এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২৪ নভেম্বর, ২০২৩): আল্লাহ'র পরীক্ষা আর মুসিবত
এই শুক্রবারের জুমআর খুতবার সারমর্ম (২৪ নভেম্বর, ২০২৩): আল্লাহ'র পরীক্ষা আর মুসিবত
ইমাম ফারাজ । মুসলিম সেন্টার অফ গ্রেটার প্রিন্সটন, ওয়েস্ট উইন্ডসর টাউনশিপ, নিউ জার্সি
ইমাম খুতবায় বললেন, এই দুনিয়ায় মানুষের জীবনে একেক জনের একেকরকম অগ্রাধিকার থাকে। কারো হয়তো সুখ, কারো অনেক টাকা-পয়সা বা সুনাম, কারো হয়তোবা সন্মান আর ক্ষমতা পাওয়ার আকাঙ্খা থাকে। কিন্তু মুসলিম হিসাবে আমাদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর আল্লাহ'র সন্তুষ্টি পাওয়া যায় সবর আর শুকরিয়ার মাধ্যমে। ইমাম সবর আর শুকরিয়াকে তুলনা করলেন দুই পায়ের দুই স্যান্ডেল'র সাথে। বললেন, দুই পায়ে এই দুই স্যান্ডেল দিয়েই মুসলিমের জীবনে হেঁটে যেতে হবে।
এরপর ইমাম বললেন, [আমাদের হয়তো মনে নাই] কিন্তু মানুষ মাত্রই আমরা আল্লাহ তা'য়ালার সাথে প্রতিজ্ঞা করে এসেছি যে তিনি আমাদের রব আর আমরা তাঁর বিধান মেনে চলবো। আর মুসলিম হিসাবে আমাদের এই প্রতিজ্ঞার পরীক্ষা আমাদের প্রতিদিনই দিতে হয়। এরপর ইমাম সূরা আল-হাদীদের [সূরা নম্বর ৫৭, আয়াত ২২ - ২৪] রেফারেন্স দিলেন, যার অর্থ: "পৃথিবী বা তোমাদের উপর কোনো মুসিবত [বা দুর্যোগ, বিপদ] আপতিত হয় না, যা আমরা তা ঘটানোর আগেই বইয়ে [লিখিত, নির্ধারিত] আছে, নিশ্চয়ই এটা আল্লাহর জন্য [করা] সহজ"। ইমাম বললেন, আল্লাহ এই কথা আমাদের কেন বলছেন, সেটা তিনি পরের আয়াতেই ব্যাখ্যা করেছেন, যার অর্থ: "এটা এইজন্য যে, যাতে করে তোমরা বিমর্ষ না হও যা তোমরা হারাও, আর উল্লসিত না হও ওই বিষয়ে যা তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন।" ইমাম বললেন, এই আয়াতে কিছু হারিয়ে বা ক্ষতির মুখে পরে সবর আর কিছু পেয়ে শুকরিয়ার করার ব্যাপারে স্পষ্ট বলা হচ্ছে। আর এর বিপরীতে দুইটা জিনিস আল্লাহ ঠিক এর পরের দুই আয়াতেই বলেছেন, যে ব্যাপারে আমাদের সবার সাবধান-সতর্ক থাকতে হবে। আল্লাহ তা'য়ালা পরের দুই আয়াতে বলছেন, যার অর্থ: "এবং আল্লাহ ভালোবাসেন না [বা পছন্দ করেন না] প্রত্যেক উদ্ধত অহংকারীকে। আর যারা কৃপণতা করে আর কৃপণতার পরামর্শ দেয়।"
ইমাম বললেন, যারা কৃপণতা করে, তাদের অনেকেই সেটা করার কারণ হিসাবে বলে যে ভবিষ্যতে বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পেতেই তারা টাকা জমাচ্ছে। এ যেন তার আগের আয়াতে আল্লাহ'র বলা যে মুসিবত নির্ধারিত - সেটা থেকে বাঁচার একটা উপায় হিসেবেই, সেটাকে চ্যালেঞ্জ করতেই তারা যেন কৃপণতা করছে, টাকা জমাচ্ছে! এরপর ইমাম তাঁর নিজের এক অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেন। বললেন, তাঁর উপস্থিতিতে তাঁর শেখের (শিক্ষকের) কাছে এক মুসলিম ভাইকে তিনি বলতে শুনেছেন যে তিনি অনেক টাকা খুইয়েছেন। সেই ব্যক্তি আফসোস করে বলছেন, তার নাকি এতো জমানো টাকা ছিল যে সেটা দিয়ে একটা নয়, বরং দুইটা মসজিদ তৈরী করতে পারতেন। উত্তরে নাকি তাঁর শিক্ষক শেখ ওই লোককে বলেছিলেন, আপনি সুযোগ হারালেন, কিন্তু আশার কথা হচ্ছে, আপনার ভবিষ্যতে আবারো হয়তো সুযোগ আসবে।
এরপর উদ্ধত অহংকারীর উদাহরণ দিতে গিয়ে বললেন, গাজাতে বিদ্যুৎ, পানি, ঔষধ, জ্বালানি তেল বন্ধ করে দিয়ে উদ্ধত অহংকারীরা ভাবছে তারাই সব ক্ষমতার অধিকারী, কিন্তু একদিন তারা উপলব্ধি করবেই যে তারা ভুল ছিল। এরপর বললেন, আমরা নিজেরাও অনেক সময় উদ্ধত অহংকারী হয়ে যাই, যা আমরা উপলব্ধি করি না। আমরা শুধু আমাদের চোখ দিয়ে, চাহনির মাধ্যমেই সেটা করে থাকি। অন্যের অবস্থা, সেটা কারো গাড়ি, বাসা, পোশাক কিংবা সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা ছবি দেখে কিংবা বিয়ের আলাপে অপরপক্ষ পাত্র কিংবা পাত্রীর পরিবারের অবস্থার দিকে তাচ্ছিল্যভরে তাকাই, ভাবি আমার অবস্থা তো তাদের থেকে অনেক ভালো - এই যে তাকানো, এই ভাবনার মাধ্যমেও আমরা আসলে উদ্ধত অহংকারীর ভূমিকায় নামি।
ইমাম আমাদের সবাইকে সাবধান হতে স্মরণ করিয়ে দিলেন। কৃপণতা আর অহংকারী না হয়ে বরং আমরা কিভাবে সবর (ধৈর্য্য) আর শুকরিয়া দিয়ে জীবন গড়তে পারি সেই চেষ্টা করার উপদেশ দিলেন।
[সাইড নোট: ১) খুতবার পরে নামাজের সময়, দ্বিতীয় রাকাআতে ইমাম সূরা ফাতিহা পড়ার সময়, খুব সম্ভবত "ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তায়িন" - "আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি, আর শুধু তোমার কাছেই সাহায্য চাই" - পড়ার সময় কেঁদে উঠলেন। কান্না যেন আর কোনোভাবেই থামাতে পারছিলেন না।
২) আজকের এশার নামাজের সময় পেছন থেকে বাচ্চার কান্নার শব্দ হচ্ছিল। প্রায়ই হয়। কিন্তু আজকে হঠাৎ করেই ইমাম যেন একটু ইতস্তত করলেন। তারপর হঠাৎ তেলাওয়াত থামিয়ে দিয়ে রুকুতে চলে গেলেন। আমার একবার মনে হচ্ছিল, ইমাম বোধহয় সূরা তেলাওয়াত করতে গিয়ে পরের আয়াত ভুলে গেছেন। যাই হোক, নামাজ শেষে ইমাম বললেন, তিনি সূরা গাফির দিয়ে নামাজ পড়াচ্ছিলেন। তাঁর আরো কিছু পড়ার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু বাচ্চার কান্নার শব্দ শুনে নামাজ সংক্ষিপ্ত করার জন্যই তিনি থামিয়ে রুকুতে চলে গেছেন। বললেন, এটা রাসূল (সাঃ)'র সুন্নত। বাচ্চা আর তার মা-বাবার কষ্ট কমানোর জন্য, স্বস্তির জন্যই এমনটা রাসূল (সাঃ) করেছেন। এরপর ইমাম বললেন, আজকের কান্না করা বাচ্চার বাবা-মা যেন এতে লজ্জিত কিংবা অস্বস্তিবোধ না করেন। ইমাম বললেন, নামাজ পড়ার সময় বরং তাঁর উপলব্ধি হয়েছে, আমরা বাচ্চারা কান্না করুক সেটাই চাই, গাজার বাচ্চাদের মতো নিশ্চুপ, নিথর হয়ে পড়ে থাকা বাচ্চা দেখতে চাই না। এরপর তিনি গাজার সবার জন্য দোয়া করলেন।]
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন