এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৭ নভেম্বর, ২০২৩): ফিলিস্তিন
এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (১৭ নভেম্বর, ২০২৩): ফিলিস্তিন
ইমামের নাম জানি না । মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি
[সাইডনোট/ডিসক্লেইমার]: এই শুক্রবারের খুতবা একজন নতুন ইমাম দিলেন, উনার নাম এখনো জানি না। একটু দেরিতে পৌঁছে যা শুনলাম, খুব সংক্ষেপে তাই লিখবো। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে উনি ফিলিস্তিন নিয়ে খুতবা দেন নাই। তাও আজকের লেখার টাইটেল 'ফিলিস্তিন' দিলাম কেননা এরপরে আসলে ফিলিস্তিন নিয়েই লিখবো। ফিলিস্তিনের ইতিহাস বাচ্চাদের জানানোর জন্য 'উম্ম আবদিল্লাহ' নামের এক লেখিকার একটা কমিক্স টাইপ ইনফো-গ্রাফিক্স বইয়ের পিডিএফ আমার মামাতো ভাই - সজীব ভাইয়া আমাদের গ্ৰুপে পোস্ট করেছেন। পড়ে দেখি, বাচ্চারা জানবে কী, আমি নিজেই তো অনেক কিছু জানতাম না। তাই ভাবলাম বাংলায় পয়েন্ট আকারে লিখে ফেলি, যদি অন্য কারো উপকারে আসে খারাপ কী! আর বইটার মধ্যেও লেখা আছে, বইয়ের পিডিএফ সবার সাথে শেয়ার করা যাবে, নিজের জন্য প্রিন্ট করাও যাবে, তবে শর্ত হচ্ছে প্রিন্ট করে বিক্রি করা যাবে না। লেখার শেষে তাই বইটার পিডিএফ-র লিঙ্কও দিয়ে দিচ্ছি।
ইমাম বললেন, আমাদের অনেকেই বাম-হাতি [তাঁর নিজের এক বাচ্চাও সম্ভবত বাম-হাতি]। আমাদের কেউ বাম হাত দিয়ে খেতে থাকলে দেখা যায় মুরুব্বি-গোছের কেউ এসে ডান হাত দিয়ে খেতে বলছেন [সাইডনোট: এই ঘটনার সাক্ষী আমি নিজেই। টেক্সাসের আর্লিংটনে মসজিদে ইফতারি করতে গিয়ে 'বাম-হাতি' এক বড় ভাই পাশে বসে বাম হাত দিয়ে খাচ্ছিলেন। এক মুসল্লি তখন এসে "ব্রাদার, রাইট হ্যান্ড, ইউস ইওর রাইট হ্যান্ড" বলে উনাকে শুধরিয়ে দিয়ে ছিলেন]। ইমাম বললেন, আমাদের বাচ্চারা অনেকেই আবার জিজ্ঞেস করে বসে, ডান হাত দিয়েই খেতে হবে কেন? বাম হাতে কী অসুবিধা? ইমাম বললেন, তার কারণ, রাসূল (সাঃ) আমাদেরকে ডান হাত দিয়ে খেতে বলেছেন। সেটাই বা কেন?
ইমাম বললেন, কুরআনে অনেক জায়গায়ই 'ডান-হাতি' দের প্রশংসা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আমলনামা যাদের ডান হাতে দেয়া হবে, তারাই সফল। তারাই জান্নাতি। আর যাদের বাম হাতে দেয়া হবে, তারা অসফল, জাহান্নামী। 'বাম হাতি' দের কেউ কেউ আবার তাদের হাত লুকিয়ে রাখতে চাবে, তারা পেছনে হাত রাখবে, তাদের পেছনে রাখা বাম-হাতেই তাদের আমলনামা দেয়া হবে। আর যেহেতু জান্নাত-জাহান্নাম, ডান হাত- বাম-হাত -- এই দুই অপশনই কেবল আছে, কাজেই আমরা সবাই ডান হাতেই আমাদের আমলনামা পেতে চাবো।
ইমাম বললেন, একজন মুসলিমের যেমন দুনিয়ার জীবন থেকে আখিরাতের জীবনের প্রতি বেশি লক্ষ্য রাখা উচিত, জান্নাতিদের সান্নিধ্য পাওয়ার আকাঙ্খা থাকা উচিত, কাজেই দুনিয়ার জীবনে তাঁদের অনুকরণ করার চেষ্টা করা উচিত। আর আখিরাতের সফলকাম এই 'ডান-হাতি'দের কথা মনে করিয়ে দেয়ার জন্যই মূলত আমাদের ডান হাত ব্যবহারে উৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু তাই বলে বাম-হাত ব্যবহারে দোষের কিংবা গুনাহর কিছুই নেই।
ইমাম সবশেষে মনে করিয়ে দিলেন, আলেমরাও মানুষ। তাদেরও ভুল হয়। তাদের কুরআন-হাদিসের ব্যাখ্যায় ভুল হতে পারে। তাঁরও ভুল হতে পারে। তাই যেকোনো আলেমের ব্যাখ্যাই ১০০% সঠিক ধরে নেয়াটা ঠিক না।
--------------
এবার ফিলিস্তিন প্রসঙ্গ: মসজিদের এক আলোচনায় 'সামি' নামের এক ফিলিস্তিনি-আমেরিকান সেদিন সংক্ষেপে বক্তব্য রাখলেন। ফিলিস্তিনে তাঁর পরিবারের ১৭ জন এই ঘটনায় মারা গেছেন। এর মধ্যে তাঁর আপন চাচা, চাচাতো বোন'ও আছেন। তিনি যখন বলছিলেন, ৪০ দিনেরও বেশি দিন ধরে চলা এই ঘটনায় আমরা অনেকেই এখন "মুভ-অন", বা এই প্রসঙ্গ এড়িয়ে, ভুলে যেতে চাচ্ছি। মানুষ মাত্রই আমরা বেশিদিন এক জিনিস নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চাই না। কিন্তু রাসূল (সাঃ)'র সহীহ হাদিসে আছে, মুসলিম উম্মাহ হবে একটা শরীরের মতো। কোনো এক অংশে কোনো অসুবিধা হলে, সমস্যা হলে, সারা শরীর সেই ব্যথা বা কষ্ট অনুভব করবে। আমরা কি ফিলিস্তিনের চলমান ঘটনায় কষ্ট পাচ্ছি? ব্যথিত হচ্ছি? -- এমনভাবে কথাটা বলছিলেন, যেন অন্তরে গিয়ে লাগছিলো, সবাই চুপ করে ছিলেন। এরপর তিনি তাঁর চাচা কিভাবে ফসফরাস বোমায় পুড়ে শেষে মারা গেলেন, চাচাতো বোনকে যখন বোমার স্প্লিন্টার বের করতে এনেস্থেসিয়া ছাড়াই অপারেশন করা হচ্ছিল, সেই ঘটনা বললেন, সেই বোনও পরে মারা গেছেন। সবশেষে বললেন, তিনি আমাদেরকে দুঃখিত করে তাঁর বক্তব্য শেষ করতে চান না, আশার কথা শুনিয়ে শেষ করতে চান। বললেন, তাঁর চাচা মারা যাওয়ার কিছু আগে নাকি তাঁর বাবার সাথে আলাপ হয়েছিল। তার চাচা তখন নাকি আঙুলে কিছু একটা গুনছিলেন। কী গুনছেন, জিজ্ঞেস করায় নাকি বলছিলেন, তিনি বেহেশতে গেলে ৭০ জনকে সাথে নিয়ে যেতে পারবেন। তিনি কাকে কাকে নিতে চান - সেটাই গুনছিলেন, সেখানে তার ভাই (ফোন দেয়া সেই ভাইও) আছেন। সামি বললেন, তিনি বেহেশতে যাচ্ছেন, তাঁর চাচার এতটাই 'ইয়াকিন' ছিল। পরে মারা যাওয়ার আগে নাকি তিনি উপরের দিকে তাকিয়ে বলছিলেন, তিনি বেহেশত দেখতে পাচ্ছেন। আর আগে মারা যাওয়া তাঁর ভাইদের নাম ধরে ডেকে বলছিলেন, তাঁদের তিনি দেখতে পাচ্ছেন, তিনি আসছেন তাঁদের সাথে মিলতে। এর কিছু পরেই মাথা এলিয়ে তিনি মারা যান। সামি বললেন, তিনি দোয়া করেন তাদের আর আমাদের সবার যেন এমন শহীদের মর্যাদায় মৃত্যু হয়।
--- ফিলিস্তিনের উপরে বাচ্চাদের বইয়ের মূল পয়েন্টগুলো, প্রতি পৃষ্ঠার বাংলা অনুবাদ: কেন ফিলিস্তিন মুসলিমদের কাছে এতো গুরুত্বপূর্ণ?
* ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে আছে 'মসজিদ-আল-আকসা' যা বায়তুল-মাকদিস নামেও পরিচিত।
* রাসূল (সাঃ)'র সহীহ হাদিসে আছে তিনি তিনটি মসজিদে অবশ্যই যেতে বলেছেন: মাসজিদ-আল-হারাম (কাবা, মক্কা), মাসজিদে-নববী (মদিনা) আর মাসজিদ-আল-আকসা (জেরুজালেম, ফিলিস্তিন)
* আরেক হাদিসে আছে, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, মাসজিদ-আল-আকসায় নামাজ পড়লে সেটা মাসজিদে নববীর নামাজের এক চতুর্থ (বা চার ভাগের এক ভাগ) সওয়াব হয়।
* এই মাসজিদ-আল-আকসাই মুসলিমদের প্রথম কেবলা (নামাজের দিক) ছিল।
* এই ফিলিস্তিন এতটা গুরুত্বপূর্ণ কেননা এই জায়গায়ই অনেক নবী-রাসূলের জন্ম, আগমন ঘটেছে। যেমন, ইব্রাহিম (আঃ) তাঁর ছেলে ইসহাক (আঃ) আর তাঁর নাতি ইয়াকুব (আঃ) কে নিয়ে এই ফিলিস্তিনেই বাস করতেন।
* আর এই ইয়াকুব (আঃ) -ই মাসজিদ-আল-আকসা বানান, যেটা মক্কার কাবা তৈরির প্রায় ৪০ বছর পর ছিল।
* ইয়াকুব (আঃ)'র আরেক নাম ইসরাইল (আঃ)। তাঁর ১২ জন ছেলে ছিল, যাদের অন্যতম হচ্ছেন ইউসুফ (আঃ)। ইয়াকুব বা ইসরাইল (আঃ)'র এই বারো ছেলের বংশই বনি-ইসরাইল নামে পরিচিত।
* ইউসুফ (আঃ) অনেক দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে দিয়ে বাধ্য হয়ে মিশরে গিয়েছিলেন। পরে তিনি মিশরের গভর্নর হন। আর তার পরেই তার পরিবারের বাকি ভাইদের তিনি মিশরে নিয়ে যান।
* অনেক যুগ পরে এই বনি-ইসরাইলকেই মিশরের ফেরাউন দাস বানিয়ে ফেলে। আল্লাহ তা'য়ালা পরে বনি-ইসরাইল জাতি থেকেই মুসা (আঃ) কে নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। আর এই মুসা (আঃ)-ই বনি-ইসরাইলকে মিশরের ফিরাউনের হাত থেকে বাঁচিয়ে, লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে, সিনাই মরুভূমিতে বের করে নিয়ে আসেন।
* যখন আল্লাহ তাদের ফিলিস্তিনে প্রবেশ করতে বলেন, তখন যুদ্ধের ভয়ে বনি-ইসরাইলের অনেকেই সেটা করতে রাজি হয় নাই, আর তখন তারা পরের ৪০ বছর সিনাই মরুভূমিতে বাস করতে থাকে।
* মুসা (আঃ) এরপর যখন পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিনে প্রবেশ করতে চান, তার আগেই তিনি মারা যান। এরপর আল্লাহ তা'য়ালা আরেকজন নবী পাঠান, যাঁর নাম ইউশা (আঃ)। এই ইউশা (আঃ) একজন সাহসী যোদ্ধা ছিলেন, তিনি পরে ফিলিস্তিন জয় করেন।
* অনেক বছর পর, আল্লাহ তা'য়ালা দাউদ (আঃ) নামের আরেকজন নবী পাঠান। আল্লাহ তা'য়ালা তাঁকে ফিলিস্তিনের রাজা বানান।
* এই দাউদ (আঃ)'র ছেলে হচ্ছেন সুলাইমান (আঃ), আল্লাহ তাঁকেও নবী করেন। আর সুলাইমান (আঃ) কে আল্লাহ এমন এক ক্ষমতা দেন, যেটা অন্য কোনো নবীকে দেন নাই:সুলাইমান (আঃ) বাতাস নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন, আর জিন আর পশুপাখিদের সাথে কথা বলতে পারতেন!
* এতদিনে ইয়াকুব (আঃ)'র বানানো সেই মাসজিদ-আল-আকসা ভেঙে পড়ে। সুলাইমান (আঃ) সেটা তাঁর লোকজন দিয়ে আবার বানান, ঠিক করেন।
* ফিলিস্তিন এরপর আরো অনেক নবীদের আবাসভূমি ছিল। তাঁদের মধ্যে আছেন: জাকারিয়া (আঃ), তাঁর ছেলে ইয়াহিয়াহ (আঃ), আরো আছেন মরিয়ম-পুত্র ঈসা (আঃ) ।
* ঈসা (আঃ)'র মা, মরিয়ম (আঃ) - এই ফিলিস্তিনে জন্মগ্রহণ করেন। আর মাসজিদ-আল-আকসার একটা ঘরেই তিনি তাঁর সারা জীবন আল্লাহ তা'য়ালার উপাসনায় ব্যয় করেন।
* ঈসা (আঃ) বনি-ইসরাইলকে অনেক বছর আল্লাহ'র পথে আহ্বান করেন। তাঁর নবূয়তের প্রমাণ হিসাবে অনেক অলৌকিক জিনিস দেখান।
* কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অনেকেই ঈসা (আঃ) কে মানে নাই, বরং তাঁকে মেরে ফেলার প্ল্যান করে। তখন আল্লাহ তা'য়ালা ঈসা (আঃ) কে উদ্ধার করে উপরে তুলে নেন, একদিন ঈসা (আঃ) আবার ফিরে আসবেন।
* আমাদের নবী মুহাম্মদ (সাঃ)'ও মাসজিদ-আল-আকসায় গেছেন। অলৌকিক মিরাজের রাতে তিনি মাসজিদ-আল-আকসায় বাকি সব নবীর নামাজে ইমামতী করেন
* আল্লাহ তা'য়ালা কুরআনে বলেছেন [সূরা আল-ইসরা, সূরা নম্বর ১৭, আয়াত ১]: মহিমাময় তিনি (আল্লাহ) যিনি তাঁর দাসকে ভ্রমণ করালেন রাতে মাসজিদ-আল-হারাম থেকে মাসজিদ-আল-আকসা, যার আশপাশকে আমরা করেছি কল্যাণময়, যাতে তাঁকে দেখাই আমাদের নিদর্শনাবলীর কিছু নিদর্শন, নিশ্চয়ই তিনি (আল্লাহ) সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
* এই রাতকে বলে 'ইসরা-আল-মিরাজ', এই রাতেই আমাদের নবী (সাঃ) মসজিদ-আল-আকসায় গিয়েছিলেন, পরে 'বোরাক' নামের এক সাদা প্রাণীতে চড়ে আসমানে গিয়েছিলেন
* আর এই রাতেই রাসূল (সাঃ) কে বলা হয়েছিল মুসলিমদের দিনে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে হবে।
* এর কয়েকবছর পর, রাসূল (সাঃ) জেরুজালেমকে বিজয় করতে সৈন্যবাহিনী প্ৰস্তুত করেছিলেন। উসামা-বিন-জায়েদ (রাঃ) কে তার সেনাপতি করেছিলেন। কিন্তু সেই সৈন্যবাহিনী রওনা হওয়ার আগেই রাসূল (সাঃ) মারা যান।
* উমর-আল-খাত্তাব (রাঃ)'র রাসূল (সাঃ)'র মৃত্যুর পর মুসলিম খেলাফতের দ্বিতীয় খলিফা ছিলেন। তিনি বিনা বাধায় জেরুজালেম বিজয় করেন, কারণ জেরুজালেমবাসি তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল।
* জেরুজালেমে মাসজিদ-আল-আকসার চত্তরে প্রবেশ করে, উমর (রাঃ) আর মুসলিমরা সেটা পরিষ্কার করে, সেই চত্বরেই মাসজিদ-আল-কিবলি নামে একটা মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন।
* উমর (রাঃ)'র সময় থেকেই বছরের পর বছর মুসলিম, খ্রিস্টান আর ইহুদিরা একসাথে মিলেমিশে ফিলিস্তিনে বসবাস করছিল।
* কাজেই তুমি দেখলে অনেক কারণেই ফিলিস্তিন ইসলাম আর মুসলিমদের কাছে কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ। দয়া করে ফিলিস্তিন আর এর লোকজনদেরকে তোমার দোয়ায় রেখো। আল্লাহ যেন মুসলিমদের রক্ষা করেন, পথ দেখান আর আমাদের সবাইকে মাফ করে দেন।
বইয়ের পিডিএফ-এর লিংক:
https://drive.google.com/file/d/1SHY5AyMtD0X74CtRmconLvQw7SIqtUzG/view?usp=sharing

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন