়ের অন্য রাজা-বাদশাদের মতো তাঁরও হয়তো আরো লোকজন সাথে নিয়ে, জৌলুসের সাথে সেখানে যাওয়া উচিৎ, তাছাড়া তাঁর সন্মান ক্ষুন্ন হবে। তার উত্তরে নাকি উমর (রাঃ) তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি দিয়েছিলেন, যা অনেকটা এইরকম: "আমরা এমন এক জনগোষ্ঠী যাদের আল্লাহ তা'য়ালা ইসলামের মাধম্যে সম্মানিত করেছেন। কাজেই যখনই আমরা [ইসলাম বাদে] অন্য কোনো কিছুর মাধ্যমে সন্মান খুঁজতে যাবো, আল্লাহ বরং আমাদের অপমানিত করবেন"।
[সবশেষ সাইডনোট: উমর (রাঃ)'র জীবনীর উপর একটা সিনেমা আছে। খুবই ভালো মেকিং, আমার দারুন লেগেছিল। নিচে লিংক দিয়ে দিচ্ছি]
উমর ইবন-আল-খাত্তাব সিরিজ: https://www.islamicity.org/9106/
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন